প্রমত্তা পদ্মা, অদূরেই পাবনা। প্রাচীন যুগে ভারতের বঙ্গ ও পুন্ড্রবর্ধন আওতাধীন জনপদটি গঙ্গারিডি, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন প্রভৃতি রাজবংশ শাসন করেছে। কালের সাক্ষী হিসেবে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুরাকীর্তি। লোকসংগীত, লোকগাথা, লোকনৃত্য, কৌতুক, পালাগান প্রভৃতি লোকনৃত্যের ভান্ডারে এলাকাটি সমৃদ্ধ। তাঁতশিল্পের যশ তো আগে থেকেই। এখানকার হিন্দু, মুসলিম তাঁতিরা মিলেমিশে বয়ন করে নজরকাড়া শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা। এগুলো রপ্তানি হচ্ছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে, যা অবদান রাখছে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে। অন্যান্য ব্যবসায়ও সুদক্ষ ব্যবসায়ীরা রাখছেন দক্ষতার ছাপ। জেলা শহরের সোনাপট্টি এলাকার মেসার্স শাহানারা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী হাজি মো. আব্দুল্লাহ্ আল মামুন এমনই এক সুদক্ষ সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানের সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে তাঁর সাফল্য-রহস্য এবারের সংখ্যায়।
ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের জন্ম ২৫ আগস্ট ১৯৫৭ পাবনার চকপৈলানপুরে। বাবা মৃত আলহাজ আফের আলী আর মা হাজি মোছা. রহিমা বেগম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে ১৯৭২ সালে মাধ্যমিক পাস করেন। তাঁর স্ত্রী মোছা. শাহানারা বেগম। সংসারে তাঁদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। তাঁরা হলেন মো. আলীউল আজীম (শাহিন), মোছা. আছিয়া বেগম, মো. সিবগাতুল্লাহ (সোহেল), মো. আবু বক্কার সিদ্দিক (শামিম), নাসরিন পারভিন (আফরোজা)। সব ছেলেমেয়েই সুশিক্ষায় শিক্ষিত। ব্যক্তিজীবনে সবাই এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের বড় ভাই কাপড়ের ব্যবসা করতেন। সে সূত্রে তিনিও এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। কয়েক বছর ব্যবসাটি করার পর আরও উন্নতির আশায় কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে নির্মাণপণ্যের ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। শুরুতেই সিমেন্ট ও ঢেউটিন বিক্রি করতেন। তখন ব্যবসা ছিল সীমিত আকারের। তবে একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে সবার কাছেই তিনি সমাদৃত। ব্যবসায়িক সূত্রেই জাহাঙ্গীর নামে চট্টগ্রামের এক নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় তাঁর। ওই ব্যবসায়ী তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়ে প্রচুর পণ্য বাকিতে কেনার জন্য উৎসাহিত করেন। তিনি সেই পণ্য বিক্রি করে একদিকে যেমন মুনাফা করেন অন্যদিকে বকেয়া অর্থও পরিশোধ করেন। এভাবেই তাঁর ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি ব্যবসায়িক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির একজন সম্মানিত পরিবেশক নিযুক্ত হন। বদলে যেতে থাকে ব্যবসার গতানুগতিক ধারা। শুরু করেন পাবনার বিভিন্ন প্রান্তরে সিমেন্ট সরবরাহ। তৈরি করেন একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তাঁর সুনিপুণ নেতৃত্ব, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কোম্পানির কর্মকর্তাদের সমনি¦ত প্রচেষ্টায় ব্যবসা পরিসর ক্রমেই বাড়তে থাকে। সিমেন্ট বিক্রিতে নিজ এলাকায় হয়ে ওঠেন অনন্য। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ ও ২০১৩ সালে আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে সারা দেশে হন প্রথম। ২০১৪ সালে অধিকার করেন ষষ্ঠ স্থান। অভাবনীয় এ সাফল্যে কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মালবাহী ট্রাক। এ ছাড়া ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল, ডায়মন্ড নেকলেসসহ নানা উপহারও জিতে নিয়েছেন। ঢাকা ও কক্সবাজারে কোম্পানির বিভিন্ন কনফারেন্সে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে তিনি আকিজ সিরামিকসের পরিবেশক স্বত্ব লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি কেওয়াই ঢেউটিনেরও একজন পরিবেশক।
কয়েকটি পণ্যের পরিবেশক হওয়াই ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা, তাঁদের নানা সমস্যার সমাধান দেওয়া, এমনকি পণ্য বিক্রয়ে উৎসাহিত করার মতো নানা পন্থায় অবলম্বন করতে হয় তাঁকে। এসব কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন ছেলেরাও। এভাবেই বেড়েছে ব্যবসার প্রসার। বাজারে বর্তমানে তাঁর রয়েছে একটি সিমেন্ট-ঢেউটিন, একটি টাইলস, একটি মোটর যন্ত্রাংশের শোরুম ও তিনটি গোডাউন। নির্মাণপণ্য ছাড়াও মালবাহী ট্রাক, মাইক্রো ও প্রাইভেটকারের পরিবহন ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। এসব ব্যবসায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক ও ধর্মীয় কাজেও তাঁর সমান পদচারণ। এলাকার দুস্থদের সাধ্যমতো সহায়তার চেষ্টা করেন। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার পাশাপাশি এখন তাঁর অবসর কাটে ধর্ম-কর্ম এবং নাতি-নাতনিদের সঙ্গ উপভোগ করে।
সেই ১৯৭৩ সালে ব্যবসায় হাতেখড়ি হওয়া আব্দুল্লাহ্ আল মামুন কেবল একজন সফল ব্যবসায়ীই হননি, অর্জন করেছেন ব্যবসায়িক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। সে অর্জনের ভিত্তিতেই তিনি মনে করেন ব্যবসায় সফল হতে দরকার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার সমন¦য়। ব্যবসায়িক শিক্ষা না থাকলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। সততা ও ধৈর্যের সঙ্গে ব্যবসা করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাফল্য আসবেই। চালকের আসনে বসে হাল ধরতে হবে শক্ত হাতে।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