জেনে বুঝে জমি কিনুন

জমির হিসাব কষেই জমি কিনতে হবে। নগরায়ন, গৃহায়ন, বানিজ্যিকায়ন, কল-কারখানা স্থাপনসহ নানা কারণে কমছে বাসযোগ্য জমির পরিমান। ফলে ক্রমেই বাড়ছে জমির দাম। দুর্মূল্যের এই বাজারে যেন এক টুকরো জমি হয়ে উঠেছে সোনার হরিণ। যদিও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে জমির স্বল্পতার কারণে ফ্ল্যাট কেনাবেচার প্রথা চালু থাকলেও সবারই ইচ্ছে থাকে একটুকরো জমির মালিকানা যেখানে গড়ে ওঠবে স্বপ্নের নিজস্ব আবাস। এমন অনেকেই আছেন, যারা তাদের সারাজীবনের জমানো টাকা দিয়ে জমি কেনেন নিজের পছন্দে বাড়ী বানাবেন বলে। কিন্তু কষ্টের সেই টাকায় কেনা মহামূল্যবান জমিতে যদি কোন আইনগত বা অন্যান্য ঝামেলা থাকে তবে আপনার অজ্ঞতার কারণে হয়তো বড় মাশুল দিতে হতে পারে। তাই জমি কেনার সময় যেমন ঠিকভাবে রেজিষ্ট্রেশন বা নিবন্ধন করতে হবে, ঠিক তেমনি কেনা জমি সম্পর্কে যাবতীয় বিষয়াদি ভালভালে জেনে বুঝে কিনতে হবে। 

সাধারণভাবে ভূ-সম্পত্তি বা ভূমি কিংবা জমি বলতে সকল আবাদী ও অনাবাদী জমি এবং নদ-নদী, খাল-বিল, নালা, পুকুর, ডোবা, বাড়ীঘর যা ভূমির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত তাই ভূমি বা জমি বলে গণ্য। কিন্তু সাগর বা উপ-সাগরকে ভূমি বলে গণ্য করা হয় না। এসব ভূমিসমূহ ভূ-সম্পত্তির আওতাধীন হলেও প্রকৃতি ও ধরণভেদে অর্থনৈতিক মূল্য ভিন্ন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল দেশে ভূমির মূল্য ভূমির প্রকৃতি ও অবস্থান ভেদে নির্ধারিত হয়। সেক্ষেত্রে গ্রামের জমির থেকে শহরের জমির দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি। আবার অপেক্ষাকৃত উচু জমির থেকে জলাজমির দাম কম হবে এটাও যুক্তিসঙ্গত। তবে ভূমির দাম যাই হোক না কেন তা আপনার সম্পত্তি। এই সম্পত্তি যেন একান্তই আপনার দখলে থাকে সেক্ষেত্রে জমি কেনার পর নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে শুধু জমি বিক্রেতাই দলিলের কাজ সম্পাদন করতেন। এখন দলিল করার সময় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষকেই উপস্থিত থাকতে হয়। সম্পত্তিটিতে বিক্রেতার উপযুক্ত মালিকানা রয়েছে কিনা, তা প্রমাণের জন্য সম্পত্তিটির পূর্ববর্তী বিক্রেতা বা মালিকের কাগজপত্রের প্রমাণপত্র থাকা চাই। এছাড়া সম্পত্তিতে যে বিক্রেতার আইনানুগ মালিকানা আছে এই মর্মে একটি হলফনামা জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় জমির বিক্রেতাকে দাখিল করতে হবে। শেষ ২৫ বছর উক্ত সম্পত্তিটিতে কার কার মালিকানায় ছিল তার বিবরণ রেজিস্ট্রেশনের সময় দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও সম্পত্তির ধরণ, দাম, মানচিত্র এবং আশপাশের সম্পত্তির বিবরণ ও আঁকানো ছবি দলিলে উল্লেখ থাকা বাঞ্জনীয়।

