বৈশাখের তীব্র গরমে যখন অতিষ্ঠ জনজীবন, তখন হঠাৎই আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা। ক্ষণিকের মধ্যেই শুরু হয় দমকা হাওয়া, সঙ্গে আকাশজুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি। এরপর অঝোর ধারায় বৃষ্টি ও বজ্রপাত। এই কয়েক পসলা বৃষ্টি জনজীবনে স্বস্তি এনে দিলেও বজ্রপাত হয়ে ওঠে বিপর্যয়ের কারণ। বজ্রপাত প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি হলেও এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাও ভয়াবহ। বজ্রের স্ফুলিঙ্গ আর ভয়াবহ গর্জন যেন পিলে চমকে দেয়। এর বিধ্বংসী ক্ষমতার জন্য আগের দিনের মানুষ বজ্রকে দেবতা মেনে পূজা করত। মানুষ এখন ভবনের নিচে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করলেও উন্মুক্ত স্থানের লোকেরা মরছে হরহামেশাই। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে বেড়ে গেছে বজ্রপাতের পরিমাণ। এ বছরেও কয়েক মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে বজ্রসহ বৃষ্টি। বজ্র বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রতিদিনই মরছে মানুষ ও গবাদিপশু। নষ্ট হচ্ছে গৃহস্থালির বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। এতে ছড়িয়ে পড়ছে জনমনে আতঙ্ক। এর মূল কারণ বজ্রপাত সম্পর্কে অজ্ঞানতা ও সচেতনতার অভাব। মানুষের জীবনহানি হ্রাস ও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে বজ্রপাতের আদ্যন্ত এ রচনায়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারা দেশে বজ্রপাতের ১ হাজার ৮০০-র বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। দেশে সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল সুনামগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল। ভয়াবহতা বিবেচনায় বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউ স্মিডলিন ‘রিস্ক ফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবেলিটি’ শীর্ষক গবেষণায় তুলে ধরেছেন, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ৪০টি বজ্রপাত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বজ্রপাত সম্পর্কিত নাসার গোদার্ড ইনস্টিটিউট অব স্পেস স্টাডিজের (জিআইএসএস) কলিন প্রাইস ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড রিন্ড তাঁদের প্রকাশিত নিবন্ধে (পসিবল ইমপ্লিকেশন অব গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অন গ্লোবাল লাইটেনিক) জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন দুটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বজ্রপাত আর দাবানলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
জিওগ্রাফির এই অধ্যাপকদের তত্ত্বমতে, পরিবেশে এখন যে পরিমাণ কার্বন রয়েছে, তা যদি কোনোভাবে দ্বিগুণ হয়ে যায়, তবে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাবে প্রায় ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসে কার্বনের পরিমাণ ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে বিগত বছরগুলোতে। বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ২০০ মাইক্রোগ্রামের সহনীয় পর্যায়ে ধরে রাখার দাবি করা হলেও রাজধানীর এলাকাভেদে প্রতি ঘনমিটারে ৬৬৫ থেকে ২৪৫৬ বা তারও বেশি মাইক্রোগ্রাম পাওয়া যাচ্ছে। সেই হিসাবে কলিন প্রাইস আর ডেভিড রিল্ডের তত্ত্ব অনুযায়ী, ঢাকায় বেশি বেশি বজ্রপাত হওয়া উচিত। হচ্ছেও তাই। কিন্তু রাজধানীতে প্রচুর পরিমাণে টাওয়ার ও বৈদ্যুতিক তারের আধিক্য থাকায় আমরা বজ্রপাতের ভয়াবহতা টের পাচ্ছি না।
বজ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে দ্বিতীয় ঘাতক। বজ্রপাত প্রকৃতির সাধারণ একটি ঘটনা। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি তারপর বিকট শব্দ। