সুইজারল্যান্ড! নাম শুনলেই দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে ছবির মতো এক দেশ। উঁচু-নিচু পাহাড়, ভ্যালি, সবুজ ল্যান্ডস্কেপ, পর্বতজুড়ে জমে থাকা বরফ প্রাকৃতিক নৈসর্গের এমন নান্দনিক সমাহার সারা বিশে^ সত্যিই বিরল। এই ছবিময় দেশটির মধ্যে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটিই যেন গ্রিন্ডেলওয়াল্ড। স্বর্গের মধ্যে যেন আরেক স্বর্গ! সুইজারল্যান্ডের অনিন্দ্যসুন্দর এই গ্রামটিতে প্রতিবছর আসেন লাখ লাখ পর্যটক। কিন্তু কেন এই পর্যটন আকর্ষণ; কী আছে সেই স্বর্গভূমে, চলুন জানা যাক।
ভৌগোলিক তথ্য
সুইজারল্যান্ড দক্ষিণ মধ্য ইউরোপের স্থলবেষ্টিত পার্বত্য এক দেশ। ইউরোপে অবস্থান হলেও এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। বরাবরই দেশটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে এসেছে। গ্রিন্ডেলওয়াল্ড (এৎরহফবষধিষফ) সুইজারল্যান্ডের ওবারহাসলি প্রশাসনিক জেলার একটি গ্রাম। গ্রামটির আয়তন ১৭১ বর্গ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,০৫০ থেকে ১০,০০০ ফুট উচ্চতার মধ্যে যার অবস্থান। লোকসংখ্যা ৩ হাজার ৮১০ জন। গ্রামটি চতুর্দিক থেকে সুউচ্চ পর্বতমালায় বেষ্টিত। এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পর্বতচূড়া হলো ফুলহর্ন, ওয়েলহর্ন, শোয়ার্জহর্ন ইত্যাদি। গ্রিন্ডেলওয়াল্ডে তুন্দ্রা জলবায়ু বিরাজমান। এখানে সারা বছরই ঠান্ডা থাকে। গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বছরে প্রায় ৭৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় আর শুষ্ক থাকে ১১৮ দিন, যার গড় আর্দ্রতা ৮৯ শতাংশ।
পর্যটন আকর্ষণের নেপথ্যে
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড যে কারণে সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে সুপরিচিত তা হলো এখানকার মনোমুগ্ধকর ও প্রশান্তি জাগানিয়া প্রাকৃতিক দৃশ্যের বহুবিধ সমাহার। একই সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের জন্য আদর্শ এক স্থান। সুইজারল্যান্ডের প্রধান পর্বত আরোহন, গ্রীষ্ম ও শীতকালীন রিসোর্টগুলোর মধ্যে এই গ্রামটির রয়েছে বিশেষ কদর। সুউচ্চ পর্বত, পাহাড় থেকে নামা গ্লেসিয়ার, পাইপের বন, ভ্যালি, নদী প্রভৃতিতে হাইকিং, সাইক্লিং, স্নোবোর্ডিং, ক্লাইম্বিংসহ নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার কর্মকাণ্ড রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ভ্যালির নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপ বিন্যাস সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এখানে সবুজ ঘাসের ওপর যখন সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়ে, তা দেখে যেন স্বপ্নালোকের রূপকথার রাজ্য বলেই মনে হয়। এত চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ বিন্যাস আর কোথাও দেখাই মেলে না।
ঝা-চকচকে এক জনপদ এই গ্রিন্ডেলওয়াল্ড। কোথাও নেই কোনো ময়লা-আবর্জনার রেশমাত্র। সবকিছুই যেন পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো। গ্রামটির কর্তৃপক্ষ ভ্যালির ঘাসগুলোকে কেটে ও আগাছামুক্ত রেখে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখে সব সময়। বিভিন্ন ধরনের বর্ণিল ফুলগাছে সাজানো গ্রামটি। পর্যটন চাহিদা মেটাতে গ্রামটিতে গড়ে উঠেছে শপিং মল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই পরিবেশবান্ধব। পর্যটকদের সুবিধার জন্য ওপর থেকে পুরো দৃশ্য উপভোগ করার জন্য নির্মিত হয়েছে কেব্্ল কার। ওয়েটারহর্ন নামের এই কেবল কার স্থাপন করা হয় ১৯০৮ সালে, যা বিশে^র প্রথম স্থাপিত কেব্্ল কারের একটি। এখানে পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে সাইক্লিংয়ের সুব্যবস্থা। মাউন্টেনের গা ঘেষে বসানো হয়েছে ক্লিফওয়াক ওয়ে। এ ছাড়া প্যারাসেলিং, গতিময় কেব্্ল ফ্লাই মেশিন, মিনি ইলেকট্রিক কার, ট্রয় ট্রেনে ভ্রমণ, টেন্ট ক্যাম্পিং, মিনি গলফ, জাদুঘর প্রদর্শন ইত্যাদির সুব্যবস্থা রয়েছে গ্রামটিজুড়ে।
স্কিইং ও স্নোবোর্ডিং
