ন্যানো সিরামিক পলিমার কোটিং

নানা অসুবিধা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সত্ত্বেও নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের মধ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার এখন শীর্ষে। বিশেষত রান্নাঘরে। খাবার সংরক্ষণে, খাবার পরিবেশনে প্লাস্টিকের ব্যবহার এখন অনেক বেশি। কিন্তু এর তাপ সহনশীলতা অনেক কম। অল্প তাপেই প্লাস্টিক পাত্র থেকে নির্গত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান খাদ্যে মিশে মানবদেহের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্লাস্টিক, পিভিসি বা পেট (PET)-এর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য বিভিন্ন রকম পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এর মধ্যে ন্যানো সিরামিক কোটিং অন্যান্য ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী বলে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

অল্প তাপমাত্রায় প্রবেশ করা ন্যানো সিরামিক পলিমার হাইব্রিড কোটিং প্লাস্টিকের এ সীমাবদ্ধতাকে কমিয়ে নিয়ে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। একসময় নিত্যব্যবহার্য জিনিসের মধ্যে বিশেষ করে রান্নাঘর, খাবার সংরক্ষণ ও পরিবেশনে ব্যবহৃত পাত্র তৈরি হতো মাটি, সিরামিক, কাচ, লোহা, কাঁসা, তামা, পিতল, দস্তা দিয়ে। এরপর সময়ের পরিবর্তনে এসবের জায়গা দখল করে নিয়েছে অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন। আর এখন চলছে প্লাস্টিকের রাজত্ব। যেহেতু প্লাস্টিকের তাপ সহনশীলতা কম, তাই অ্যালুমিনিয়াম ও মেলামাইনকে পুরোপুরি বিদায় করা যায়নি। আর সিরামিক ও কাচ ব্যবহার সমাজে ব্যবহারকারীর অবস্থান নির্ণয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. নূর নবীর ভাষ্য, ‘কাচ, চীনামাটি/সিরামিক ও লোহার তৈরি পাত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে অ্যালুমিনিয়াম, কপার বা তামা, স্টেইলনেস স্টিল, মেলামাইন, প্লাস্টিক ইত্যাদি কোনো না কোনোভাবে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের পাত্রকে ডায়াবেটিস, বন্ধ্যাত্ব, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়াসহ অনেক হরমোনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য দায়ী করা হয়।’

প্লাস্টিক থেকে নির্গত ‘বসফেনল-এ’ বা বি পি এ মানবদেহের বিভিন্ন হরমোনের কর্মকাণ্ডকে ওলটপালট করে দেয়। বিশেষ করে যখন কোনো প্লাস্টিকের পাত্র মাইন ওভেনে ব্যবহার করা হয় তখন সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিপিএ নির্গত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ন্যানো সিরামিক পলিমার হাইব্রিড কোটিং বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক যেমন, পিভিসি, পেট, অথবা সিলিকন, টেফলন ইত্যাদি দিয়ে তৈরি পাত্রের ওপর ব্যবহার করা হয়। ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক নিঃসরিত হয়ে খাদ্যে মিশে খাদ্যকে বিষাক্ত করতে পারে না। এ ধরনের কোটিং দেওয়ার জন্য সাধারণত ক্রিস্টাল টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড (Tio2) এবং জিঙ্ক অক্সাইড (ZnO) ব্যবহার করা হয়। টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড বা টাইটানিয়া সানস্ক্রিনও খাবারে ব্যবহৃত রং হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই বলা যায়, এর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। জিঙ্ক অক্সাইডও দীর্ঘদিন ধরে সিরামিক পাত্রসহ বিভিন্ন জায়গায় কোটিং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এখনো এর প্রত্যক্ষ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রমাণিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। টাইটানিয়া ও জিঙ্ক অক্সাইডের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি প্রতিরোধ ক্ষমতা খাদ্যকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। আর এর মসৃণ চকচকে ভাব খুব সহজেই পাত্রকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে তেল, চর্বির মতো পদার্থ সহজে পাত্রের গায়ে আটকে যেতে পারে না, তাই পরিষ্কারের জন্য ডিটারজেন্টের ব্যবহার কমে যায়। এ ধরনের কোটিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো অধিক তাপে বা ঠান্ডায় প্লাস্টিক পাত্রের আকারের কোনো পরিবর্তন হয় না এবং অধিক তাপে ক্ষতিকর রাসায়নিক বেরিয়ে এসে খাবারে মিশতে পারে না।

সাধারণত ১০০ সেলসিয়ামের চেয়ে কম তাপমাত্রা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাত্রের ওপর ইলেক্ট্রো ডিপজিশনিং পদ্ধতিতে কোটিং দেওয়া হয়। তাই পাত্রের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরিবেশন কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো যাবে না। কাচ সিরামিক ও ধাতব পাত্রের তুলনায় বৈচিত্র্যপূর্ণ খরচ কম এবং তুলনামূলকভাবে স্থায়ী হওয়ায় এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু প্লাস্টিক সামগ্রীর স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াও আরেকটি সাধারণ কিন্তু বড় সমস্যা হলো খাবার বা পাত্রে দুর্গন্ধ হওয়া ও বিচ্ছিরিভাবে দাগ পড়ার ফলে খাবার তৈরি, পরিবেশন ও সংরক্ষণের কাজে এ ধরনের পাত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় না।

