ভূগর্ভস্থ লাইফ-লাইন সার্ভিস

পুরকৌশলে মূলত আমরা মাটির ওপরের অবকাঠামোর কথাই ভাবি। তবে আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্যতার কথা ভাবলে পানি, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন, রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্টের মতো পুরকৌশল অবকাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধরনের অবকাঠামোব্যবস্থা ‘লাইফ-লাইন সার্ভিস’ হিসেবে বিবেচিত। এই আবশ্যকীয় সার্ভিসগুলো না থাকলে আমাদের দৈনন্দিন জীবন হয়ে পড়তো স্থবির। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অতিপরিচিত ভোগান্তির দৃশ্য হচ্ছে মাটির নিচের পানি, গ্যাস, বর্জ্যরে পাইপলাইন হরহামেশাই নষ্ট হয়ে পড়া আর তা সংস্কারের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকা। পানি, গ্যাসের মতন লাইন সাধারণত রাস্তার নিচে থাকে, এর ফলে এই ধরনের পাইপলাইন মেরামতের জন্য রাস্তা বন্ধ করতে হয়; এতে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড যানজটের, যার দুর্ভোগ বর্ণনাতীত। আর রাজধানী ঢাকার মতন সরু গলির রাস্তায় এ ধরনের দুর্ভোগ নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। মাটির নিচের অবকাঠামো গড়তে গেলে শুধু জনদুর্ভোগই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত নানা বিপদ। ভূগর্ভস্থ এই পুরকৌশলের সংকট ও এর সমাধানসূত্র এবারের আলোচ্য।

ভূমিকম্পের সময় আমরা শুধু দালানকোঠার নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত থাকি। কিন্তু বড় ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু ঘরবাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, অন্যান্য অবকাঠামোও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে-সেতু, পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের লাইন। আধুনিক শহুরেজীবন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের পাইপলাইন নেটওয়ার্কের ওপরে অনেকটাই নির্ভরশীল। শহরে আধুনিক জীবনে পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসের সার্বক্ষণিক ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ উন্নত সমাজের অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু এ ধরনের স্থাপনা অতীতে প্রকটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্পে। অতীতে বড় ভূমিকম্পের পরপরই গ্যাসের পাইপলাইনে ফাটল থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে মাটির নিচে অবস্থিত পানির পাইপলাইনে ভূমিকম্পের সময় ফাটল দেখা দিলে বা ভেঙে গেলে পানির লাইনে চাপ কমে যাওয়া ও পানির সরবরাহ না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের সময় অগ্নিনির্বাপণের কাজে বিঘ্ন ঘটে, যা দুর্যোগের মাত্রা ও সার্বিক ভোগান্তি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ভোগান্তির এ ধরনের ঘটনা বড় ভূমিকম্পে প্রায়শই দেখা যায়, যেমন অতীতে ১৯০৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো ভূমিকম্প থেকে নিকট অতীতের ২০১১ সালের নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ ভূমিকম্পেও দেখা গেছে।

ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলের সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছে প্রায় ১০০ বছর আগে এবং তখনকার সময়ে গ্যাস ও পানির লাইন তেমনভাবে না থাকায় সেই রকম দুর্যোগের ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর পানি, গ্যাস, নর্দমার লাইনের পুরোনো পাইপলাইনে প্রতিনিয়তই ফাটল বা ভাঙন দেখা যায় এতে স্বাভাবিক জীবন হয় বিঘ্নিত। বাংলাদেশের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে এ ধরনের ঝুঁকি অনেক, নিকট অতীতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটলেও আমাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। পুরোনো পাইপলাইনের ফাটল শুধু পানি/গ্যাসের অপচয়ই করে না, বরং বিপুল ক্ষতিসাধন করে আশপাশের অবকাঠামোরও (রাস্তা, সড়ক ইত্যাদির)।

আগে থেকেই পানি, গ্যাস ইত্যাদির পাইপলাইন সাধারণত রাস্তার নিচে সমান্তরালে ডিজাইন করা হয়। পাইপলাইন মাটির নিচে প্রবাহিত হয় বলে এটি পাইপলাইনের ওপর ও পার্শ্ববর্তী মাটি ও যানবাহনের ভর সহ্য করে। এ ছাড়া পাইপলাইনের মধ্যে প্রবাহমান পানি/গ্যাসের চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিত্রে (১.১) মাটির নিচে অবস্থিত আদর্শ একটি পাইপলাইনের বর্ণনা রইল। 

