আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমাগত বিরূপ পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক জলবায়ু, মনুষ্য করাল ঘাতসহ নানা কারণে ধ্বংস হচ্ছে বিশে^র বৃহৎ রেইনফরেস্ট ‘আমাজন’। গত ৪০ বছরে আমাজনের প্রায় ২০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। শুধু ২০০৪ সালেই উজাড় হয়েছে আমাজনের ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার বন। ব্রাজিলে আমাজনের উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে ২০১৯ সালে ব্রাজিলিয়ান স্পেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী রেকর্ডসংখ্যক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ (আইএনপিই) বলছে, তাদের উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় এ বছর আগুন লাগার ঘটনা বেড়েছে ৮৫ শতাংশ। সরকারি হিসাব বলছে, এ বছরের প্রথম আট মাসে শুধু ব্রাজিলের বনে ৭৫ হাজারের বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন কারণে এ বন উজাড় হচ্ছে। অবৈধ কাঠ বিক্রি, কৃষিজমি, পশুর চারণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও সোনার খনি খুঁজে বেড়ায় সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা। এতে শুধু বনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং বনের নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় এমনকি তামাম বিশ^। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, মহাবন আমাজনে স্বল্পপরিসরে হলেও মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে গুটিকয়েক গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
ধারণা করা হয়, আমাজনের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৪০০-র বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস। সব মিলিয়ে এদের জনসংখ্যা দুই লাখের মতো। এদের মধ্যে আমাজনের গভীরে অনেক নৃগোষ্ঠী আমাদের তথাকথিত সভ্যতার সঙ্গে একবারেই অপরিচিত। আর যারা পরিচিত, তাদের বসবাস আমাজন নদী বা তথাকথিত সভ্য দেশগুলোর কাছাকাছি। বিশ্বের বৃহত্তম নদীর অববাহিকায় এই আমাজন। এটি দক্ষিণ আমেরিকার ৪০ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি গ্যালন পানি আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলছে। এটি যখন পেরু অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন এর মোট প্রবাহের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ চলে আসে, এই অবস্থাতেও এটি বিশ্বের যেকোনো নদীর চেয়ে আকারে অনেক বড়। দুর্ভাগ্যক্রমে এই বিশাল জলপ্রবাহ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও কৃষিবর্জ্য এবং এর সঙ্গে আশপাশের মানুষের পয়োনিষ্কাশন মিলিয়ে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে এই জলধারা। ফলে এই জলধারার আশপাশে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে দারুনভাবে। ওরা ভুগছে বিভিন্ন ধরনের রোগে। আমাজন নদীর পাশেই পেরুর ছোট্ট এক গ্রাম মার্সিকাল ক্যাসিলা (Mariscal Castilla)। এ গ্রামের জনবসতি মাত্র ১৫০ জন। এদের সবাই দৈনন্দিন কাজে পানির জন্য নির্ভরশীল আমাজন নদীর ওপর। কিন্তু এর দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে সবাই ভুগছে কোনো না কোনো অসুস্থতায়। এক দিকে বন উজাড় হওয়া, অন্য দিকে পানিদূষণ। এসবের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, আমাদের সভ্য সমাজই এর জন্য দায়ী। তবে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল যে কেউ নেই তা বলা যাবে না! এমননি একটি দল আমেরিকার সেন্ট্রাল হিউস্টোনভিত্তিক ইঞ্জিনিয়ার্স উইদাউট বর্ডার্স (Engineers Without Borders)। তারা কাজ করছে মার্সিকাল ক্যাসিলা গ্রামের মানুষের জন্য। ইঞ্জিনিয়ার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর কাজটা ছিল তাদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা।
২০১৭ সালে ওরা প্রথমবারের মতো মার্সিকাল ক্যাসিলা গ্রামে যায়। এখানে গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা হয়। এখানে তাদের প্রধান সমস্যা ছিল সুপেয় খাবার পানির। নদীর পানি দূষিত হওয়ার কারণে তা খাওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের পেটের পীড়ায় ভুগতো তারা। আশপাশে কিছু ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা থাকলেও তা ছিল বিস্বাদ ও গন্ধযুক্ত, তাই তা ছিল পানের অনুপযোগী। খাবার পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে তাদের গ্রামের অনেক মানুষ সেখান থেকে সরে গেছে। এমনকি তাদের কাছাকাছি কয়েকটি গ্রামই সেখান থেকে চলে গেছে। এখানে বলে রাখতে হয় যে এই গ্রামে যেতে হলে আমাজন নদী ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তাই কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সহজে চিকিৎসা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এখানে। আর তাদের নিজস্ব