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড বিশ্বমানের স্কিইং ও স্নোবোর্ডিংয়ের জন্য নিখুঁত জায়গা। ইউনেসকো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুইস আল্পস জংফ্রাউ-আল্পস পর্বতমালার অন্যতম দর্শনীয় পর্বত, যা বছরের বেশির ভাগ সময়ই থাকে বরফে আবৃত। আপনি যদি শীতকালে আসেন এবং স্নোবোর্ড করতে চান, তাহলে আপনার গিয়ারটি আপনার সঙ্গে টেনে আনতে হবে না। এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে আপনি আপনার সরঞ্জাম ভাড়া নিতে পারবেন সহজেই।
জংফ্রা ও জোচ রেলওয়ে চড়ুন
আপনি যদি গ্রিন্ডেলওয়াল্ড ভূখণ্ডটির ওভারভিউ দেখতে চান তাহলে আদর্শ হলো জংফ্রা ও জোচ রেলওয়েতে যাওয়া। লালকগওয়েল ট্রেনটি ক্লেইনশিডেগ থেকে ছেড়ে যায়। যার একটি বড় অংশ জংফ্রাউটানেলের মধ্য দিয়ে চলে। ট্রেনে ভ্রমণকালে আপনি অত্যাশ্চর্য পর্বত প্যানোরামা দেখতে পাবেন এবং টানেলের দেয়ালে এমনকি জানালাও রয়েছে, যেখানে আপনি আলেশগ্লেশ্চারের বরফের অবিশ্বাস্য সমুদ্র দর্শন করতে পারবেন।
বাচাল্প থেকে আলপাইন
অনেক কম চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা হলো মনোরম লেক বাচাল্প-এ হাঁটা। সেখানে যাওয়ার জন্য আপনার দরকার হবে হাইকিং জুতা। লেক পর্যন্ত সব পথ সমতল। একটি পরিষ্কার দিনে যদি সূর্য ঠিক থাকে, তবে আপনি লেকে প্রতিফলিত পাহাড় দেখতে পাবেন। যে দৃশ্য আগে হয়তো কখনো আপনি দেখেননি।
জংফ্রাজোচ আইস প্যালেস
এখানে রয়েছে একটি বরফ নির্মিত প্রাসাদ, যা আপনাকে স্থাপত্য শিল্পের ভিন্ন এক দুনিয়ায় স্বাগতম জানাবে। একবার ভাবুন, একটি হিমবাহের নিচে বরফের টানেলের মধ্য দিয়ে আপনি হেঁটে যাচ্ছেন।
হিমবাহ ক্যানিয়নে হাইকিং
শহরের কেন্দ্র থেকে একটু হাঁটলেই হিমবাহের শুরুটা পাবেন। প্রায় শূন্য দশমিক ৫ মাইল হাঁটলেই দেখা মিলবে প্রাকৃতিক টানেল এবং শিলা গ্যালারির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হিমবাহ। পুরো হাঁটা এবং পর্যটন স্বর্গ গ্রিন্ডেলওয়াল্ডে ফেরার জন্য এক থেকে দুই ঘণ্টার পরিকল্পনা করুন।
মিনি গলফ
প্রধান রাস্তায় একটি চমৎকার ১৮ গর্তের মিনি গলফ কোর্স রয়েছে, যা শুধু একটি চ্যালেঞ্জিং রাউন্ড নয়, বরং পাহাড় ও ওবেরার হিমবাহের দুর্দান্ত দৃশ্য উপস্থাপন করে।
ক্লিফওয়াক
পাহাড়ের মুখের পাশে নির্মিত ক্লিফওয়াক হলো একটি উঁচু ওয়াকওয়ে, যা ব্যতিক্রমী দৃশ্য উপস্থাপন করে। বার্গস্টোরান্টেরটেরেস শেষ করার আগে ওয়াক ওয়েটি পাহাড়ের মুখের চারপাশে ঘুরে আসে।
মিডিয়ায় পর্যটন স্বর্গ গ্রিন্ডেলওয়াল্ড
হলিউডের বেশ কিছু চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন ধারণ করা হয়েছে এখানে। জেমস বন্ড সিরিজের ‘অন হার মেজেস্ট্রি’স সিক্রেট সার্ভিস’ চলচ্চিত্রটির বেশ কিছু অংশ এখানে নির্মিত। এ ছাড়া স্টার ওয়ার্স: এপিশোড ৩-এ ‘রিভেঞ্জ অব দ্য সিথ’ ও ‘দ্য গোল্ডেন কম্পাস’ চলচ্চিত্র দুটি এখানে ধারণকৃত। আল্পস পর্বতমালার ওপর নির্মিত ডকুমেন্টারি ‘দ্য আল্পস’ এই গ্রামটির বিভিন্ন লোকেশনেই দৃশ্যায়িত।
যাওয়ার উপায়
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড ইন্টারলেকেন থেকে ২১ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে চমৎকার গণপরিবহন পরিসেবা। নিয়মিত বাস ও ট্রেন দুটি শহরের সঙ্গে প্রায় ৩৫ মিনিটের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
থাকার আয়োজন
গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের ভ্রমণে আবাসনের ব্যয় কিছুটা বেশি। তবে বিভিন্ন বাজেটের আবাসনব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। কম বাজেটে থাকতে চাইলে তাঁবু বেছে নেওয়াই শ্রেয়।
কোথায় কী খাবেন
গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের বেশির ভাগ ভালো রেস্তোরাঁগুলো প্রধান রাস্তা ডর্ফস্ট্রাসে অবস্থিত। এ ছাড়া হোটেলগুলোতেও মানসম্মত রেস্তোরাঁ রয়েছে। রেস্তোরাঁগুলোতে সুইচ ঐতিহ্যবাহী খাবার, ফন্ডু চিজ এবং মাংসের তৈরি বিশেষ রোস্টি, আলু প্যানকেক পাওয়া যায়। এই খাবারগুলোর ভিন্নস্বাদ আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
ভ্রমণবিষয়ক টিপস
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড দেখার সেরা সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর। জুলাই মাসে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে গ্রিন্ডেলওয়াল্ড গ্রীষ্ম ও শীতকাল উভয় ঋতুতে সমানভাবে জনপ্রিয়। বছরের যেকোনো সময় এখানে আপনার ভ্রমণ হবে উপভোগ্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।