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বজ্রপাত বলে। বজ্রপাতে ১ সেকেন্ডেরও কম সময়ে একজন মানুষের মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগাভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, যেখানে একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১০০ ভোল্ট বিদ্যুৎই যথেষ্ট। এত ধ্বংসাত্মক শক্তির কারণ কী? প্রচলিত ধারণা রয়েছে, মেঘে মেঘে সংঘর্ষের ফলেই সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। আসলে এটি ভুল ধারণা। প্রকৃত কারণ হচ্ছে, পানিচক্রের নিয়মে জলাধারের পানি বাষ্পীভূত হয়ে মেঘ আকারে আকাশে উড়ে যায়। এই মেঘই বজ্রপাতের ব্যাটারি, যা বৈদ্যুতিক চার্জের আধারের মতো আচরণ করে। এর ওপরের অংশ পজিটিভ এবং নিচের অংশ নেগেটিভ চার্জপ্রাপ্ত হয়। ইলেকট্রন জলীয় কণার নিচের দিকে বেশি অবস্থান করে বলে এই অংশে ঋণাত্মক চার্জ জমা হয় আর ওপরে ধনাত্মক চার্জ জমা হয়। উভয় চার্জ যখন মিলিত হয় তখনই বজ্রের সৃষ্টি হয়। এই সময় তড়িৎ বিভবের পার্থক্য ১০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে আর তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা ৩০ হাজার অ্যাম্পায়ার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিভবের পার্থক্যের ওপর প্রবাহের মাত্রা নির্ভর করে। এই সময় বাতাসের তাপমাত্রা ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই প্রচণ্ড শক্তির স্থায়িত্ব মাত্র সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ।
শব্দ ও বিদ্যুৎ একই সঙ্গে উৎপন্ন হলেও গতির পার্থক্যের কারণে আমরা আগে আলো দেখতে পাই আর পরে শব্দ শুনতে পাই। কিন্তু এই দুই চার্জের ফলে সৃষ্ট বজ্রপাত সংঘটিত হওয়ার জন্য বা বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য বাতাস ছাড়া কোনো মাধ্যম নেই। আমরা জানি, বাতাস বিদ্যুৎ অপরিবাহী, তাহলে কীভাবে ঘটে এই দুই চার্জের মিলন? মেঘের বিপুল শক্তিশালী বিদ্যুৎক্ষেত্র তার চারপাশের বাতাসের অপরিবাহী ধর্মকে নষ্ট করে দেয়। যাকে বলে ডাইইলেকট্রিক ব্রেকডাউন (উরবষবপঃৎরপ ইৎবধশফড়হি)। মেঘে অবস্থিত বিদ্যুৎক্ষেত্র যখন যথেষ্ট শক্তিশালী হয় (প্রতি ইঞ্চিতে প্রায় ১০ হাজার ভোল্ট), তখন তার আশপাশের বাতাস পজিটিভ এবং নেগেটিভ চার্জে বিভক্ত হয়ে যায়। এই আয়নিত বাতাস প্লাজমা নামেও পরিচিত। বাতাস আয়নিত হয়ে মেঘ এবং ভূপৃষ্ঠের মধ্যে বিদ্যুৎ চলাচলের পথ বা শর্ট সার্কিট তৈরি করে বজ্রপাত ঘটায়। এই বিদ্যুৎ তখন প্রায় ৬০ হাজার কিলোমিটার বেগে ওপরে উঠে যায়। তাহলে বজ্রপাতের স্ফুলিঙ্গ কোথা থেকে আসে? কোনো ধাতুর সঙ্গে অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় ইলেকট্রন নিষ্কাশনের প্রক্রিয়াই হলো জারন। আয়নিত বাতাস বা প্লাজমা পরিবাহী হওয়ার কারণে এতে ধাতব বৈশিষ্ট্য প্রবলভাবে বিদ্যমান। তাই বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে প্লাজমার বিক্রিয়ায় বজ্রপাতের স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ৪০টির মতো বজ্র সৃষ্টি হলেও তার মাত্র ২৫ ভাগ ভূপৃষ্ঠে পড়ে বাকিগুলো মেঘের মধ্যেই ঘটে থাকে। সাধারণত ৩ ধরনের বজ্রপাত হয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে-
- ক্লাউড টু গ্রাউন্ড (CG)
- ইনট্রা ক্লাউড (IC)
- ক্লাউড টু ক্লাউড (CC)
বাংলাদেশে বজ্রপাত বেড়েছে যে কারণে
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৭ ডিগ্রি বেড়েছে। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাত বাড়ে ২০ শতাংশ হারে। এ হিসাবে বজ্রপাত এখন প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৮১ সাল থেকে দেশে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে আমাদের দেশে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্বে মোট বজ্রপাতের ৭৮ শতাংশ ঘটে ক্রান্তীয় অঞ্চলে। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশ যেহেতু ক্রান্তীয় অঞ্চলের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, তাই মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বজ্রপাত ও বজ্রঝড় এখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। একদিকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে আসছে গরম আর আর্দ্র বাতাস, অন্যদিকে উত্তরের হিমালয় থেকে আসছে ঠান্ডা বাতাস। এই দুই বায়ু প্রবাহের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। শীতের পর বঙ্গোপসাগর থেকে উষ্ণ বাতাস আসতে শুরু করেছে, অন্যদিকে হিমালয় থেকে আসে ঠান্ডা বাতাস। দক্ষিণের গরম আর উত্তরের ঠান্ডা বাতাসে অস্থিতিশীল বাতাস তৈরি হয় আর এর থেকে তৈরি হয় বজ্র মেঘের। এ রকম একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে বজ্রের সৃষ্টি হয়।
