Varhut Sthup

ভারহুত স্তূপ: বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অতি প্রাচীন নিদর্শন

ভারতীয় উপমহাদেশ এশীয়ার প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ঐতিহ্যবাহী। ভোলগা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত অনেক পথ পরিক্রমায় আজ হয়তো আধুনিকতার হাওয়া লেগেছে যুগের পালে। তবে এর পেছনে আছে অনেক গল্প, অনেক ইতিহাস। অনেক শাসক, ধর্মযাজক, পণ্ডিত, অনেক ভিলেনেরও গল্প খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের পাতায়।

ভারহুত স্থূপ। ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ সভ্যতার ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। বৌদ্ধদের ইতিহাস যত সমৃদ্ধ, ততটাই বৈচিত্র্যময় এর স্থাপত্য ও শিল্পকলার ঐতিহ্যে। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন হলো ভারহুত স্থূপ (Bharhut Stupa)। মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম ভারহুতে অবস্থিত এই প্রাচীন স্থূপ শুধু একটি ধর্মীয় স্মৃতিস্তই নয়; এটি প্রাচীন ভারতের শিল্প, স্থাপত্য, সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল।

দৃশ্যত আজ ভারহুত স্থূপের মূল কাঠামো প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে এর খোদাই করা পাথরের রেলিং, তোরণ, শিলালিপি ও ভাস্কর্য বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং শিল্প গবেষকদের কাছে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ শিল্পকলার বিকাশ, শুঙ্গ যুগের স্থাপত্যরীতি এবং বুদ্ধের প্রতীকী উপস্থাপনা বোঝার ক্ষেত্রে ভারহুত স্থূপের গুরুত্ব অপরিসীম।

Gate
ভারহুত স্থূপের তোরণ। ছবি: সংগৃহীত

ভারহুত স্থূপ কোথায় অবস্থিত?

ভারহুত স্থূপ ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সাতনা জেলায় অবস্থিত। বর্তমান সময়ে এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। যদিও মূল স্থূপের অধিকাংশ অংশ আর টিকে নেই। তবে এখানকার বহু মূল্যবান ভাস্কর্য ও খোদাইকৃত পাথর ভারতের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

ভারহুত স্থূপের ইতিহাস

ভারহুত স্থূপের ইতিহাস বহু পুরনো। এই ইতিহাস শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে, যখন মৌর্য সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য স্তূপ নির্মাণ করেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, প্রথমে অশোক একটি সাধারণ ইটের স্তূপ নির্মাণ করেন। পরে শুঙ্গ রাজবংশের শাসনামলে, বিশেষ করে পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ও তাঁর উত্তরসূরিদের সময় এই স্তূপ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এই সময় লাল বেলেপাথরের রেলিং, অলংকৃত তোরণ এবং অসাধারণ ভাস্কর্য সংযোজন করা হয়।

এই সম্প্রসারণের ফলে ভারহুত স্থূপ একটি বিশাল ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

আবিষ্কারের ইতিহাস

অনেক শতাব্দী ধরে ভারহুত স্থূপ মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিলো। ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম এই স্থানের খননকার্য পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে বহু মূল্যবান ভাস্কর্য, শিলালিপি, স্তম্ভ, রেলিং ও তোরণের অংশ উদ্ধার করা হয়।

এই আবিষ্কার ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে অধিকাংশ ভাস্কর্য কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।

ভারহুত স্থূপের মূল স্থূপ ছিলো পুরো স্থাপত্য কমপ্লেক্সের কেন্দ্রবিন্দু। আজ এর অধিকাংশ অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, ভিত্তি, ইটের অবশেষ এবং উদ্ধারকৃত স্থাপত্য উপাদানের মাধ্যমে এর গঠন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

Terracota
ভারহুত স্থূপে খোদাই করা বিভিন্ন কাহিনীর চিত্রায়ণ। ছবি: সংগৃহীত

মূল স্থূপের নির্মাণ

ঐতিহাসিকদের মতে, মূল স্থূপটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অশোক-এর শাসনামলে নির্মিত হয়। এটি ছিলো পোড়া ইট দিয়ে নির্মিত একটি অর্ধগোলাকার (হেমিস্ফেরিক) গম্বুজ, যার ভেতরে বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন বা কোনো পবিত্র ধাতু সংরক্ষিত ছিলো বলে ধারণা করা হয়।

