ফিল্ম ভ্যালি
আন্তর্জাতিক মানের ফিল্মি দুনিয়া

সমগ্র পৃথিবীতে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য আছে ফিল্ম সিটি। যেমন ডিজনি স্টুডিও, হলিউড, রামোজি ফিল্ম সিটি, মুম্বাই ফিল্ম সিটি। এসব ফিল্ম সিটিতে আছে নানারকম স্থাপনা আর সেগুলোর ভেতর ও বাইরে সেট বসিয়ে সিনেমা, নাটক থেকে শুরু করে হালের ওয়েবসিরিজ- সবই নির্মাণ করা হয়। এই রকম ফিল্ম সিটি বাংলাদেশে যে ছিল না, এমন নয়। বাংলাদেশের বিএফডিসির (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন) ভেতর এভাবে হাজার হাজার চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছে। কিন্তু এখন বিএফডিসির ভেতর অনেকেই ফিল্ম শুট করতে চান না। একই রকম চর্বিতচর্বণ মুভির চাহিদাও কমে গেছে। বেড়েছে ওয়েব সিরিজের চাহিদা, সঙ্গে শর্টফিল্ম থেকে শুরু করে নানা রকম ওয়েব বেইজড মুভি। এসব চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের জন্য নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। বিএফডিসির আধুনিকায়ন না হওয়ায় এখানে অনেক তরুণ ফিল্মমেকার আসতে চান না। এসব কিছু মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে আধুনিক ফিল্ম সিটি-‘ফিল্ম ভ্যালি’।

একটা ভালো মানের গল্পকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আনতে প্রয়োজন হয় নানা রকমের সেটের। যেমন, কুঁড়েঘর কিংবা বস্তির গল্পের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন হয় ছনের ঘর, আবার পাঁচতারা মানের পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন হয় নান্দনিক ইন্টেরিয়রসমৃদ্ধ বাড়ির। এ রকম সবকিছু নিয়ে একটি ফিল্ম সিটি বানানোর চিন্তা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন ইসমাইল হোসেন নয়ন। কিন্তু বিষয়টির প্রপোজাল নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরেছেন তিনি। অনেক মানুষকে জিজ্ঞেস করেছেন, অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। একসময় ইউরো গ্রুপ ওনার এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়। আর প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সহযোগিতায় ১২ বছর পর বাস্তবায়নের মুখ দেখে ঢাকার অদূরে সাভারের ধামরাইয়ে সাড়ে তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ‘ফিল্ম ভ্যালি’।

এই ফিল্ম ভ্যালির স্থপতি এ বি এম নাসিম জামান সম্রাট যখন এই কাজটি শুরু করেন, তখন তিনি দেখলেন বাংলাদেশে কোনো ফিল্ম সিটি নেই। খোলা জায়গাকে সেট বানিয়ে ফিল্ম শুট হয়, বাসাবাড়িতে ফ্ল্যাট ভাড়া করে হয় ফিল্মের শুটিং। তখন তিনি বিভিন্ন ফিল্ম সিটি স্টাডি করে এরপর ডিজাইন করলেন ফিল্ম ভ্যালির। এই জায়গাটি আগে ছিল ধানিজমি। একই সঙ্গে এ কাজে ছিল বাজেটস্বল্পতা। এখানে দরকার হাইটেক সাপোর্টের পাশাপাশি টেকনিক্যাল ও এসথেটিক ভ্যালু। এমন কিছু আর্কিটেকচার এখানে বানানো দরকার, যেগুলো ফিল্ম শুট করার সময় একদম আসলের মতো দেখাবে। প্রয়োজন পার্ক, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিসহ নানা স্থাপনা, যেগুলো একই সঙ্গে এক জায়গায় করাটা বেশ কঠিন কাজ। এ জন্য বিভিন্ন ফিল্ম ডিরেক্টরের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। বড় স্থপতি, যাঁরা দেশে-বিদেশে নানারকম ফিল্ম সিটি ডিজাইন করেছেন, তাঁদের সঙ্গে আলাপের পর এখানকার প্ল্যানিংয়ে হাত দেন স্থপতি।