বন্যা ও সাইক্লোনের মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বজ্রপাত অনেকটা ভূমিকম্পের মতোই আকস্মিক। বজ্রপাত প্রতিরোধের এখন পর্যন্ত কোনো উপায় আবিষ্কৃত না হলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রাণহানির আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। ঝড়বৃষ্টির সময় বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কতিপয় করণীয় মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে-
- ঝড়ের পূর্বাভাস দেখলে এবং ঘন ঘন বজ্রপাত হলে কোনো অবস্থাতেই খোলা মাঠ, উঁচু জায়গা, পাহাড়ের চূড়া ও সমুদ্রসৈকতে থাকা যাবে না। এ অবস্থায় ভবন বা দালানের নিচে আশ্রয় নিন।
- উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকায় সেগুলো থেকে দূরে থাকুন।
- কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয় থেকে দূরে থাকুন।
- বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতর থাকুন।
- বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে হতাহত হয়।
- বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরবেন না। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন।
- বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করুন। যদি প্রচণ্ড বজ্রপাত ও বৃষ্টির সম্মুখীন হন, তবে গাড়ি কোনো পাকা ছাউনির নিচে নিয়ে যান। এ সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
- বজ্রপাত অব্যাহত থাকলে রাস্তায় না বেরুনোই মঙ্গল। এ সময় রাস্তায় জমা জল এড়িয়ে চলুন। একে তো বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে, উপরন্তু কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।
- বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। যদি একান্ত বেরোতেই হয় পা-ঢাকা জুতা পরে বের হোন। রাবারের গামবুট এ ক্ষেত্রে সব থেকে ভালো কাজ করবে।
- বজ্রপাতের সময় জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন।
- প্রতিটি ভবনে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন নিশ্চিত করুন।
- খোলাস্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যান।
- কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।
- বজ্রপাতের সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেরাও বিরত থাকুন।
- বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ুন।
- যারা ধানখেতে কাস্তে দিয়ে ধান কাটে তারা এতে বেশি আকৃষ্ট হয়। এ জন্য এ সময়ে কাস্তে দূরে রাখুন। আশপাশে কোনো আশ্রয় না থাকলে ছোট ছোট গাছের ঝোপে আশ্রয় নিন।
- বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করুন।
- মোবাইল বহন করলে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়। কাছে মোবাইল ফোন থাকলে তা বন্ধ করে চামড়ার আবরণ দিয়ে ঢেকে নিন।
- বজ্রপাতের আগে বিদ্যুতের প্রভাবে চুল খাড়া হয়ে যাবে, ত্বক শিরশির করবে বা বিদ্যুৎ অনুভূত হবে। এ সময় আশপাশের ধাতব পদার্থ কাঁপতে পারে। এমন পরিস্থিতি অনুভব করলে বুঝবেন বজ্রপাত হবে।
ক্ষয়ক্ষতি রোধে গৃহীত পদক্ষেপ
বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর লক্ষ্যে দেশবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের ৮টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আটটি ডিটেকটিভ সেন্সরের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। বজ্রপাতের বিষয়ে সতর্কতায় সারা দেশে ২০০টি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস পেতে সারা দেশে চারটি রাডার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শহরের তুলনায় গ্রামে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেশি বিধায় মৃত্যু কমানোর জন্য দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। থাইল্যান্ড তালগাছ লাগিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়েছে। এর পাশাপাশি হাওর অঞ্চলে টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনাও নিয়েছে সরকার।
