Image

থ্রিডি প্রিন্টেডে প্রথম ব্যারাক

নির্মাণশিল্পে থ্রিডি প্রিন্টারের ব্যবহার নিয়ে এখন বিস্ময় প্রকাশ করার আর কোনো কারণ নেই। যদিও কিছুদিন আগ পর্যন্ত এটা আলোচনার অন্যতম এক বিষয় ছিল কিন্তু এখন এটি স্বাভাবিক এক ব্যাপার। বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ি, কটেজ এমনকি বহুতল ভবন নির্মাণ করেও আমাদের বিস্মিত করতে পারছে না। কারণ, সাধারণত স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য যতটুকু নিরাপত্তাসুবিধা গতানুগতিক একটি বাড়ি বা ভবন থেকে পাওয়ার কথা, তার সবকিছুই থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো চাহিদার চেয়ে একটু বেশিই পাওয়া যায়। বিশেষ করে নির্মাণকালীন কথা চিন্তা করলে এটা অনেক সহজে ও কম সময়ে করা সম্ভব। 

সাধারণত থ্রিডি প্রিন্টেড স্থাপনা তৈরির জন্য কোনো কারখানায় স্থাপনার বিভিন্ন অংশ তৈরি করে যেখানে স্থাপনা তৈরি হবে সেখানে একটির সঙ্গে আরেকটিকে জুড়ে দিয়ে পুরো স্থাপনাটি তৈরি করা হয়। আর যদি ছোটখাটো কোনো স্থাপনা হয়, সেই ক্ষেত্রে নির্মাণের স্থানেই থ্রিডি প্রিন্টার স্থাপন করে কাজটি সেরে ফেলা হয়। তবে যতই সুবিধা থাক না কেন, এত দিন পর্যন্ত এ ধরনের স্থাপনা তৈরি হয়েছে সাধারণ জনগণের ব্যবহারের জন্য। কোনো সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বহিনী থ্রিডি প্রিন্টেড স্থাপনা তাদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেনি। তাই বলে তারা ভবিষ্যতে যে এটি ব্যবহার করবে না তা কিন্তু নয়।

মাত্র কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রথম থ্রিডি প্রিন্টেড ব্যারাকটির নির্মাণকাজ শেষ করল। এই নির্মাণকাজটি দুটি কারণে আলোচনার দাবি রাখে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া অপরটি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জন্য নির্মিত হওয়া। ৪৬ বর্গমিটারের এই ব্যারাকটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছে মাত্র ৪০ ঘণ্টা। অন্যদিকে এটিই প্রথম স্থাপনা, যা সেনাবাহিনীর ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত। এদিক থেকে বিবেচনা করলে থ্রিডি প্রিন্টেড স্থাপনার জন্য এটা এক বড় স্বীকৃতি।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর মেরিন কর্পস সিস্টেম কমান্ড (Marine Corps Systems Command-MCSC) ইলিনয় রাজ্যে তাদের আর্মি ইঞ্জিনিয়ার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে এটি নির্মাণ করেছে। এমসিএসসির একজন প্রজেক্ট অফিসার ক্যাপ্টেন ম্যাথিউ ফ্রেইডেল মনে করেন, এটাই বিশ্বের প্রথম স্থাপনা, যা একটানা কংক্রিট প্রিন্টারে প্রিন্ট করা যায়। এর আগেও অনেক বড় বড় স্থাপনা কংক্রিট থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি হয়েছে। কিন্তু তারা সেসব একসঙ্গে নির্মাণস্থলে তৈরি করেনি।

কার্বেড

ব্যারাকের দেয়ালগুলো হালকা ঢেউ খেলানো। দেয়াল নির্মাণের সময় একটি কংক্রিটের স্তরের ওপর আরেকটি কংক্রিটের স্তর যুক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে দেয়ালের গায়ে সুন্দর একটি ঢেউ খেলানো নকশা তৈরি হয়েছে। মূলত এমসিএসসি টিমটি তৈরি করা হয় মেরিনদের মধ্য থেকে ক’জন সদস্য নিয়ে। এই ব্যারাক তৈরির জন্য চারজন সদস্য একটানা ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন। নির্মাণকালীন তাঁদের কাজ ছিল মেশিনটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না তার তত্ত্বাবধায়নে করা আর প্রিন্টারের কংক্রিট শেষ হয়ে গেলে তাতে নতুন করে কংক্রিট ভরে দেওয়া। 

