সলোমন আর গগেনহ্যাম মিউজিয়াম
স্থপতি রাইটের অনবদ্য সৃষ্টি

সলোমন আর গগেনহ্যাম মিউজিয়ামকে (Solomon R. Guggenheim Museum) আমরা গগেনহ্যাম মিউজিয়াম নামেই চিনি সেই ১৯৫২ সাল থেকে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ১০৭১ ফিফথ অ্যাভিনিউ, ম্যানহাটনে অবস্থিত। এটা সেই বিখ্যাত মিউজিয়াম, যার বাইরের আর ভেতরের স্থাপত্যকলা দেখার জন্য সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকেরা আসেন। অনেকে এর বাইরের সৌন্দর্য দেখে প্রলুব্ধ নয়নে। প্রস্থান করার সময় চিন্তা করেন আর কিছু দেখার বাকি নেই তো! এমনকি মিউজিয়ামের ভেতরের শিল্পকলাগুলোও। কিন্তু শিল্পীরা কি এতে দমে যান? উত্তর, না। আর দমে যায় না মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষও। তাই দিনের পর দিন এখানেই জমা হচ্ছে ইম্প্রেশনিস্ট, পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট, মর্ডান ও কনটেমপরারি আর্টের বিশাল সংগ্রহ। সলোমন আর গগেনহ্যাম ফাউন্ডেশন এই মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৯ সালে।

১৯৫৯ সালে গগেনহাম মিউজিয়াম স্থান পরিবর্তন করে চলে আসে আজকের এই অবস্থানে। স্থানসংকুলান করতে না পারা ছিল এটির প্রধান কারণ। স্থপতি ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট পান এর ডিজাইনের দায়িত্ব। এর পরের বাকিটা শুধুই ইতিহাস।

সলোমন গগেনহ্যাম ছিলেন ধনী পরিবারের সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো একজন। তবে ছিলেন শিল্পের দারুণ সমঝদার। তাঁর ঘরে ছিল বিশাল আর্টের সংগ্রহ। ১৯২৬ সালে শিল্পরসিক হিলা ভন রিবের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। রিবে ছিলেন একজন উঁচুদরের শিল্পী। রিবে সলোমনকে ইউরোপিয়ান এভান্ত গ্রেড আর্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই এভান্ত গ্রেড আর্ট হচ্ছে একধরনের অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট, যা কি না স্পিরিচুয়াল ও ইউটোপিয়ান এস্পেক্টের কাজের ফসল। এই আর্ট দেখে গগেনহ্যাম তাঁর সংগ্রহ হঠাৎ করেই পরিবর্তন করেন। তিনি তাঁর সংগ্রহে নিয়ে আসেন কান্দিনস্কি থেকে শুরু করে সে সময়ের বিখ্যাত এভান্ত গ্রেড আর্টিস্টদের আর্ট পিসে। সলোমন এসব আর্ট পিসের সংগ্রহশালা মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন তাঁর প্লাজা হোটেলের বাসভবনে। ১৯৩৭ সালে তিনি তৈরি করেন সলোমন গগেনহ্যাম ফাউন্ডেশন।

রিবে সেই ফাউন্ডেশনের প্রথম এক্সিবিশন করেন ম্যানহাটন শহওে, ১৯৩৯ সালে। রিবের সাহায্যে গগেনহ্যাম বহু পুরোনো ও নতুন আর্ট পিসের সংগ্রহ বাড়াতে থাকেন। তাদের মাঝে ঠাঁই পায় রুডলফ বুওর, রিবে, ক্যান্ডিনস্কি, মন্ড্রিয়ান, মার্ক শ্যাগেল, রবার্ট ডিলনি, ফারনান্দ লিগে, আমিদিও মদিগ্লিয়ানি ও পিকাসো অন্যতম। কিন্তু ধীরে ধীরে ফাউন্ডেশন এসব আর্টের জন্য একটা সত্যিকারের স্থাপনা নির্মাণের চিন্তা করে। সময়টা তখন ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের। তিনি দিকে দিকে সুনামের সঙ্গে কাজ করছিলেন। সে সময় রিবে প্রথম ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটকে বলেন এমন একটি স্ট্রাকচার তৈরি করার জন্য, যা দেখে মনে হবে এটি শুধু আর্ট এক্সিবিশনের জন্যই বানানো। ফ্রাঙ্ক সেই সুযোগটাকে লুফে নেন। রিবে ১৯৪৩ সালে ফ্রাঙ্ককে একটি চিঠিতে লেখেন, ‘বাড়িটি হবে একটি মন্দিরের মতো। টেম্পল ওব লাইট থিম নিয়ে কাজ করতে পারো।’ ওই একটি কথাই ফ্রাঙ্কের ডিজাইনকে গাইড করেছিল। তাতে লেগেছিল ৭০০ স্কেচ, ৬ সেট ওয়ার্কিং ড্রয়িং এবং টানা ১৫ বছর। এরপর সৃষ্টি হয়েছিল গগেনহ্যাম। সুবিখ্যাত সেই গগেনহ্যাম মিউজিয়াম। ১৯৪৯ সালে গগেনহ্যামের মৃত্যুর পর এই মিউজিয়ামের বোর্ড ট্রাস্টিগণ মিলে এর নাম দেন ‘সলোমন আর গগেনহ্যাম মিউজিয়াম’।  