সরকারি এসব পদক্ষেপের বাইরেও আরও কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনগণেরও রয়েছে কিছু করণীয়। যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতে আগে যেখানে বছরে ৪০০ থেকে ৪৫০ জন মারা যেত, সেখানে এখন মারা যায় ৫০ থেকে ৬০ জন। জাপানে বছরে ১০ লাখের বেশি বজ্রপাতে মৃত্যু হয়, আগে যেখানে মারা যেত ৩০ জনের বেশি। এখন সচেতনতা গড়ে তোলায় বছরে ২ জনের বেশি মানুষ মারা যায় না। দেশটিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে স্থানে বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে, ১০ মিনিট আগে তার পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। আর তাই উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে বজ্রপাতে প্রাণহানিসহ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে করণীয়-
- আগে দেশে তাল, খেজুর, নারিকেল ও সুপারিগাছের আধিক্য থাকায় বজ্র পড়ত এসব গাছের ওপর। ফলে মানুষ বেঁচে যেত। এ ছাড়া গ্রামের জমিদারবাড়ির ছাদে, মন্দিরের চূড়ায় কিংবা মসজিদের মিনারে যে ত্রিশূল ও চাঁদ-তারার দণ্ড দিয়ে আর্থিং করা থাকত, সেটাও বজ্রপাতের প্রাণহানি থেকে মানুষকে রক্ষা করত। বড় বড় গাছ কেটে ফেলার কারণে বজ্রপাত সরাসরি মানুষ ও গবাদিপশুর ওপর পড়ছে। এই অবস্থা রোধে বড় ও উঁচু গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে।
- খোলা মাঠে যেহেতু বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বেশি, সে ক্ষেত্রে উন্মুক্ত স্থানেও একধরনের পিলার বসিয়ে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ব্রিটিশদের সময় সারা দেশে মাটির নিচে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর এ ধরনের পিলার বসানো হয়েছিল। পিলারগুলো তামা, পিতল, টাইটেনিয়াম-জাতীয় ধাতবের সমন্বয়ে তৈরি হওয়ায় বজ্রপাতে যে ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি হয়, সেটি সরাসরি এ পিলারগুলো টেনে নিত, যা আর্থিংয়ের কাজ করত। এতে বজ্রপাতে হলেও মানুষ মারা যেত না। অসাধু কিছু লোক এই পিলারগুলো মহামূল্যবান; অনেক দামে বিক্রি করা যায় এ রকম গুজব ছড়ানোর ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে পিলারগুলো চুরি হয়ে গেছে। এই ধরনের পিলার স্থাপন করে মৃত্যুর হার কমানো যায়।
- প্রতিবছর অসংখ্য স্থাপনা বজ্রপাতে ধ্বংস বা ক্ষতির শিকার হয়। ঢাকার নব্বই শতাংশ ভবনে বজ্রপাত নিরোধক কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ বজ্রপাতের ঝুঁকি বিবেচনা করেই জাতীয় বিল্ডিং কোডে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বা আর্থিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেসব ভবনে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা নেই, সেসব ভবনে বজ্রপাতের সময় ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। আর্থিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহী তামার তারের এক মাথা মাটির গভীরে পুঁতে রাখা হয়, অন্য প্রান্ত থাকে ছাদের ওপরে। ওই শলাকার সঙ্গে যুক্ত তামার তার দেয়ালের ভেতরে পাইপের মধ্য দিয়ে মাটির অন্তত ১০-১২ ফুট গভীরে বিশেষ ব্যবস্থায় স্থাপন করা হয়। মাটি বিদ্যুৎ ভোল্টশূন্য হওয়ায় বজ্রপাতে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তা আর্থিংয়ের মাধ্যমে মাটির নিচে চলে যায়। ফলে বজ্রপাতের হাত থেকে ভবন ও ঘরের মানুষ রক্ষা পায়। এ জন্য ভবনকে নিরাপদ করতে একজন অভিজ্ঞ কাঠামো প্রকৌশলী দিয়ে কাঠামো ডিজাইন এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বজ্র প্রতিরোধক আর্থিং ব্যবস্থা বা এয়ার টার্মিনাল স্থাপন করা উচিত। মাটি বা ছনের ঘরকে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করতে ঘরের ওপর দিয়ে একটি রড টেনে তার সঙ্গে দুই দিকে দুটি রড খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির চারপাশে উঁচু সুপারি ও নারকেলগাছ লাগিয়ে বাজের হাত থেকে বাড়িকে সুরক্ষিত রাখা যায়। প্রতিটি ভবনে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা ভবন নির্মাণ বিধিমালায় অবশ্যই বাধ্যতামূলক করা উচিত।
- বাসাবাড়ির ছাদে যে মোবাইল টাওয়ার আছে, সেগুলো যেন সুরক্ষিত ও নিরাপদ হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
- কৃষিজমি ও সড়কে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। যেন কৃষক ও পথচারীরা ঝড়-বৃষ্টির সময় আশ্রয় নিতে পারে।
