• Home
  • স্থাপত্য
  • হ্যাবিটাট ৬৭:একটা মাস্টার্স থিসিস যেভাবে হয়ে উঠল বিশ্বখ্যাত ভবন
Image

হ্যাবিটাট ৬৭:একটা মাস্টার্স থিসিস যেভাবে হয়ে উঠল বিশ্বখ্যাত ভবন

একটি বহুতল ভবন, অথচ দেখতে যেন বিশাল এক কংক্রিটের ভাস্কর্য বা লোগো। অথচ প্রায় ৬০ বছর আগে কানাডার মন্ট্রিয়লে ঠিক এমনই এক ভবন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল, আর তার নেপথ্যের স্থপতির বয়স তখন মাত্র ২৯ বছর। ৩৫৪টি একই আকৃতির কংক্রিটের ব্লক একটার উপর আরেকটা এলোমেলোভাবে সাজিয়ে গড়ে তোলা এই ভবনের নাম হ্যাবিটাট ৬৭ (Habitat 67), যা আজও আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত হয়।

থিসিস থেকে শুরু

হ্যাবিটাট ৬৭-এর গল্প শুরু হয় একজন স্থাপত্য ছাত্রের মাস্টার্স থিসিস থেকে। মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোশে সাফদি ১৯৬১ সালে “আ কেস ফর সিটি লিভিং” (A Case for City Living) শিরোনামে একটি থিসিস তৈরি করেন, যার মূল প্রশ্ন ছিল, ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় কীভাবে শহরতলির (সাব-আর্বান) বাড়ির মতো সুযোগ-সুবিধা, যেমন আলো-বাতাস, গোপনীয়তা এবং নিজস্ব বাগান দেওয়া সম্ভব। 

থিসিসে তিনি একটি ত্রিমাত্রিক মডিউলার নির্মাণ পদ্ধতির ধারণা তুলে ধরেন, যেখানে প্রি-ফেব্রিকেটেড কংক্রিটের একক ইউনিটগুলো একটার উপর আরেকটা সাজিয়ে আবাসন তৈরির কথা বলা হয়।

সাফদির থিসিসের মতো প্রতিটি ইউনিটে ছাদ, বারান্দা আর নিজস্ব বাগান। ছবি: উইকিপিডিয়া
এক্সপো ৬৭: কল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ

থিসিসের এই আইডিয়া বাস্তবে রূপ নেওয়ার সুযোগ আসে ১৯৬৭ সালে মন্ট্রিয়লে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এক্সপো ৬৭-এর মাধ্যমে। কানাডা সরকার সাফদিকে দায়িত্ব দেয় এক্সপোর জন্য একটি পাইলট আবাসন প্রকল্প তৈরির, যেখানে আবাসন ছিল অন্যতম উপ-প্রতিপাদ্য। সাফদি এই সুযোগে তার থিসিসের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন, জন্ম নেয় হ্যাবিটাট ৬৭। 

ভবনটি তৈরি হয় ৩৫৪টি অভিন্ন প্রি-ফেব্রিকেটেড কংক্রিট মডিউল দিয়ে। যেগুলো একটার উপর আরেকটা পিরামিড-সদৃশ বিন্যাসে সাজিয়ে সর্বোচ্চ ১২ তলা পর্যন্ত উঁচু করা হয়। প্রতিটি ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি করে ছাদ, বারান্দা ও নিজস্ব বাগানের সুযোগ ঠিক যেমনটা সাফদি তার থিসিসে কল্পনা করেছিলেন।

দেখতে যেন বিশাল এক কংক্রিটের ভাস্কর্য বা লোগো। ছবি: উইকিপিডিয়া
স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত

আইডিয়াটা যতটা রোমান্টিক শোনায়, বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন ছিল। নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বাজেট বারবার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং নির্মাণ খরচ হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী। ফলে যে মূল লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী গণ-আবাসন তৈরি করা সেই লক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যায়নি। 

