ভেবে দেখুন তো, আপনি নিজের ড্রয়িংরুমে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। মাথার ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন কোনো কৃত্রিম ছাদ নয়, বরং আস্ত এক প্রাচীন গাছ ছাদ ফুঁড়ে উঠে গেছে খোলা আকাশের পানে! আবার খালি পায়ে ঘরের মেঝেতে হাঁটতে গিয়ে টের পেলেন, ঠিক পায়ের নিচ দিয়েই বয়ে চলেছে শীতল এক পাহাড়ি ঝরনা।
এটা কোনো কল্পকাহিনি নয়; ইট-কাঠের জঙ্গল থেকে বহুদূরে, খান্ডালার সবুজ পাহাড়ে ঘেরা ঠিক এমনই এক অমরাবতী বানিয়ে রেখেছেন বলিউডের ‘আন্না’ খ্যাত অভিনেতা সুনীল শেঠি। বাড়িটির নাম তিনি রেখেছেন ‘জাহান’। বাজার মূল্য প্রায় ২০ কোটি রুপির এক বিলাসবহুল খামারবাড়ি, কিন্তু আসল সত্য হলো এটি কেবল টাকার মহড়া নয়, প্রকৃতির প্রতি এক মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসার দলিল।
যেখানে প্রকৃতিকে সরিয়ে বাড়ি তৈরি হয়নি, বরং বাড়ির ভেতরে প্রকৃতি ডেকে নেওয়া হয়েছে
সাধারণত আমরা মানুষরা বাড়ি বানাতে গেলে কী করি? জমি ঝোপঝাড়মুক্ত করি, মাঝখানে থাকা গাছগুলো কেটে ফেলি, পাথর গুঁড়িয়ে সমান করি। কিন্তু সুনীল শেঠি হেঁটেছেন ঠিক উল্টো পথে।
বাড়িটি তৈরির সময় স্থপতিদের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল ‘এখানে যা যেভাবে আছে, তা সেভাবেই থাকবে। প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে তার চারপাশে ঘর তুলতে হবে।’
ফলে যা হলো, তা রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়:
- গাছ কাটেনি কাঠুরে: শতবর্ষী যে গাছগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেগুলোকে কেটেই ফেলা হয়নি। ঘরের নকশাই এমনভাবে করা হয়েছে যেন গাছগুলো সগৌরবে ঘরের ভেতর দিয়ে উঠে ছাদে গিয়ে ডালপালা মেলতে পারে।
- মেঝের নিচে ঝরনার সুর: পাহাড়ি এই জমিতে আগে থেকেই একটি স্বাভাবিক জলের ধারা বা ঝরনা বইত। এর গতিপথ বন্ধ না করে, তার ওপর দিয়েই বিশেষ প্রযুক্তিতে মেঝের ঢালাই দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘরে বসেই পাওয়া যায় ঝরনার একটানা কলতান।
- লিভিং রুমে বিশাল পাহাড়ের টুকরো: জায়গাটিতে থাকা একটি বিশাল প্রাকৃতিক পাথরকে সরানো অসম্ভব তো ছিলই, কিন্তু সুনীল সেটা সরানোর চেষ্টাও করেননি। পাথরটিকে ঘরের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অংশ বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
স্থপতিদের ভাষায় একে বলে ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’ যার সহজ অর্থ হলো, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই না করে তার কোলে আশ্রয় নেওয়া।
এক ছাদের নিচে মাটির ঘ্রাণ আর পরাবাস্তব বিলাসিতা
‘জাহান’-এ পা রাখলেই মনটা কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়। ঘরের দেয়ালে বা আসবাবে নেই কোনো চোখে ধাঁধা লাগানো কৃত্রিম রঙের প্রলেপ। সেখানে আধিপত্য মাটির রঙের বাদামি, সবুজ, লালচে আর কাঠের স্বাভাবিক উষ্ণতার।
সুনীল শেঠির ঘুরে বেড়ানোর খুব শখ। বিশ্ব ভ্রমণের সময় কুড়িয়ে আনা দেশ-বিদেশের দুর্লভ সব ঐতিহ্যবাহী কাঠের মুখোশ দিয়ে সাজানো হয়েছে বসার ঘরের একটি দেয়াল। তবে আসল চমক লুকিয়ে আছে রাতের বেলা। খোলা আকাশের নিচে আড্ডা দেওয়ার জন্য তৈরি বিশেষ জোনটিতে বোতাম চাপলেই পুরো ছাদটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরে যায়! মাথার ওপর তখন শুধু তারাভরা রাত আর মৃদু পাহাড়ি হাওয়া।
আর বাগানের দিকে তাকাতেই চোখে পড়বে সবুজ পাহাড়ের ক্যানভাসে মিশে থাকা এক বিশাল ‘ইনফিনিটি সুইমিংপুল’। পুতুলের ঠিক পাশেই ধ্যানে মগ্ন একটি বুদ্ধমূর্তি। সব মিলিয়ে সেখানে এমন এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করে, যা শহরের ব্যস্ত মানুষকে নিমেষেই ভুলিয়ে দেয় সব ক্লান্তি।
আমরা প্রায়ই বিলাসিতা মানে বুঝি উঁচু উঁচু কাঁচের দেয়াল, এসি আর বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলা। কিন্তু ৫৯ পার করা সুনীল শেঠি তাঁর এই খামারবাড়ি দিয়ে আমাদের অন্য এক শিক্ষা দিলেন।
হলিউড বা বলিউডের তারকাদের স্বপ্নের বাড়ি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কাঁচ আর কংক্রিটের তৈরি চোখ-ধাঁধানো বহুতল প্রসাদ। সত্যিকারের বিলাসিতা প্রকৃতিকে জয় করার মধ্যে নেই, বরং প্রকৃতিকে নিজের ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। খান্ডালার মেঘ-পাহাড়ের কোলে ‘জাহান’ তাই শুধুই একজন তারকার অবকাশ যাপনের ঠিকানা নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সুন্দর সহাবস্থানের এক জীবন্ত গল্প।
























