স্বপ্ন যখন সবুজ ঢাকার

ঢাকা মানেই বিশ্বের অন্যতম বসবাস অনুপযোগী শহর। অপরিকল্পিত বসতি, অপ্রতুল সড়কব্যবস্থা, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা, ইট-কংক্রিটের জঞ্জাল এ অবস্থার জন্য দায়ী। অথচ শতাব্দীকাল আগেও ঢাকা ছিল জল-সবুজে পূর্ণ, যার চারদিকে ছিল সবুজ বৃক্ষরাজি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল বাগান, উদ্যান, পার্ক ও খেলার মাঠ। ঢাকার এমন প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে আকৃষ্ট হয়ে এখানে এসেছে অসংখ্য পর্যটক। অথচ নগর কর্তাদের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ প্রকৃতি, পাখি আর প্রজাপতি। সেই সঙ্গে বিলীন হচ্ছে লাস্যময়ী ঢাকার রূপলাবণ্য। তবুও আমরা স্বপ্ন দেখি এই শহরকে ঘিরে, যেটি হবে সবুজঘেরা আধুনিক তিলোত্তমা এক নগরী। আর এমন স্বপ্ন নগরের উত্তর ও দক্ষিণের মেয়রের। ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে উত্তর সিটি করপোরেশন ‘গ্রিন ঢাকা, ক্লিন ঢাকা’ স্লোগান নিয়ে গড়ে তুলছে ‘সবুজ ঢাকা’ আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে চলছে ‘জল সবুজে ঢাকা’ কার্যক্রম।

একটি আদর্শ শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য যে পরিমাণ সবুজ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, আমাদের শহরগুলোতে রয়েছে তার চেয়ে অনেক কম। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা সিটি করপোরেশনের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০ শতাংশের বিপরীতে এ নগরে সবুজ বনভূমি রয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক গবেষণা বলছে, নাগরিকদের সুস্থতায় একটি শহরের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কমপক্ষে ৯ বর্গমিটার সবুজের আচ্ছাদন থাকা প্রয়োজন, যা ঢাকায় রয়েছে ২ বর্গমিটারেরও কম। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় ঢাকায় মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করায় ক্রমেই বাড়ছে এখানকার তাপমাত্রা। ভবনের অভ্যন্তরেও সহনীয় তাপমাত্রার চেয়ে এটি অন্তত ২.৫-৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, একটি ৯.৬ মিটার লম্বা গাছ কমপক্ষে ৮ শতাংশ হিটিং-কুলিং লোড কমাতে সক্ষম। পর্যাপ্ত বৃক্ষায়ন করা গেলে শহরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সহজেই বজায় রাখা সম্ভব। 

পর্যাপ্ত সবুজ না থাকায় এবং ঢাকার চারপাশের ইটভাটা, যানবাহন, শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলা এবং যত্রতত্র উন্মুক্ত ডাস্টবিন থাকায় দিনে দিনে বাড়ছে নগরীর বায়ুদূষণের মাত্রা। গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ইনডেক্স-২০১৪ অনুযায়ী, বায়ুদূষণের দিক দিয়ে সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান বাংলাদেশের। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন মতে, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি। প্রতি কিউবিক মিটারে এয়ার বোর্ন পার্টিকুলেট ম্যাটারের (বাতাসে সহনশীল পদার্থ) পরিমাণ এ শহরে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম, যেখানে সহনীয় মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে কার্বনের পরিমাণ সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২৯০-৩০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন), সেখানে ঢাকার বাতাসে কার্বনের মাত্রা ৩৫০ পিপিএম। বায়ুদূষণের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তা ছাড়া মানুষের জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন, তা-ও পাওয়া যাচ্ছে না গাছের অভাবে। অথচ গাছপালা থাকলে শুধু অক্সিজেনই নয়, বাতাসকেও করে তোলে বিশুদ্ধ ও নির্মল। প্রতিটি বড় গাছ বাতাস থেকে ৬০ পাউন্ডের বেশি ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে ১০টি এসির সমপরিমাণ তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ রোধসহ শত শত টন কার্বন শোষণ করে গাছ পরিবেশকে অক্ষত রাখতে সহায়তা করে। এক হেক্টর বনভূমি বছরে ১৮ লাখ গ্রাম কার্বন গ্রহণে সক্ষম।

জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় বাড়ছে নিরাপদ পানির চাহিদা, যা মেটাতে ভূ-অভ্যন্তর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নামছে পানির স্তর। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) গবেষণামতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামার এই হার প্রতিবছর গড়ে অন্তত ১০ ফুট। ঢাকার অধিকাংশ জায়গা পিচ তথা কংক্রিট আচ্ছাদিত হওয়ায় বৃষ্টি ও ব্যবহৃত পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারছে না। গাছের শিকড় পানিকে মাটির নিচে যেতে সাহায্য করে। অথচ পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় নগরে ভূ-ভাগ রিচার্জের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য। পর্যাপ্ত বৃক্ষায়ন করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে তীব্র পানির সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি ভূ-ভাগ দেবে যাওয়ার আশঙ্কাও ক্রমেই বাড়বে।

নগরের সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে এবং সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন সময়ে স্থানভেদে বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। কিন্তু তা কখনোই পরিকল্পিতভাবে হয়নি। কখনো লাগানো হয়েছে বিদেশি গাছ আবার কখনো বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় গাছ। এই গাছগুলো বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে চরমভাবে। অধিকাংশ গাছই লাগানোর পর টিকতে ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি বনানী থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিউটিফিকেশন প্রকল্পের আওতায় বহুমূল্যের বেশ কিছু ফাইকাস বনসাই লাগানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো সড়কের দুধারে কিংবা সড়কদ্বীপে মেহগনি, নিম, বকুল, উইপিং ও অন্যান্য গাছ লাগানো হয়েছে, যার সাধারণত ডালপালা ছাঁটা, পানি দেওয়াসহ সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। আলো-বাতাস ও পানির অভাবে এসব গাছ মরে যায়। আবার সড়ক সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ বা সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়িতে ফুটপাতে বা সড়কদ্বীপে গাছের শিকড়ও কেটে যায়। এতেও গাছগুলো মরে যায়। এ ছাড়া রাজধানীর প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে পেরেক, তার ও রশি দিয়ে বিলবোর্ড ও ব্যানার লাগানো হয়। এতে গাছের যেমন ক্ষতি হয় তেমনি ব্যাহত হয় নগরের সৌন্দর্যও। এসব কারণে গাছ মারা গেলে সিটি করপোরেশন থেকে তা সময়মতো অপসারণও করা হয় না। প্রায়ই দেখা যায় সামান্য ঝড়েও নগরের গাছ উপড়ে হতাহত হয় অনেক মানুষ।

ঢাকাকে বাহ্যিক, পরিবেশ ও প্রতিবেশগতভাবে সুন্দর ও সুস্থভাবে গড়ে তুলতে অন্যান্য বিষয়ের মতো বৃক্ষায়নেও গুরুত্ব দিতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে। লাগাতে হবে দেশীয় প্রজাতির ফুল-ফল ও দৃষ্টিনন্দন গাছপালা। যেহেতু নগরে পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব রয়েছে সেহেতু ঢাকাকে ঘিরে নিতে হবে ভিন্ন পরিকল্পনা। শহরের ভেতরে বড় গাছ লাগানোর সুযোগ কম থাকায় ঢাকার চারপাশে যে বেড়িবাঁধ এবং বাঁধসংলগ্ন এলাকা রয়েছে, সেখানে ব্যাপক বৃক্ষায়ন করতে হবে। এ ছাড়া যেসব স্থানে জলাভূমি (যেমন রাতারগুল জঙ্গল, সিলেট) রয়েছে, সেখানে পানিতে টিকতে সক্ষম জলজ উদ্ভিদ, যা জল ও স্থল উভয় পরিবেশেই টিকতে সক্ষম (হিজল, করচ, সুন্দরী) এমন গাছ লাগাতে হবে। ঢাকার মধ্যে গাছ লাগানোর সুযোগ কম থাকলেও সড়ক, সড়কের দুই ধার ও সড়কদ্বীপে লতা-গুল্মজাতীয় (কাঠটগর, বেলি, গন্ধরাজ, জবা প্রভৃতি) প্রচুর গাছ লাগানো সম্ভব। বাড়ির আশপাশে একটু খোলা জায়গায় শেফালি, কাঠটগর, পলাশ, জবা, করবী, মহুয়া প্রভৃতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে জারুল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালি, অর্জুন, নিম, বকুল, পলাশ, দেবদারুর মতো গাছ লাগানো হলে ঢাকার সৌন্দর্য বাড়বে বহুগুণে।