আর্কিটেকচারাল ডিজাইন

রিবে যে ধারণাটি দিয়েছিলেন, সেটা ছিল ‘টেম্পল অব স্পিরিট’ বা ‘শক্তির মন্দির’। মিউজিয়ামটি হবে একটি মন্দির, যা নতুন শিল্পকলাকে ধারণ করবে। পেইন্টিংগুলো ঝোলানো থাকবে এবং মানুষ দেখতে দেখতে নামতে থাকবে। তিনি রাইটকে চিঠিতে লেখেন, ‘একটি স্পেসে এ পুরো বাড়িটি অর্গানাইজড হয়ে থাকে। পৃথিবীর সব বিখ্যাত স্থাপনাই এমন। এবং আমি জানি, একমাত্র আপনিই তা করতে পারবেন। আমি চাই একটি মন্দির। শক্তির মন্দির, যার ভেতরের শক্তি হলো আর্ট পিসসমূহ।’

এ সম্পর্কে পল গোল্ডবার্গার লিখেছেন, এই স্থাপনাটির আগে মিউজিয়ামের মর্ডান স্থাপনা ছিল মাত্র দুটো। একটা হলো বিওক্স আর্টস প্যালেস, অপরটি ছিল ইন্টারন্যাশনাল স্টাইল প্যাভিলিয়ন। গোল্ডবার্গার ভেবেছিলেন এই বাড়িটা হবে এমন একটি স্থাপনা, যা কি না সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এবং হয়েছেও তা-ই। এই গগেনহ্যাম শেষমেশ সে সময়কার এমন এক উচ্চতায় ওঠা মিউজিয়াম, যাকে এখনো সব মিউজিয়ামের পিতা বলে ধরা হয়।

১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৪ সালের শুরু পর্যন্ত রাইট চারটি কনসেপচুয়াল স্কেচ প্রদান করেন। এর মাঝে প্রতিটিতেই স্থপতি একটি সুবিশাল র‍্যাম্প ডিজাইন করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তিনি নিজের সন্তানের জন্য ১৯৫২ সালে ডিজাইন করা বাড়িটিতে প্রথম এটি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেন। বাড়িটির নাম ছিল David & Gladys Wright House.  অ্যারিজোনায় অবস্থিত বাড়িটির মতো ছিল না গগেনহ্যাম। গগেনহ্যামের কনসেপ্ট হিসেবে রাইট বেছে নিয়েছিলেন প্রাচীন মন্দির ‘জিগুর‍্যাত’ (ziggurat) থেকে। এই শক্তির মন্দির ঠিক উল্টো জিগুর‌্যাতের মতো। জিগুর‌্যাতে ছিল একটি সুবিশাল সিঁড়ি বেয়ে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর প্রচ্ছন্ন ব্যবস্থা। কিন্তু রাইট চিন্তা করেছিলেন মানুষকে প্রথমেই একটি এলিভেটর দিয়ে ওপরে একেবারে ছাদে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে র‌্যাম্প দিয়ে নামানোর। নামতে নামতে মানুষ আবিষ্কার করবে এক সুবিশাল শিল্পসম্ভার। 