জমি কেনার ক্ষেত্রে ভূমির মালিকানাস্বত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি ভূ-সম্পত্তির একক বা একাধিক মালিক বা অংশীদার থাকতে পারে। আর সে কারণেই ভূ-সম্পত্তি কেনার আগে সেই সম্পত্তি বর্তমানে কার দখলে রয়েছে তা জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। সম্পত্তি যদি অন্য কারও দখলে থাকে তবে তারা কেন, কতদিন ও কোন সূত্রে দখল করে আছে এবং এতে বিক্রেতার স্বত্ব ক্ষুন্ন হয় কিনা তা যাচাই করতে হবে। বিক্রেতা যদি ওয়ারিশানসূত্রে সম্পত্তির মালিক হন তাহলে তার পূর্ববর্তী মালিকদের ধারাবাহিক ও বংশানুক্রমিক একটি তালিকা থাকবে রেকর্ডে। খোঁজ নিয়ে জানতে হবে বর্তমান মালিকের আগে যদি কেউ এই সম্পত্তির মালিক থাকে তবে এই সম্পত্তির উপর তার বৈধ স্বত্ব ছিল কিনা। যদি থাকে তাহলে সময় প্রবাহে তাদের মালিকানা স্বত্ব খর্ব করা হয়েছে কিনা তাও খোঁজ নিতে হবে। ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত বিক্রেতার সম্পত্তির ওপর অন্য কোন ওয়ারিশের হক আছে কিনা এবং থাকলে ছাহাম বন্টন হয়েছে কিনা এ বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি বিক্রেতা ক্রয়সূত্রে বিক্রয়কৃত সম্পত্তির মালিক হন তাহলে, সে যার নিকট হতে সম্পত্তি ক্রয় করেছে তার বৈধ মালিকানা-স্বত্ব ছিল কিনা এবং থাকলে সঠিক রেজিষ্ট্রি করে স্বত্বান্তর করা হয়েছে কিনা এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য প্রয়োজন। বিক্রেতার মালিকানা-স্বত্ব সম্পর্কীয় চেক, পর্চা, নকশা ইত্যাদি পরীক্ষার পর সম্পত্তি সম্পর্কিত ইতিপূর্বে সম্পাদিত দলিল দস্তাবেজ (বায়া দলিল) পরীক্ষা করতে হবে। দলিল দস্তাবেজ বলতে মূল দলিল, বন্টননামা, হেবা-নামা, সালিশী আদালতে হুকুমজারী, ট্রাস্ট দলিল, ওয়াকফনামা, স্বত্ব প্রত্যার্পণ সম্পর্কিত কোন দলিলাদি, উইলের প্রবেট ইত্যাদি বোঝায়। বিক্রেতার স্বত্বের প্রমাণ হিসাবে দেওয়ানী আদালতের রায়ের কপি নামজারীর সইমোহরী কপি, সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত খাজনার রসিদপত্র ইত্যাদি যাচাই করে দেখা উচিত। এসব বিষয়সমূহ যথাযথ থাকলে যে সম্পত্তি ক্রয় করা হবে তা যে রেজিষ্ট্রেশন ও রাজস্ব দফতরের অধীন ওখানে গিয়ে এই সম্পত্তির কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে কিনা সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে।

ভূমি পরিমাপের হিসাব

ভূ-সম্পত্তির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও জমি কেনার ক্ষেত্রে পরিমাপ বিষয়ক কিছু হিসাব-নিকাশ চলে আসে। যেমন, কোন দাগে যে জমি থাকে বিক্রেতা তার অর্ধেক বা আংশিক জমি বিক্রি করতে চান, সেক্ষেত্রে জমি মেপে নির্ধারিত অংশ বিক্রেতাকে বুঝে নিতে হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় জমির মাপ-জোক। বিশেষ কিছু পদ্ধতিতে জমির মাপ করা হয়। এই পরিমাপ পদ্ধতি নিয়ে অধিকাংশ মানুষেরই রয়েছে অজ্ঞতা। এজন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় আমিন বা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারের ওপর। জমি মাপার সময় একজন আমিন বা সার্ভেয়ার অপর পক্ষের সাথে যোগসাজসে জমির ক্রেতাকে প্রতারিত করতে পারেন। এ ধরণের সুক্ষ কারচুপি করলে তা জানাও বেশ কষ্টকর। জমির মাপ নিরুপন পদ্ধতি জানা থাকলে জমি কেনার আগে ওই জমির পরিমাণ কত তা নিজে নিজে মেপে বের করা সম্ভব।