মূল স্থূপের গঠন

স্থাপত্যগতভাবে মূল স্থূপে কয়েকটি প্রধান অংশ ছিলো। এতে ছিলো অর্ধগোলাকার গম্বুজ। এটি ছিলো স্থূপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৌদ্ধ স্থাপত্যে একে “আণ্ড” বলা হয়। এটি পৃথিবী ও মহাবিশ্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। ভক্তরা এই গম্বুজে প্রবেশ করতেন না। তারা বাইরে থেকে প্রদক্ষিণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।

এই স্থূপে ছিলো পবিত্র ধাতু সংরক্ষণের কক্ষ। গম্বুজের ভেতরে একটি ছোট কক্ষে বুদ্ধ বা তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র বস্তু সংরক্ষিত ছিলো বলে ধারণা করা হয়। যদিও ভারহুত স্থূপে এমন ধাতু উদ্ধার হয়নি, তবে সমসাময়িক অন্যান্য বৌদ্ধ স্থূপের সঙ্গে মিলিয়ে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই স্থূপের মূল গম্বুজকে ঘিরে ছিলো প্রদক্ষিণ পথ। এটি ছিলো গোলাকৃতির। ভক্তরা ঘড়ির কাটা অনুযায়ী প্রদক্ষিণ করতো গম্বুজকে। এটি বৌদ্ধ উপাসনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্থূপের চারপাশে সুরক্ষার জন্য ছিলো পাথরের রেলিং। শুঙ্গ যুগে মূল ইটের স্থূপকে ঘিরে লাল বেলেপাথরের একটি অলংকৃত রেলিং নির্মাণ করা হয়। এই রেলিং শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং ধর্মীয় প্রতীক ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এই রেলিংগুলোতে অসংখ্য ফুল, লতাপাতা, প্রাণী, দেবতা, যক্ষ-যক্ষিণী, জাতক কাহিনি, অসাধারণভাবে খোদাই করা হয়েছে। রেলিংয়ের প্রবেশপথে অলংকৃত তোরণ ছিলো। এগুলোর ওপর জাতক কাহিনি, দেবতা, যক্ষ-যক্ষিণী, প্রাণী এবং বিভিন্ন প্রতীক খোদাই করা ছিলো।

মূল স্থূপের আকার ও পরিমাপ

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে মূল স্থূপের ব্যাস ছিলো প্রায় ২০–২১ মিটার (প্রায় ৬৮–৭০ ফুট)। এটি পোড়া ইট দিয়ে নির্মিত ছিলো। পরবর্তীতে এর চারদিকে পাথরের রেলিং যোগ করা হয়, যা পুরো স্থাপনাকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

কেন মূল স্থূপটি গুরুত্বপূর্ণ?

ভারহুতের মূল স্থূপটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি অশোক-যুগের বৌদ্ধ স্থাপত্যের একটি প্রাচীন নিদর্শন। এখানে বুদ্ধের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উপাসনা পরিচালিত হতো। পরবর্তী শুঙ্গ যুগে এর চারপাশে যে রেলিং ও ভাস্কর্য নির্মিত হয়, তা ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। সাঁচি, আমরাবতী ও অন্যান্য বৌদ্ধ স্থূপের বিকাশেও এর স্থাপত্যরীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

History
ভারহুত স্থূপের ঐতিহাসিক চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

ভারহুত স্থূপের ভাস্কর্য

ভারহুতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাস্কর্য। এখানে প্রায় প্রতিটি পাথরের অংশেই গল্প খোদাই করা ছিলো। এই ভাস্কর্যগুলো থেকে জানা যায় প্রাচীন ভারতের সমাজজীবন সম্পর্কে। তখনকার পোশাক, স্থাপত্য, যানবাহন, প্রাণী, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনীতি এবং লোকজ সংস্কৃতির প্রতিফলন ছিলো ভারহুত স্থূপের ভাস্কর্যগুলোতে।

