নির্মাণশিল্পে গ্যালভানাইড আয়রন বা জিআই পাইপ বহুল ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ, যার পূর্ণরূপ গ্যালভানাইজিং আয়রন। এই বিশেষ ধরনের পাইপ পানি সরবরাহ, গ্যাস সরবরাহ, গভীর নলকূপে, টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে, বায়ু নির্গমন, কাঠামোগত ব্যবহারে, কৃষি, শিল্প ও পয়োনিষ্কাশনের মতো বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। পিভিসি ও ইউপিভিসি পাইপের তুলনায় টেকসই, মজবুত ও অধিক কার্যকরী হওয়ায় নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জিআই পাইপ বেশি ব্যবহৃত হয়। উন্মুক্ত অবস্থায় লোহা ফেলে রাখলে কিছুদিনের মধ্যেই তাতে মরিচা ধরে। বাতাসের জলীয় বাষ্প এবং অক্সিজেনের সংস্পর্শেই এমনটা ঘটে, যা আয়রন অক্সাইড নামে পরিচিত। এই আয়রন অক্সাইড বা মরিচা লোহার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মরিচা লোহার গুণাগুণ নষ্ট করে এর কার্যকর সক্ষমতা নষ্ট করে। তবে বিশেষ তাপমাত্রায় লোহার সঙ্গে জিঙ্ক বা দস্তা মেশালে তাতে মরিচা ধরে না। এ পদ্ধতিকেই বলা হয় গ্যালভানাইজেশন বা ফ্যারাডিজম।
প্যারিসের রসায়নবিদ স্টেনিসলাস সোরেস ১৮৩৭ সালে গ্যালভানাইজেশন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তবে সপ্তদশ শতাব্দীতেই ব্রিটিশ-ফরাসিদের রাজকীয় অস্ত্রশস্ত্রে কৃত্রিম উপায়ে গ্যালভানাইজেশনের সন্ধান পাওয়া যায়। এ রকম কিছু অস্ত্রশস্ত্র ব্রিটিশ ও ফরাসিদের অস্ত্রাগার জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। গ্যালভানাইজেশন সভ্যতাকে বিশাল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে। গ্যালভানাইজেশন না হলে বিশাল বিশাল লোহা ও স্টিলের তৈরি স্থাপনা ও সেতুর মতো অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে টিকতে পারত না। লোহা জাতীয় মূল্যবান সব বস্তুই এখন দস্তামিশ্রিত। তবে প্রযুক্তির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে ভারত, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে দস্তার ব্যবহার স্বল্প। ফলে বছরে বছরে এসব দেশের লোহা ও স্টিল নির্মিত বস্তুগুলো নষ্ট হওয়ার কারণে প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। যেমন- ভারত ও বাংলাদেশের অসংখ্য ব্রিজ, ট্রেন, পাইপ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে গ্যালভানাইজেন না করার কারণে। ইউরোপ বিংশ শতাব্দী থেকেই তাদের সব লৌহনির্মিত বস্তু গ্যালভানাইজেশনের আওতায় এনেছে।
বিশ্বজুড়ে ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হওয়ায় উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও উৎপাদিত হচ্ছে বিশ্বমানের জিআই পাইপ। চাহিদা মেটাতে আগে বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে দেশের বেশ কটি প্রতিষ্ঠান জিআই পাইপ উৎপাদন করায় আমদানি-নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের জিআই পাইপ পাওয়া যায়। এসব পাইপের সাইজ ৩/৪ ইঞ্চি থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। ইলেকট্রিক ওয়ারিংয়ে সাধারণ মানের প্লাস্টিকের ইউপিভিসি পাইপ ব্যবহার করা হলেও ছাদের ওয়ারিংয়ে জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন সাইজের জিআই পাইপ প্রতি ফুট ২৫-৩০ থেকে থেকে শুরু করে ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে এশিয়া, আরএফএল, যমুনা, বসুন্ধরা, ন্যাশনাল টিউবস, হাতিমসহ বিভিন্ন কোম্পানির জিআই পাইপ পাওয়া যায়। তবে সাধারণ আবাসিক নির্মাণ কাঠামোতে এশিয়া, আরএফএল, যমুনা ও বসুন্ধরার জিআই পাইপ বেশি ব্যবহৃত হয়।
