ব্যবসা হোক আনন্দের সঙ্গী

একজন ব্যবসায়ী তাঁর ব্যবসাকে সফল করতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় পণ্য বিক্রিতে। যিনি যত পণ্য বিক্রি করবেন, তিনি ততই লাভবান হবেন। এটাই ব্যবসার সাধারণ সূত্র। কিন্তু এমন কিছু ব্যবসায়ী আছেন যাঁরা ব্যবসাকে শুধু মুনাফা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবেই দেখেন না বরং দীর্ঘ সময় ব্যবসায় টিকে থেকে সার্বিকভাবে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। এমনই একজন ব্যবসায়ী মো. আমির হোসেন। ঢাকার উত্তর যাত্রাবাড়ীর মেসার্স আমির ট্রেডার্স-এর কর্ণধার তিনি। নিজ ব্যবসা প্রসারের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি এলাকার অসংখ্য বেকার যুবককে তৈরি করেছেন ব্যবসায়ী হিসেবে। উদ্দেশ্য ছিল তরুণ এসব ব্যবসায়ীর মাধ্যমে নিজ ব্যবসার প্রসার ঘটানো, পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত মনোন্নয়ন সাধন। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এ সংখ্যায় জানব সফল এই ব্যবসায়ীর আদ্যোপান্ত। সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক জ্যেষ্ঠ বিক্রয় কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান। 

ব্যবসায়ী আমির হোসেনের জন্ম ১৯৬৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। বাবা হাজি মো. মিয়া চান সর্দার ও মা হাজি মোছা. মিলন বিবি। পিতা ছিলেন একজন গৃহস্থী। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড়। করাটিটোলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় সাংসারিক উন্নয়নে কৈশোরেই  প্রবেশ করেন কর্মজীবনে। বিদেশ যাওয়ার একান্ত ইচ্ছে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। এ জন্য নিজ এলাকায় গড়ে তোলেন একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। এরপর চলমান ব্যবসার সঙ্গেই এসটিএস বিডি লি. নামে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন একটি খাদ্যপণ্য কোম্পানি। এসব ব্যবসা নিয়ে কাটে এক যুগেরও বেশি সময়। কিন্তু এসব ব্যবসায় আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়ায় কিছুতেই যেন তৃপ্ত হতে পারছিলেন না ব্যবসায়ী আমির হোসেন। এই অতৃপ্তি থেকেই ব্যবসা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। ২০০১ সালে নতুন করে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। বিক্রি করতেন অ্যাঙ্গেল বার। পরে তাঁর ব্যবসাসম্ভারে যুক্ত হয় রড ও সিমেন্ট।

২০১৪ সাল পর্যন্ত ব্যবসায়ী আমির হোসেন খুচরা পর্যায়ে সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সম্ভাবনা দেখে নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসায় গভীর মনোযোগী হন। আগের ব্যবসাগুলোতে সফলতা না পাওয়ার জন্য যেসব কারণ দায়ী তা বাদ দিয়ে নতুন কৌশলে এগিয়ে যান। প্রথমেই প্রাধান্য দেন জনসংযোগের বিষয়টিকে। এ ছাড়া রাত পরিশ্রম করতে থাকেন। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ছুটে যান ব্যবসার প্রয়োজনে। কথা বলেন ভবন নির্মাতাদের সঙ্গে। তাঁদের গুণগতমানের পণ্য কেনার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলেন। তিনি সব সময় চেষ্টা করেন ক্রেতার কাছে পণ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে। এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরা তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নেন। এমনকি অত্র এলাকার অধিকাংশ স্থাপনা নির্মাণে তাঁর প্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবহৃত হয়। এভাবেই তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন একধরনের একচেটিয়া বাজার।

তাঁর এমন নিষ্ঠাদীপ্ত পদক্ষেপগুলোই এনে দেয় ব্যবসায়িক সাফল্য। এ জন্য তিনি খুচরা পর্যায়ে সিমেন্টের ব্যবসা করলেও ২০১৪ সালে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির একজন পরিবেশক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির একজন এক্সক্লুসিভ ডিলার। এ ব্যবসায়  উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় আর কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার স্বীকৃতিস্বরূপ কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন এসি, ল্যাপটপ, মোবাইল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী ও সম্মাননা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, তুরস্ক, চীন, সিঙ্গাপুর, মালেয়শিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অফারও পান প্রায়শ।

ব্যবসায়ী আমির হোসেন সংসার জীবন শুরু করেন ২০০১ সালে। সহধর্মিণী পলাশী আক্তার পান্না। এ দম্পতির এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. আকিব হোসেন পর্ণব মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও মেয়ে নুসরাত জাহান আমিশা একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। রড-সিমেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ইট ও বালুও সরবরাহ করেন। এ ছাড়া বিল্ডিং ডেভেলপিং ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। আমির হোসেন ব্যবসার পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক সেবামূলক কাজেও ব্যস্ত। তিনি বাগবাড়ি সূর্যকমল ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক, বাগবাড়ি বায়তুর রহমান জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক, বাগবাড়ি পঞ্চায়েতের একজন মাতুব্বর ও কবরস্থানের একজন সদস্য। আগে সিনেমা প্রযোজনা ও আমদানির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে এ ব্যবসা দেখছে তাঁর ছোট ভাই। বাগবাড়ি সূর্যকমল ক্লাবের উদ্যোগে বছরব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

বর্তমানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পণ্য বিক্রি করলেও তাতে তৃপ্ত নন ব্যবসায়ী আমির হোসেন। তিনি এ ব্যবসায় যথেষ্ট পরিশ্রম করেন বিধায় ব্যবসাটির আরও প্রসার ঘটাতে চান। নিজের এলাকায় যেমন আধিপত্য বিস্তার করেছেন, তেমনি তাঁর টেরিটরির অধীন পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতেও চান ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার করতে। প্রতি মাসে অন্তত ৫০ হাজার ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি করাই এখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর এমন অভিপ্রায়  পূরণ হয় এমনটাই প্রত্যাশা বন্ধন পরিবারের।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯১তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭।

Related Posts

ব্যবসার সাফল্যে চাই পরিকল্পনা

জীবন মানে যুদ্ধ; আর যুদ্ধে জেতার বড় উপায় কৌশল। তেমনি ব্যবসায় সাফল্য পেতেও হতে হয় কৌশলী; দিতে হয়…

ব্যবসায় সফলতায় চাই মনোবল

দেশের প্রাচীন জনপদ নওগাঁ। ছোট ছোট নদীবহুল বরেন্দ্র এ ভূমি প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিকাজের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায়…

সততায় যিনি আপসহীন

একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সকলে তাঁকে আদর্শ মানলেও ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে অনেক ব্যবসাতেই  হয়েছেন ব্যর্থ। ব্যক্তিজীবন ও সংসারেও…

ব্যবসায়ীকে হতে হবে সাহসী

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ। ঢাকার সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার; গড়ে উঠছে অসংখ্য…