জাপানের নাগাসাকি প্রিফেকচারের ইসাহায়া শহরের কোনাগাই এলাকা পরিচিত এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের জন্য। এখানে রাস্তার ধারে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকে বিশাল আকৃতির ফল, যেগুলো আসলে যাত্রীদের বাসের জন্য অপেক্ষা করার আশ্রয়স্থল।
আরিয়াকে সাগরের তীর ঘেঁষে চলে যাওয়া ২০৭ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে এই স্থাপনাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর অবকাঠামো এবং একটি ভাস্কর্যধর্মী শৈল্পিক উদ্যোগ হিসেবে টিকে আছে দশকের পর দশক ধরে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল
১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত “জার্নি এক্সপোজিশন নাগাসাকি ১৯৯০” উপলক্ষে এই বাস স্টপগুলো তৈরি করা হয়েছিল। যখন কোনাগাই শহরটি ওই প্রদর্শনীতে প্রবেশের একটি পূর্বদিকের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছিল।

মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রদর্শনী উপলক্ষে আগত দর্শনার্থীদের নজর কাড়া। প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরও এই বাস স্টপগুলো এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে সেগুলো স্থায়ী স্থাপনা হিসেবে থেকে যায়, এবং প্রায় তিন দশক পরও যাত্রীরা এখনও এই ফলের ভেতরে বসে বাসের অপেক্ষা করেন।

নির্মাণ কৌশল: ভাস্কর্যের মতো কারুকাজ
এই কাঠামোগুলোর নকশা করেছে ইয়োশিতসুগু ইন্ডাস্ট্রিজ (Yoshitsugu Industries) এবং টাইম ডিজাইন অফিস (Time Design Office), আর নির্মাণকাজ করেছে ইয়োশিতসুগু ইন্ডাস্ট্রিজ। এই নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচলিত রাস্তার আসবাবপত্র তৈরির চেয়ে অনেকটা ভাস্কর্য গড়ার মতো।

প্রথমে ধাতব জাল (মেটাল ল্যাথ) দিয়ে কাঠামোর মূল অবয়ব তৈরি করা হয়। এরপর মর্টার দিয়ে ধীরে ধীরে আয়তন গড়ে তোলা হয়। শেষে রঙিন প্রলেপ দিয়ে প্রতিটি ফলকে তার নিজস্ব “বহিরাবরণ” দেওয়া হয়। এবং ডাঁটা ও পাতাগুলো সরাসরি কাঠামোর অংশ হিসেবে খোদাই করে গড়া হয়।

স্ট্রবেরি আকৃতির বাস স্টপগুলোতে এই শ্রমসাধ্য কারুকাজ সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রতিটি স্ট্রবেরিতে মূলত প্রায় ১৮০টি বীজ ছিল। যেগুলো আলাদাভাবে খালি ক্যানের কফির কৌটায় মর্টার দিয়ে ছাঁচে ফেলে তৈরি করে পরে হাতে বসানো হয়েছিল। বীজগুলো থেকে সূক্ষ্ম চুলের মতো অংশও বের করা হয়েছিল। আর ভেতরের বেঞ্চগুলোতে কাঠের গঠন অনুকরণ করে টেক্সচার দেওয়া হয়েছিল।

পাঁচ রকমের ফল, ষোলোটি স্থাপনা
কোনাগাই এলাকায় মোট ষোলোটি ফল-আকৃতির বাস স্টপ ছড়িয়ে আছে। যার মধ্যে চৌদ্দটি আরিয়াকে সাগরের পাশ দিয়ে যাওয়া প্রধান সড়কের ধারে অবস্থিত। এগুলো পাঁচ ধরনের ফলের আকৃতিতে গড়া। সেগুলো হলো- স্ট্রবেরি, তরমুজ, রকমেলন (ক্যান্টালুপ জাতীয় খরমুজ), কমলা এবং টমেটো। প্রতিটি বাস স্টপকে একটি করে ফাঁপা, ঘর-আকৃতির আশ্রয়স্থলে রূপ দেওয়া হয়েছে, যেখানে যাত্রীরা ঢুকে বসতে পারেন।

এখনো জীবন্ত অবকাঠামো
তিন দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এই বাস স্টপগুলো এখনও পুরোদমে কার্যকর গণপরিবহন অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে। যদিও এর মধ্যেই এগুলোর ছবি কোনাগাই এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছে। একজন যাত্রী যখন একটি স্ট্রবেরির ভেতরে ঢুকে তার পাতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন বাসের জন্য অপেক্ষার মতো একটি সাধারণ মুহূর্তও পরিণত হয় স্কেল ও কল্পনার এক ছোট্ট অভিজ্ঞতায়। প্রতিটি ছাঁচে গড়া বীজ আর অতিরঞ্জিত বক্ররেখা এই কাঠামোগুলোকে দশকের পর দশক ধরে রাস্তার পাশে নিজের জায়গা ধরে রাখার মতো উপস্থিতি দিয়েছে।

জাপানের কোনাগাই এলাকার এই ফল-আকৃতির বাস স্টপগুলো প্রমাণ করে যে দৈনন্দিন নগর অবকাঠামোও কল্পনাশক্তি আর নিখুঁত কারুকাজের মিশেলে হয়ে উঠতে পারে অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। একটি সাময়িক প্রদর্শনীর জন্য তৈরি হওয়া এই স্থাপনাগুলো আজ কোনাগাইয়ের পরিচয়ের অংশ, যেখানে কার্যকারিতা আর খেলাচ্ছলে মজার নকশা একসঙ্গে টিকে থাকে প্রতিদিনের যাত্রাকে করে তোলে একটু বেশি রঙিন।
সূত্র: ডিজাইনবুম
