দেয়াল ও ছাদ বাগান এখন বেশ জনপ্রিয়। এই বাগান ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন ভবনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে  সাহায্য করে তেমনি ভবনের সৌন্দর্যও বাড়ায় বহুগুণে। এজন্য ভবনের দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়ায় মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত উল্লম্ব বাগান সৃষ্টি করে তাতে মাধবীলতা, মর্নিং গ্লোরি, লতাবট ও ফার্ন-জাতীয় উদ্ভিদ লাগানো সম্ভব। এ ছাড়া ভবনের ছাদে রংবেরঙের পাতাবাহার, গোলাপ, লবঙ্গলতিকা, অপরাজিতা, হাসনাহেনা প্রভৃতি গাছ লাগানো যায়। আবার ধনিয়াপাতা, পুদিনাপাতা, মরিচ, বোম্বাই মরিচ, শসা, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেও পরিবারের সবজি চাহিদা মেটানো সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী নেওয়া হচ্ছে ইকোসিটি কার্যক্রম। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, পোল্যান্ড, জার্মানির হামবার্গসহ বিভিন্ন নগরগুলো পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম টেকসই নগরে। ২০১২ সালে কানাডার ভানকুভার নগরকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচে সবুজ নগরী করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বে সবুজ নগরের এ ধারণাটি বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও আসলে এর কোনো প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞা বা নীতিমালা এখনো হয়নি। তবে শুধু গাছ লাগিয়ে ইকো সিটি করা সম্ভব এমন ধারণা একেবারেই ভুল। নগর গবেষকদের মতে, অন্তত এই ১০টি কাজ না করলে সাসটেইন শহর ও সবুজ যে উদ্দেশে করা হচ্ছে তা করা যাবে না। ঢাকাকে ইকোসিটির আওতায় আনতে যেসব পদক্ষেপসমূহ নিয়ে প্রতিনিয়ত চর্চা করতে হবে তা হচ্ছে 

১.     প্রথমেই সর্বজন স্বীকৃত দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পিত সবুজ নগরায়ণের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে

২.    পর্যাপ্ত পার্ক ও উদ্যান গড়ে তুলতে হবে কেননা এগুলো শহরের ফুসফুসস্বরূপ যা মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় টনিকের মতো কাজ করে

৩.    তাপমাত্রা সহনীয় রাখতে পর্যাপ্ত জলাধার, গ্রিন ও ওপেন স্পেস নিশ্চিত করতে হবে

৪.    ভবন নির্মাণ বিধিমালা সবুজ সহায়ক হতে হবে

৫.    রিনিউঅ্যাবল এনার্জি-নির্ভরতা ও উৎপাদন বাড়াতে হবে

৬.   সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্যকরী সুয়ারেজ সিস্টেম চালু করতে হবে

৭.    পানিসাশ্রয় ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে হবে

৮.    গণপরিবহনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে

৯.    প্রতিটি সড়কে পৃথক বাইসাইকেল লেন করতে হবে

১০.  রিসাইক্লিনিং করতে হবে।

ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে ‘সবুজ ঢাকা’ কার্যক্রমের আওতায় সবুজ নগর গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ। এসবের মধ্যে অন্যতম-

  • প্রচুর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
  • রাজধানীবাসীকে গাছ লাগাতে উৎসাহিতকরণ
  • বিনা মূল্যে গাছের চারা বিতরণ
  • ফুট ওভারব্রিজে গাছ লাগানো
  • ছাদবাগান সৃজন
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডাস্টবিন স্থাপন
  • স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগার নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম।

বর্তমানে ডিএনসিসিতে আরবরিকালচার বা বৃক্ষ সম্পর্কিত বিভাগ না থাকায় এ ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোগিতা নিয়ে কাজ চলছে। এ ছাড়া রয়েছে নানা অসংগতি। এসব অসংগতিসমূহ দূর করতে না পারলে এবং সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা না করলে কখনোই সবুজ নগরী গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সবুজ নগর গড়তে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি তা হচ্ছে-

