থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে, ফাং-এনগা প্রদেশের মাতালাই প্রকল্পের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বাভাবিক স্থাপনা যার নাম, গোয়া টাওয়ার। ইট, কংক্রিট বা স্টিলের বদলে এই টাওয়ারের মূল উপাদান হাতির মল দিয়ে হাতে তৈরি করা শত শত গোলাকার ইট।
থাই স্থপতি বুনসের্ম প্রেমথাদা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান ব্যাংকক প্রজেক্ট স্টুডিও এই প্রকল্পের রূপকার। বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত একটি উপাদানকে তারা রূপান্তরিত করেছেন একটি স্থাপত্য-স্থাপনায়, যা পরিবেশ, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং কারুশিল্পকে উদযাপন করে।
প্রায় ছয় বছরের গবেষণার ফসল এই গোয়া টাওয়ার।

নামকরণ ও প্রেক্ষাপট
টাওয়ারটির নাম রাখা হয়েছে গোয়া নামের এক স্ত্রী হাতির নামে, যার জন্ম এই অঞ্চলেই। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে হাতি ও মানুষের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
হাতিরা যুগ যুগ ধরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পরিচয় গঠনে ভূমিকা রেখেছে। কাছেই রয়েছে খাও চ্যাং বা ‘এলিফ্যান্ট মাউন্টেন’ নামের একটি চুনাপাথরের পাহাড়। যার আকৃতি অনেকটা শায়িত হাতির মতো বলে জনশ্রুতি আছে। ভূদৃশ্য ও স্থাপত্যের মধ্যে এই প্রতীকী সম্পর্কই আরও জোরালো হয়েছে গোয়া টাওয়ারের মাধ্যমে।

গবেষণার সূচনা
এই প্রকল্পের বীজ বপন হয়েছিল ফাং-এনগা থেকে বহু দূরে, তা ক্লাং গ্রামে। সেখান থেকে একটিমাত্র হাতির মলের ইট ব্যাকপ্যাকে করে বহন করে আনা হয়েছিল। এটিকে শুরুতে অনেকের কাছেই এক অদ্ভুত পরীক্ষা বলে মনে হয়েছিল। এমনকি হাসি-তামাশারও পাত্র হতে হয়েছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পরীক্ষা রূপ নেয় দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায়। কীভাবে হাতি-পালনকারী সম্প্রদায়গুলো নতুন ধরনের কারুশিল্প, মূল্য ও স্থাপত্য-উৎপাদনের পথ তৈরি করতে পারে সে রহস্যই গেল জানা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হাতির মলের ইট জায়গা করে নেয় মোমা (MoMA) এবং এম প্লাস মিউজিয়ামের (M+ Museum) মতো প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে। তবে গোয়া টাওয়ারের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো এই গবেষণা রূপ নিয়েছে একটি বসবাসযোগ্য, ব্যবহারযোগ্য পাবলিক স্থাপনায়।

ইট তৈরির প্রক্রিয়া
প্রতিটি গোলাকার ইট হাতে তৈরি করা হয়েছে হাতির মল দিয়ে। এর ব্যাস প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার এবং পুরুত্ব প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। এই ইট কোনো ভাটায় পোড়ানো হয় না। হাত, রোদ আর সময় এই তিনের সমন্বয়েই তা শক্ত রূপ নেয়।
ইটগুলো তৈরি হয় পাঁচটি স্বাভাবিক রঙে। নির্মাণের সময় প্রতিটি ইট একটি কেন্দ্রীয় স্টিলের রডে গেঁথে সাজানো হয়, একটি পূর্বনির্ধারিত রঙের বিন্যাস অনুসরণ করে। এভাবে পুনরাবৃত্তি, ভার আর স্পর্শের মধ্য দিয়ে এই জৈব উপাদান একই সঙ্গে হয়ে ওঠে কাঠামো এবং পৃষ্ঠতল দুটোই।

ডিজাইন ও অভিজ্ঞতা
গোয়া টাওয়ার মূলত অসংখ্য বেলনাকার (cylindrical) স্তম্ভের এক ঘন সমাহার। যেগুলো উঁচু উঁচু চলাচলপথ বা ওয়াকওয়েকে ধরে রেখেছে। আর সেই পথ সর্পিলভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে, আলো-ছায়ার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
দর্শনার্থীরা এই বেলনাকার স্তম্ভ ও বাঁকানো ওয়াকওয়ের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে ওপরে উঠতে থাকেন। ওঠার সময় ধাপে ধাপে চোখের সামনে খুলে যায় রাস্তা, বাগান, বন, আকাশ ও সমুদ্রের দৃশ্য যা চূড়ায় পৌঁছানোর পরও যা শেষ হয় না। বরং ধীর ছন্দের এই আরোহণ-অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।

গোয়া টাওয়ারের মধ্য দিয়ে হাতির মলের ইট শুধু সংরক্ষণযোগ্য বা প্রদর্শনযোগ্য বস্তু হয়ে থাকেনি, বরং প্রাণী, মানুষ ও ভূমির মধ্যকার এক বৃহত্তর চক্রের অংশ হয়ে উঠেছে। এই স্থাপনা প্রমাণ করে, বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া উপাদানও কীভাবে অর্থবহ স্থাপত্যের ভিত্তি হতে পারে। ছয় বছরের গবেষণা, স্থানীয় কারুশিল্প এবং হাতি-মানুষের চিরায়ত সম্পর্ককে একসূত্রে গেঁথেছেন বুনসের্ম প্রেমথাদা ও ব্যাংকক প্রজেক্ট স্টুডিও। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা দেখিয়েছেন, স্থায়িত্বশীল স্থাপত্য কীভাবে প্রকৃতি, সম্প্রদায় ও সৃজনশীলতাকে একসঙ্গে মেলাতে পারে।
তথ্যসূত্র:
ডিজাইনবুম





















