Collocium

ইতালিয়ানদের ২ হাজার বছরের আবেগ লুকিয়ে আছে কলোসিয়ামে

দুই হাজার বছর আগের কথা। মানুষ দলবদ্ধ হয়ে থাকতেই পছন্দ করতো। তখন ছিলো গোষ্ঠীভিত্তিক, এলাকা ভিত্তিক বসতি। ছিলো রাজা, রাজ্য আর প্রজাকূলও। ইতালির রোমে এটিই ছিলো তখন রাজ্যের প্রায় সবাইকে একসাথে জড়ো করে আনন্দ, বিনোদন, খেলাধুলা কিংবা সম্মেলনের জন্য আশ্চর্য এক স্থাপনা।

এখানেই রাজা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মকান্ডের আয়োজন করতেন। এর নাম কলোসিয়াম। এখানে প্রায় ৫০ হাজার দর্শক একসাথে বসে খেলা উপভোগ করতে পারতেন। বিশাল এই মুক্ত মঞ্চে সাধারণত গ্ল্যাডিয়েটরদের প্রতিযোগিতা এবং জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কোন প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহৃত হত।

৭০ থেকে ৭২ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে কোন এক সময় রোমান ফোরামের পশ্চিমে ভেসপাসিয়োনের রাজত্বের সময় এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো। শেষ হয়েছিলো তিতুসের রাজত্বকালে ৮০ খ্রিষ্টাব্দে। পরে দোমিতিয়ানের শাসনামলে এটির আরও পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়।

Collocium2
কলোসিয়ামের ভগ্নদশা। ছবি: সংগৃহীত

শুরুর দিকে এই কলোসিয়ামের নাম ছিলো ফ্ল্যাভিয়ান নাট্যশালা। ষষ্ঠ শতকের আগে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প ও অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো ফ্ল্যাভিয়ান নাট্যশালা। বর্তমানে আমরা যা দেখি তা অনেক পরিবর্তিত রূপ। বহির্তোরণের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বর্তমানে টিকে আছে।

ইতিহাস

খৃস্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দ থেকেই খুব ঘনবসতি গড়ে উঠে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের এই এলাকায়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে হঠাৎই অগ্নিকান্ডে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সর্বহারা মানুষ পথে বসে যায়। সে সময় রোমান সম্রাট ছিলেন নিরো।

মানুষের এ দুর্দিনে তিনি এক আদেশ জারি করে সমগ্র উপত্যকা নিজে করে নেন। উপত্যকায় নির্মাণ করেন এক বিশাল প্রাসাদ। বাগান আর লেক তৈরি করে সাজিয়েছেন চারপাশটা। প্রথম দিকে এই বিশাল প্রাসাদ ডোমাস ওরিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রাসাদের নির্মাণ শেষে এর সামনে কলোসাস অব নিরো নামে নিজের একটি বিশালাকার ভাস্কর্য স্থাপন করেন। নিরো পরবর্তী সম্রাট ভাস্কর্য থেকে নিরোর মাথা সরিয়ে নিজেদের মাথা সংযোজন করেন। এই ভাস্কর্যকে সম্রাটের বিশালত্ব ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে জনগনের সামনে তুলে ধরার চেস্টা করা হয়।

Shilalipi
কলোসিয়ামে উদ্ধারকৃত শিলালিপ। ছবি: সংগৃহীত

সম্রাটদের মাথার পরিবর্তে একসময় এপরো বা সূর্যদেবতার প্রতীক হিসেবে সোলার ক্রাউন সংযোজিত হয়। বিভিন্ন আলৌকিক ক্ষমতার কথনসহ কলোসাসের অস্তিত্ব ছিলো অনেকদিন। । রোমান সাম্রাজ্যের স্থায়ীত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা এই ভাস্কর্যকে।

নিরোর শাসনের পর আর কোন শাসক এ প্রাসাদের প্রতি কোন আগ্রহ দেখায়নি। তাই দিনে দিনে অযত্ন অবহেলায় জৌলুস হারিয়েছে প্রাসাদটি। চুরি হয়ে যেতে থাকে অনেক দামি দামি জিনিসপত্র। অনেক সময় পর নিরোর অত্যাচারের বিচারের উদ্যোগ নেন সম্রাট ভেস্পিসিয়ান। অবমুক্ত করা হয় নিরোর দখল করা উপত্যকা।

ভেস্পিসিয়ানের সময় জনপ্রিয় হয়ে উঠে গ্লাডিয়েটরিয়াল ফাইট বা মল্লযুদ্ধ। ভেস্পিসিয়ান নিরোর প্রাসাদটি ছেড়ে দেন গ্লাডিয়েটরদের জন্য। পরে দর্শকদের জন্যও উন্মুক্ত করে দেন গ্যালারি। নির্মাণ করেন বাড়তি স্থাপনা গ্লাডিয়েটরদের চর্চা ও প্রশিক্ষণের জন্য।

ফ্ল্যাভিয়ান নাট্যশালা থেকে কলোসিয়াম হয়ে উঠার গল্প

প্রাক মধ্যযুগ থেকে কলোসিয়াম বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে বেশি জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে আরো অনেক কাজেই ব্যবহার করা হতো। কখনও আবাসন, কখনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাক, তীর্থযাত্রীদের আবাসন, আবার কখনো দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে। খৃস্টান সমাধি হিসেবে একসময় কেউ কেউ দাবি করলেও এর কোন শক্ত দলিল পাওয়া যায় না।