  • নদীতীর, খালপাড়, খেলার মাঠ, জলাভূমি প্রভৃতি স্থান দখলমুক্ত করে গড়তে হবে সবুজ উদ্যান
  • সড়ক, সড়কের দুই পাশ এবং সড়কদ্বীপে উপযুক্ত গাছ লাগাতে হবে
  • রোপণকৃত গাছকে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও ডালপালা কর্তন করতে হবে যাতে বৈদ্যুতিক তার ও টেলিফোন লাইনের কোনো ক্ষতি করতে না পারে এবং যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটায় সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে
  • ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুসারে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা ছেড়ে ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’ (এফএআর) বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খোলা জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর যে নির্দেশনা রয়েছে তা মানতে বাধ্য করতে হবে
  • কোনো গাছ মারা গেলে বা রোগাক্রান্ত হলে তা প্রতিস্থাপন করতে হবে
  • কোনো অবস্থাতেই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ লাগানো যাবে না
  • গাছ থেকে বিলবোর্ড কিংবা প্রচারপত্র উচ্ছেদ ও বন্ধে কঠোর আইন প্রনয়ণ করতে হবে
  • নগরের প্রতিটি মহল্লায়, প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে তুলতে হবে সবুজ নগর ও নগরীয় কৃষিব্যবস্থা গড়ার বলিষ্ঠ আন্দোলন
  • ঢাকার সৌন্দর্যবৃদ্ধির পাশাপাশি নগরবাসীর সুস্বাস্থ্যে গাছের ভূমিকা নিয়ে নাটক, গান, কবিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সেমিনার ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে হবে
  • আয়োজন করতে হবে বেশি বেশি বৃক্ষমেলার। মেলা চলাকালে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা করলে নতুন প্রজš§কে গাছ লাগাতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হবে।

নগরীতে ব্যাপকহারে সবুজায়ন করা হলে-

  • নগরের সৌন্দর্য বাড়বে
  • তাপমাত্রা সহনীয় থাকবে
  • বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়বে; কমবে বায়ুদূষণ
  • নগরবাসীর মনে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের আরবান এইজ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর রিকি বারডেট্ বলেছেন, ‘তুমি যদি তোমার শহরকে পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোল, তাহলে তুমি এ পৃথিবীটাকেই টেকসই করে তুলছ।’ বাংলাদেশ সুজলা সুফলা দেশ। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই আমরা পেয়েছি প্রকৃতিপ্রদত্ত এই সবুজ প্রকৃতি। গ্রামের মতো শহরগুলোকেও সবুজ-শ্যামলীমায় ভরে তোলা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন কিছুটা স্বদিচ্ছা, সুষ্ঠু ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকরী পরিকল্পনা ও সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রয়াস ঢাকাকে করে তুলতে পারে স্নিগ্ধ সবুজ এক মহাউদ্যান, যা ফিরিয়ে দেবে হারিয়ে যাওয়া তিলোত্তমা প্রাচীন সেই ঢাকাকে।

বিশেষজ্ঞ মত

মোকারম হোসেন, নিসর্গপ্রেমী, সাধারণ সম্পাদক, তরুপল্লব

মোকারম হোসেন প্রায় ২০ বছর ধরে দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করছেন। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে বৃক্ষ, প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতামূলক লেখালেখি, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অনুষ্ঠান নির্মাণ, শিক্ষার্থীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বৃক্ষ ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে পরিবেশ-বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তরুপল্লবের মাধ্যমে ২০০৮ সাল থেকে ‘গাছ দেখা গাছ চেনা’ কর্মসূচি, ‘তরুপল্লব উদ্যানকর্মী কর্মশালা’, বিপন্ন বৃক্ষ সংগ্রহ, সংরক্ষণসহ নানা ধরনের শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রবর্তন এবং ‘প্রকৃতিপত্র’ নামে একটি প্রকৃতি ও পরিবেশ-বিষয়ক নিয়মিত প্রকাশনা সম্পাদনা। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এ পর্যন্ত তাঁর লিখিত গ্রন্থ ৪৪টি। পরিবেশ শিক্ষা ও প্রচারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে অর্জন করেন জাতীয় পরিবেশ পদক, ২০০৩ সালে কাজী কাদের নওয়াজ স্বর্ণপদক, ১৪০৮ ও ১৪১০ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার, ২০১০ সালে এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য সম্মাননা, ২০১৫ সালে কবি হাবীবুর রহমান সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৭ সালে ৫ম এইচএসবিসি-ডেইলি স্টার ক্লাইমেট অ্যাওয়ার্ড অন্যতম। প্রকৃতিপ্রেমী এ মানুষটির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফয়সাল হাসান সন্ধী

