ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডম রোড
মাটি ভরাট কিংবা কাটার মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে নির্মাণকৃত বেইজ কোর্সের ওপর ধারাবাহিকভাবে ইট বা পাথরের খোয়া (কোর্স এগ্রিগেটস) বিছানো হয়। এরপর প্রথমে শুকনা অবস্থায় রোলার চালিয়ে কমপ্যাকশন করা হয়। অতঃপর স্ক্রিনিং ও বাইন্ডিং ম্যাটেরিয়ালস ফেলে পানি স্প্রে করার পর রোলার চালিয়ে কমপ্যাকশন করা হয়। অত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেকানিক্যাল ইন্টারলকিং নিশ্চিত করে যে রোড তৈরি করা হয়, তাকে ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোড বা সড়ক বলা হয়।
কাঁচা রোডের পর আসে ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোড। এরপর পর্যায়ক্রমিকভাবে সিমেন্ট কংক্রিট (সি.সি.) রোড, রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (আর.সি.সি) রোড এবং সর্বশেষ অ্যাজফালট কার্পেটিং রোডের প্রবর্তন আর প্রচলন। মানুষ তার দৈনন্দিন প্রয়োজনে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে উন্নয়ন সাধন করছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপেই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছানোর জন্য অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সেই ধারাবাহিকতায় রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের বিবর্তন সাধিত হয়েছে সময়ের ব্যবধান আর সামগ্রিক উন্নয়ন ও প্রয়োজনের তাগিদে। উপরোল্লিখিত রাস্তাসমূহের নির্মাণ এবং ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা-অসুবিধা বিচার-বিশ্লেষণ করে আমাদের দেশসহ বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশেই আজ অ্যাজফালট কার্পেটিং রোডই বহুল প্রচলিত। অত্র অ্যাজফালট কার্পেটিং রোড নির্মাণকল্পে সাব-গ্রেড হিসেবে ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডম করা হয়।
ফলে, ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডম রোডের নির্মাণপদ্ধতি এবং কাজ ও নির্মাণ সামগ্রীর মান সম্পর্কে সম্যক একটি ধারণা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হলো। ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোড নির্মাণকল্পে রাস্তার বেইজ কোর্স হিসেবে মাটি ভরাট করা কিংবা কেটে সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে আগের পর্বে আলোচিত কাঁচা রাস্তা তৈরির মতো একই নিয়মে সকল কাজ শেষ করে তার ওপর ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম করা হয়।
কাঁচা রোড তৈরির ক্ষেত্রে প্রচলিত সকল নিয়মনীতি অনুসরণ করে মাটির বেইজ কোর্স তৈরির পর নির্দিষ্ট ডিজাইন এবং অনুপাত অনুযায়ী মিশ্রিত বিভিন্ন গ্রেডের কোর্স এগ্রিগেট এবং স্ক্রিনিং ও বাইন্ডিং ম্যাটারিয়ালস স্তরে স্তর বিছিয়ে প্রথমে শুকনা অবস্থায় রোলার চালিয়ে কমপ্যাকশন করা হয়। এরপর পানি স্প্রে করে পুনরায় কমপ্যাকশন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে ওপরে মোটা বালুর পাতলা একটি স্তর বিছিয়ে পানি স্প্রে করে পুনরায় রোলিং করে ফিনিশিং দেওয়া হয়।
কোর্স এগ্রিগেট ফেলানোর সময় আলগা অবস্থায় কাক্সিক্ষত পুরুত্বের চেয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি পুরুত্বে মালামাল ফেলানো হয়ে থাকে। যাতে প্রয়োজনীয় কমপ্যাকশন করার পর কাক্সিক্ষত পুরুত্ব পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্তরের খোয়া-বালু সঠিকভাবে কমপ্যাকশন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পানি ছিটিয়ে পুনঃ পুনঃ রোলার চালানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। সর্বশেষে কমপ্যাকশন সঠিকভাবে হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করণার্থে ল্যাবরেটরি টেস্ট করতে হয়।
ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোডে ব্যবহৃত কোর্স এগ্রিগেটসের গ্রেডিং
ওপরের ছকে দেখানো গ্রেডিং আনুযায়ী গ্রেডিং নম্বর-১ প্রথম লেয়ারে এবং গ্রেডিং নম্বর-২ দ্বিতীয় লেয়ারে এবং গ্রেডিং নম্বর-৩ ওপরের বা তৃতীয় লেয়ারে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
