আগে এ অঞ্চলের পরিচিত ছিল বাগড়ী, ব্যাঘ্রতট, সমতট নামে। মনুষ্য বসবাসের আগে এলাকাটি ছিল বিস্তীর্ণ এক জলাভূমি। কালের বিবর্তনে পলি জমে গড়ে ওঠে চরাচর, বনভূমি আর মানব বসতি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও রয়েছে এর আওতায়। জলজ ও বনজ সম্পদের বিপুল আধার হওয়ায় ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই অর্থনীতিতে এ জনপদটির অবদান অনেক। উপকূলবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এখানে গড়ে উঠেছে প্রচুর মৎস্য খামার। বিশেষ করে চিংড়ি, দেশীয় রপ্তানি খাতে যা সৃষ্টি করেছে অভাবনীয় এক বিপ্লব, যার খ্যাতি ‘হোয়াইট গোল্ড’ নামে। সমৃৃদ্ধ এ জনপদের নাম সাতক্ষীরা। এর সদরের একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. শাহিনুজ্জামান (শাহিন)। সদরের শহীদ সিরাজ সরণি, আমতলা মোড়ের মেসার্স নিরালা ট্রেডার্সের কর্ণধার যিনি। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এ সংখ্যার সফল মুখ তিনিই। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলমের সহযোগিতায় জানাব তাঁরই সাফল্য-কাহিনি।
ব্যবসায়ী শাহিনুজ্জামানের জন্ম ১৯৮৫ সালের ৭ নভেম্বর আমতলা, সাতক্ষীরায়। পিতা মরহুম মো. ওমর আলী ও মা মোছা. হাফিজা খাতুন। ২০০২ সালে টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং ২০০৪ সালে পিএন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে স্নাতক (সম্মান) পড়ার সময় ব্যবসায় জড়িয়ে যান। বর্তমানে তাঁর ব্যবসাসম্ভারে রয়েছে সিমেন্ট, রড, ইট, বালু, প্রাকৃতিক গ্যাস, চুলা ও হার্ডওয়্যারসামগ্রী।
ব্যবসায়ী শাহিনুজ্জামান ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা, চাচা, মামা ও বড় ভাই যৌথভাবে যুক্ত ছিলেন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। বাল্যকাল থেকেই ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁকেও প্রায়ই দোকানে বসতে হতো। তখন থেকেই ব্যবসার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। কলেজে পড়াকালীন শাহিনুজ্জামানের বড় ভাই মো. মনিরুজ্জামান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে মাস তিনেক পর মারা যান। তখন থেকেই তাঁকে নিয়মিত দোকানে বসতে হতো। সঙ্গে চলত লেখাপড়াও। কিন্তু ব্যবসা বা লেখাপড়া এর কোনোটাতেই তিনি ঠিকভাবে মন দিতে পারছিলেন না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল উভয়ই। বিষয়টি উপলব্ধি করে ব্যবসার প্রতি তাঁর ব্যাপক আগ্রহ থাকায় অবশেষে ব্যবসায় নিয়মিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আগে ব্যবসার পরিসর ছিল ছোট। স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। শাহিনুজ্জামান হাল ধরার পর থেকেই বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিসর। যদিও অনেক আগ থেকেই ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে এলাকায় যথেষ্ট সুনাম ছিল তাঁদের। তবে ব্যবসার উন্নয়নে এই সুনামের ওপর নির্ভর না করে নির্ভর করেন নিজস্ব মেধা ও কৌশলের ওপর। ন্যায্য দামে গুণগতমানের পণ্য বিক্রি, সততা, নিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা এবং পরিশ্রম দিয়ে নিজেকে নিয়ে যান প্রতিষ্ঠিত ও সফল ব্যবসায়ীর কাতারে। বিক্রি শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট। পণ্যটি বিক্রিতে বেশ সফল হন শুরুতেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির সাতক্ষীরা টেরিটরিতে নির্বাচিত হন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রেতা। এ ছাড়া সব সময় ছিলেন সেরা বিক্রেতার তালিকায়। তদুপরি আনোয়ার ইস্পাতের স্থানীয় পরিবেশক তিনি। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য বিক্রি আর কোম্পানি প্রদত্ত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন এলইডি টিভি, মাইক্রোওভেন, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া অফার পেয়েছেন মিশর, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের।
ব্যবসায়ী শাহিনুজ্জামান বিয়ে করেন ২০১৫ সালে। সহধর্মিণী মোছা. শারমিন আক্তার। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে মুফতাসিম ফুহাদ তাওসিফ। বয়স দুই বছর। স্থানীয় পর্যায়ে তিনিসহ তাঁর পরিবার বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িত। স্থানীয় মসজিদ ও ঈদগাহ নির্মাণের জন্য পারিবারিকভাবে তাঁরা জায়গা দিয়েছেন। চেষ্টা করেন ধর্মীয় কাজে সাধ্যমতো সহায়তা করার।
বর্তমানে সাতক্ষীরা সদরে এ ব্যবসায়ীর রয়েছে দুটি শোরুম ও দুটি গোডাউন। ব্যবসার পরিসরও বেড়েছে আগের তুলনায় কয়েক গুণ। ব্যবসায় এমন অর্জনের পেছনে তাঁর ছোট ভাই মো. তুহিনুজ্জামানের অবদানও কম নয়। এ ব্যবসায়ীর ইচ্ছে মিল বাজার, বিজিবি ক্যাম্প এলাকাতে তাঁদের নিজস্ব জায়গায় আরও বড় পরিসরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; যেখানে থরে থরে সাজানো থাকবে সব ধরনের নির্মাণসামগ্রী।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।