ভূমির পরিমাপের এককসমূহ

ভূমি পরিমাপ বিভিন্ন এককে প্রকাশ করা হয়। এই একক দেশ বা অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত শতক, কাঠা, বিঘা, একর, হেক্টরের এককেই এই পরিমাপ বোঝানো হয়। বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় দলিল লিখন, সরকারি হিসাব ও অফিসের কাজে ব্যবহার্য দুই প্রকার পরিমাপ শতাংশের হিসাব ও কাঠা’র হিসাব। শতক বলতে বুঝায় এক একরের এক শত ভাগের এক ভাগ বা এক শতাংশ জমি। একে ডেসিমেলও বলা হয়। কাঠার উর্ধ্বতর একক বিঘা এবং বিঘা’র উর্ধ্বতর একক একর। ২০ কাঠা সমান এক বিঘা এবং তিন বিঘা সমান এক একর জমি। এই পরিমাপ সর্বজনীন এবং সরকারি মান হিসেবে অনুমোদিত। ভূমি পরিমাপে বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে গান্টার শিকল জরিপ পদ্ধতিতে জমির পরিমাণ মাপা হয়। আন্তজার্তিক প্রয়োজনে কখনো কখনো সরকারী কাগজে হেক্টর ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও অঞ্চলভেদে কানি বা গন্ডা পদ্ধতিতেও জমি কেনা-বেচা হয়।

ভূমির বিভিন্ন একক
১ শতাংশ=১০০ অযুতাংশ/৪৩৫.৬ বর্গ ফুট
১ কাঠা১৬ ছটাক
১ ছটাক২০ গন্ডা
১ বিঘা৩৩ শতাংশ
২০ কাঠা১ বিঘা
১ একর১০০ শতাংশ
১ কাঠা৭২০ বর্গফুট
১ কাঠা১.৬৫ শতাংশ
১ হেক্টর২.৪৭ একর
১ হেক্টর৭.৪৭ বিঘা
৪০ শতক১ কাচ্চা কানি
১ সাই কানি১২০ বা ১৬০ শতক (অঞ্চলভেদে)

ভূমির খতিয়ান

খতিয়ান বলতে ভূমি মালকানার বিবরনকেই বোঝায়। সাবেক ও বর্তমান খতিয়ান পর্যালোচনা করলেই ভূমি মালিকানার ধারাবাহিকতার প্রমান মেলে। অর্থাৎ এই খতিয়ান থেকেই কখন কে ভুমির মালিক ছিল, বর্তমানেই বা কে বা কারা আছে তা অনায়াসেই বের করা যায়। এক বা একাধিক দাগের সর্ম্পূণ বা আংশিক পরিমান ভূমি নিয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তির নামে সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যে ভূমি-স্বত্ব প্রস্তুত করা হয় তাকেই খতিয়ান বলে। প্রত্যেক খতিয়ানে একটি সংখ্যা থাকে যাকে খতিয়ান নম্বর বলা হয়। প্রত্যেক মৌজায় খতিয়ান এক ১ থেকে শুরু হয়। কোন কোন মৌজায় কয়েক হাজারের বেশী খতিয়ান নম্বর থাকতে পারে।

প্রত্যেক মৌজার ১নং খতিয়ানটিকে ‘খাস-খতিয়ান’ বলা হয়। বাংলাদেশ সরকারের ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংষ্কার মন্ত্রণালয়ের স্বত্বাধীন সমূদয় ভূমি যথা-হাট বাজার, খাল-বিল, রাস্তা-ঘাট এবং অন্যান্য কৃষি ও অকৃষি ভূমি উক্ত ১ নং খতিয়ানের অন্তভূর্ক্ত হয়ে থাকে এবং সরকারের পক্ষে ‘কালেক্টর’ হিসাবে উক্ত ১ নং খতিয়ানে লিখনভূক্ত করা হয়।

