উত্তরের শহর রাজশাহী। প্রমত্তা পদ্মা নদী তীরের এ বিভাগীয় শহরটি রেশমশিল্প, আম ও লিচুর জন্য প্রসিদ্ধ। শিক্ষা ও রেশম নগর নামেও বিশেষভাবে স্বীকৃত। তবে এসব বিশেষত্বকে ছাপিয়ে রাজশাহী এখন দেশের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন শহরের তকমা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তেমনটাই বলছে। পরিবেশবান্ধব এ নগরীটি ব্যবসা-বাণিজ্যেও এগিয়ে, যাতে অবদান রাখছেন সফল কিছু ব্যবসায়ী। মো. আবদুস সালাম (তুহিন) এমনই একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। শহরের গোরহাংগা, স্টেশন রোডের ‘মেসার্স প্রিয় ট্রেডিং করপোরেশন’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে সফল এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-কথন জানতে হাজির হয়েছি বরেন্দ্রভূমি রাজশাহীতে। সহযোগী আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. তরিকুল ইসলাম।
ব্যবসায়ী মো. আবদুস সালামের জন্ম ১৯৬৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুরে। বাবা মরহুম হাজি জামাল উদ্দীন ও মা মোছা. জাহানারা বেগম। ১৯৮৪ সালে রহনপুর এবি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৮৬ সালে ইউসুফ আলী মহাবিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৯ সালে একই কলেজ থেকে সম্পন্ন করেন স্নাতক। বাবা ছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী; আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করতেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনিও জড়িয়ে পড়েন বাবার ব্যবসায়। প্রথমে ব্রিক ফিল্ড, পরে রাইস মিল দিয়ে ব্যবসার শুরু। পাশাপাশি চলতে থাকে ঠিকাদারি। ২০০১ সালে জড়িয়ে পড়েন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির রাজশাহী ১, ২ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ টেরিটরির সম্মানিত পরিবেশক। এ ছাড়া আরও দুটি সিমেন্ট কোম্পানিসহ কেএসআরএম, এসএস স্টিল, সালাম স্টিল ও একেএস স্টিল কোম্পানির পরিবেশক।
আবদুস সালাম তুহিন বাবার হাত ধরেই ব্যবসার জগতে আসেন। তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র। বাবা ব্রিক ফিল্ড করতে তাঁকে কিছু টাকা দেন। সে অর্থ যথেষ্ট না হওয়ায় নানার কাছ থেকে শর্ত সাপেক্ষে অবশিষ্ট টাকা ধার নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ইটের ব্যবসা ও ঠিকাদারি করার সুবাদে নির্মাণপণ্য ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা পান। অনুভব করেন ব্যবসাটির সম্ভাবনা। ভাবনাটি বাস্তবায়ন ঘটান কিছুদিনের মধ্যে। ব্যবসার শুরু থেকেই গুণগতমান, সুলভ মূল্য ও সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতা আস্থা অর্জন করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, কৌশল এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় কয়েক বছরের মধ্যে তিনি শহরের অন্যতম নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। ব্যবসাটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন ওয়াশিম রেজা। সেরা বিক্রেতার সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যবসায়ী তুহিন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন অসংখ্য উপহার ও সম্মাননা। এ ছাড়া ভ্রমণ করেছেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। মিসর, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অফারও রয়েছে। শুরু দিককার ব্যবসাগুলোকেও উন্নীত করেছেন আরও আধুনিকতায়। একটি অটো রাইস মিল ও দুইটি অটো ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী তিনি।
আবদুস সালাম তুহিন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর আরেক পরিচয় তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, রহনপুর পৌর বিএনপির সভাপতি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ পদপ্রার্থী। এ ছাড়া নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িয়েছেন নিজেকে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ আন্তজেলা ট্রাক শ্রমিক সমিতির সদস্য এবং রহনপুর স্টেশন শাহি জামে মসজিদ, খান আজহারুল মাদ্রাসা, সংগীতা ক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি। তাঁর বিভিন্ন ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৫০ জন কর্মচারী।
ব্যবসায়ী তুহিন বিয়ে করেন ১৯৮৮ সালে। সহধর্মিণী মোর্শেদা বেগম পপি। এ দম্পতির তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া রাজশাহী কলেজে স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষে, মেজো মেয়ে সুরাইয়া পারভীন তনি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন দ্বিতীয় বর্ষে, ছোট মেয়ে উম্মে কুলসুম বৃষ্টি রাজশাহী মহিলা কলেজে প্রথম বর্ষে ও ছেলে সাদমান সাকিব প্রিয় প্যারাম প্রি-ক্যাডেট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ব্যবসা, রাজনীতি ও পরিবার নিয়েই তাঁর জগৎ। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলে ব্যবসায়িক ব্যস্ততার পর বাসায় নিজ পরিবারকে সময় দিতেই পছন্দ করেন। তাঁদের সান্নিধ্য সবসময়ই উপভোগ করেন।
ব্যবসায়ী আবদুস সালাম তুহিন অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছেন তাতেই হয়েছেন সফল। এই সফলতার ধারাবাহিকতায় শিক্ষানগরী রাজশাহীতে গড়ে তুলতে চান শিল্পকারখানা। সে লক্ষ্যে একটি থ্রি-স্টার হোটেল, কোল্ড স্টোরেজ, অটো রাইস মিলস ও অন্যান্য শিল্পকারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর এ ভাবনার মূলে রয়েছে নগরের প্রবহমান উন্নয়ন। এ নগর যত উন্নত হবে, এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ততই বাড়বে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।