সৈনিকেরা সাধারণত তাঁদের ব্যারাক কাঠ দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে এটি তৈরি করতো। এই সনাতন পদ্ধতিতে একটি ব্যারাক তৈরি করতে সময় লাগে কমবেশি পাঁচ দিনের মতো। ম্যাথিউ ফ্রেইডেল মনে করেন যদি কংক্রিট মিক্সিং ও পাম্প করার জন্য রোবট ব্যবহার করা হয়, তাহলে সময় আরও কম লাগবে। তার ধারণা, এটি তখন মাত্র ২৪ ঘণ্টায় শেষ করা সম্ভব হবে।

এমসিএসসির এই প্রজেক্টটি ছিল পরীক্ষামূলক একটি কাজ। তারা আসলে দেখতে চাচ্ছে থ্রিডি প্রিন্টারকে তাদের মেরিনাররা ঠিক কতটুকু দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এটিকে কেমন করে বড় বড় নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যায়, তার একটা ফিল্ড টেস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এই প্রজেক্টটিকে। ২০১৬ সালেই তাদের কমান্ডান্ট মনে করতেন এ ধরনের নির্মাণকাজ বিশেষ করে যেখানে তেমন বুদ্ধির ব্যবহার নেই কিন্তু বিপদ বা ঝুঁকি রয়েছে অথবা ধুলা-ময়লা বা নোংরা রয়েছে, সেসব কাজ তাদের সৈনিকেরা না করে রোবট দিয়ে করানোই বেশি যুক্তিযুক্ত। যদি যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের কাজের প্রয়োজন হয় তখন সেখানেও এ ধরনের কাজে রোবটের ব্যবহার অনেক সুবিধা এনে দিতে পারে। 

ফ্রেইডেলের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে বা মহড়ার সময় একজন সৈনিক হাতুড়ি ঝুলিয়ে প্লাইউড নিয়ে ছুটোছুটি করবে এটা শোভা পায় না। তাই একটা কংক্রিট প্রিন্টার এ রকম পরিস্থিতিতে হতে পারে ভালো এক সমাধান। বিশেষ করে যখন তাদের চাহিদা অনুযায়ী স্বল্প সময়ে স্থাপনা তৈরিতে সক্ষম। এটা সৈনিকদের জন্য বিরাট এক সুবিধা। তিনি আরও মনে করেন, এ ধরনের প্রযুক্তির সুবিধা শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা মহড়ার সময়ই ব্যবহার করতে হবে তা নয়; বরং মেরিন বা সৈনিকেরা যখন সাধারণ জনগণের সেবায় বা দুর্যোগ পরবর্তী সমস্যা সমাধানে কাজ করে তখনো এসব নতুন নতুন প্রযুক্তির সুবিধা তারা নিতে পারে সহজেই। 

গত কয়েক বছরের মধ্যে থ্রিডি প্রিন্টিং কনস্ট্রাকশন অর্জন করেছে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা। এখনো আর্কিটেক্ট আর ইঞ্জিনিয়াররা তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কেমন করে আরও কার্যকরভাবে থ্রিডি প্রিন্টারকে ব্যবহার করা যায়। গত বছর মিলান ডিজাইন উইক-এ অরূপ অ্যান্ড সিএলএস (Arups & CLS) তাদের সহজে বহনযোগ্য অর্থাৎ পোর্টেবল থ্রিডি প্রিন্টার প্রদর্শন করেছে। এ ছাড়া বিশ্বের আরও অনেক কোম্পানি তাদের থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ি ভাড়া দেওয়া শুরু করেছে। এসব দেখে শুনে মনে হয় এই রোবট নির্মাণশিল্পে তার জায়গাটা বেশ শক্তপোক্তভাবেই করে নিতে যাচ্ছে।


প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮

Related Posts

ভবনে নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা যখন নাগরিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি

আধুনিক ভবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প—সব ধরনের ভবনের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে…

বাঁশবনের ভেতর মনোরম ‘ভেইল টাওয়ার’

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের শিয়ানিং শহরের ‘ঘন মসো’ বাঁশবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক অস্থায়ী স্থাপনা যার নাম, ‘ভেইল…

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আগামীর সাশ্রয়ী আবাসন শিল্পকে বদলে দেবে

বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির ফলে সাশ্রয়ী বা এফোর্ডেবল হাউজিং আজ একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে…

‘Solaris’: শিশুর স্কেচ থেকে শিল্পোৎপাদিত নকশা

সৃজনশীল নকশার ক্ষেত্রে বয়স যে কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, তারই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ Solaris (সোলারিস)। সুইডিশ আলোকসজ্জা ব্র্যান্ড Blond…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Cover
Ramna Park
রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়
Qatar
Electric
Mondir
Tiles
Indian Homes
গাছকে কেন্দ্র করে নির্মিত আবাসনের নতুন ভাষা: ‘হোমস অ্যারাউন্ড ট্রিজ’