ঘন বসতিপূর্ণ এই নগর ঢাকাকে কি সবুজ নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা। উন্নত দেশগুলোতে নগর গড়ে তোলার আগেই পরিকল্পনা নেয় ফলে বৃক্ষায়নও হয় পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু এ দেশে লোকালয় গড়ে ওঠার পর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ফলে জায়গাস্বল্পতা আর পরিকল্পিত বৃক্ষায়নের সুযোগ না থাকায় সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু করা হয়। আদতে এটি তেমন কাজে আসে না। ঢাকাও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু যতটুকুই বৃক্ষায়ন হোক না কেন তা যদি সঠিক ও নিয়মিতভাবে পরিচর্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় তাহলে ঢাকাকেও সবুজ নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আপনার মতে ঢাকার জনসংখ্যা অনুপাতে গাছের অনুপাত কেমন হওয়া উচিত, বর্তমানে রয়েছেই-বা কত?

ঢাকায় মোট গাছের সংখ্যা কত তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই, যা থাকা উচিত ছিল। তবে প্রয়োজনের তুলনায় গাছের সংখ্যা একেবারেই কম তা সহজেই বোঝা সম্ভব। উন্নত দেশগুলোতে নগর অঞ্চলে বৃক্ষায়নের ক্ষেত্রে প্রতিটা গাছকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। কোন পয়েন্টে কোন গাছ আছে বা তার অবস্থা কী তা মনিটর করা হয়। কোথাও কোনো গাছ মরে গেলে তা দ্রুত প্রতিস্থাপন করা হয়। ঢাকায় এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে তখন প্রকৃত গাছের সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে ‘সবুজ ঢাকা’ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে বেশ কিছুদিন হলো, উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখছেন কি?

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এই উদ্যোগ অতি চমৎকার। গত বছর থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। আমি নিজেও ‘সবুজ ঢাকা’ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারসহ কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবকেরাও যুক্ত রয়েছেন। আমরা সমন্বিতভাবে ঢাকার জন্য কোন কোন গাছ লাগানো যেতে পারে তার একটা তালিকা করে দিয়েছি। পাশাপাশি কিছু স্থান নির্দিষ্ট করেছি। পার্কগুলো সংস্কার ও নতুন কিছু পার্ক সৃজনের পরামর্শ দিয়েছি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। আশা করি এভাবে কাজ চলতে থাকলে অচিরেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবে নগরবাসী।

সবুজ ঢাকা কার্যক্রমের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা কি উদ্ভিদতত্ত্ব বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন?

হ্যাঁ। উদ্ভিদ ও বৃক্ষায়ন নিয়ে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন বিষয়সংশ্লিষ্টদেরই বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে সবুজ ঢাকা কার্যক্রমের সঙ্গে। এ কারণেই আমি এই ‘সবুজ ঢাকা’ প্রকল্পের ব্যাপারে আশাবাদী।

ঢাকার প্রকৌশল, পরিবেশ ও অবস্থানগত অবকাঠামো বিবেচনায় কোন অঞ্চলে কোন ধরনের গাছ লাগানো উচিত বলে আপনি মনে করেন?

