সুপ্রাচীনকাল থেকেই ভবনের জলছাদের ব্যবহার দারুণ জনপ্রিয়। জলছাদ (Lime Terracing) খুবই প্রয়োজনীয় ভবনের আবরণ (Roof Covering) একে সংক্ষেপে L.C.C (Lime Cement Concrete) বলা হয়। বাড়ি বা ভবনের সমতলে সর্ব ওপরের আরসিসি ছাদকে রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য জলছাদে ঢেকে দেওয়া হয়। এই জলছাদ অনবরত বৃষ্টির সময় ভবনের ছাদে পানি শোষণ বন্ধ করে প্রচণ্ড দাবদাহে ভবনকে ঠান্ডা রাখে। তাই তাপ ও আর্দ্রতারোধক হিসেবে এর জুড়ি নেই। অধুনা বিভিন্ন ধরনের তাপরোধী নির্মাণ উপকরণ বাজারে থাকলেও প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত জলছাদ ব্যবহৃত হচ্ছে সফলতার সঙ্গে।
আমাদের দেশে লাইম কংক্রিটের সাহায্যে জলছাদ নির্মাণ করা হয়। লাইম কংক্রিটে চুন, সুরকি ও খোয়ার অনুপাত ২ : ২ : ৭। ছাদের ক্ষেত্রফল ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে জলছাদের পুরুত্ব নির্ধারণ করা হয়, যা গড়ে তিন থেকে চার ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। জলছাদের পানি গড়ানোর দিকে প্রতি ১০ ফুট কমপক্ষে এক থেকে দেড় ইঞ্চি পর্যন্ত ঢাল দিতে হয়। বৃষ্টির পানি নির্গমনের জন্য পাইপ (Rain Water Pipe) ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশের গড় বৃষ্টিপাতের ওপর ভিত্তি করে প্রতি ৩০০ বর্গফুট ছাদে বৃষ্টির পানি নির্গমনের জন্য চার ইঞ্চি ব্যাসের একটি রেইন ওয়াটার পাইপ ছাদের পানি নির্গমনে ব্যবহার করা হয়।
লাইম কংক্রিট নির্মাণে ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ
১. চুন (Lime)
২. সুরকি (Surki)
৩. খোয়া (Brick Chips)
৪. পানি (Water)
৫. ঝোলগুড় (Molasses)
৬. খয়ের
৭. মেথি প্রভৃতি।
জলছাদে ব্যবহৃত চুনের বৈশিষ্ট্য
- চুনাপাথর আকারে গোটা গোটা বা টুকরা টুকরা হবে
- রং হবে সাদা
- গুঁড়ো চুন ব্যবহার করা যাবে না
- অন্য কোনো রং যেমন কাল, হলুদ রঙের চুনাপাথর ব্যবহার না করাই ভালো।
জলছাদে ব্যবহৃত সুরকির গুণাগুণ
- সুরকি প্রথম শ্রেণির ইট থেকে প্রস্তুতকৃত
- সুরকি পরিষ্কার এবং লালচে রঙের হবে
- সুরকির মধ্যে অন্য কোনো পদার্থ মিশ্রিত থাকবে না
- অতিরিক্ত ধুলা-ময়লা থাকবে না।
জলছাদে ব্যবহৃত খোয়ার গুণাগুণ
- খোয়া প্রথম শ্রেণির ইট থেকে তৈরি হতে হবে
- সাইজ হবে ৩/৪ ইঞ্চি ডাউন
- প্রতি ঘনফুটে ওজন হবে ৭৫ পাউন্ড
- খোয়ার মধ্যে ঝামা থাকবে না
- খোয়ার সাইজ একই হবে এবং অন্য কিছু মিশ্রিত থাকবে না। এ ছাড়া ছাদে ব্যবহৃত পানি পরিষ্কার হতে হবে (পানের যোগ্য)।
১০০ Cft. (স্কয়ারফিট/বর্গফুট) জলছাদের জন্য উপকরণের মিশ্রণ
| ১ | খোয়া | ২.৭ ঘনমিটার | ৯৫ বর্গফুট |
| ২ | চুন | ৪৮২ কেজি | ১৩ মণ |
| ৩ | সুরকি | ০.৭৭ ঘনমিটার | ২৭ বর্গফুট |
এ ছাড়া ৮ সে.মি. পুরু ১০০ বর্গমিটার জলছাদের (২:২:৭) অনুপাতে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী সুরকি ০.২১ ঘনমিটার, খোয়া ০.৭৬ ঘনমিটার এবং চুন ০.২১ ঘনমিটার। জলছাদের স্বাভাবিক পুরুত্ব ধরা হয় ৭৫ মি.মি. বা তিন ইঞ্চি। জলছাদে চুন, সুরকি ও খোয়া ছাড়াও ঝোলগুড়, খয়ের ও মেথির প্রয়োজন হয় প্রতি বর্গমিটারের জন্য ঝোলগুড় ২৫০ গ্রাম, খয়ের ২৫ গ্রাম ও মেথি ২৫ গ্রাম।
মসলা প্রস্তুতের (Mortar Preparation) ধাপ
যেকোনো ধরনের প্ল্যাটফর্মের ওপর চুনাপাথর অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে নাড়াচাড়া করে ফোটাতে হয়। এই কাজ রাতে করা ভালো। তারপর ফোটানো চুন চালনি দিয়ে ছেঁকে আলাদা করে বস্তাবন্দী করা হয়।
- পরিমাণমতো খোয়া ছাদের ওপর ছয় ইঞ্চি উঁচু করে ফেলা হয়।
- খোয়ার ওপর পরিমাণমতো সুরকি সমান পুরু করে বিছাতে হয়।
- সুরকির ওপরে ফোটানো চুন পরিমাণমতো সমান পুরু করে বিছাতে হয়।
