জার্মান কর্তৃপক্ষ ভাবছে তারা ২০৩০ সালের পর আর কোনো পেট্রলচালিত গাড়ি রাখবে না। কর্তৃপক্ষের ভাবনাকে সমর্থন জানিয়ে সেই দেশের বিশ^খ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেন্জ আর ভক্সওয়াগন তৈরি করতে শুরু করেছে ব্যাটারিচালিত গাড়ি। আর বিভিন্ন দেশের উড়োজাহাজ নির্মাতারা চিন্তা করছেন কীভাবে খনিজ তেল ব্যবহার না করে চালানো যায় একে। তাহলে আর রেল কোম্পানিই-বা বসে থাকবে কেন? তাই ফ্রেঞ্চ কোম্পানি ‘আসতম’ (Alstom) নির্মাণ করেছে ‘কোরাডিয়া আইলিন্ট’ নামের বিশ্বের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেন। দেখতে অনেকটাই ডেমু ট্রেনের মতো। তবে ডেমুর মতো ডিজেল পুড়িয়ে এটি বায়ু বা পরিবেশদূষণ করে না। কম শব্দ উৎপাদনকারী ও পরিবেশবান্ধব এই আইলিন্ট বা হাইড্রেইল ট্রেন জার্মানিতে আগামী বছরের শুরুতে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করবে বলে আশাবাদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
ডিজেল বা বিদ্যুৎ ছাড়া যানবাহনের স্বপ্ন মানুষের অনেক দিনের। বিজ্ঞানী আর প্রকৌশলীদের নিরলস চেষ্টায় এটি এখন আর স্বপ্ন নয়, বরং তা সত্যি হওয়ার দোরগোড়ায়। বিদ্যুৎ বা খনিজ তেল ব্যবহার না করে হাইড্রোজেনকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে সফলভাবে যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো এখন নিরেট বাস্তবতা। জার্মানরা সব জায়গায় বিদ্যুৎ, তেল, কয়লাসহ কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির ব্যবহার ছেড়ে শুধু নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, হাইড্রোজেনচালিত নব উদ্ভাবিত এই ট্রেন সেই উদ্যোগকে সফলতার দিকে অনেকটা পথ এগিয়ে নেবে।
বর্তমান বিশ্বে যত যাত্রীবাহী ট্রেন বা লোকমোটিভ চলাচল করছে, তার সবই হয় ডিজেল নতুবা বিদ্যুৎ-চালিত। আর বিদ্যুৎ বা ডিজেল থেকে শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশদূষণ। বিশ্বব্যাপী শুধু যাত্রীবাহী ট্রেন বা লোকমোটিভগুলোকে চালু রাখতে এখন পর্যন্ত লাখ লাখ টন বর্জ্য ও কার্বন যুক্ত হচ্ছে আমাদের পরিবেশে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে কোরাডিয়া আইলিন্ট কোনো ধরনের কার্বন নিঃসরণ করছে না বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো বর্জ্য উৎপন্নও করছে না। হাইড্রোজেনের উপজাত হিসেবে পরিবেশে শুধু যুক্ত হবে বাষ্প ও পানি। তাই নির্মাতারা এটিকে বিশ্বের প্রথম শূন্য কার্বন নিঃসরণকারী যাত্রীবাহী ট্রেন হিসেবে দাবি করতেই পারেন। দীর্ঘযাত্রায় নিয়মিত চলাচলের উপযোগী এই ট্রেন যেহেতু জ¦ালানি হিসেবে হাইড্রোজেন ব্যবহার করছে, তাই এর আরেক নাম ‘হাইড্রেইল’।
কোরাডিয়া আইলিন্ট বা হাইড্রেইল কদিন আগে বার্লিনের ইননোট্রান্স ট্রেড শোতে প্রথম প্রদর্শন করা হয়। আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে চলাচলের জন্য জার্মানির লোয়ার স্যাক্সোনি প্রদেশের পরিবহন কর্তৃপক্ষ নির্মাতা কোম্পানি এসটমকে ১৪টি হাইড্রেইল সরবরাহের কার্যাদেশ দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথম ট্রেনটি লোয়ার স্যাক্সোনি প্রদেশের বাক্সটেহিউড থেকে ব্রেমারভর্ড ও ব্রেমার হেভেন হয়ে কাক্সহেভেনের মাঝে চলাচল করবে। পরীক্ষামূলক চলাচল সফল হলেই আগামী ডিসেম্বর নাগাদ জনসাধারণের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে। লোয়ার স্যাক্সোনি প্রদেশে হাইড্রেইলের পরিসেবা যদি জার্মান কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সারা দেশে যাত্রী পরিবহনের জন্য হাইড্রেইল চালু করবে জার্মান পরিবহন কর্তৃপক্ষ। জার্মানের পরিক্ষামূলক পরিচালনার পাশাপাশি নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের মতো দেশও এই ট্রেন চালু করার ব্যাপারে দারুণ আগ্রহ দেখিয়েছে।