খড়্্ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। তাই ঢাকাকে যদি প্রকৃতির ছোঁয়ায় সাজাতে হয় তাহলে মাথায় রাখতে হবে ঋতুর কথা। প্রকৃতিতে ঋতু পরিবর্তনের প্রধাণ সূচক হলো গাছে ঋতু অনুযায়ী বর্ণিল ফুল আসা। বর্ষা, শরৎ বা বসন্ত প্রত্যেক ঋতুর ফুলের আলাদা আলাদা রূপ। তাই সড়কের দুপাশে গাছে ছয় ঋতুর কথা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলে বছরের সব সময়ই কোনো না কোনো ফুলে ছেঁয়ে থাকবে ঢাকা নগরী। আর প্রকৌশল ও অবস্থাগতভাবে চিন্তা করলে খেয়াল রাখতে হবে কোন গাছের বেড়ে ওঠার জন্য কতটুকু জায়গা প্রয়োজন। কোন গাছের শিকড় কতটুকু জায়গা ধরে ছড়িয়ে থাকে তাও বিবেচনায় নিতে হবে। যেমন, আমরা নিশ্চয় রোড ডিভাইডারের মাঝে বৃহদাকার বটবৃক্ষ রোপণ করব না। ঠিক তেমনিভাবে যেসব গাছ অপেক্ষাকৃত স্বল্প শক্তিশালী, যা ঝড়েই উপড়ে পড়ে, সেগুলো ফুটপাতে লাগানো থেকে বিরত থাকা উচিত। 

নগরে বৃক্ষায়ন কি ঠিকভাবে হচ্ছে? এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

সম্প্রতি নগরে কিছুটা পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষায়ন হচ্ছে। আগে বৃক্ষায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়নি, যা হয়েছে তাতে খুব একটা সমন্বয় ছিল না। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবসতিপূর্ণ শহর। এই শহরে বৃক্ষায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে আমাদের। যত্রতত্র সাময়িক সুবিধার কথা মাথায় রেখে বৃক্ষায়ন করলে চলবে না। আমাদের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ওয়াসা, বিটিসিএল, বিদ্যুৎ বিভাগ, সওজ, সিটি করপোরেশন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে গাছ লাগাতে হবে। বৃক্ষায়ন নিয়ে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আগামী ১০০ বছরের কথা মাথায় রাখতে হবে। তবেই ঢাকাকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।

ঢাকা যদি একটি সবুজ নগরে পরিণত হয় তবে তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কী ধরনের অবদান রাখবে?

ঢাকাকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুললে জাতীয় অর্থনীতিতে তা অবশ্যই বড় ভূমিকা রাখবে। এতে নাগরিকেরা উপভোগ করবে নির্মল বায়ু; বিষমুক্ত অক্সিজেন। তাতে রোগ বালাই কম হবে; শরীর থাকবে সুস্থ। চিকিৎসা খরচ কমে আসবে। মানুষের কর্মদক্ষতা যাবে বেড়ে। পরিবেশদূষণ কমায় পরিবেশ সংরক্ষণেও ব্যয় হবে কম। আবার অধিক পরিমাণ গাছের জন্য শহরের তাপমাত্রাও কমে আসবে। ফলে ফ্যান ও এসির ব্যবহার কমবে ফলে বিদ্যুৎ-সাশ্রয় হবে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে ঢাকা যদি অচিরেই একটি সবুজ নগরে পরিণত হয় তাহলে তা শহরের মানুষের জীবনমানে ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।

রুপাই ইসলাম,

চেয়ারম্যান, সবুজ ঢাকা       

নগরকে সবুজ করে গড়ে তোলা লক্ষ্যে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ‘সবুজ ঢাকা’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যাত্রা শুরু করে। এরা কাজ করে মূলত ‘কার্বন বাজেট’ নিয়ে। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাসাবাড়ির ছাদে ফুল ও ফলের বাগান তৈরি করতে এই সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ লাখ বাড়িতে অন্তত ৩০ বছরের জন্য পরিপূর্ণ বাগান করে দেওয়া।

ঢাকার উত্তাপ কমিয়ে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে ‘সবুজ ঢাকা’ প্রথম পর্যায়ে উত্তরের ৩৬টি ওয়ার্ডের ১০৮টি এলাকায় ব্যাপক বনায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বাড়ির ছাদ ও বাড়ির ফাঁকা জায়গায় সারা বছরই গাছ লাগানো হচ্ছে। এরই মধ্যে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪০টি স্কুলে ১ লাখ গাছ দিয়ে স্থায়ী বাগান করা হয়েছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করতে নিয়মিত সেমিনার আয়োজন এবং অংশগ্রহণকারী প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে একটি করে গাছ উপহার দিচ্ছে। এ উত্তরের ৩৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মসজিদকে ছাদবাগান করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র সবুজ ঢাকা গড়ার প্রত্যয়ে ‘সবুজ ঢাকা’কে একটি গাড়ি দিয়েছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘সবুজ চাকা’। কিছুদিনের মধ্যে আরও চারটি গাড়ি যোগ হবে। গাড়িগুলো গাছ, মাটি ও সার নিয়ে উত্তরের ৩৬টি ওয়ার্ডে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।

এ বছরের মে মাসে ‘সবুজ ঢাকা’ ও উত্তর সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যৌথভাবে আয়োজন করেছিল বাংলাদেশের ৩০০ জন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীকে নিয়ে ‘আর্ট ক্যাম্প-২০১৭’। অনুষ্ঠানে চিত্রশিল্পীরা তাঁদের ক্যানভাসে সবুজ ঢাকাকে যাঁর যাঁর নিজের মতো করে এঁকেছেন। এ জন্য তাঁদের পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেকের বাড়িতে একটি করে বাগান করে দেবে ‘সবুজ ঢাকা’। যেহেতু রাজধানীতে জমির পরিমাণ কম, তাই বারান্দা ও ছাদবাগানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ‘সবুজ ঢাকা’।

আহসান রনি

প্রতিষ্ঠাতা, গ্রিন সেভার্স

২০১১ সালে ‘সবুজ বাঁচান জীবন বাঁচান’ এই স্লোগানে কৃষি ও নগরের পরিবেশ উন্নয়নে ছাদবাগানসহ বেশ কয়েকটি লক্ষ্য সামনে রেখে যাত্রা শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রিন সেভার্স। নগরবাসীর কাছে নগর কৃষির ধারণা প্রদান ও বাগান সৃজনে সার্বিক সহায়তা প্রদান করছে এ প্রতিষ্ঠানটি। এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সবুজ ঢাকা গড়তে ছাদবাগান কার্যক্রমকে একরকম সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার পেছনে আহসান রনি ও তাঁর প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। এ পর্যন্ত নগরের প্রায় ২ হাজার ৬০০টি বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় বাগান গড়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া ছাদবাগানকে দীর্ঘমেয়াদি টিকিয়ে রাখার জন্য বাগান পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত করতে প্রতিমাসে ফ্রি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শহরবাসীর দোরগোড়ায় গাছ লাগানোর উপকরণ, মাটি, সার ও গাছের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয় গ্রিন সেভার্স।

এ ছাড়া ছোটদের সবুজের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহী করে তুলতে ঢাকার ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরও সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় সারা দেশে ৩৮০টি স্কুলে স্থাপন করা হয়েছে অক্সিজেন ব্যাংক নামে একটি কাঠের ব্যাংক। সেখানে স্কুলের বাচ্চারা তাদের টিফিনের পয়সা জমায়। পরে ওই টাকায় তারা স্কুলে বাগান তৈরি করে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসিক কৃষি পাঠের আয়োজন, আগারগাঁওয়ে পথশিশুদের জন্য একাটি পরিবেশ স্কুল ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শিশুদের গাছ চেনানো ও গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি নান্দনিক শিশু কানন। ‘ভ্রাম্যমাণ বৃক্ষ ক্লিনিক’ আহসান রনির একটি অনন্য উদ্যোগ। যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ দিনগুলোতে বাচ্চাদের গাছ উপহার দেওয়া এবং গাছ কিনতে ও লাগাতে উৎসাহিত করা হয়।

বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বৃক্ষ পরিচর্যার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইউএনডিপির সহায়তায় তিনি তৈরি করেছেন প্লান্টস ডক্টর নামের একটি মোবাইল অ্যাপ। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা নগরে ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাদবাগান সৃজনের একটি আদর্শ রূপরেখা প্রণয়নের কাজে গ্রিন সেভার্স ও আহসান রনিকে সম্পৃক্ত করেছে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও একটি সবুজ ঢাকা গড়ার কার্যক্রমে গ্রিন সেভার্সকে সঙ্গে নিয়েছে। এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৩ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জাতীয় পুরস্কার, ২০১৫ সালে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৬ সালে অর্জন করেন চে গুয়েভারা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া পরিবেশ ও নগর কৃষি নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে তাঁর ঝুলিতে জমা পড়েছে আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top