- চুন, সুরকি ও খোয়া মিশ্রিত মসলা শুকনো অবস্থায় ভালোভাবে মেশাতে হয়।
- কোদাল বা বেলচার সাহায্যে কমপক্ষে তিন থেকে চারবার দিক পরিবর্তন করে মিক্সিং করতে হয়।
- ওপরে মিশ্রিত মসলায় পরিমিত পানি দিয়ে পুনরায় ভালোভাবে মিক্সিং করতে হয়।
- ওপরের একই নিয়মে একদিন পরপর কমপক্ষে চারবার পানি দিয়ে পুনরায় কোদাল দিয়ে কেটে ভালোভাবে মিক্সিং করতে হয়।
- মিক্সিং দেখতে কাদামাটি বা পেস্টের মতো হওয়ার পর মিক্সিং সঠিকমতো হয়েছে কি না তা বোঝার জন্য একপিণ্ড মসলা সিলিংয়ে লাগাতে হবে। যদি মসলা সিলিংয়ে আটকে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে মসলা তৈরি ঠিক আছে এবং মসলা এখন লেইং করা যাবে।
- কিন্তু মসলা যদি পড়ে যায় তাহলে আরও দু-এক দিন মসলায় পুনরায় পানি দিয়ে মিক্সিং করতে হবে।
জলছাদ তৈরির পদ্ধতি
- পুরো ছাদ ভালোভাবে চিপিং করতে হবে।
- ওপরের তৈরি করা মসলা চার ইঞ্চি পুরুত্বে ছাদের ওপরে ভালো করে বিছাতে হবে।
- ১:২৭ অনুপাতে ঢাল দিতে হবে। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের কাঠের পাট্টার সাহায্যে ভালোভাবে কম্পাশন করতে হবে। চার থেকে পাঁচ দিন একই নিয়মে ছাদ পেটাতে হবে।
- চুনের সেটিং টাইম বাড়ানোর জন্য ঝোলগুড় (গড়ষধংংবং) ব্যবহার করতে হবে।
- ছাদ শক্ত হয়ে গেলে ১:১ অনুপাতে চুন ও সুরকি দিয়ে তৈরি পুটিং ছাদের ওপরে লাগাতে হবে।
- অথবা পানিরোধী করার জন্য চুনের পানি এবং ঝোলগুড়, খয়ের ও মেথির মিশ্রণ ছিটাতে হবে। যার অনুপাত ও পরিমাণের বর্ণনা আগেই দেওয়া হয়েছে। প্রথমে ১০০ লিটার থেকে ১২০ লিটার পানিতে দুই কেজি খয়ের ও মেথি একত্রে মিলিয়ে ফোটাতে হয়। এরপর ঠান্ডা হলে সাড়ে তিন কেজি ঝোলগুড় মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চুন মেশাতে হবে।
- দুই দিন পর ছাদের ওপরের অংশ পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
- ছাদের ও পেরাপেটের সংযোগস্থলে লাইম কংক্রিট দ্বারা গোলাকৃতি করে খুন্ডি তৈরি করে দিতে হয়। এতে পালিলিক বা ড্রাম্প হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
- সবশেষে লাইম কংক্রিটকে সাত দিন কিউরিং করতে হবে।
জলছাদের সমস্যা ও সমাধান
| ক্রমিক নং | সমস্যা | সমাধান |
| ১ | ছাদে পানি আটকে থাকে যদি স্লোপ নিয়মমতো না দেওয়া হয় | সতর্কতার সঙ্গে ১:২৭ অনুপাতে স্লোপ দিতে হবে |
| ২ | জলছাদে ফাটল দেখা যায় | চুন ও সুরকির ফিনিশিং কোট এবং কিউরিং সঠিক নিয়মে করতে হবে |
| ৩ | জলছাদে Damp দেখা দেয় | ফিনিশিং উত্তম মানের হতে হবে। খুন্ডি সব জয়েন্টে প্রয়োগ করতে হবে |
| ৪ | ছাদ কোথাও কোথাও গর্ত হয়ে যায় | সাধারণত মিক্সিং সঠিক না হলে এবং কম্পালন বা পাট্টা পেটানো ভালোভাবে না হলে এমন হয়। তাই উত্তম সুপারভিশন থাকতে হবে। |
জলছাদ ব্যবহারের সুবিধা
- ছাদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা।
- ছাদের পানি প্রবেশে বাধাদান করা।
- জড়ড়ভ ঋষড়ড়ৎ-কে কভারিং করা।
- ছাদের নিচে বসবাসের উত্তম পরিবেশ সৃষ্টি করা।
- ছাদকে সব প্রতিবন্ধকতা থেকে রক্ষা করা এবং রুফকে দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রদান করা।
- ছাদের ওপরের বৃষ্টির পানিকে সঠিক ঢালে ড্রেনেজ করা।
- এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অনেক সুবিধা জলছাদ ব্যবহারে পাওয়া যায়।
যাঁরা সাধারণত ওপর ফ্লোরে বাস করেন, তাঁরাই গরমে সরাসরি জলছাদের সুবিধা পেলেও প্রকৃতপক্ষে জলছাদের মাধ্যমেই ছাদের পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হয়ে Rain Water Pipe-এ প্রবাহিত হয়। তা ছাড়া ছাদের ওপরে বাগান থাকলেও জলছাদের কারণে কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই সহজেই সেগুলো পরিচর্যা করা যায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