ব্যয়বহুল নির্মাণ প্রক্রিয়ার কারণে হ্যাবিটাট ৬৭ হয়ে ওঠে সাধারণের নাগালের বাইরে, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয় সমাজের সচ্ছল ও অভিজাত শ্রেণির আবাসনে।

আজকের হ্যাবিটাট ৬৭

বর্তমানে হ্যাবিটাট ৬৭ একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেট রেসিডেন্স হিসেবে টিকে আছে। ২০০৯ সালে মন্ট্রিয়ল শহর কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ (historical monument) হিসেবে ঘোষণা করে, যা এর স্থাপত্যিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। মূলত সাশ্রয়ী গণ-আবাসনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, আজ এটি বরং বিশ্বস্থাপত্যের ইতিহাসের এক আইকনিক নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত।

২০০৯ সালে মন্ট্রিয়ল শহর কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করে. ছবি: উইকিপিডিয়া

একজন তরুণ স্থাপত্য ছাত্রের থিসিসের ধারণা, যা তৈরি হয়েছিল নিছক কল্পনা থেকে, তা কীভাবে ছয় দশক পরও বিশ্বজুড়ে স্থাপত্যপ্রেমীদের বিস্মিত করে চলেছে, হ্যাবিটাট ৬৭ তারই এক জীবন্ত প্রমাণ। আজ হ্যাবিটাট ৬৭ হয়তো আর সাশ্রয়ী গণ-আবাসনের প্রতীক নয়, কিন্তু এটি রয়ে গেছে মানবসৃষ্ট সাহসী কল্পনার এক অবিস্মরণীয় নিদর্শন হিসেবে।

তথ্যসূত্র

ইন্টারনেট

Related Posts

বৈচিত্র্যময় সাম্প্রতিক স্থাপত্যের এক ঝলক

স্থাপত্য জগতের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ডিজেইন প্রতি মাসে পাঠকপ্রিয় বাড়িগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অভিনব…

কানাডা আমেরিকাকে যুক্ত করলো যে সেতু

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে “গর্ডি হাও ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ”।…

ভারহুত স্তূপ: বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অতি প্রাচীন নিদর্শন

ভারতীয় উপমহাদেশ এশীয়ার প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ঐতিহ্যবাহী। ভোলগা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত অনেক পথ পরিক্রমায় আজ হয়তো আধুনিকতার হাওয়া…

ইতালিয়ানদের ২ হাজার বছরের আবেগ লুকিয়ে আছে কলোসিয়ামে

দুই হাজার বছর আগের কথা। মানুষ দলবদ্ধ হয়ে থাকতেই পছন্দ করতো। তখন ছিলো গোষ্ঠীভিত্তিক, এলাকা ভিত্তিক বসতি। ছিলো…

স্থাপত্য ও ডিজাইনের ছয় আয়োজন

প্রতি মাসেই বিশ্বজুড়ে স্থাপত্য ও নকশা বিষয়ক নানা প্রদর্শনী, উৎসব ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যা এই শিল্পের সৃজনশীলতা…

শব্দের সঙ্গে গড়ে ওঠা স্থাপত্য: তামা-মোড়ানো কনসার্ট হল লা সোর্স ভিভ

শব্দই কখনো কখনো একটি ভবনের রূপ, উপকরণ ও গঠন নির্ধারণ করে দিতে পারে। ফ্রান্সের এভিয়ানে সদ্য নির্মিত লা…

কিছু পাগলাটে স্থাপনা

ধরুন, রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন- হঠাৎ চোখের সামনে একটা বিশাল হাঁস দাঁড়িয়ে! ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ওটা আসলে একটা…

ইলেকট্রনিক মিউজিক ও স্থাপত্যের উত্তরাধুনিক ভাষার অদৃশ্য স্রোত

প্রকল্প পরিচিতি প্রকল্পের নাম: HATCH: SUBCURRENT (Main Stage)প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা: ইছহাক সিকদার, মৈনাক আহমেদ মৃদুল ও রাশাদ ওয়াজাহাতস্থপতি: প্রতীতি…

হাওরে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

সারোয়ার আলম বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যই বিশেষভাবে বিখ্যাত। তবে এটি দেশের অর্থনীতি,…