প্লাস্টিক পাত্রে ন্যানো সিরামিক কোটিং ব্যবহারের ফলে এসব সমস্যা অনেকটা দূর করা সম্ভব। ফলে পাত্রগুলো যথেষ্ট টেকসই ও ব্যবহারের উপযোগী থাকে দীর্ঘদিন। প্লাস্টিক পাত্রে এ ধরনের কোটিং ব্যবহারে আরও কিছু সুবিধা পাওয়া যায়, যা সাধারণত প্লাস্টিক পাত্রে থাকে না। জীবাণুরোধী, নন-স্টিল ও সহজে পরিষ্কারযোগ্য এসব পাত্রে রং, সাইজ ও ডিজাইনেও বিশেষ বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তোলা সম্ভব। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর তাপ সহন ক্ষমতা ও ভাজাভাজির কাজসহ সব রকম রান্নাবান্না করা সম্ভব। সম্ভব রান্নার কাজে ব্যবহৃত বাসনের চিরাচরিত আকারের বাইরে যেকোনো ধরনের সুবিধামতো আকৃতি দেওয়া।

এ ধরনের কোটিং দিতে সাধারণত অনেক কম খরচ ও সময়ের প্রয়োজন হয়। ন্যানো সিরামিক কোটিংয়ের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, তা আসলে নতুন কোনো পদ্ধতি নয়। নবম শতাব্দীতে মেসোপটেমিয়ায় ব্যাপকভাবে এ পদ্ধতির প্রচলন ছিল। সে সময় তারা মাটির পাত্রের ওপর ধাতব আবরণ দিয়ে তা আরও চকচকে, উজ্জল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলত আর এ জন্য তারা কপার, সিলভার সফট ও অক্সাইড ব্যবহার করত। এ ধরনের মৃৎপাত্র রেনেসাঁর পরবর্তী দীর্ঘ সময় তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম।

ন্যানো সিরামিক কোটিং এ কারণেই এখন ব্যবহার করা হয়।

টাইটানিয়া ও জিঙ্ক অক্সাইড

প্লাস্টিক পাত্রকে টাইটানিয়া বা জিঙ্ক অক্সাইডের দ্রবণে ততক্ষণ পর্যন্ত চুবিয়ে রাখা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত পাত্রের ওপর আস্তরণটি একটি নির্দিষ্ট পুরুত্বে না পৌঁছায়। তারপর এটিকে দ্রবণ থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অবশ্য কোনো কোনো সময় এ ধরনের পুরোনো পদ্ধতি ব্যবহার না করে ইলেক্ট্রো-ডিপজিশন পদ্ধতিতেও ন্যানো সিরামিক কোটিং দেওয়া হয়।

ন্যানো সিরামিক কোটেশন যে শুধু প্লাস্টিকের বাসনপত্রের ওপর ব্যবহার করা হয় তা কিন্তু নয়। বাঁশ, কাঠ, তামা, পিতলসহ বিভিন্ন ধাতব পদার্থের ওপর ব্যবহৃত হতে পারে। বাঁশ বা কাঠের ওপর এ ধরনের কোটিং ব্যবহারের ফলে তা দেখতে যেমন সুন্দর হয়, তেমনি কোটিংটি এর ক্ষয় রোধ করতে পারে, ফলে তা হয় দীর্ঘস্থায়ী।

অ্যালুমিনিয়াম বিষাক্ত ধাতু হওয়া সত্ত্বেও রান্নার কাজে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। অবশ্য যে তাপমাত্রায় রান্না করা হয় তাতে অ্যালুমিনিয়াম খাবারে মিশতে পারে না। রান্নার পর পরিষ্কারের সময় যেটুকু ক্ষয় হয় তাও ধুয়ে ফেলার সময় চলে যায় কিন্তু রান্নার সময় চামচ বা খুন্তির আঘাতে যেটুকু খাবারে মিশে যায়, তা অবশ্যই ক্ষতিকর। তা ছাড়া টক বা অম্ল জাতীয় খাবার অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে দীর্ঘ সময় রান্না বা সংরক্ষণ করলে অ্যালুমিনিয়াম খাবারে মিশে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে।

আমরা এখন অনেকেই রান্নাঘরে এনলিস্ট পাত্র ব্যবহার করি। কিন্তু এর উপরিভাগে টেফলন (Teflon), কালফ্যালন আনোলন (Calphalon Anolon), টেফাল (Tefal) ইত্যাদির যে প্রলেপ দেওয়া থাকে, তাতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, টেফলন নিজেই খাবারে মিশলে মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কালফ্যালনের সঙ্গে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়, যা খাবারে ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তামা ও লোহার তৈরি বাসনের মধ্যে লোহা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হলেও তামার পাত্র বহুদিন ব্যবহারের পর ক্ষয়প্রাপ্ত হলে বিশেষজ্ঞরা তা ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। আবার বহুল ব্যবহৃত মেলামাইন তৈরি হয় ইউরিয়া ও ফরমালডিহাইডের মিশ্রণে। ঠান্ডা অবস্থায় এই বেমিনক বিশেষ পরিবর্তন হয় না কিন্তু তাপের সংস্পর্শে এলে বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে উত্তপ্ত করলে রাসায়নিক উপাদানগুলো বিভক্ত হয়ে খাদ্যে বিষাক্ততা তৈরি করে। আর কিছু কিছু প্লাস্টিক তো তাপের সংস্পর্শে এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাই-অক্সেন তৈরি করে, যা একটি কারমিনোজেন উপাদান হিসেবে চিহ্নিত। এই কারমিনোজেন উপাদান মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী।

এত সব সমস্যার সমাধান হতে পারে ন্যানো সিরামিক পলিমার হাইব্রিড কোটিং। যদিও টাইনিয়ারে মাত্রা অতিরিক্ত ব্যবহার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তারপরও নিত্যব্যবহার্য জিনিসে যে ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকে সে তুলনায় এটাকে নিরাপদ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top