Image

ফাটল যখন কংক্রিট মেঝের 

কংক্রিট স্থাপনার দৃঢ়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সৃষ্টি করে ফাটলও। স্থাপনায় তখনই ফাটল দেখা যায়, যখন নির্মাণ উপকরণের শক্তির চেয়ে প্রযুক্ত চাপ হয় বেশি। ভবনের নির্মাণ উপাদানের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় সাধারণত ভূকম্পীয় চাপ, অভ্যন্তরীণ তাপীয় গতি-প্রকৃতি, আর্দ্রতার পরিবর্তনের মতো বাহিক্য বলের ফলে। এ জন্য কংক্রিট নির্মিত ভবনের দেয়াল, কলাম ও বিমের মতো মেঝেতেও ফাটল বা চির দেখা দেয়। মেঝের এই ফাটল একদিকে যেমন স্থাপনার স্থায়িত্বে হুমকি ও জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য অনিরাপদ তেমনি সৌন্দর্যেরও অন্তরায়।

ফাটল সৃষ্টির কারণ

কংক্রিট মেঝেতে নানা কারণে ফাটল দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ অল্প উচ্চতাসম্পন্ন ভবন ইট, কংক্রিট, ব্লক বা চূর্ণ পাথরে তৈরি। এই উপাদানগুলোর বিশেষ চাপ সহ্য করার ক্ষমতা থাকলেও অনেক অসংগতির কারণে সঠিক দৃঢ়তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলে ফাটল দেখা দেয়। এ ছাড়া সম্ভাব্য অনেক কারণেই ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। ফাটল সৃষ্টির কয়েকটা সাধারণ কারণ:

  • কংক্রিটের উপাদানসমূহের ভুল অনুপাতে মিশ্রণ
  • নিম্নমানের নির্মাণকাজ
  • নিম্নমানের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার
  • ভুল নির্মাণ পদ্ধতি
  • অসম কিউরিং
  • পারিপার্শ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ
  • ভূমিকম্পজনিত চাপ
  • উষ্ণতার তারতম্য
  • আর্দ্রতার পরিবর্তনের সঙ্গে মাটির সংকোচন ও প্রসারণের প্রভাব
  • ভিত প্রশমন বা হ্রাস
  • প্রাক্তন মাইনওয়ার্কিং ধ্বংসে পড়া
  • ভিতকে ধরে রাখা মাটি নরম হয়ে যাওয়া
  • ঢালু ভূমিতে ভূমিধস
  • অতিরিক্ত ঠান্ডা
  • কংক্রিটের সিক্ততা
  • এগ্রিগেটে ক্ষার ও সালফেটের আক্রমণ।

ফাটল সংস্কার যে উদ্দেশ্যে

কংক্রিটের স্থাপনায় যেকোনো ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পরে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। ফাটলের আকার-আকৃতি বিবেচনায় যথাযথ ও উপযুক্ত সংস্কারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। আর্দ্রতা বা স্যাঁতসেঁতে অবস্থার কারণে ভবনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং ভবনের স্থায়িত্ব হ্রাস পায়। এ জন্য ফাটল দ্রুত সংস্কার করে ভবনের সৌন্দর্য, পুরোনো আকার-আকৃতি ও শক্তিমাত্রা ফিরিয়ে আনাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

ফাটল সংস্কার পদ্ধতি

ফাটল দেখা দেওয়ার পরে তার সংস্কারপদ্ধতি নির্ভর করে কংক্রিটে সৃষ্ট ফাটলে আকার ও ধরনের ওপর। সংস্কারকাজকে ভাগ করা হয় কংক্রিটে সৃষ্ট ফাটল কত বড় আকৃতির তার ওপর নির্ভর করে। সহজ ও নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে কংক্রিট মেঝের ফাটল বা চির যথাযথভাবে সংস্কার করা সম্ভব।

