টেকসই বাড়ি নির্মাণের ৫ কৌশল

আমাদের সবার স্বপ্ন সুন্দর টেকসই একটি বাড়ি নির্মাণের। বাড়িটি হবে দারুণ আরামদায়ক ও নান্দনিক। কীভাবে কম খরচে নির্মাণ করা যায় স্বপ্নের বাড়ি? বাস্তবে বাড়ি নির্মাণে কম খরচটাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। কারণ, সবাই চান বাড়িটি যেন হয় টেকসই, মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী। সে ক্ষেত্রে যথাযথ খরচ করাটাই যুক্তিসংগত। অনেকে ভাবেন, অযথা ডিজাইন করে, মাটি পরীক্ষা করে খরচ করা মানেই টাকা নষ্ট। হাতুড়ে মিস্ত্রিসহ অনেক ডিপ্লোমাধারী প্রকৌশলীরাও এ ধারণা পোষণ করে থাকেন। কিন্তু প্রকৌশল দৃষ্টিকোণ থেকে (Engineering Point of View) বাড়ি কিংবা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পাঁচটি পদক্ষেপ অতীব জরুরি।

প্রথমত, মাটি পরীক্ষা বা সয়েল টেস্ট

ভবনধসের যতগুলো মৌলিক কারণ রয়েছে, তার মধ্যে সঠিকভাবে মাটি পরীক্ষা না করা অথবা আদৌ পরীক্ষা না করা একটি বড় কারণ। কেননা সয়েল টেস্টের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেই ভবনের ফাউন্ডেশন ডিজাইন করা হয় এবং এই ফাউন্ডেশনের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে ভবনটি। কিন্তু যাঁরা বাড়ি বানান, তাঁদের প্রচণ্ড অনীহা থাকে এই কাজে। ধরুন, পাঁচ কাঠা জমির ওপর একটি সুন্দর ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ করতে খরচ হতে পারে আনুমানিক তিন কোটি টাকা। কিন্তু ভালো মানের মাটি পরীক্ষাকারী কোম্পানি দিয়ে সয়েল টেস্ট করাতে সর্বোচ্চ খরচ পড়বে ২৫ হাজার টাকা। মোট ব্যয়ের তুলনায় সয়েল টেস্টের ব্যয় নগণ্যই। অথচ ২৫ হাজার টাকা খরচ না করলে তিন কোটি টাকা খরচ করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া মাটি পরীক্ষা ছাড়া আনুমানিক ধারণায় ফাউন্ডেশন ডিজাইন করাতে ফাউন্ডেশনে অনেক বেশি খরচ হয়ে যায়, যা টেস্ট করানোর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কিন্তু বাড়ি নির্মাণের সময় মালিক তা বুঝতে পারেন না। তাই মাটি পরীক্ষা করা উচিত, যার খরচটা বেশ সাশ্রয়ী, সঙ্গে ফাউন্ডেশন ডিজাইনও অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বিল্ডিং ডিজাইন

ডিজাইন মূলত দুই ধরনের। আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন। আর্কিটেকচারাল বা স্থাপত্য ডিজাইন একজন ভালো আর্কিটেক্ট দিয়ে করানো উচিত। এতে ভবনের ভিউ এবং  যথাযথ সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া এয়ার ভেনটিলেশন এবং ভবনে আলো-বাতাস প্রবেশ করায় কক্ষে বসবাস একদিকে যেমন আরামদায়ক, অন্যদিকে ভবনের আর্কিটেকচারাল ভিউ ভালো দেখায়। একজন স্থপতি যেভাবে খুঁটিনাটি চিন্তাভাবনা করে প্ল্যান তৈরি করেন, তা অন্য কেউ করতে পারেন না।

এ ছাড়া স্ট্রাকচারাল বা অবকাঠামো ডিজাইন বা স্ট্রাকচার ডিজাইন একজন অভিজ্ঞ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বা কনসাল্টিং ফার্ম দিয়ে করানো উচিত। ভবনের স্থায়িত্ব ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বা স্ট্রাকচারাল নকশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে ব্যাপারে নজরদারি প্রয়োজন