চিকিৎসাব্যবস্থা এসব সভ্য অসুখের চিকিৎসায় তেমন কার্যকরও নয়। ফলে কেউ ই-কোলির মতো ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যু ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাদের ভাগ্যটা এমনই যে সারা বিশ্বের খাবার পানির অন্যতম প্রধান যে দুটি উৎস নদী ও ভূগর্ভস্থ পানি, সে দুটিই তাদের জন্য সহজলভ্য হলেও এর কোনোটিই ব্যবহারোপযোগী নয়। বলাবাহুল্য এখানে পানি পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। আসলে এসব প্রকৃতির সন্তানেরা পানি পরিশোধনের বিষয়ে জানেও না। আমাজনবাসীরা খুবই সৌভাগ্যবান যে এখানে বছরে প্রায় ২০০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এখানে সহজলভ্য এই তৃতীয় উৎসটিকে তারা যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে পারেনি।
আমাজনে মাত্র দুটি ঋতু, একটি গ্রীষ্ম অপরটি বর্ষা। অর্থাৎ এখানে ছয় মাস বৃষ্টির পানি পাওয়া সহজ কিন্তু বাকি ছয় মাস বৃষ্টির পানি পাওয়া দুষ্কর। বাকি ছয় মাস বৃষ্টির পানি পাওয়া দুষ্কর হলেও ইঞ্জিনিয়ার্স উইদাউট বর্ডার্স মার্সিকাল ক্যাসিলা গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য খাবার পানির উৎস হিসেবে এটাকেই বেছে নেয়। অবশ্য এর পেছনে তাদের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যেমন, এখানকার অধিবাসীদের একটা পানি পরিশোধনাগার তৈরি করে দিলে তারা তা বেশি দিন চালাতে পারবে না। কারণ, গ্রামটির অবস্থান দুর্গম এলাকায়। এখানে বিদ্যুৎ নেই, নদীপথ ছাড়া নেই কোনো যোগাযোগের ব্যবস্থা। এর চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, পানি পরিশোধনাগারের মতো জটিল একটা পদ্ধতি পরিচালনা করার জন্য উপযুক্ত দক্ষতা ও ইচ্ছা কোনোটাই এখানকার মানুষের নেই। তাই ইঞ্জিনিয়ার্স উইদাউট বর্ডার্স বৃষ্টির পানিকে বর্ষা ঋতুতে সংগ্রহ করে যেন সারা বছর তা ব্যবহার করা যায় এদিকটা চিন্তা করেই। পানি সংগ্রহ ও সরবরাহের জন্য কোনো জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার না করে খুব সহজ পদ্ধতি ব্যবহারের চিন্তা তাদের। অর্থাৎ কোনো একটি উঁচু স্থানে পানির ট্যাংক বসিয়ে এর সঙ্গে পানি সরবরাহের পাইপ যুক্ত করা হবে যেন পানি তার স্বাভাবিক নিয়মেই নিচের দিকে নেমে আসে। এই গ্রামের যে জনসংখ্যা তাতে দেখা যায় প্রতিদিন যদি প্রত্যেকে গড়ে ১৫ লিটার পানি ব্যবহার করে, তবে প্রায় ২৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকের প্রয়োজন। এখানে জনপ্রতি ১৫ লিটার পানির ব্যবহার হিসাব করা হয়েছে খাবার, রান্না আর গোসলের জন্য। কাপড় ধোয়াসহ বাকি কাজের জন্য নদীর পানিই ব্যবহার করবে তারা। কিন্তু ট্যাংক স্থাপন নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। এ গ্রামের অধিকাংশই বর্ষাকালে ডুবে থাকে তিন থেকে পাঁচ ফুট পানির নিচে। গ্রামবাসীরা তাদের প্রয়োজনমতো সুবিধাজনক স্থানে সরে যায় এ সময়। কিন্তু বিশাল আকার পানির ট্যাংক তো যখন তখন সরানো যায় না। তাই এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে যেন একবার স্থাপন করলে আর সরানোর প্রয়োজন না হয়। অন্য দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO)-এর সাধারণ নিয়ম হচ্ছে বাসস্থান থেকে পানি সংগ্রহের স্থানের দূরত্ব ৩০০ থেকে ৩০০০ ফুটের মধ্যে হতে হবে।
শেষ পর্যন্ত পুরো সিস্টেমটিকে এমনভাবে সাজানো হয় যে, যেকোনো বাড়ি থেকে পানি সংগ্রহের স্থানের দূরত্ব ৫০০ ফুটের বেশি যেন না হয়। ট্যাংক থেকে পানি সংগ্রহের স্থানের দূরত্ব ১০০০ ফুটের কম হবে। কারণ, এখানে এমন পরিমাণে পানির চাপ থাকতে হবে যেন একটি শিশু পানি সংগ্রহের জন্য যে ধরনের পাত্র বহন করে তা এক মিনিটের মধ্যেই ভর্তি হয়ে যায়। যোগাযোগব্যবস্থা, বন্যা, বৃষ্টি এবং গ্রামের লোকজনের বার্ষিক ফসল সংগ্রহÑসবকিছু মাথায় রেখে কাজটি শেষ করতে বছর গড়িয়ে যায়। কাজ চলা অবস্থাতেই শুরু হয়েছে বর্ষা। মাথার ওপর কালো মেঘ ছেয়ে আছে। বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে ট্যাংক, ভাল্ব, ফিল্টার, পাইপ, পানির কল ইত্যাদি সেট করা। ট্যাংক যেন মশা উৎপাদনের জায়গা না হয় সেই জন্য নেট দিয়ে ঢেকে দেওয়া। এরপর বৃষ্টির অপেক্ষা। একসময় বৃষ্টি নামে ট্যাংকের ভেতর শোনা যায় পানি পড়ার শব্দ। কিছুক্ষণ পর কল খুললে বেরিয়ে আসে পরিষ্কার পানি। ইঞ্জিনিয়ার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর কাজ এখানেই শেষ।
এটি ছিল ২০১৮ সালের শেষের দিকের ঘটনা। মার্সিকাল ক্যাসিলার বাসিন্দারা আট মাস ধরে নিয়মিত তাদের খবর পাঠাচ্ছে, তারা আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে, সুস্থ আছে। সভ্যতার ব্যাকটেরিয়ায় তাদের কেউ মারা যায়নি। সভ্যতার দুর্গন্ধযুক্ত পানির চেয়ে এ পানি অনেক ভালো। যদি সভ্যতার আগুন তাদের বাসভূমিকে না পোড়াত, যদি সভ্যরা সভ্যতার আগ্রাসন থেকে তাদের মুক্তি দিত, তবে হয়তো ওরা আরও ভালো থাকতে পারত!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।