সুরমা নদীতীরের সুরম্য শহর সিলেট। দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত আধ্যাত্মিক এক নগর। সীমান্তজুড়ে সুউচ্চ পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনা, শীতল-স্বচ্ছ পাথুরে নদী ও সবুজ চা-বাগানের মোহনীয় সৌন্দর্য বুঁদ করে রাখে এখানে আসা পর্যটকদের। বর্ষার বৃষ্টিতে এ জনপদ যেন সবুজের অবারিত এক প্রান্তর। নির্মাণশিল্পের অন্যতম উপকরণ বালু ও পাথর দেশজুড়ে সরবরাহ করা হয় এখান থেকেই। সিলেট বালু ও পাথরে খুবই প্রসিদ্ধ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার আর পুণ্যভূমির এ শহরের সফল ও অভিজ্ঞ নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান খসরু। শহরতলির খাসদবীর এলাকায় অবস্থিত সাগরিকা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের সহায়তায় আলাপ এ ব্যবসায়ীর সঙ্গে। ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে সফল এ মানুষটির জীবনালেখ্য।
ব্যবসায়ী খসরুর জন্ম ১২ আগস্ট ১৯৬৮ সালে, সিলেটের চৌহাট্টায়। বাবা আলহাজ মো. আবদুল মান্নান ও মা মোছা. আসমা বেগম। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার বড় খসরু। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক এবং মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময়ে মারা যান মা। নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে আর লেখাপড়া চালানো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয় কিশোর বয়সেই। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে চাকরি, পরে একজন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় আত্মপ্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ী খসরুর ইচ্ছে ছিল বিদেশ গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় এতে সায় ছিল না বাবার। তাঁকে দেশেই কিছু করতে বলেন। শুরুতে চাকরি করলেও পরে হাতেখড়ি ব্যবসায়। তবে তা ছিল অনেকটাই ভ্রাম্যমাণ। ঢাকা থেকে নির্মাণ ও হার্ডওয়্যার পণ্য কিনে সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতেন। এভাবেই ব্যবসায়ী হিসেবে বাড়তে থাকে পরিচিতি; মুনাফাও হয় বেশ। স্বভাবতই ব্যবসাটির প্রতি জন্ম হয় ভালো লাগার। উপলব্ধি করেন এ ব্যবসাই তাঁকে এনে দেবে প্রতিষ্ঠা। ব্যবসার প্রতি মনোযোগ, পরিশ্রম, নিষ্ঠা দেখে আত্মীয়-পরিজন ও শুভাকাঙ্খীরা তাঁকে একটি স্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়তে অনুপ্রাণিত করেন। কিছু পুঁজি দেন বাবা; তাঁর নিজেরও কিছু জমানো টাকা ছিল, যা দিয়ে তিনি নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শহরের প্রাণকেন্দ্র আম্বরখানায় ভাড়া নেন একটি দোকান। প্রায় এক যুগ এখানে ব্যবসা করার পর খাসদবীর এলাকায় সরে আসেন। আগের তুলনায় আরও বড় পরিসরে। নতুন ঠিকানায় এসেই শুরু করেন রডের ব্যবসা। ব্যবসায় পেয়েছেন বাবার যাবতীয় সহযোগিতা।
খসরু অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন ব্যবসায়ী। নির্মাণপণ্য বিক্রিতে শহরময় তাঁর তুমুল পরিচিতি। ফলে স্থায়ীভাবে ব্যবসা শুরু করার মাত্র আড়াই মাসে পান ছাতক সিমেন্টের পরিবেশক স্বত্ব। এ ক্ষেত্রে বাবা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন সাহায্যে। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির একজন পরিদর্শক ছিলেন তিনি। পরিবেশক স্বত্ব পাওয়ার পর ব্যবসায় যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। খুচরা, পাইকারি, ছোট-বড় প্রকল্পে সিমেন্ট সরবরাহ করে পান ব্যাপক পরিচিত। অধিক বিক্রির সুবাদে ব্যবসার পসারে ক্রমেই যুক্ত হয় সিমেন্ট, রড, ইট, বালু, পাথর, হার্ডওয়্যার, ঢেউটিন ও প্লাস্টিক দরজা।
প্রায় সব ধরনের নির্মাণপণ্য তাঁর প্রতিষ্ঠানে পাওয়ায় ক্রেতাসমাগম হয় প্রচুর। কম মুনাফায় বিক্রি করেন উন্নতমানের পণ্য। ফলে অধিক পণ্য বিক্রি হয়। তিনি একটি সিমেন্ট কোম্পানির পরিবেশক ও অন্য আরেকটির প্রাইম সেলার। এ ছাড়া কেএসআরএম, আরএসআরএম ও ডিপিএইচ স্টিলের পরিবেশক। এসব কোম্পানি থেকে বেশি পণ্য বিক্রির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ফার্নিচার, ফ্রিজ, স্বর্ণালংকার, মাইক্রোওভেন, মোবাইল, ডিনারসেট, নগদ টাকাসহ নানা উপহার ও সম্মাননা। বর্তমানে বাজারে তাঁর রয়েছে একটি শোরুম ও দুটি গোডাউন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন শ্রমিক-কর্মচারীও নিয়োজিত রয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠানে।
ব্যবসায়ী খসরু বিয়ে করেন ১৯৯৭ সালে। স্ত্রী রুফসানা বেগম। সংসারে দুই ছেলে। বড় ছেলে মো. সাজিদুর রহমান সাজিদ ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট স্কুলে ও লেভেল এবং ছোট ছেলে মো. সাইফুর রহমান সাইফ একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ট্যান্ডার্ড থ্রিতে পড়ছে। ব্যবসায়িক ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি ঈদ, পয়লা বৈশাখ ও অন্যান্য ছুটির দিনে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে বেড়ান। এ ছাড়া যথাসাধ্য পালন করেন সামাজিক দায়িত্বও। তিনি সিলেট রড-সিমেন্ট-ঢেউটিন মার্চেন্ট গ্রুপের অন্যতম সদস্য। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সাধারণ শাকসবজি ও ডাল-ভাতই তাঁর পছন্দ।
ব্যবসায়ী খসরু একজন সফল ব্যবসায়ী হলেও নিজেকে তিনি ব্যর্থই মনে করেন। আলাপচারিতার মাঝে আনমনা হয়ে পড়েন; কণ্ঠে কিছুটা হতাশা, বিরক্তি ও ক্ষোভ মেশানো। বিভিন্ন ক্রেতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তাঁর পাওনা টাকা কয়েক কোটি। অথচ এ ব্যবসার পেছনে কত শ্রম দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন, মানুষের উপকার করেছেন কিন্তু অনেকেই বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেনি। সুযোগ নিয়েছে তাঁর সরলতা আর সততার। অনাদায়ী অর্থগুলো আদায় করতে পারলে তিনি হয়তো আরও সমৃদ্ধ হতেন। তবুও তাঁর এখনকার অর্জনে তিনি সন্তুষ্ট। এখন ছেলেদের ঘিরেই তাঁর যত আশা আর স্বপ্ন। সুশিক্ষায় শিক্ষিত করছেন তাদের। তারা মানুষের মতো মানুষ হলেই আসবে তাঁর সত্যিকারের সাফল্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