সহোদরদের সফল ব্যবসা

চা-বাগান পরিবেষ্টিত মাধবপুর, হবিগঞ্জ জেলার একটি প্রসিদ্ধ উপজেলা। সোনাই নদীর তীরে অবস্থিত এ জনপদটি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পীঠস্থান। এখানেই স্বাধীনতাযুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কিত প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুদ্ধও সংঘটিত হয় এলাকাজুড়ে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো আর গ্যাসের সুবিধা থাকায় এ এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে স্থাপনা, অবকাঠামো এমনকি প্রান্তিক মানুষের ঘরে ঘরে। আর সে উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন এলাকার নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ীরা। মো. জাকির হোসেন স্বপন ও সুমন ভূঁইয়া এই মাধবপুরের সফল দুই নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। সম্পর্কে তাঁরা সহোদর। স্টেডিয়াম পাড়া, মাধবপুরে অবস্থিত ‘মেসার্স বৈশাখী ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তাঁরা। বন্ধনের নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ভ্রাতৃদ্বয়ের ব্যবসায়িক সাফল্যের রহস্য। এ ব্যাপারে সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির বি.বাড়িয়া টেরিটরির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা শাহিনুজ্জামান সাগর ও আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. আহসান কবির। 

ব্যবসায়ী সহোদরের বাবা মরহুম আব্দুল কাইয়ুম ও মা নিলুফা আক্তার। ব্যবসায়ী জাকির হোসেন স্বপন পড়াশোনা শেষে ঢাকার নবাবপুরে হার্ডওয়্যার ব্যবসা শুরু করেন। পাঁচ বছর পর ব্যবসা ছেড়ে পাড়ি দেন মালয়েশিয়ায়। সেখানে প্রায় ১৪ বছর অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসেন। ২০১০ সালে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। অন্য দিকে ব্যবসায়ী সুমন ভূঁ  ইয়া উচ্চমাধ্যমিকের পর বোন-জামাই মেজবাহ উদ্দিন বেনু এবং মো. আতিউর রহমান দীপকের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। সাতবর্গ, বিজয়নগর, বি.বাড়িয়ার এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিতে বিক্রি করেন অ্যাঙ্গেল, পাতি, ফ্লাটবার, রডসহ বিভিন্ন ধরনের গ্রিলের মালামাল। এরপর বড় ভাই জাকির হোসেন স্বপন দেশে ফিরে এলে মাধবপুরে দুই ভাই যৌথভাবে নির্মাণপণ্য ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁরা অত্র এলাকার প্রসিদ্ধ রড ও সিমেন্ট বিক্রেতা।

সিমেন্ট ব্যবসার শুরু থেকেই তাঁরা বিক্রি করছেন আকিজ সিমেন্ট। গুণগতমানের এ পণ্যটি স্বল্প সময়েই তাঁদের এনে দিয়েছে অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। তাঁরা আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির বি.বাড়িয়া টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এমন অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক সাফল্যে আকিজ সিমেন্টসহ অন্যান্য কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, টিভি, মাইক্রোওভেন, স্মার্টফোন, ডিনার সেট, ক্রোকারিজ সামগ্রী, নগদ টাকাসহ নানা উপহার সামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভুটান, নেপাল, ওমরাহ হজসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার। 

ব্যবসায়ী জাকির হোসেন স্বপনের জন্ম ১৯৬০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আন্দিউড়া, হবিগঞ্জে। তিনি ১৯৭৬ সালে আন্দিউড়া উম্মেতুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৭৮ সালে কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৮২ সালে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিয়ে করেন ১৯৯৫ সালে। সহধর্মিণী আর্জদা বেগম। এ দম্পতির এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মোফাজ্জেল হোসেন আলভী বুশরা ইসলামিক কিন্ডারগার্টেন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী, ছোট মেয়ে রাফিদা জাকির রোজা একই স্কুলে নার্সারিতে পড়ছে। 

ব্যবসায়ী সুমন ভূঁইয়ার জন্ম ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি। তিনি ২০০০ সালে আন্দিউড়া উম্মেতুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ২০০২ সালে মাধবপুর সৈয়দ উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিয়ে করেন ২০১৩ সালে ১৫ মে। তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা সাদেকুন্নাহার কুমকুম। এ দম্পতির একমাত্র মেয়ের নাম নুর হাফিজা রুহি। বয়স সাড়ে তিন বছর। 

ব্যবসায়ী মো. আতিউর রহমান দীপক ভৈরব, কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা। তাঁর সহধর্মিণী মাহাবুবা আক্তার রীণা। এ দম্পতির তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে তন্ময়, মেজ মেয়ে প্রার্থনা এবং ছোট ছেলে আনিদ।  

এ ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয় যেমন একসঙ্গে ব্যবসা করেন, তেমনি যৌথ পরিবারেই বসবাস করেন, থাকেন একই সঙ্গে। নিজেদের মধ্যে চমৎকার ব্যবসায়িক বোঝাপড়া। ব্যবসাই তাঁদের ধ্যান-জ্ঞান। দুজনে মিলে ব্যবসার সবকিছু দেখভাল ও তদারকি করেন। বিশেষ করে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেন। তা ছাড়া দীর্ঘদিন সৎভাবে ব্যবসা করায় তাঁরা সবার পরিচিত হয়ে উঠেছেন। আর সে কারণেই মাধবপুরের ক্রেতারা ছাড়াও সাতবর্গ, বিজয়নগরের ক্রেতারাও তাঁদের কাছ থেকে পণ্য কেনেন। ক্রেতারা তাঁদের এতটাই বিশ্বাস করেন যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে না এসেও ফোন করে পণ্যের অর্ডার দেন। তা ছাড়া লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকায় কোম্পানির পণ্য থেকেও পান সার্বিক সহযোগিতা। এভাবেই এ সহোদর নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। 
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top