পাইপলাইনে ফাটল ও ক্ষয়

অনেকাংশেই এ ধরনের ফাটল কিংবা ভাঙনের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে মূলত ধাতব পাইপলাইনের গায়ে মরিচা পড়ার প্রভাব দায়ী। মাটির নিচে পাইপলাইনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মরিচা পড়তে থাকায় পাইপলাইনের বল প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। এই পাইপলাইনগুলো ডিজাইন করা হয় দীর্ঘ সময়ব্যাপী ব্যবহারের জন্য। তবে মাটির নিচে থাকার কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাইপলাইনের বাইরের দিকে মরীচিকা ধরায় পাইপলাইনের পুরুত্ব কমতে থাকে। মাটির প্রকৃতি অনুসারে মরীচিকা পড়ার হার বাড়ে কিংবা কমে। এই ধরনের ঘটনা পাইপলাইনের বল প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া পাইপলাইনের দেয়ালের মধ্যেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মরিচা পড়ে পাইপলাইনের মধ্যে বন্ধুরতার (Hydraulic Roughness) সৃষ্টি হয়, যা পানি জাতীয় তরল পদার্থ (পানি, তেল) প্রবাহের গতি কমিয়ে দেয়। এ কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে একই পরিমাণ পানি প্রবাহের জন্য তুলনামূলক বেশি চাপের প্রয়োজন হয়, যার ফলে পানির উৎস (পানির পাম্প, পানির ট্যাংক) পরিচালনায় বেশি শক্তির দরকার হয়, যা খরচ বাড়িয়ে দেয়।

ধাতব পাইপলাইনে মরিচার সৃষ্টি

মাটির নিচে ধাতব পাইপলাইনের গায়ে প্রধানত দুই ধরনের মরিচা পড়ে। এর একটা হচ্ছে সমভাবে বিস্তৃত (Uniform Corrosion), যা পাইপলাইনের চারপাশে সময়ের সঙ্গে সমানভাবে সৃষ্টি হয় চিত্রের (১.২ প্রথমটি) মতো। আরেকটি হচ্ছে সময়ের সঙ্গে পাইপলাইনের গায়ে অনেক জায়গায় ছোট ছোট কূপের (Pitting Corrosion) মতো গর্তের সৃষ্টি হয় যা অনেকটা চিত্রের (১.২ দ্বিতীয়টি) মতো। এ ধরনের কূপ সৃষ্ট মরিচা পড়ার হার পাইপলাইনের চারদিকে সমভাবে সৃষ্ট মরিচা পড়ার চেয়ে অনেকটাই দ্রুততর। এ ধরনের কূপ/গর্তের সৃষ্ট অংশের পাইপের পুরুত্ব সবচেয়ে কম হওয়ায় ওই স্থানের বল প্রতিরোধক্ষমতা হয় সবচেয়ে কম।

আগে পাইপলাইনের ফাটলের হার এসব অংশেই সবচেয়ে বেশি দেখা যেত। যখন পাইপলাইনের দেয়ালে মরিচার গভীরতা পাইপলাইনের মূল পুরুত্বের কাছাকাছি পৌঁছে, তখনই দেখা মেলে লিক/ফাইলের এতে পাইপলাইন অকার্যকর হয়ে পড়ে। আগে স্থাপনকৃত অনেক পাইপের বাইরে তৈরির সময় মরিচা প্রতিরোধী প্রলেপ দেওয়া হতো না। যে কারণে ওই সব পাইপলাইনের মরিচা সৃষ্টির হার অনেকটাই বেশি। বর্তমানে উৎপাদনের সময়েই ধাতব পাইপলাইনের গায়ে মরিচা প্রতিরোধী প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয়, যা মরিচা প্রতিরোধে বিশেষ সহায়ক। তবে যেহেতু ধাতব পাইপলাইন ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের জন্য ডিজাইনকৃত তাই মাটির নিচে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গায়ে মরিচার গভীরতা বাড়তে থাকে যা একটা সময় পাইপে ফাটলের সৃষ্টি করে। মাটির নিচে মরিচা পড়া ও মরিচার পড়ার হার অনেকটাই নির্ভর করে মাটির প্রকৃতির ওপর। মাটির মধ্যে যদি ক্ষয়কারক পদার্থ বা জারকের মাত্রা বেশি থাকে, তবে পাইপলাইনের গায়ে দ্রুতহারে মরিচার পড়ে। পাইপলাইন যদি রেইনফোর্সড কংক্রিটের সৃষ্ট হয়, তবে কংক্রিটের মধ্যে রেইনফোর্সমেন্টেও মরিচার সৃষ্টি হয়ে পাইপকে দুর্বল করে ফেলে।