বুদ্ধের প্রতীকী উপস্থাপন

ভারহুত স্থূপের শিল্পকলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে কোথাও বুদ্ধের মানবমূর্তি নেই। এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে ধর্মচক্র, পদচিহ্ন, বোধিবৃক্ষ এবং খালি সিংহাসনের মতো স্মৃতি বহনকারী নানা নিদর্শন।

এগুলো বুদ্ধের উপস্থিতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে উদ্ধারকৃত যে নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো বৌদ্ধ শিল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

জাতক কাহিনির চিত্রায়ণ

ভারহুত স্থূপে অসংখ্য জাতক কাহিনি খোদাই করা রয়েছে। জাতক কাহিনিতে বুদ্ধের পূর্বজন্মের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এসব কাহিনির মাধ্যমে বৌদ্ধের নৈতিক শিক্ষা, দান, করুণা, সত্যবাদিতা এবং ত্মত্যাগের গল্পই উপস্থাপন করা হয়েছে।

শিলালিপির গুরুত্ব

ভারহুত স্থূপে অসংখ্য ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা শিলালিপি পাওয়া গেছে। এসব শিলালিপি থেকে জানা যায় কোন সম্পত্তি কে দান করেছেন, কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন এসব তথ্য। দাতা কোন সম্প্রদায়ের ছিলেন,  কার অর্থায়নে নির্মাণ হয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া যায়। ফলে ইতিহাস গবেষণায় এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Varhut Main
ভারহুত স্থূপে ব্যবহৃত ইট। ছবি: সংগৃহীত

স্থাপত্যশৈলী

ভারহুত স্থূপের স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি মূলত মৌর্য যুগের সরল স্থাপত্য এবং শুঙ্গ যুগের অলংকরণশিল্পের এক অনন্য সমন্বয়। স্থাপত্যের দিক থেকে এটি এমন একটি নিদর্শন, যেখানে ধর্মীয় প্রতীক, ভাস্কর্য এবং প্রকৌশল একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ভারহুত স্থূপের মূল কাঠামো ছিলো একটি অর্ধগোলাকার ইটের গম্বুজ, যাকে বৌদ্ধ স্থাপত্যে “আণ্ড” বলা হয়। এটি বুদ্ধের পরিনির্বাণ এবং মহাবিশ্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। গম্বুজের ভেতরে পবিত্র ধাতু বা স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল বলে ধারণা করা হয়।

স্থূপটি একটি “বৃত্তাকার পরিকল্পনা” অনুসারে নির্মিত হয়েছিলো। এই পরিকল্পনা বৌদ্ধ ধর্মে চক্র, অনন্ত জীবন এবং ধর্মের ধারাবাহিকতার প্রতীক। ভক্তরা স্থূপের চারদিকে ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রদক্ষিণ করতেন, যা ধর্মীয় উপাসনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারহুত স্থূপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য হলো এর লাল বেলেপাথরের বেদিকা বা রেলিং। এই রেলিং মূল স্থূপকে ঘিরে নির্মিত হয়েছিল এবং এতে অসংখ্য খোদাই করা স্তম্ভ, আড়াআড়ি দণ্ড এবং বৃত্তাকার অলংকরণ (মেডেলিয়ন) ছিল।

ভারহুতের ভাস্কর্যগুলোকে বর্ণনামূলক ভাস্কর্য বলা হয়। প্রতিটি প্যানেলে একটি নির্দিষ্ট গল্প বা ঘটনা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভাস্কররা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ধর্মীয় আচার, রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং জাতক কাহিনিকে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

স্থাপত্যে সমমিতি ও জ্যামিতিক অনুপাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রেলিংয়ের প্রতিটি স্তম্ভ সমান দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছিলো এবং অলংকরণেও ছন্দময় পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, যা পুরো স্থাপনাকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে।

ভারহুত স্থূপে প্রধানত দুটি উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হলো পোড়া ইট যা দিয়ে মূল গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি লাল বেলেপাথর যা ব্যবহার করা হয়েছে রেলিং, স্তম্ভ, তোরণ ও অলংকরণের কাজে। এই উপকরণ দুটির সমন্বয় স্থাপনাটিকে দৃঢ়তা ও নান্দনিকতা দুটিই প্রদান করেছে।