ফিল্ম ভ্যালি লিমিটেড

একটা শুটিং সেটে বেশ কিছু অংশ থাকে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম লাইট প্রজেকশন। যে আলো আমরা সূর্য থেকে পাই, সেটা একটা শুটিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। অনেকেই তখন বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করেন। কেউ কর্কশিট হাতে নিয়ে সূর্যের আলোকে দুই পাশ থেকে প্রজেক্ট করতে সাহায্য করেন। ক্যামেরার জন্য ট্রলির দরকার হয়। সেই ট্রলির সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারগুলো যেন সব সময় থাকে, সেই ব্যবস্থা করতে হয়। করতে হয় বৈদ্যুতিক সংযোগের সুব্যবস্থা। ধরুন, নায়ক-নায়িকা যদি গানের সিকোয়েন্স করতে করতে পানিতে নেমে যায়, তাহলে সেই পানির সামনে ক্যামেরার জন্য যদি কেবল-সংকট হয়, তাহলে তো সেই দৃশ্যটি নেওয়াই যাবে না। এসব চিন্তা করে পুরো জায়গাটির প্রতিটি অংশে মেইল-ফিমেইল সকেটের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই ফিল্ম সিটিতে রয়েছে এগারোটি স্টুডিও ও ফ্লোর। এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে কিংবদন্তি মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের নামে। যেমন আছে, রাজরাজ্জাক ফ্লোর, চিত্রনায়ক জসিম ফ্লোর, জহির রায়হান স্টুডিও, চিত্রনায়ক সালমান শাহ স্টুডিও, চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল কটেজ, মহানায়িকা সুচিত্রা সেন মেকআপ রুম প্রভৃতি। ঢাকার বিএফডিসি বা উত্তরার যেসব শুটিংস্পট আছে, সেগুলোতে শুধু ইনডোর শুট করা যায়। বাসাবাড়ির ভেতরের ফ্যাসিলিটি পাওয়া গেলেও আউটডোরের জন্য বাইরে যেতেই হয়। আর বাইরে শুটিং করা মানে উৎসুক জনতার ঢল। অনেক সময় নায়ক-নায়িকাকে দেখার জন্য এত বেশি মানুষ ভিড় করে যে এর চাপ সামলাতে গিয়ে নাটক-সিনেমার শুটিং ব্যাহত হয়। আর এসব কারণে একটি ফিল্ম সিটির প্রয়োজন অনেক। আর সেটাই করে দিয়েছে ইউরো গ্রুপ।

একটা ফিল্ম সিটিতে ‘প্রপস’ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন গল্পের প্রয়োজনে এমন একটি বস্তু প্রয়োজন, যেটা কিনতে গেলে দেখা যায় ছবির বাজেটের অনেকটাংশ চলে যায়, যা ছবির মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। এ জন্য দেখা যেত আগেকার দিনের সিনেমাগুলোতে কোনো সায়েন্স ফিকশন চরিত্রকে টিন দিয়ে বানানো পোশাক পরিয়ে দেওয়া হতো, আবার সায়েন্টিস্টের কাজকর্ম বোঝাতে নানারকম কাচের বোতলের ভেতর ধোঁয়া ঢুকিয়ে শুট করা হতো। এসব দেখতে যে শুধু হাস্যকর তা-ই নয়, এগুলো বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের সিনেমার মান নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করে। এসব বন্ধের জন্যই মূলত এই ফিল্ম ভ্যালি। এখানে আছে নানা রকমের প্রপস। আছে উন্নতমানের ফার্নিচার, যেগুলো একই সঙ্গে মডার্ন ও অভিজাত।