- নগরে বায়ুদূষণ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং শিল্পকারখানাগুলোতে পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলা।
- মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পাঠ্যবই এ পাঠদান ও গণমাধ্যমে যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা চালানো।
বজ্রপাতের উপকারী দিক
বিষ্ময়কর হলেও সত্য বজ্রপাত ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হলেও পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে। পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে বায়ুমণ্ডল। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৪-১৫ কিলোমিটার উঁচু পর্যন্ত বায়ুস্তরের নাম ট্রোপোস্ফিয়ার। এর ওপরে রয়েছে ওজোন গ্যাসে পরিপূর্ণ স্তর স্ট্রাটোস্ফিয়ার। ঝড়, বৃষ্টি, তুষার, বজ্র এসবের যা কিছু কারিগরি সবই কিন্তু ট্রোপোস্ফিয়ারেই সীমাবদ্ধ। বায়ুমণ্ডলের এ স্তরে রয়েছে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রভৃতি গ্যাস। এর মধ্যে আয়তন অনুপাতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ৭৭.১৬ শতাংশ, তারপর অক্সিজেন ২০.৬০ শতাংশ, জলীয় বাষ্প ১.৪০ শতাংশ, কার্বন ডাই-অক্সাইড ০.০৪ শতাংশ, নিষ্ক্রিয় ও অন্যান্য গ্যাস ০.০৮ শতাংশ। বজ্রপাতের সময় নাইট্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করে নাইট্রোজেন অক্সাইড। এই অক্সাইড জলের সংস্পর্শে পরিণত হয় অতি লঘু নাইট্রিক অ্যাসিডে। বিভিন্ন স্থানের বৃষ্টিতে অ্যাসিডের মাত্রা ভিন্ন। এই অতিলঘু নাইট্রিক অ্যাসিড বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে নেমে আসে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে প্রচুর কলকারখানা, যানবাহন ও রাসায়নিকের ব্যবহার। শিল্পাঞ্চলের বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড প্রভৃতি আরও অনেক প্রকার গ্যাস থাকে। এসব গ্যাসের উপস্থিতি বায়ুদূষণ ঘটায়। বায়ুমণ্ডলে বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ ক্ষরণের ফলে এসব গ্যাস অতিলঘু অ্যাসিডে পরিবর্তিত হয়ে মাটিতে নেমে আসে। ফলে বায়ুমণ্ডলের দূষণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরির পেছনেও বজ্রপাতের ভূমিকা অনেক বেশি। ‘সাইবেরিয়ান সায়েন্টিফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব জিওলজির’ তথ্যমতে, যদি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বজ্রপাতের ঘটনা না হতো, তবে বিশ্বের সব কারখানাকে নাইট্রোজেন সার কারখানায় পরিণত করতে হতো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, ধরণির বুকে থাকত না কোনো প্রাণস্পন্দন। কারণ, জীববিজ্ঞানীদের অনেকের মতে, প্রথম প্রোটোপ্লাজম সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে বজ্রপাতের ভূমিকা।
এক নজরে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ যত বজ্রপাত
- বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবোতে। সেখানে বছরে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৩২টির বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে।
- ওয়ার্ল্ড মেটেওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বজ্রপাত আঘাত হানে আমেরিকার ওকলাহোমাতে ২০০৭ সালের ২০ জুন। এর আয়তন ছিল প্রায় ৩২১ কিলোমিটার (২০০ মাইল) এলাকাজুড়ে একটিই মাত্র বজ্রপাত!
- সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আঘাত হানা বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে ফ্রান্সের কোটে ডি আজার এলাকায়। ২০১২ এর ৩০ আগস্ট আঘাত হানা ওই বজ্রপাত স্থায়ী ছিল ৭.৭৪ সেকেন্ড!
- ১৭৬৯ সালে ইতালির ব্রেসকিয়া এলাকায় ঘটে ভয়াবহ এক বজ্রপাতের ঘটনা। সেন্ট নাজায়ের চার্চে বজ্রপাত আঘাত হানার পর সেখানে থাকা ৯০ টন গানপাউডারে বিস্ফোরণ হয়। এতে নিহত হয় তিন হাজারের মতো মানুষ। ধ্বংস হয় শহরের ছয় ভাগের এক ভাগ অংশ।
- বজ্রপাতের কারণে একই রকম আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে লুক্সেমবার্গে। ১৮০৭ সালের ২৬ জুন ওই দুর্ঘটনায় একটি গানপাউডার ফ্যাক্টরিতে বিস্ফোরণে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।