উত্তম পেশা নিজস্ব ব্যবসা

ছোট্ট একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার আর একটি লোহার বেঞ্চ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির আসবাব বলতে এটুকুই! দোচালা একটি টিনের দোকান, যেখানে থরে থরে সাজানো সিমেন্ট; ব্র্যান্ডও মাত্র একটি। আর একটি মাত্র ব্র্যান্ডের পণ্য ও সাধারণ একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়েই তিনি উপজেলার বড় বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। তিনি ভাঙ্গা, ফরিদপুরের একজন সফল সিমেন্ট ব্যবসায়ী মো. শাহ আলম মাতুব্বর। কাউলীবেড়া বাজারে অবস্থিত ‘মেসার্স আরী এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. শাহেদ মোর্শেদের সহযোগিতায় জানাব সফল এ ব্যবসায়ীর সাফল্যগাথা।

ব্যবসায়ী মো. শাহ আলমের জন্ম ১ জুন ১৯৭২ ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার পল্লীবেড়া গ্রামে। বাবা মরহুম আবুল হাশেম মাতুব্বর ও মা লালবানু। কাউলীবেড়া কাজী ওয়ালিউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর প্রবেশ করেন কর্মজীবনে। চাকরি নেন একটি বহুমুখী সমবায় সমিতিতে। ছয়-সাত বছর পর চাকরি ছেড়ে কাউলীবেড়া বাজারে গড়ে তোলেন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেখানে শুধু বিক্রি করতেন সিমেন্ট। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বিক্রি করলেও পরে বেছে নেন শুধু আকিজ সিমেন্টকে। আর এ পণ্যটি বিক্রির সুবাদেই কয়েক বছরের মধ্যে আসে ব্যবসায়িক সাফল্য।

সিমেন্ট ব্যবসায় তেমন কোনো পূর্বাভিজ্ঞতা ছিল না শাহ আলমের। বাবাও ছিলেন কৃষিজীবী। তা সত্ত্বেও নিজের পরিচিতি ও সুনামকে পুঁজি করে ব্যবসা করতে উদ্যোগী হন। ব্যবসার শুরু থেকেই গুণগতমানের পণ্য বিক্রির ব্যাপারে হন মনোযোগী। ক্রেতাদের সঙ্গে সুব্যবহার ও ভালো পণ্য ক্রয়ে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেন সব সময়। তাঁর এমন দূরদর্শিতা ও ব্যবসায়িক কৌশলে কাউলীবেড়া বাজার ছোট্ট একটি গ্রাম্য বাজার হওয়া সত্ত্বেও মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি তাঁর ব্যবসায়িক অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হন। বাজারে আরও দু-একটা দোকান থাকলেও তিনি তাদের ছাড়িয়ে যান ব্যবসা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই। আশপাশের এলাকার মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকেই সিমেন্ট কেনেন। ফলে সব সময় তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আকিজ সিমেন্ট বিক্রি করতে সমর্থ হন। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি, ভাঙ্গা টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। ২০১৫-১৬ সালে তিনি সিমেন্ট বিক্রিতে অত্র টেরিটরিতে পঞ্চম হন। কোম্পানির দেওয়া এমন কোনো নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা নেই, যা তিনি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন, ডিনার সেট, নগদ টাকাসহ অসংখ্য উপহার। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, নেপাল ও অন্যান্য দেশে ভ্রমণের অফার তো রয়েছেই। তাঁর ব্যবসায়িক লেনদেন অত্যন্ত স্বচ্ছ। তিনি সময়মতো কোম্পানির সব দায়দেনা পরিশোধ করেন। আর তাই প্রতিবছর ঠিকভাবে লেনদেনের জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে নিয়মিত পান নানা ধরনের উপহার ও সম্মাননা।

ব্যবসায়ী শাহ আলম বিয়ে করেছেন ১৯৯০ সালে। সহধর্মিণী মোছা. নার্গিস আক্তার। এ দম্পতির এক মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে পপি আক্তার, কেএম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। ছেলে মো. হিমেল বর্তমানে সৌদিপ্রবাসী। ব্যবসায়ী শাহ আলম নিজের ব্যবসা নিজেই দেখাশোনা করেন। এ জন্য ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন অধিকাংশ সময়। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন নিজেকে। তিনি পল্লীবেড়া ঈদগাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি, পল্লীবেড়া দাখিল মাদ্রাসার সদস্য, কাউলীবেড়া হাট কমিটির সাবেক সভাপতি এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। বংশপরম্পরায় ঐতিহ্যবাহী মাতুব্বর পরিবারের সদস্য হওয়ায় এলাকার মাতব্বরি তাঁকেই করতে হয়। এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নিয়মিত সালিস-বৈঠকে থাকে তাঁর সরব উপস্থিতি।

সুপ্রাচীনকাল থেকেই ফরিদপুরের রয়েছে কীর্তিময় সব গৌরবগাথা। অনেক আউলিয়া-দরবেশ, রাজনীতিক, পুণ্যাত্মার আবাসভূমি হিসেবে এ অঞ্চল অত্যন্ত সুপরিচিত। গড়াই, মধুমতি, বারাসিয়া, চন্দনা, কুমার প্রভৃতি নদী অধ্যুষিত এই জনপদটি নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, খেজুরের পাটি, ছাতাশিল্প, স্বর্ণকার, মাধুলীশিল্প, কাঠের কাজ, বাঁশ ও বেতের কাজ, সেলাই, তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এসব কিছু তাঁর ব্যবসায় প্রেরণার উৎস। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে এ জনপদ আসবে ব্যাপক উন্নয়নের আওতায়। আর তাই তিনি নিজেকে ও তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সে উন্নয়নের অংশীদার করতে চান। বর্তমানে ভাড়া দোকানে ব্যবসা করছেন। ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে বাজারে কিছু জায়গা কিনে সেখানে একটি বড় আকারের নির্মাণপণ্যের শোরুম করার। তাঁর এই ইচ্ছে পূর্ণ হোক, এমনটাই কামনা বন্ধন পরিবারের।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top