যদিও স্থূপটির সূচনা মৌর্য যুগে, এর অধিকাংশ অলংকরণ শুঙ্গ যুগে সম্পন্ন হয়। শুঙ্গ শিল্পের বৈশিষ্ট্য যেমন সূক্ষ্ম রেখা, অলংকারময় নকশা এবং বাস্তবধর্মী প্রাণীচিত্র দেখা যায় এই স্থূপের স্থাপত্যশৈলীতে। এতে প্রকৃতিনির্ভর মোটিফ এবং শিলালিপির ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়।

স্থাপত্যগত গুরুত্ব

ভারহুত স্থূপের স্থাপত্যশৈলী ভারতীয় বৌদ্ধ স্থাপত্যের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর পরিকল্পনা, প্রতীকধর্মী শিল্প, বর্ণনামূলক ভাস্কর্য এবং অলংকৃত রেলিং পরবর্তী বহু বৌদ্ধ স্থাপনার নকশাকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে সাঁচি স্তূপ, অমরাবতী স্তূপ এবং অন্যান্য প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যে ভারহুতের শিল্পধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

Varhut
ভারহুত স্থূপের বর্তমান অবস্থা। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে ভারহুতের মূল স্থাপনা আর আগের মতো নেই। খননের পর অধিকাংশ নিদর্শন নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়েছে। কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে ভারহুত গ্যালারিতে এসব নিদর্শনের উল্লেখযোগ্য অংশ সংরক্ষিত রয়েছে।

যদিও ভারহুত স্থূপ বর্তমানে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এটি ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আন্তর্জাতিক গবেষণায় ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ভারহুত স্থূপ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হচ্ছে। বিশেষ করে বৌদ্ধ শিল্প, প্রত্নতত্ত্ব এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস এ গবেষণার মূল বিষয়। এছাড়াও  শিল্পকলার বিবর্তন, ধর্মীয় প্রতীক হিসেবেও ভারহূত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

ভারহুত স্থূপ শুধু একটি প্রাচীন বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নয়। এটি ভারতীয় সভ্যতার শিল্প, ধর্ম, সমাজ ও ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় সূচনা এবং শুঙ্গ যুগে শিল্পসমৃদ্ধ সম্প্রসারণের ফলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর রেলিং, তোরণ, শিলালিপি ও প্রতীকধর্মী ভাস্কর্য আজও গবেষকদের কাছে অমূল্য তথ্যভান্ডার।

ভারহুত স্থূপ আমাদের শেখায় স্থাপত্য কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়। এটি একটি সভ্যতার বিশ্বাস, নন্দনচেতনা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির বহিঃপ্রকাশ। তাই এই নিদর্শন সংরক্ষণ ও এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সবার দায়িত্ব।

সূত্র: ব্রিটানিকা, রোয়ার বাংলা

Related Posts

ইতালিয়ানদের ২ হাজার বছরের আবেগ লুকিয়ে আছে কলোসিয়ামে

দুই হাজার বছর আগের কথা। মানুষ দলবদ্ধ হয়ে থাকতেই পছন্দ করতো। তখন ছিলো গোষ্ঠীভিত্তিক, এলাকা ভিত্তিক বসতি। ছিলো…

স্থাপত্য ও ডিজাইনের ছয় আয়োজন

প্রতি মাসেই বিশ্বজুড়ে স্থাপত্য ও নকশা বিষয়ক নানা প্রদর্শনী, উৎসব ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যা এই শিল্পের সৃজনশীলতা…

শব্দের সঙ্গে গড়ে ওঠা স্থাপত্য: তামা-মোড়ানো কনসার্ট হল লা সোর্স ভিভ

শব্দই কখনো কখনো একটি ভবনের রূপ, উপকরণ ও গঠন নির্ধারণ করে দিতে পারে। ফ্রান্সের এভিয়ানে সদ্য নির্মিত লা…

কিছু পাগলাটে স্থাপনা

ধরুন, রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন- হঠাৎ চোখের সামনে একটা বিশাল হাঁস দাঁড়িয়ে! ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ওটা আসলে একটা…