৩/৪ থেকে সর্বোচ্চ ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল, মফস্বল ও শহরে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় ৩/৪ ইঞ্চি জিআই পাইপ। ব্যবহারের ভিত্তিতে বাজারে দুই ধরনের জিআই পাইপ পাওয়া যায়। একটি হলো গোল্ড আর অন্যটি লাইট। গোল্ড জিআই পাইপকে বলা হয় হেভি জিআই পাইপ আর লাইট জিআই পাইপকে বলা হয় নরমাল জিআই পাইপ।
আকারভেদে জিআই পাইপের বিভিন্ন ধরন। যার মধ্যে রয়েছে-
বাংলাদেশে সাধারণ আবাসিক অবকাঠামো নির্মাণে ৩/৪, ১ ও ১/২ ইঞ্চিÑ এ তিন ধরনের জিআই পাইপই বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে ১.৫ ও ২ ইঞ্চির জিআই পাইপ ও শিল্প-কারখানায় ২-এর অধিক ইঞ্চির জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। ক্রেতাদের চাহিদাভেদে ১৫ মিমি থেকে ১০০ মিমি পর্যন্ত জিআই পাইপ সরবরাহ করা হয়।
কোম্পানিভেদে জিআই পাইপের ধরন
বাজারে বিভিন্ন ধরনের জিআই পাইপ পাওয়া যায়। তবে এশিয়া, আরএফএল, যমুনা ও বসুন্ধরা এই চারটি কোম্পানির জিআই পাইপ বেশি চাহিদাসম্পন্ন। এই চার কোম্পানির পাইপের দরদাম-
এশিয়া
| সাইজ | ধরন | দাম (প্রতি ফুট) |
| ৩/৪ | গোল্ড | ৪০-৪৫ টাকা |
| ৩/৪ | লাইট | ২৮-৩৩ টাকা |
| ১/২ | গোল্ড | ২৫-২৮ টাকা |
| ১/২ | লাইট | ২৮-৩২ টাকা |
| ১ | গোল্ড | ৪৮-৫৩ টাকা |
| ১ | লাইট | ৭০-৭৫ টাকা |
আরএফএল
| সাইজ | ধরন | দাম (প্রতি ফুট) |
| ৩/৪ | গোল্ড | ৪৫-৫০ টাকা |
| ৩/৪ | লাইট | ৩০-৩৫ টাকা |
| ১/২ | গোল্ড | ২৬-২৮ টাকা |
| ১/২ | লাইট | ২৮-৩২ টাকা |
| ১ | গোল্ড | ৫০-৫৫ টাকা |
| ১ | লাইট | ৭০-৭৫ টাকা |
যমুনা
| সাইজ | ধরন | দাম (প্রতি ফুট) |
| ৩/৪ | গোল্ড | ৪৮-৫৩ টাকা |
| ৩/৪ | লাইট | ৩০-৩৫ টাকা |
| ১/২ | গোল্ড | ২৭-৩০ টাকা |
| ১/২ | লাইট | ৩০-৩৫ টাকা |
| ১ | গোল্ড | ৫৮-৬৫ টাকা |
| ১ | লাইট | ৭৫-৮০ টাকা |
বসুন্ধরা
| সাইজ | ধরন | দাম (প্রতি ফুট) |
| ৩/৪ | গোল্ড | ৫০-৫৫ টাকা |
| ৩/৪ | লাইট | ৩৫-৩৮ টাকা |
| ১/২ | গোল্ড | ২৭-৩২ টাকা |
| ১/২ | লাইট | ৩৫-৪০ টাকা |
| ১ | গোল্ড | ৬০-৬৫ টাকা |
| ১ | লাইট | ৭৫-৮০ টাকা |
জিআই পাইপ ফিটিংস
জিআই পাইপ ছাড়াও বিভিন্ন কাজের সুবিধার্থে জিআই পাইপ ফিটিংস ও ফিকচারসও পাওয়া যায় বাজারে। এর মধ্যে রয়েছে-
জিআই পাইপের ব্যবহার
- খাবার পানীয় সরবরাহ
- গ্যাস সরবরাহ
- গভীর নলকূপে
- টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে
- বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে
- বায়ু নির্গমনের জন্য
- কাঠামোগত ব্যবহারে।
তৈরির কাঁচামাল
জিআই পাইপের কাঁচামাল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বাজারের অধিকাংশ হার্ডওয়্যার ও নির্মাণসামগ্রীর দোকানেই জিআই পাইপ পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জিআই পাইপের পাইকারি বাজার নবাবপুরের আলু বাজারে। আগে জিআই পাইপ পানির লাইনে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে গ্যাসের লাইনে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে গরম পানির ক্ষেত্রে এখনো জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। মরিচা ধরার কারণেই মূলত জিআই পাইপ পানির লাইনে অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয় না।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।