বাড়িটির স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে একেবারেই রাস্তার পাশের কর্নার প্লট নির্ধারণ করা হয়েছিল। রাইট অনেক সাইট থেকে এই সাইটটি বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘পুরো শহরের যানজট আর চিৎকার থেকে এই মিউজিয়াম মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও অব্যাহতি দেবে।’ এবং হয়েছিলও তা-ই। রাইট অর্গানিক আর্কিটেকচার নিয়ে গবেষণা করেছেন এর আগেও। এই মিউজিয়ামে ঢেলে দিয়েছিলেন সেসব গবেষণালব্ধ জ্ঞান। অর্গানিক আর্কিটেকচারের মূল থিমের প্রধান রসদ জোগানদাতা হিসেবে তিনি মনে করতেন বাড়ি সাজানো হবে তাঁর ম্যাটেরিয়েলসগুলোর আসল রূপে। একে পলিশ করার পরের চেহারা দিতে তিনি ছিলেন নারাজ। একেবারেই অর্গানিক লুক দিয়েছিলেন ফলিং ওয়াটার স্থাপনাটিতে। এই স্থাপনাটিতেও এমন একটি লুক দিতে চেয়েছেন যেন প্রকৃতি নিজের হাতে বানিয়েছে এটি। রাইট এর আগের স্থাপনাগুলোয় ভার্টিক্যাল ডিজাইন বেশি করেছিলেন। কিন্তু এখানে এসে তিনি প্রথমবারের মতো হরাইজন্টাল ফর্ম নিয়ে কাজ করলেন। রাইট রিজিট ফর্ম নিয়েও কাজ করলেন। মানুষের চিন্তাভাবনা-অনুভূতি নিয়ে আর্কিটেকচারাল ডিজাইন করার মতো চিন্তা-চেতনার জনক রাইট এখানে নিজেকে ঢেলে দিলেন শতভাগ। এখানে বৃত্তাকার পাঞ্চগুলো ইনফিনিটি বোঝাতে, ত্রিভুজ স্ট্রাকচারগুলোকে ইফনিটিই বোঝাতে, স্পাইরাল র‌্যাম্পকে অর্গানিক চলাচল বোঝাতে ব্যবহার করেছেন অবলীলায়।

এই বাড়িটির বাইরের সারফেস নির্মাণ করা হয় কংক্রিট দিয়ে, যেন এর বিল্ডিং কস্ট কমে আসে। এতে দেওয়া হয়েছিল পাথরের ফিনিশিং, যেমনটা রাইট চেয়েছিলেন তেমন করেই।

উইকিপিডিয়া

সমলোচনায় স্থাপনাটি

গগেনহ্যাম মিউজিয়ামের উদ্বোধন হওয়ার আগে থেকেই ক্রিটিক তথা সমালোচকেরা এটা নিয়ে সমালোচনার ঝড় তোলেন। কিছু লোক বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে এখানে লাইট কোনোভাবেই পেইন্টিংয়ের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। বিল্ডিংয়ের ছায়ায় ঢেকে নষ্ট হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেন যে ছবিগুলো বাঁকানো দেয়ালে ঝোলানোর জন্য মানুষ দেখতে পাবে না ঠিকমতো। এসব বিতর্কের মধ্যে ২১ জন শিল্পী মিলে চিঠি দেন মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের কাছে যেন তাঁদের ছবিগুলো টানানো না হয়। এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ লুইস মামফোর্ড বলেন, ‘Wright has allotted the paintings and sculptures on view only as much space as would not infringe upon his abstract composition. …(He) created a shell whose form has no relation to its function and ofered no possibility of future departure from his rigid preconceptions. [The Promenade] has, for a museum, a low ceiling-nine feet eight inches [liiting painting size. The wall] slanted outward, following the outward slant of the exterior wall, and paintings were not supposed to be hug vertically or shown in their true plane but were to be titled back against it. …. Nor [can a visitor] escape the lght shining in his eyes from the jnarrow slots in the wall.’

২১ অক্টোবর, ১৯৫৯। সলোমন গগেনহ্যাম মারা যান এরও বছর দশেক আগে। আর মহান ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট মারা যান এর ছয় মাস আগে। মিউজিয়ামে শুরু হয় প্রদর্শনী। এবং বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করল অনন্য এক সাধারণ স্থাপনা, যা পরে অন্য স্থপতিদের কাছে বিরল এক নিদর্শন হয়ে আছে আজতক।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts
Scroll to Top