হাইড্রোজেনকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে যান চালানোর বিষয়টি একেবারে নতুন তা কিন্তু নয়। নাসা তাদের রকেট উৎক্ষেপণের জন্য ১৯৭০ সাল থেকে জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন ব্যবহার করছে। কারণ, হাইড্রোজেনকে যখন অক্সিজেনের সংস্পর্শে এনে পোড়ানো হয় তখন এটি প্রচুর শক্তি উৎপাদন করে কিন্তু কোনো ধোঁয়া বা কার্বন নির্গত না করে বাষ্প বা পানি নির্গত করে। জাপানিজ রেলওয়ে রিসার্চ ইনস্টিটিউট একধরনের ফুয়েল সেল তৈরি করেছে, যেখানে হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ফুয়েল সেল দিয়ে এখনো জাপান দিব্যি তাদের ট্রেন চালাচ্ছে। গত বছর থেকে চীনারাও শুরু করেছে ট্রেন চালাতে হাইড্রোজেন জ্বালানির ব্যবহার। যে কারণে সর্বোচ্চ জনসংখ্যার এই দেশটি তাদের পরিবেশ ও বায়ুদূষণ অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, হাইড্রেইলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যটা কী? প্রথমত, চীন কিংবা জাপান কেউই এ জ্বালানি দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চালাচ্ছে না। তদুপরি এসব ট্রেন একবার জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে অক্ষম। তাই দূরের যাত্রায় একে ঘন ঘন থামতে হয় জ্বালানি নিতে। কিন্তু হাইড্রেইলকে তৈরি করা হয়েছে যাত্রী পরিবহন ও দীর্ঘযাত্রার জন্য। হাইড্রেইলের প্রতিটি কারে যে ফুয়েল ট্যাংক থাকে, তাতে ৯৪ কেজি পর্যন্ত জ্বালানি ধারণ করতে পারে। এ পরিমাণ জ্বালানি নিয়ে সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার বা ৮৭ মাইল বেগে ৮০০ কিলোমিটার (৪৯৭ মাইল) পথ ৩০০ যাত্রী নিয়ে কোনো বিরতি ছাড়াই পাড়ি দেওয়া সম্ভব, যা আমাদের দেশের রেলপথের সর্বোচ্চ দূরত্বের সমান। এ ছাড়া হাইড্রোজেন থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত শক্তিকে বেশ বড় ও শক্তিশালী লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে জমা করে রাখা হয়। ফলে অন্তত জ্বালানিস্বল্পতার কারণে কোনো যাত্রাবিরতির প্রয়োজন হয় না। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি চলাচলের সময় চাকার ঘর্ষণ আর বাতাস কাটার শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ উৎপন্ন হয় না। তাই একে অনেকটা নিঃশব্দে চলা ট্রেন বলা যেতে পারে। আর এসব বৈশিষ্ট্যের জন্যই চীন ও জাপানের তৈরি হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনের তুলনায় হাইড্রেইল এখন দারুণ কার্যকরী।
জার্মানি চায় বিশ্বের প্রথম ‘শূন্য কার্বন নিঃসরণকারী’ দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী এই ট্রেন তাদের এ লক্ষ্য পূরণে অনেক দূর এগিয়ে নেবে। বিশ্বের ব্যাপক শিল্পায়িত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির অবস্থান প্রথম দিকে। তাই এখানে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির চাহিদাও বিপুল। কিন্তু তারা এখন আর পুরোনো উৎসের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। বিদ্যুৎ বা শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে শতভাগ নির্ভর করছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর। এটা তাদের নেহাত উচ্চাকাঙ্খা বা কল্পনাবিলাস নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, ২০১৬ সালের মে মাস অবধি প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ জার্মানবাসী ব্যক্তিগত কাজে যে শক্তি ব্যবহার করেছে, তার সবই এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। কেউ কেউ আবার উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রিও করছে ব্যবহারকারীদের কাছে। কাজেই আইলিন্ট বা হাইড্রেইলের শুভাগমনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে জার্মানি তার শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার লক্ষ্যের শতকরা ৬০ ভাগ অর্জন করতে পারবে বলে আশাবাদ তাদের।
প্রকৃতপক্ষে একটি ডিজেল ইঞ্জিনে যে ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, প্রায় একই ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় হাইড্রেইলের ক্ষেত্রেও। তবে এটি করা হয় নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, একটু ভিন্নভাবে। রাসায়নিক শিল্পের বর্জ্য হিসেবে যে হাইড্রোজেন উৎপন্ন হয়, তা এখানে জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই বর্তমান হাইড্রেইল ইলেকট্রিক লাইনে চলাচলের উপযুক্ত নয়। এ ছাড়া গতিও জার্মানের আন্তনগর এক্সপ্রেস ট্রেন বা ফ্রান্সের টিজিভির তুলনায় আহামরি কিছু নয়, তারপরও আপাতত সারা জার্মানে চলাচলরত চার হাজারেরও বেশি ডিজেল লোকমোটিভকে বন্ধ করে দিয়ে নতুন এই ট্রেন চললে বিশ্ববাসী উপকৃত হবে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি গ্রাহকসেবায়ও।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।