প্রয়োজনীয় উপকরণ বা মালামাল

  • কর্ণিকা
  • কোদাল
  • কড়াই
  • চিজেল
  • ব্রাশ
  • ঝাড়ু প্রভৃতি।

কাজের ধারা

  • কংক্রিটের মেঝেতে যে স্থানে ফাটল সে স্থানকে খসখসে বা অমসৃণ করে নিতে হবে, যাতে নতুন কংক্রিট দৃঢ়ভাবে আটকে থাকতে পারে। মেরামত স্থান থেকে সব ধরনের আলগাসামগ্রী সরিয়ে স্থানটিকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। তারপর সিমেন্টের গ্রাউন্টিং প্রয়োগ করে নতুন কংক্রিট ঢালাই করতে হবে। এরপর যথারীতি কিউরিং করতে হবে।
  • কংক্রিট মেঝেতে কোনো গর্ত মেরামত করতে হলে প্রথমে গর্তটিকে ছেনি দিয়ে কেটে খাড়া পার্শ্ববিশিষ্ট বর্গাকার বা আয়তাকার আকারে নিয়ে আসতে হবে। নতুন কংক্রিট ঢালাইয়ের আগে গর্তটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে গর্তের তলদেশে বালু ভরে দুরমুশ করতে হবে। তারপর কংক্রিট দিয়ে গর্ত ভরাট করে কম্প্যাকশন করতে হবে। কর্ণিকা দিয়ে উপরিপৃষ্ঠ সমান করে দিতে হবে। কাজটি শেষ হলে কিউরিং করতে হবে।
  • কংক্রিট মেঝের উপরিপৃষ্টের নিট সিমেন্টে ফিনিশিং নষ্ট হয়ে গেলে তা চিজেল (Chisel) দিয়ে উঠিয়ে ফেলতে হবে। নিচের আর্দ্রতা প্রতিরোধের জন্য ২ x ১/২ সে.মি পুরুত্বে প্যাটেন্ট স্ট্যান ঢালাই (১ : ১ : ৫ : ৩) করতে হবে এবং এর সঙ্গে পডলো, পারমো বা সিকো নামের পানিরোধক যোগ করে ব্যবহার করতে হবে। তারপর নিট সিমেন্ট ফিনিশিং করে নিয়মানুযায়ী কিউরিং করতে হবে।
  • কংক্রিট মেঝের ফাটল বা চির সংস্কারে বিশেষ ধরনের কংক্রিট সিলিং (Sealing) রেসিন বা আঠার দ্রবণ ব্যবহৃত হচ্ছে। 

সতর্কতা

  • কংক্রিট ফাটলের সব স্থানে ছড়িয়ে ভালোভাবে স্থাপন করতে হবে, যেন কংক্রিট স্থাপনের পরপর Tamping শুরু করতে হয়, যাতে করে কংক্রিটের মধ্যে কোনো এয়ার পকেট বা ফাঁকা জায়গা না থাকে।
  • এরপর মেরামতকৃত কংক্রিটের ফিনিশিং করতে হয়। কংক্রিট ফাটলের মধ্যে স্থাপনের পরে সেট হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হয়। কংক্রিট ভালোভাবে সেট হলে Existing Surface-এর সঙ্গে এটাকে মিলিয়ে ফিনিশিং করা হয়।
  • গ্রাউন্ড ফ্লোরে D.P.C দিতে হবে।
  • আর্দ্রতা প্রতিরোধের আচ্ছাদন দিতে হবে।
  • অন্তস্থ আর্দ্রতা নিরোধকরণ প্রদান।
  • পৃষ্ঠ নিরোধ প্রদান।
  • পরিমিত কিউরিং করতে হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।

Related Posts

নির্মাণে উচ্চশক্তির রড ব্যবহারে বিএনবিসি কোড

কি সত্যিই অন্তরায়? ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উঠে আসা পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের মধ্যে ৩২তম শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশ।…

প্লাস্টার ও প্লাস্টারে ফাটল

একটি ইমারতের ইটের গাঁথুনি কিংবা অমসৃণ কংক্রিটকে মসৃণ করতে সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণে যে বহিরাবরণ দেওয়া হয়, তার নামই প্লাস্টার…

নগর পরিকল্পনায় বিবেচ্য বিষয়াদী

নগর পরিকল্পনা একটি কারিগরী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ভূমির ব্যবহার এবং নাগরিক জীবনব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন করা হয়।…

বৃষ্টির দিনে কংক্রিটিং

কয়েক দিন আগে একজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তার বাসার তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের ৪০-৫০ মিনিট পর বৃষ্টি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *