‘অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান আমি! কৃষক বাবার কয়েক বিঘা জমির বেশির ভাগই অনাবাদি। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী; কোনো রকমে চলত সংসার! তাই বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারিনি। কৃষিকাজ করেছি, হাটে হাটে জুতা-স্যান্ডেল বিক্রি করেছি, সাইকেলের ব্যবসা করেছি। পরে শুরু করি বালুর ব্যবসা। কিন্তু ছিল না কোনো দোকান! একটা ভাঙা সাইকেল চালিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বালু বিক্রির চেষ্টা করতাম। একপর্যায়ে শুরু করি সিমেন্টের ব্যবসা। এ পণ্যটিই আমাকে এনে দেয় ব্যবসায়িক সাফল্য! এখন আমার গোডাউনসহ পাঁচটি দোকান; হরেক রকম ব্যবসা।’Ñএভাবেই নিজের সংগ্রামী জীবনের কথাগুলো অকপটে বলছিলেন সফল একজন ব্যবসায়ী মো. আব্দুল মান্নান। কাউন্সিল মোড়, কার্পাসডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গার ‘মান্নান ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী যিনি। আলাপচারিতার শুরুতে তাঁর কথায় দুঃখবোধ প্রকাশ পেলেও, শেষটায় ফোটে বিজয়ীর সাফল্য। যেন ‘হ্যাঁ আমি পেরেছি, শত প্রতিকূলতা জয় করে সফল ব্যবসায়ী হতে।’ বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-রহস্য। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. নাজমুল হোসেন।
ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নানের জন্ম ১৯৮৪ সালের ১৫ মার্চ চুয়াডাঙ্গা জেলার বাগাডাঙ্গায়। বাবা মরহুম মো. আব্দুস সাত্তার ও মা মোছা. রেহেদা খাতুন। বিয়ে করেন ২০০১ সালে। সহধর্মিণী মোছা. রূপসা খাতুন। এ দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে মো. ইসরাফিল হক রিমন কার্পাসডাঙ্গা ফাজিল মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট ছেলে মো. মিকাঈল হোসেন লিমন একই মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাল্যকাল থেকেই তিনি সংসারের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃষিকাজের পাশাপাশি জুতা-স্যান্ডেল, ভূসিমাল ও বাইসাইকেলের ব্যবসা করেছেন। ২০১১ সালে বালু ও বছর দুই পরে শুরু করেন সিমেন্টের ব্যবসা। বর্তমানে তাঁর ব্যবসাসম্ভারে রয়েছে সিমেন্ট, বালু, হার্ডওয়্যার, সেনেটারিওয়্যার, টাইলস, প্লাম্বিং সামগ্রী, রং, দরজাসহ নির্মাণসামগ্রীর যাবতীয় উপকরণ।
সিমেন্ট ব্যবসার শুরুতে আব্দুল মান্নান অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে; মাত্র ২০-৩০ ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি করতেন। বিক্রি কিছুটা বাড়লেও তা ১০০-১৫০ ব্যাগের বেশি হতো না। ফলে মুনাফাও হতো না আশানুরূপভাবে। অথচ এলাকায় পণ্যটির রয়েছে প্রচুর চাহিদা। একপর্যায়ে প্রতিবেশী ব্যবসায়ী হাসান ইমামের পরামর্শে অন্য সব সিমেন্টের পরিবর্তে শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট বিক্রি। গুণগতমানের এ পণ্যটি স্বল্পসময়ে তাঁকে এনে দেয় অনন্য ব্যবসায়িক সাফল্য। প্রচুর বিক্রি আর লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকায় স্থানীয় পরিবেশকও তাঁকে চাহিদামতো পণ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির চুয়াডাঙ্গা টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। ব্যবসা শুরুর দ্বিতীয় বছরেই হন দ্বিতীয় এবং ২০১৭-১৮ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হয়েছেন প্রথম। এমন অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, মোবাইল ফোন, ক্রোকারিজ সামগ্রী, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকার প্রভৃতি। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় অফার পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, নেপালসহ নানা দেশ ভ্রমণের।
সফল এ ব্যবসায়ীর অনন্য এই ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনে রয়েছে সীমাহীন পরিশ্রম। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি অবসর কাটাননি। কোনো কারণে ব্যবসায় মন্দা গেলে অথবা আশানুরূপ বিক্রি না হলে ক্ষেতে চলে যেতেন চাষাবাদ বা হালচাষ করতে। মানুষের সঙ্গে সহজেই মিশে যাওয়ার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। এই গুণটি ব্যবসা প্রসারে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। সব সময় চেষ্টা করেন গুণগতমানের পণ্য বিক্রি করতে। ওজনে কম দিয়ে বা অসৎ পথে এক পয়সাও আয়ের চেষ্টা করেননি। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ব্যবসায়। সিমেন্ট ব্যবসার চার বছরের মধ্যে নির্মাণ করেছেন পাকা বাড়ি, কিনেছেন ভূ-সম্পত্তি।
ব্যবসায়ী মান্নানের উত্থানের পেছনে যেমন রয়েছে নিজের ঐকান্তিক চেষ্টা, তেমনি বাবা-মায়ের দোয়া ও কিছু মানুষের সহযোগিতা। সংসারের উন্নয়নে তাঁর স্ত্রীর অবদান অপরিসীম। ব্যবসা শুরুর সময়ে এবং দরকারে ছোট বোনের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পান তিনি। প্রতিবেশী ব্যবসায়ী হাসান ইমাম এবং তাঁর ব্যবসায়িক অভিভাবক আকিজ সিমেন্ট পরিবেশক মো. রাহিনুর ইসলাম হিমালয়ের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই তাঁকে পণ্য, বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করায়।
বন্ধন ম্যাগাজিন পড়েন নিয়মিত। ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে সফল ব্যবসায়ীদের গল্পটি তাঁর কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। দীর্ঘ দিন যাবৎ তাঁদের জীবনী পড়তে পড়তে মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা জাগে, যদি কখনো তাঁর জীবনের গল্পটা ছাপা হয়! কিন্তু এই ইচ্ছেটার প্রকাশ কারও কাছেই করেননি তিনি। বন্ধনে প্রকাশের জন্য যখন তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। বন্ধন সেই সব সফল ব্যবসায়ীকে খুঁজে নেয়, যাঁরা শত প্রতিকূলতার মাঝেও ছিনিয়ে আনেন ব্যবসায়িক সাফল্য। তিনি শুধু সফলই নন, সার্থকও বটে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