খতিয়ানে যে সকল বিষয় অন্তর্ভূক্ত থাকে-

  • খতিয়ানের ক্রমিক নং বা খতিয়ান নম্বর
  • জমির মালিকের নাম
  • মালিকের পিতার বা স্বামীর নাম
  • মালিকের অংশ বা মালিকের মোট জমির পরিমান
  • দাগ নং বা যে দাগে জমিটি অবস্থিত
  • উক্ত দাগে মোট জমির শ্রেনী
  • উক্ত দাগে মোট জমির পরিমাণ
  • মোট জমির মধ্যে অত্র খতিয়ানের অংশ রাজস্ব প্রদেয় জেলার নাম বা যে জেলায় জমিটি অবস্থিত থানা বা উপজেলার নাম জেএল নাম্বার (জুরিসডিকশন লিস্ট) ইত্যাদি।

হাল খতিয়ান নম্বর

কোন এলাকায় সর্বশেষ জরিপে খতিয়ানের রেকর্ড প্রস্তুত হওয়ার পর সরকার কর্তৃক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হয়ে বর্তমানে চালু আছে, এ ধরণের খতিয়ানসমূহকে ‘হাল-খতিয়ান’ বলা হয়।

সাবেক খতিয়ান নম্বর

যে সকল খতিয়ান হাল খতিয়ান চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চালু ছিল এবং বর্তমানে চালু নেই এইরূপ খতিয়ানসমূহে সাবেক খতিয়ান বলা হয়। এই সাবেক খতিয়ান ভূমির ধারাবাহিক পরিচিতির জন্য প্রয়োজন। এছাড়া সাবেক খতিয়ানও হাল-খতিয়ান হিসেবে চালু থাকা কালে সম্পাদিত সকল দলিল, মামলা-মোকদ্দমার রায়ে, ডিক্রিতে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে এই খতিয়ান লেখা হয়েছিল।

খতিয়ান সংশোধন পদ্ধতি

অনেক প্রয়োজনে খতিয়ান সংশোধন করতে হয়। ১৯৫০ সালের জমিদারী উচ্ছেদ এবং প্রজাস্বত্ব আইনে খতিয়ান পরিবর্তন, পরিমার্জন সম্পর্কে বলা হয়েছে। খতিয়ান সংরক্ষনের দায়িত্ব কালেক্টরের। জমি বিক্রয়ের মাধ্যমে হস্থান্তর বা উত্তরাধীকারের ফলে জমির মালিকানা হস্তান্তরিত হলে তার জন্য নাম খারিজ করা হলে খতিয়ান সংশোধন হয়। সরকার কর্তৃক জমি ক্রয়কৃত হলে নতুন খতিয়ান সংশোধন হয় জমি পরিত্যাগ বা বিলুপ্তি বা অর্জনের কারণে খাজনা মওকুফ হলে খতিয়ান সংশোধিত হয়। একটি খতিয়ান তৈরী হলে যদি তাতে ভূল থাকে তাহলে তা সংশোধনের জন্য, যে ব্যক্তি বা জমির মালিক সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদিসহ স্থানীয় দেওয়ানী আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। দেওয়ানী আদালত যদি মনে করে খতিয়ানে ভূল আছে তাহলে প্রয়োজনীয় শুনানী শেষে সংশ্লিস্ট প্রমানপত্র বিশ্লেষন করে সংশোধনের আদেশ দিবেন।