ধাতব কাস্ট আয়রন পাইপলাইনের গায়ে মরিচা সৃষ্টির একটি নমুনা মডেল (১.৩ নম্বর চিত্রে) দেখানো হলো। চিত্রে সবুজ, হলুদ ও লাল রঙের মাধ্যমে যথাক্রমে স্বল্প, মাঝারি ও উচ্চমাত্রার ক্ষয়কারক মাটিতে সৃষ্ট মরিচার তফাত দেখানো হলো। খুব স্বাভাবিকভাবেই পাইপলাইন যদি উচ্চমাত্রার ক্ষয়কারক মাটিতে থাকে, তবে মরিচা পড়ার পরিমাণ হবে তুলনামূলক বেশি। মাটির মধ্যে যদি বৈদ্যুতিক প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি থাকে, তবে সেই মাটির মধ্যে অবস্থিত পাইপের গায়ে মরিচা পড়ার হার হয় অনেক কম। গবেষণায় দেখা গেছে, পাইপলাইনের স্থাপনের পরে মরিচা সৃষ্টি হওয়ার সময় থেকে প্রথম দিকে মরিচা সৃষ্টির হার অনেকটাই বেশি, পরে সৃষ্ট মরিচা মাটির নিচে অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে অক্সিডাইজেশনের ফলে মরিচার ওপরে একধরনের আবরণ পড়ে এতে মরিচা সৃষ্টি হওয়ার হার অনেকটাই ধীর হয়ে কমে। এই ধরনের ঘটনাকে পাইপলাইনের ‘নিজস্ব মরিচা দমনক্রিয়া’ বলা হয়। পাইপলাইনের ঝুঁকি নিরূপণে এই ধরনের মডেল খুবই কার্যকর, বিশেষ করে যদি যথেষ্ট পরিমাণে ডেটা সহজলভ্য থাকে, তবে এই ধরনের মডেল ক্যালিব্রেশন করে আগে স্থাপন করলে পাইপলাইনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা যায়, যা সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ সহায়ক।

বর্তমান পাইপলাইনের অবস্থা

অন্যান্য অবকাঠামোর মতো পাইপলাইন সহজে সংস্কার করা যায় না। দীর্ঘদিন টেকসই হয় বলে ধাতব পাইপলাইনই প্রকৌশলকাজে প্রথম পছন্দ। প্রথম দিকে পাইপলাইন মূলত ধাতব পদার্থ কাস্ট আয়রন দিয়ে তৈরি হতো, ধীরে ধীরে প্রযুক্তির মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরে ডাকটাইল আয়রন, প্রিকাস্ট কংক্রিট এবং পিভিসি মতন পদার্থের তৈরি পাইপলাইন উৎপাদন ও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘস্থায়িত্ব ও পূর্বে স্থাপন করা হয় বলে এখনো বাংলাদেশ ও বিশ্বের অধিকাংশ পাইপলাইনই ধাতব পদার্থে তৈরি। দীর্ঘদিনের জন্য ডিজাইন করা হয় এবং উপাত্ত সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি বলে অনেক ক্ষেত্রেই মাটির নিচের পুরোনো পাইপলাইন সম্পর্কিত অনেক তথ্যই আমাদের অজানা। তবে পুরোনো পাইপলাইন এখনো যথেষ্ট ভালোভাবে অনেক জায়গায়ই সার্ভিস দিয়ে আসছে। পুরোনো পাইপলাইনের সংখ্যাও অধিক অন্যান্য পাইপলাইনের তুলনায়। এ কারণে পুরোনো পাইপলাইনসমূহ একেবারে পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। যদিও অনেক পুরোনো পাইপলাইন ভালোভাবে সার্ভিস তথা সেবা দিচ্ছে, তদুপরি যেকোনো দুর্যোগে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে অনেক বেশি।

পাইপলাইনের ফাইল ঘাঁটলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুরোনো ও ধাতব পাইপলাইনসমূহ। পাইপলাইনে ভাঙন ও লিক শুধু ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেই হয় না বরং দুর্বল ঝুঁকিপূর্ণ ও মরিচাযুক্ত পাইপলাইনে পানি/গ্যাসের অতিরিক্ত চাপ কিংবা যানবাহনের অতিরিক্ত ভরের কারণেও হতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন যে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার বেশির ভাগ সংস্কারকাজে রাস্তা খননের প্রয়োজন হয়, যা আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থাকেও বাধাগ্রস্ত করে। বাড়িঘর ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা পাইপলাইন-সেতু ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সৃষ্ট অবকাঠামোর প্রতি খুব বেশি সচেতন নই। পাইপলাইনের সৃষ্ট দুর্যোগের ক্ষেত্রে সামষ্টিকভাবে সমাজের ভোগান্তি হয় অনেক বেশি। আবার পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই একই কাজ একাধিকবার করতে হয়। যেমন, অনেক সময় দেখা যায় পুরোনো পাইপলাইনের উপরে নতুন করে তৈরি করা রাস্তা অনেক ক্ষেত্রেই পাইপলাইন নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে আবার ওই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয় পাইপলাইন সংস্কারের জন্য, এই রকম ঘটনা অহরহই ঘটে। এ কারণে, আমাদের পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস ইত্যাদি উপযোগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকলে একই কাজ বারবার করতে হয় না, যা আমাদের জন্য সাশ্রয়ী একই সঙ্গে জনভোগান্তিহীন। 