  • স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারকে হতে হবে একজন অভিজ্ঞ গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলী (সিভিল) এবং তাঁকে প্রফেশনাল ডিজাইনার হতে হবে। প্রফেশনাল অর্থাৎ ডিজাইনে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকতে হবে।
  • আমরা অনেকে ভুল করে থাকি। না জেনে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে দিয়ে ডিজাইন করাই। এটা করা উচিত নয়।
  • অনেককেই দেখা যায় রাজমিস্ত্রি বা ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করে চার-পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করতে। এ ক্ষেত্রে ভবনের মালিকেরা তাঁদের খামখেয়ালি বা অজ্ঞতার জন্য মারাত্মক ক্ষতির শিকার হন। গ্রাম বা মফস্বল শহরে এ সমস্যা বেশি। এতে অনেক জায়গায় প্রকৃত ডিজাইন ছাড়া আনুমানিক ধারণায় এমএস রড এবং ঢালাই করা হয়; যা ক্ষতিকর। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি এমএস রড ও ঢালাই করে থাকেন, যা অনর্থক অর্থ ব্যয়। একদিকে অতিরিক্ত নির্মাণ উপকরণের ব্যবহার কোনো কাজে আসে না, অন্যদিকে কাঠামোটি মজবুত হয় না। এতে ভবনের মান ভালো না হয়ে বরং ক্ষতি হয়।

আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য, অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে দিয়ে বাড়ি বা ভবনের ডিজাইন করালে একই সঙ্গে জায়গার সুষ্ঠু ব্যবহার ও আর্থিক সাশ্রয় হয়, যা বাস্তবায়ন খুবই সুবিধাজনক।

তৃতীয়ত, নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহ

নির্মাণকাজের গুণগতমান নিশ্চিত করতে হলে ভালো মানের নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহ আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে ডিজাইন প্রকৌশলীর পরামর্শ অনুযায়ী ইট, রড, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হবে। সস্তা মানের ইট, রড, সিমেন্ট ও বালু সংগ্রহ করলে কাজের গুণগত মান ও মজবুত কাঠামো তৈরি করা অসম্ভব। গুণগত মানের মালামাল সংগ্রহে অতিরিক্ত কিছু অর্থ ব্যয় হলেও তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো।

চতুর্থ, সাটারিং কাজ

অনেকে মনে করেন সাটারিং কাজটি বেশ সহজ। ভাড়া করলেই চলবে। আসলে কিন্তু তা নয়। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি মোটেই অবহেলার ব্যাপার নয়। কারণ, ফর্ম ওয়ার্ক বা সাটারিং ভালো না হলে Leak proof হয় না। ফলে আরসিসি কাজের গুণগত মান হ্রাস পায়, যাতে কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দেয়। ফলে কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিছুদিন পর রডে রাস্ট পড়ে আরসিসি কাজে পোরাস সৃষ্টি হয়, ফাটল ধরে এবং আরসিসি ঢালাই খসে পড়ে। মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অনেকে অবহেলা করেন, যা মোটেও কাম্য নয়। এ জন্য স্টিল সাটারিং ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। হিসাব করে দেখা গেছে, স্টিল সাটারিং ব্যবহার করার পর কাজ শেষে বিক্রি করলে অনেক অর্থ ফেরত আসে। বিষয়টি অধিকাংশ বাড়ির মালিক মানেন না। প্রকৃতপক্ষে ভাড়া করে কাজ করলে কাঠের সাটারিংয়ে খরচ প্রায় একই পড়ে। 

পঞ্চমত, সুপারভিশন বা তদারকি

নির্মাণকাজের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সঠিক তদারকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজের ব্যাপারে নির্মাণ উপকরণের গুণগতমান নিশ্চিত করে প্রতিটি পদক্ষেপে ডিজাইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হলে একজন দক্ষ প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধান জরুরি।

এ জন্য কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে-

  • সার্বক্ষণিক একজন দক্ষ অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর (ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সিভিল হলেও চলবে) নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাজ তদারকি করাতে হবে।
  • সম্ভব হলে যে প্রকৌশলী স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন, তাঁকে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে একবার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী সাইট ভিজিট করাতে হবে।
  • নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মালামালের গুণগতমান প্রতিনিয়ত সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
  • প্রতিটি আরসিসি ওয়ার্ক যেমন- বালু চালানো, খোয়া বা পাথর ঢালাই করার এক দিন আগে ভেজানো সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ঢালাইয়ের সময় অবশ্যই ডিজাইনারের পরামর্শ অনুসরণ করতে হবে, যা দক্ষ প্রকৌশলী ছাড়া কেউ দেখেন না।
  • সাইট ইঞ্জিনিয়ার মিস্ত্রির কাজের ত্রুটিসমূহ ধরতে পারেন, তাই সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন।

এসব পদক্ষেপ সঠিকভাবে অনুসরণ করলে সীমিত ব্যয়ে টেকসই ও সুন্দর বাড়ি নির্মাণ করা হবে সহজতর।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫

মো. মকবুল হোসেন
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top