Open Stage
কলোসিয়ামের বিশাল উন্মুক্ত মঞ্চ। ছবি: সংগৃহীত

৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে এম্পিথিয়েটার কাঠামোর মধ্যে একটি চ্যাপেলের নির্মাণ করা হয় বলে জানা যায়।  এরেনা বা মঞ্চ অংশটি সমাধি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বসার আসন সমুহের নিচের ভল্টেড ছাদাবৃত স্খানগুলো বসবাস এবং ওয়ার্কশপের কাজে ব্যবহার হতে থাকে এবং ১২ শতাব্দী পর্যন্ত এ ধারা চালু ছিলো। পরে প্রভাবশালী ফ্রাঞ্জিপানি পরিবার কলোসিয়ামকে দখল করে। তারা এটিকে তাদের দুর্গসদৃশ প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

গঠনশৈলী

কলোসিয়াম মুক্তভাবে দাড়িয়ে থাকা একটি মুক্তমঞ্চ। পাখির চোখে এই স্থাপনাটিকে ইতালিয়ান পাঁচ পয়সার কয়েনের মতো দেখতে মনে হয়। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে বৃত্তাকার মনে হলেও আসলে এটি উপবৃত্তাকার।

১৮৯ মিটার (৬১৫ ফিট / ৬৪০ রোমান ফুট) লম্বা এবং ১৫৬ মিটার (৫১০ ফিট / ৫২৮ রোমান ফুট) চওড়া। মোট ২৪০০০ বর্গমিটার এলাকা নিয়ে এর বিস্তৃতি। বাইরের দেয়ালের উচ্চতা ৪৮ মিটার (১৫৭ ফিট / ১৬৫ রোমান ফুট). ঘের মূলত ৫৪৫ মিটার (১৭৮৮ ফিট / ১৮৩৫ রোমান ফুট)।

কলোসিয়ামের মঞ্চটির আকার ডিমের মতো দেখতে। এটি দৈর্ঘ্যে ৮৭ মিটার এবং প্রস্থে ৫৫ মিটার। মঞ্চটি ৫ মিটার উচ্চতার একটি দেয়াল ঘেরা। এর উপর থেকেই আসন বিন্যাস শুরু। মঞ্চের নিচে সুরঙ্গাকারে অগভীর একটি প্যাসেজওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিলো। পশুদের আনা-নেয়া এবং গ্লাডিয়েটরদের যাতায়াতের জন্য এই প্যাসেজওয়েটি ব্যবহার করা হতো।

Sculpture
কলোসিয়ামের সামনে রাজাদের মূর্তি। ছবি; সংগৃহীত

ধারণা করা হয় বাইরের দেয়াল নির্মাণের জন্য এক লক্ষ ঘনমিটার ট্রাবারটাইন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিলো। দেয়ালটি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কোন মসলা ছাড়াই কেবল লোহা বা ব্রোঞ্জের ক্লাম্প ব্যবহার করা হয়েছিলো। এতে প্রায় তিনশ টন ক্লাস্প ব্যবহরা করা হয়েছে।

বিভিন্ন দুর্যোগের নানা ঘাত প্রতিঘাত মোকাবিলার পর বর্তমানের কলোসিয়ামের  যে অংশটি দাড়িয়ে আছে তা উত্তর অংশ। প্রত্যেক কোণায় ত্রিকোনাকৃতির ইটের তৈরী যে অংশ দেখা যায় তা আধুনিক সময়ের সংযোজন মাত্র।

কলোসিয়াম শুধু ইতালির একটি মুক্ত মঞ্চই নয় এটি ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক সম্মেলন। ইতালিয়ানদের হাজার হাজার বছরের আবেগ জড়ি এই কলোসিয়ামের সাথে। তার সঠিক সংরক্ষণ আরও হাজার বছর ধরে রাখবে পৃথিবীর বৈচিত্রময় ইতিহাসকে।

Related Posts

স্থাপত্য ও ডিজাইনের ছয় আয়োজন

প্রতি মাসেই বিশ্বজুড়ে স্থাপত্য ও নকশা বিষয়ক নানা প্রদর্শনী, উৎসব ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যা এই শিল্পের সৃজনশীলতা…

শব্দের সঙ্গে গড়ে ওঠা স্থাপত্য: তামা-মোড়ানো কনসার্ট হল লা সোর্স ভিভ

শব্দই কখনো কখনো একটি ভবনের রূপ, উপকরণ ও গঠন নির্ধারণ করে দিতে পারে। ফ্রান্সের এভিয়ানে সদ্য নির্মিত লা…

বাংলাদেশে টেকসই সড়ক নির্মাণ বাধ্যবাধকতা

বর্তমান বিশ্বে অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো সড়ক নির্মাণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান…

ওডিসি’র ম্যাট ডেমনের ৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবাসন সাম্রাজ্য

হলিউডের শীর্ষ তারকাদের পছন্দের রিয়েল এস্টেট বলতেই সাধারণত চোখে ভেসে ওঠে বেভারলি হিলসের চোখ-ধাঁধানো বিশাল ম্যানশন বা ম্যানহাটনের…