পাইপলাইনের অবস্থা যাচাই

আমাদের দেশের পানি ও গ্যাসের পাইপলাইনের ভূমিকম্প প্রতিরোধে সক্ষমতা যাচাই করাটা খুবই জরুরি। মাটির নিচের অবস্থানের কারণে ও মাটির চারিত্রিক ভিন্নতা অনেক বেশি থাকায় ভূমিকম্প বা অন্যান্য বলের প্রতিরোধে পাইপলাইনের আচরণ কেমন হবে তার নির্দিষ্ট মৌলিক কোনো পদ্ধতি নেই। যেসব পাইপলাইন ভূমিকম্প ছাড়াই মরিচা পড়ার প্রভাবে পানি/গ্যাসের চাপ ও মাটির ওপরের থেকে প্রয়োগকৃত বল (যেমন: যানবাহন থেকে সৃষ্ট)  প্রতিরোধ করতে পারে না, সেই সব পাইপলাইন ভূমিকম্পের সময় দুর্বল আচরণ করবে বলেই ধরে নেওয়া হয়, যা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে অধিক দুর্বল পাইপলাইনসমূহ চিহ্নিত করে তার যথাযথ সংস্কার দরকার, যা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে পাইপলাইনের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

মাটির নিচে পাইপলাইনের বর্তমান অবস্থা নির্ণয়ে অনেকগুলো পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে (যেমন: সিসি টিভি ফুটেজ, রেডিওগ্রাফিক পদ্ধতি, প্রভৃতি)। যেমন: সিসি টিভি পদ্ধতিতে ছোট ছোট রোবটের সঙ্গে উন্নত ক্যামেরা যুক্ত করে পাইপলাইনের মধ্যকার ৩৬০ ডিগ্রি ছবি সংগ্রহ করা হয়, যা দিয়ে বোঝা যায় কোন স্থানে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই ধরনের পদ্ধতি কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও পাইপে ফাটলের ফলে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয় তার চেয়ে এর খরচ অনেক কম।

পাইপলাইনে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা

ভূমিকম্পে পাইপলাইনে ভাঙনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা অত্যন্ত দুরূহ ও ব্যয়বহুল কাজ। মাটির ওপরের কাঠামোর ক্ষেত্রে ওই স্থানের ভূমিকম্পের সময় সর্বোচ্চ ত্বরণ হিসাব করে ওই কাঠামোর প্রতিক্রিয়া বের করা হয়, মাটির নিচে অবস্থানের কারণে পাইপলাইনের ক্ষেত্রে হিসাব তেমনটি নয়। মাটির নিচের কাঠামো হিসেবে আমরা সর্বোচ্চ গতি বা মাটির নিচের ভূমিকম্প তরঙ্গ ও মাটির স্থায়ী স্থানচ্যুতি হিসাব করে পাইপলাইনের ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নির্ণয় করি। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যেকোনো পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই না করে সার্বিকভাবে পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, সেটা হিসাব করা হয়। অধিকাংশ পদ্ধতিই আগের ভূমিকম্পের পাইপলাইনের আচরণ ও কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটার হিসাব বের করে পরিসংখ্যানের ভাষায় ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা যাচাই করেছে। তবে প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে আমেরিকান লাইফলাইন অ্যালাইনসের ২০০১ সালে প্রবর্তিত গাইডলাইনটি বহুলভাবে প্রচলিত। এর কারণ হচ্ছে এই পদ্ধতি প্রবর্তনের সময় যথেষ্ট পরিমাণে ভিন্ন ভিন্ন টাইপের পাইপলাইনের ভূমিকম্পজনিত ফাটল ও ভাঙনের ডেটার সম্বনয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি গবেষকদের মধ্যে বহুল পরিসরে গ্রহণযোগ্য। সাধারণভাবে একটি হিসাব করা হয় যে কোনো একটি ভূমিকম্পে যতসংখ্যক পাইপলাইনের দুর্ঘটনা ঘটে তার মধ্যে ৮০ শতাংশ হচ্ছে পাইপে লিক এবং ২০ শতাংশ হচ্ছে ফাটল।

পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ 

পাইপলাইনের মতো অবকাঠামোর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খরচ কমিয়ে দিলে এই ধরনের অবকাঠামো ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সচরাচর দুই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ প্রচলিত, প্রতিষেধকমূলক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশোধনমূলক রক্ষণাবেক্ষণ। প্রথমটি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরেরটি হচ্ছে দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া। আমরা সাধারণত যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে খুব বেশি সচেতন হই না এবং যেকোনো দুর্ঘটনা পূর্ববর্তী রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কিছুটা অতিরিক্ত ব্যয় মনে করেই বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করি। এ ধরনের মানসিকতা সংশোধনমূলক রক্ষণাবেক্ষণ খরচের পাশাপাশিও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতির কারণ হয়, অনেক সময় তা প্রাণহানির ঘটনাও ঘটায়। এই কারণে আমাদের প্রয়োজন সাধারণ নাগরিক থেকে বিশেষ করে যারা ওই অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।

আধুনিক শহরে রাস্তা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির কার্যক্রম একে অন্যের ওপরে নির্ভরশীল। যেকোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য আরেকটির মধ্যে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। যেমন-বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিকভাবে না হলে, তেল-গ্যাস-পানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তেমনিভাবে পাইপলাইনের ফাটল ও সংস্কারকাজ রাস্তায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। পানি, গ্যাস, রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময়ই গ্যাস, পানি ইত্যাদি পরিচালনাকারী সংস্থার একই কাজ কয়েকবার করতে হয়।

শেষের আগে

আমাদের প্রয়োজন মাটির নিচে পাইপলাইন সম্পর্কিত সম্ভাব্য তথ্যের উপযুক্ত ব্যবহার করে একটা ডেটাবেইস ও তার সম্ভাব্য ঝুঁকির পরিমাণ নির্ণয় করা পাশাপাশি ঝুঁকি কমাতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমরা অনেক সময়ই সর্বত্র ‘সাসটেইনেবল’ শব্দটির প্রয়োগ করি না। তবে পানি-গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইনের ডিজাইন ও ব্যবস্থাপনার  ক্ষেত্রে এই বিষয়টির প্রয়োগ সবচেয়ে জরুরি। কোনো কাঠামো ‘সাসটেইনেবল’ হওয়ার প্রথম শর্তই পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে ভবিষ্যতের চাহিদা সমানভাবে মেটানো। পানি-গ্যাসের পাইপলাইন ডিজাইন করা হয় ১০০ বছর কিংবা তারও বেশি, যার ফলে এই ধরনেরই পাইপলাইন চাইলেই প্রতিনিয়ত সংস্কার কিংবা নতুন করে বিস্তৃত করা সম্ভব নয়। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পানি-গ্যাসের চাহিদা বাড়তেই থাকে যাতে একই সঙ্গে স্থাপনকৃত পাইপলাইন দুর্বল হতে থাকে। তাই শুরুতেই যদি আমরা এই বিষয়গুলো ডিজাইনের সময় বিবেচনায় না নেই, তবে এ ধরনের অবকাঠামো যুগের সঙ্গে চাহিদা মিটিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের উপযোগী করা সম্ভব নয়। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানে নতুন করে পাইপ বসানোর খরচের চেয়েও মাটি খননকাজের খরচ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় অনেক বেশি। এই সব স্থানে অধিক পুরু পাইপ ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। আবার কম খরচের পাইপ নির্বাচন করলে যদিও প্রাথমিক স্থাপন খরচ কম হয়, তবে তা পরে এর উপযোগিতার ভালো প্রমাণ নাও দিতে পারে। অনেক সময় কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের তৈরি পাইপ বসানোর খরচ কম হলেও তার সংস্কার খরচ হয় অনেক বেশি। পাইপলাইন নেটওয়ার্ক ডিজাইন করা হয় অনেকটাই জটিল ও বড় গ্রাফের মতো। উৎস থেকে পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তরল পদার্থ বিল্ডিং/গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেক বিকল্প পথ থাকলে ভালো, যাতে করে যেকোনো স্থানে পাইপলাইনে ফাটলের কারণে ওই পাইপলাইন বন্ধ করে দিতে হলেও বিকল্প উপায়ে গ্রাহকের কাছে প্রয়োজনীয় উপযোগ (তেল, গ্যাস, পানি) যাতে সহজেই পৌঁছে যেতে পারে।  

 প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।

রামকৃষ্ণ মজুমদার
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top