নামজারি বা মিউটেশন

নামজারি বা মিউটেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা জমি কেনার পর বা মালিকানা পরিবর্তনের পর ক্রেতাকে করতে হয়। নামজারি বলতে বুঝায় মালিকানার পরিবর্তন। এক বা একাধিক দাগের সম্পূর্ণ বা আংশিক ভূমি নিয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তির নামে সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যে ভূমিস্বত্ব প্রস্তুত করা হয় তাকে খতিয়ান বলে। বিক্রয়, দান, বিনিময় ইত্যাদির মাধ্যমে খতিয়ানভুক্ত জমি হস্তান্তর করা হলে উক্ত খতিয়ান থেকে হস্তান্তরিত ভূমির পরিমাণ ওই খতিয়ান হতে বাদ দিয়ে হস্তান্তর গ্রহীতার বা যে ব্যক্তি জমি ক্রয় করেছেন বা ক্রেতা নামে খতিয়ান খুলেছেন তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটাই মূলত নামজারি বা মিউটেশন। হস্তান্তরিত ভূমির প্রকৃত প্রজাকে এবং যার নিকট হতে খাজনা আদায় করা হবে তার জন্য স্বত্বলিপি বা খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। কাজেই নামজারি না করলে সরকারি রেকর্ডে পুর্বের স্বত্বাধিকারীর নামই থেকে যাবে হস্তান্তরগ্রহীতার নাম থেকে যাবে অজ্ঞাত। তাই অন্তবর্তীকালীন রেকর্ড পরিবর্তন, সংশোধন এবং হালনাগাদকরণের প্রক্রিয়াকে নামজারি বলা হয়।

দলিলের শাব্দিক অর্থ

বাংলা দলিল কিংবা চুক্তিপত্রে অনেক শব্দ আছে, যেগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা হয়। আবার এমন সব শব্দও আছে, যেগুলো কথাবার্তায় খুব কম ব্যবহৃত হয় এ ধরণের কতিপয় শব্দের অর্থসহ ব্যুৎপত্তি-

সাংকেতিক নামশব্দের অর্থবিবরণ
সাংসাকিন সাকিম। সাকিন বা সাকিম শব্দের অর্থ ঠিকানা বাসস্থানঠিকানা বাসস্থান
গংঅন্যরা সমূহকোন ব্যক্তি ও অন্যান্য বা তার সহযোগীগণ। যেমন যদি লেখা থাকে রহিম গং তাহলে বুঝতে হবে রহিম ছাড়াও অন্যরা সম্পত্তির অংশীদার।
মোংমোকামআবাস বাসস্থান হলেও মূলত বাণিজ্যিক সম্পত্তিকে মোকাম বলে।
কিঃকিস্তিশব্দটি দফা বার ক্ষেপ এই অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
এজমালি/ইজমালিযৌথ সংযুক্ত বহুজন একত্রেএজমালি সম্পত্তি বলতে যৌথ মালিকাধীন সম্পত্তিকে বোঝায়।
ছোলেনামামীমাংসা আপোষআপস-মীমাংসাপত্র
খারিজসাধারণ অর্থে বাতিল করা হয়েছে এমন বোঝায়ভূমি আইনে একজনের নাম থেকে অন্যজনের নামে জমির মালিকানা পরিবর্তন করে নেওয়াকে বোঝায়।

ভূমি সার্ভে ও সেটেলমেন্ট সংক্রান্ত কতিপয় শব্দ বা পদের মানে

পর্চা

পৃথক একটি কাগজে খতিয়নের অনুলিপি তৈরী করা হয় তখন তাকে পর্চা বলা হয় যা হাতে লিখে বা কম্পোজ করে তৈরী করা হয়। অনুলিপি যখন রেকর্ড রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয় তখন তাকে নকল বা সার্টিফাইড কপি বলে। অনেক সময় জরিপ চলাকালে প্রাথমিকভাবে হাতে লেখা একটি খসড়া বিবরণ যাচাইয়ের জন্য জমির মালিককে দেয়া হয়। একে মাঠ বা হাত পর্চাও বলে।

জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিবরণ, জমির খতিয়ান-দাগ, অংশ, হিস্যা, শ্রেণী ইত্যাদি জানার জন্য পর্চা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জমি কেনা বেচার সময় পর্চা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস, এসি (ল্যান্ড) অফিস বা রের্কডরুমে যোগাযোগ করা যেতে পারে। নির্ধারিত ফিসহ আবেদন করলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ডরুমেও পর্চা পাওয়া যায়।

