হিমালয় পর্বতের হিমবাহের পলল করতোয়া, আত্রাই, তিস্তা, চারালকাটা, যমুনেশ্বরী, শালকী প্রভৃতি নদীর প্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে। এই পলিমাটি দিয়েই গঠিত হয় উর্বর সমভূমি। পলিমাটির আধিক্যে উৎপাদিত হয় নানা ধরনের ফসল। বিষয়টি অজানা থাকেনি ইংরেজ নীলকরদেরও। নীল চাষের জন্য খুবই অনুকূল আবহাওয়া ও অধিক ফলনের লোভে এ অঞ্চলে অসংখ্য নীল খামার গড়ে তোলে তারা। আর তাই জনপদটির নাম নীলফামারী। ধারণা করা হয়, স্থানীয় কৃষকদের মুখে ‘নীলখামার’ রূপান্তরিত হয় ‘নীলখামারী’তে। আর এই নীলখামারীর অপভ্রংশ হিসেবে উদ্ভব হয় নীলফামারী। এই জেলার ডোমার উপজেলার একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী আলহাজ আবদুল হালিম। ডোমার বাজারের ‘নিউ সুখিমা ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের জুনিয়র আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. শেখ মনিরুজ্জামানের সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার সফল এ ব্যবসায়ীর জীবনের গল্প।
ব্যবসায়ী আবদুল হালিমের জন্ম ১৯৫৪ সালে, বিক্রমপুরের শ্রীনগরে। বাবা মরহুম আবদুল বারেক আর মা মরহুমা হালিমা বেগম। তিন ভাই, চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বাবার ব্যবসাসূত্রেই বাল্যকালেই যুক্ত হন ব্যবসায়। প্রথম দিকে বাবার ছিল কাঁসা-পিতলের ব্যবসা। পরবর্তী সময়ে কাপড়ের। ব্যবসায়ী আবদুল হালিমও ডোমার বাজারে শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। কিন্তু কাপড়ের ব্যবসায় তুলনামূলক কম মুনাফা হওয়ায় ১৯৭৬ সালে শুরু করেন নির্মাণপণ্য সামগ্রীর ব্যবসা। দেশের স্বনামধন্য নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির কর্ণধারের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে তাঁদের পরামর্শে তিনি এ ব্যবসায় আগ্রহী হন। তাঁরা তাঁকে নির্মাণপণ্য সামগ্রী সরবরাহ করে সহায়তা করেন। এভাবেই তিনি পুরোদস্তুর নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বর্তমান ব্যবসায় পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, সিমেন্ট সিট, এঙ্গেল, পাতি, ফ্লাটবার ও ঢেউটিন।
ব্যবসায়ী আবদুল হালিমের বাবা ছিলেন ভারতের আসাম প্রদেশের বাসিন্দা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ১৯৫৬ সালে তিনি আসাম থেকে আসেন বিক্রমপুরে। বৈবাহিক ও ব্যবসাসূত্রেই এলাকাটিতে আসা। সেখানে বেশ কয়েক বছর থাকার পর মুক্তিযুদ্ধের আগেই ডোমারে চলে আসেন। তখন থেকেই এ এলাকায় একজন ব্যবসায়ী হিসেবে সবার কাছে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী আবদুল হালিমের জন্যও বাবার ব্যবসায়িক পরিচয় সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী হিসেবেও এলাকায় যথেষ্ট সুনাম রয়েছে তাঁর। ফলে নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসায় সফলতা আসে সহজেই। ডোমার উপজেলা শহর হলেও তুলনামূলক অধিক নির্মাণপণ্য বিক্রি করায় বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, নগদ টাকাসহ নানা উপহার ও সম্মাননা। আকিজ সিমেন্টের পক্ষ থেকে গত বছরই ঘুরে এসেছেন নেপাল থেকে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জসহ বেশকিছু স্থানে ব্যবসায়িক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।
পরিবারের কাছ থেকে ব্যবসার শুরুতে মূলধন হিসেবে পান মাত্র ৩০৯ টাকা। সামান্য এ অর্থ নিয়েই শুরু হয় তাঁর ব্যবসায়িক যাত্রা। আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন ব্যবসাকে দাঁড় করাতে। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ফলে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। এদিকে পুঁজিও প্রায় শেষ হয়ে আসে। যুদ্ধ শেষে হাতে মাত্র নয় টাকা। তা দিয়েই নব উদ্যমে শুরু করেন ব্যবসা। কঠোর পরিশ্রম ও বুদ্ধিমত্তায় ব্যবসাটি আবারও দাঁড়িয়ে যায়। সেই থেকে এখনো চলছে তাঁর ব্যবসা। এ ছাড়া প্রায় এক যুগ ঠিকাদারি করেছেন। কিন্তু ক্রমেই সেখানে মিথ্যা ও অসততা ভিড় করায় তা ছেড়ে নিজ ব্যবসাতেই মনোযোগী হন। বর্তমানে ডোমারে রয়েছে তাঁর দুটি শোরুম ও একটি গোডাউন। আটজন কর্মচারী রয়েছেন তাঁর ব্যবসায়িক সহযোগী হয়ে।
ব্যবসায়ী আবদুল হালিম বিয়ে করেছেন ১৯৮৯ সালে। স্ত্রী মুন্নি বেগম। সুখী এ দম্পতির এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে মিজানুর রহমান জেবিন শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, রংপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অধ্যয়নরত। মেজো মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে এবং ছোট মেয়ে জারিন তাহসিন প্রকৃতি ডোমার সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তাই অনেকের আহ্বান সত্ত্বেও সাংগঠনিক দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। তবুও সামাজিক কর্মকাণ্ড হিসেবে পৌর হাজি কল্যাণ সমিতির সভাপতি। এ ছাড়া ডোমার বাজার কেন্দ্রীয় মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য। মসজিদ, মাদ্রাসা, লেখাপড়া, বিয়ে, চিকিৎসাসহ এলাকার দুস্থদের সাধ্যমতো সহায়তার চেষ্টা করেন। কাজের অবসরে ভালোবাসেন ঘুরতে। ইতিমধ্যে ঘুরে এসেছেন সৌদি আরব, বাহরাইন ও ভারত থেকে।
ব্যবসায়ী আবদুুল হালিম দীর্ঘদিন ধরেই নির্মাণপণ্যের ব্যবসায় যুক্ত। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। তাঁর মতে, সততা দিয়ে ক্রেতার আস্থা অর্জন করা ব্যবসায় সফলতা লাভের প্রথম ধাপ। তাই কেউ যদি নিজেকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তবে তাঁকে অবশ্যই হতে হবে সৎ। এ ছাড়া সবার সঙ্গে করতে হবে ভালো ব্যবহার। অলসতা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করে হতে হবে পরিশ্রমী। যা-ই ঘটুক না কেন, ক্রেতার ওপর রাগ করা চলবে না। ঠান্ডা মাথায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। তবেই মিলবে সফলতা।
প্রকাশকাল: বন্ধন,৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