সিনেমা-নাটকে বৃষ্টির দৃশ্য বেশ কষ্টকর। একটা রেইন মেশিন নিয়ে কিছু লোক বিভিন্ন শুটিংস্পটে ঘোরাঘুরি করে। যেখানে দরকার সেখানে বৃষ্টির দৃশ্যায়নের জন্য নকল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মেশিন দিয়ে সেটা চিত্রায়ন করে। আর এ জন্য লোকবলও প্রচুর দরকার হয়, যার জন্য বেশ কিছু টাকাও খরচ হয়। এই ফিল্ম ভ্যালিতে যেকোনো জায়গায় বৃষ্টিপাত বোঝানোর জন্য অনেক রেইন মেশিন বসানো আছে। যেকোনো স্থানে বৃষ্টির শুট করা যাবে যেকোনো সময়। অযথা জিনিসপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না।

ফিল্ম ভ্যালি লিমিটেড

বর্তমানে হলিউড-বলিউডে আছে অনেক ক্রোমা স্টুডিও। ক্রোমা স্টুডিও হলো একটা স্টুডিও, যাতে ব্লু বা গ্রিন স্ক্রিন থাকে বড় একটা হলঘরে। ওপরে থাকে সূর্যালোক তৈরির জন্য বিশাল লাইটের সারি। সে রকম ক্রোমা স্টুডিওতে হলিউডে নানারকম চলচ্চিত্রের শুটিং হয়। এরপর সেই ফিল্ম থেকে পেছনের নীল পর্দা ফেলে দিয়ে ডিজিটালি বিভিন্ন ছবি সংযুক্ত করে বানানো হয় আসল চলচ্চিত্র। অনেক সময় মূল কলাকুশলীদের মুখে ও শরীরে নানা রকম কারুকাজ করে দেওয়া হয়। সেগুলো ডিজিটাল নানা ক্যারেক্টারে রূপান্তরিত হয়ে নানা ধরনের প্রাণীতে পরিণত হয় সিনে পর্দায়। যেমন, বাহুবলী ছবিতে ষাঁড়ের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে আসল ষাঁড় ব্যবহার করা হয়নি। একটা নকল ষাঁড়ের মাথা নিয়ে একজন মানুষ নীল জামা পরে বল্লাল দেবের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি একটি খেপাটে ষাঁড় যুদ্ধ করছে বল্লাল দেবের সঙ্গে। এ ছাড়া গেম অব থ্রোন্স থেকে শুরু করে হালের ব্যাটম্যান, সুপারম্যান মুভিগুলোতে হরহামেশাই ক্রোমা স্টুডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। ডিরেক্টর এং লি তো এই ক্রোমা স্টুডিওতে একটা পুরো সিনেমা ‘লাইফ অব পাই’ শুট করেছেন। কিন্তু আমরা দেখেছি পাই নামের শিশুটি কীভাবে একটি বাঘের সঙ্গে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। আর এই ফিল্ম ভ্যালিতে ‘কবরী ক্রোমা স্টুডিও’-তে আছে ক্রোমা শুটের যাবতীয় উপকরণ। এটি আকারে মাঝারি হলেও এর পরিধি বাংলাদেশের আয়োজনে বেশ বড়ই বলা চলে। বাংলাদেশে কয়েকটি টিভি সিরিজ নির্মিত হয়েছিল ক্রোমা স্টুডিওতে। এ ছাড়া তেমন কোনো কাজ হয়নি। স্টুডিওর অভাবে কাজ করাও সম্ভব হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতে এসব বাধা কাটিয়ে বাংলাদেশেও বিশ্বমানের ক্রোমা স্টুডিও বেইজড ফিল্ম তৈরি হবে।

একদিন বাংলাদেশে তৈরি হবে হলিউড বা ডিজনির মতো বিশালাকৃতির ফিল্ম সিটি। হাজার কোটি টাকা দিয়ে এই বাংলাদেশেই তৈরি হবে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র। হয়তো সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন অশ্লীলতা ও অবাস্তব সিনেমার যুগ শেষ করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প হবে সমগ্র পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠতম চলচ্চিত্রশিল্প। আর এই পথচলাটা হয়তো শুরু হলো ফিল্ম ভ্যালি দিয়েই।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top