মৌজা

সার্ভের সময় সাধারণত একই রকম ভূ-প্রকৃতির ভৌগলিক এলাকা স্বতন্ত্রভাবে পরিমাপ করা হয়। কোন থানা বা উপজেলার এরকম স্বতন্ত্র ভৌগলিক এলাকাই হলো মৌজা। কয়েকটি গ্রাম একটি মৌজার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আবার কোন গ্রামেও একাধিক মৌজা থাকতে পারে। খতিয়ান বাদ দিলে মৌজার নাম উল্লেখ থাকে। উপজেলাধীন প্রত্যেক মৌজাকে একটি ক্রমিক নম্বর দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এই নম্বরকে জেএল নম্বর বলে।

মৌজা ম্যাপ

খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ দুটো মিলেই পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড। জরিপের সময় খতিয়ান বা জমির মালিকানার বিবরণ এবং জমির নকশা বা ম্যাপ এক সাথেই তৈরী করা হয়। শুধু খতিয়ান দেখে জমি চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। এজন্য মৌজা ম্যাপ প্রয়োজন হয়। এতে দাগ নম্বর দিয়ে জমি চিহিৃত করা হয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমির পাশাপাশি রাস্তা, স্কুল, মসজিদ, পুকুর, ঈদগাহ ইত্যাদি গণসম্পত্তিও চিহ্নিত করা থাকে। মৌজা ম্যাপও ডিসি অফিসের রেকর্ডরুম থেকে সংগ্রহ করা যায়।

তফসিল

তফসিল বলতে ভূমির পরিচয়কে বুঝায়। অর্থাৎ জমিটি কোথায়, এর মালিক কে ইত্যাদি উল্লেখ থাকে। তফসিলে জেলার নাম, উপজেলা বা থানার নাম, মৌজার নাম, জমির দাগ-খতিয়ান নম্বর উল্লেখ করা হয়। এতে অনেক সময় জমির পরিমাণ, শ্রেণী এবং মালিকানার বর্ণনাও থাকে।

দাগ নম্বর

দাগ বলতে বুঝায় জমির নম্বর (Plot Number) সাধারণত মাপ জোকের মাধ্যমে জমিকে একাধিক অংশে ভাগ করা হয়। এর প্রতিটি খন্ডকে দাগ বা Plot বলে। জরিপের সময় এরকম প্রত্যেক খন্ড জমিকে একটি নম্বর দ্বারা চিহিৃত করা হয়। এই নম্বরকেই দাগ নম্বর বলে।

এওয়াজ বদল

অনেক সময় পারস্পরিক ব্যবহারের সুবিধার্থে এবং উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে একজনের সম্পত্তির সাথে আরেকজনের জমির মালিকানা বদল বা বিনিময় করা হয়। এটাই এওয়াজ বদল। এ ক্ষেত্রে, জমি বা সম্পত্তি পরস্পর ভোগ দখল করলেও স্বত্ত্ব বা মলিকানার হস্তান্তর হয় না। কেবলমাত্র দখল বদল হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না রেজিস্ট্রেশন করে জমির স্বত্ত্ব বদল করা হয়, ততক্ষণ ঐ জমি পূর্ব মালিকের নামেই থেকে যায়। মনে রাখতে হবে এওয়াজ বদল কেবলমাত্র ব্যবহার বা চাষাবাদের সুবিধার্থে করা হয়।

অছিয়তনামা

যদি কোন ব্যক্তির মৃত্যুর আগে তার ওয়ারিশ বা আত্মীয়-স্বজনকে তদীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বাটোয়ারা সম্পর্কে দলিল মূলে কোন নির্দেশ দিয়ে যান, তবে তাকে অছিয়তনামা বলে। হিন্দু ধর্মে একে উইল বলে।

চৌহদ্দি

জমির সীমানা। কোন নির্দিষ্ট স্থাবর সম্পত্তির চারপাশে যা কিছু রয়েছে (জমিজমা, পুকুর, স্থাপনা, মালিকের নাম এবং সম্পত্তির বিবরণসহ) তাই চৌহদ্দি।

দিয়ারা

পলিমাটি দ্বারা গঠিত চর। দরিয়া থেকে দিয়ারা শব্দ এসেছে। চরের জমি পরিমাপের জন্য দিয়ারা জরিপ করা হয়।

নকশা

ম্যাপ বা নকশা বলতে অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করে ভূমির অবিকল প্রতিচ্ছবিকে বুঝায়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৪তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top