কোর্স এগ্রিগেট হিসেবে ব্যবহৃত মালামাল
- স্টোন চিপস
- ওভার বার্ন্ট ব্রিকস
- কঙ্কর প্রভৃতি।
স্ক্রিনিং এবং বাইন্ডিং ম্যাটারিয়ালস হিসেবে ব্যবহৃত মালামাল
- বালু
- স্টোন ডাস্ট
- ব্রিক ডাস্ট
- স্টোন লাইম
- সিমেন্ট ইত্যাদি।
কোর্স এগ্রিগেট
ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোড নির্মাণকল্পে পুরুত্ব নির্ণয় এবং শক্ত ও মজবুত একটি বেইজ তৈরির লক্ষ্যে কোর্স এগ্রিগেট (স্টোন চিপস, ওভার বার্ন্ট ব্রিকস, কঙ্কর ইত্যাদি) ব্যবহার করা হয়।
পুনশ্চ: উপরোল্লিখিত কোর্স এগ্রিগেট বিছানোর সময় কাক্সিক্ষত কমপ্যাকটেড থিকনেস পাওয়া নিশ্চিত করণার্থে লুজ অবস্থায় ১২০ থেকে ১৪০ শতাংশ মালামাল ব্যবহার করা হয়। এসব মালামাল সাধারণত মিক্সিং প্ল্যান্ট থেকে মিক্স করে আনা হয়ে থাকে। অত্র কোর্স এগ্রিগেটের ওপর বিছানোর জন্য প্রতি ১০ বর্গমিটার এলাকায় ০.২৩ থেকে ০.৩৫ ঘনমিটার স্ক্রিনিং এবং বাইন্ডিং মালামাল প্রয়োজন হয়, যা কোর্স এগ্রিগেটের সাইজের ওপর নির্ভরশীল।
স্ক্রিনিং ম্যাটারিয়ালস
কোর্স এগ্রিগেটের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা পূরণ করার জন্য স্ক্রিনিং ম্যাটারিয়ালস ব্যবহার করা হয়। স্ক্রিনিং ম্যাটারিয়াল হিসেবে সাধারণত বিভিন্ন সাইজে ছোট আকারের কোর্স এগ্রিগেট ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর্থিক বিষয় বিবেচনা করে কঙ্কর, মুরাম অথবা গ্রাভেল স্ক্রিনিং ম্যাটারিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাইন্ডিং ম্যাটারিয়ালস
কোর্স এগ্রিগেট ও স্ক্রিনিং ম্যাটারিয়লসের ভেতরের ফাঁকাসমূহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে সুষ্ঠু কমপ্যাকশন নিশ্চিত করণার্থে বাইন্ডিং ম্যাটারিয়ালস (বালু, স্টোন ডাস্ট, ব্রিক ডাস্ট, স্টোন লাইম, সিমেন্ট ইত্যাদি) ব্যবহার করা হয়।
ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোড নির্মাণকল্পে প্রয়োজনীয় ধাপসমূহ:
- প্রিপারেশন অব সাব-গ্রেড
- প্রিপারেশন অব সাব-বেইজ
- প্রিপারেশন অব বেইজ কোর্স
- প্রিপারেশন অব ওয়ারিং কোর্স
- প্রিপারেশন অব শোলডার্স
- ওপেনিং টু ট্রাফিক।
উপরোল্লিখিত কাজগুলো একটির পর একটি পর্যায়ক্রমিকভাবে বিভিন্ন ধাপে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। সর্বোপরি, ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোডের কমপ্যাকশন নিশ্চিত করা এবং কাজের গুণগত মান রক্ষা করে রাস্তার স্থায়িত্বতা বাড়ানোর লক্ষ্যে যে কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করা অত্যাবশ্যক। যেমন:
- যথাযথ নিয়মানুযায়ী শক্ত ও মজবুত একটি বেইজ তৈরি করে নেওয়া।
- বেইজের ওপর সমান পুরুত্বে লেয়ারে লেয়ারে কোর্স এগ্রিগেটস বিছিয়ে দেওয়া।
- শুকনা অবস্থায় একবার রোলিং করা।
- এরপর স্ক্রিনিং এবং বাইন্ডি মালামাল ছড়িয়ে দেওয়া।
- অতঃপর পানি স্প্রে করে রোলিং করা।
- সবার ওপরে মোটা বালুর পাতলা একটি স্তর দিয়ে হালকাভাবে রোলিং করা।
ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোডের সুবিধা ও অসুবিধা:
সুবিধাসমূহ
- কংক্রিট কিংবা অ্যাজফালট রোডের তুলনায় খরচ কম।
- নির্মাণ ও মেরামত করা সহজ।
- সাধারণ লেবার দিয়েই তৈরি করা যায়।
- মেরামত খরচ কম।
অসুবিধা যত
- কংক্রিট কিংবা অ্যাজফালট রোডের তুলনায় চলাচলে আরামদায়ক নয়।
- কংক্রিট কিংবা অ্যাজফালট রোডের তুলনায় বহন ক্ষমতা কম।
- রোড সারফেস ধোয়া-মোছা করা যায় না।
- রোড সারফেসে পানিনিষ্কাশন করার ব্যবস্থা নেই।
- ট্রাফিক চলাচলে ধুলায় পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নষ্ট করে।
- বর্ষার পানিতে সহজেই নষ্ট হয়ে যায়।
- সর্বোপরি দীর্ঘস্থায়িত্বতা কম।
উপরোল্লিখিত সুবিধা আর অসুবিধাসমূহ বিচার-বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম রোড নির্মাণের প্রচলন ক্রমেই বিলুপ্তির পথে।
(চলবে)
ডিজিএম (কিউএ) অ্যান্ড এমআর
দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৩তম সংখ্যা, নভেম্বর, ২০১৮