চীনের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ম্যাড (MAD) সম্প্রতি উন্মোচন করেছে “শেনজেন বে কালচার স্কয়ার” নামের একটি নতুন জাদুঘর। এটি শেনজেন শহরের নানশান জেলার হোহাই এলাকায় অবস্থিত। এই স্থাপনার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হলো, ঢেউ খেলানো এক সবুজ ছাদের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কতগুলো পাথর বা বোল্ডারের আকৃতির স্থাপনা, যেগুলোর ভেতরে রয়েছে জাদুঘরের প্রদর্শনী কক্ষ। জাদুঘরটি সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রের পাশাপাশি শহরের উপকূলীয় জনসমাবেশের স্থান হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।
ডিজাইনের দর্শন ও স্থপতির ভাবনা
ম্যাড-এর প্রতিষ্ঠাতা মা ইয়ানসং জানিয়েছেন, তার কাজের মূল লক্ষ্যই হলো, সর্বজনীন স্থানকে আরও উন্মুক্ত ও সমতাভিত্তিক করে তোলা। শেনজেন একটি তরুণ ও কর্মক্ষম শহর, আর এই জায়গাটি সম্পূর্ণভাবে সমুদ্র থেকে পুনরুদ্ধার করা জমির ওপর গড়ে উঠেছে। তার প্রশ্ন ছিল, কীভাবে ডিজাইনের মাধ্যমে প্রাচীন প্রকৃতিকে মানুষের ভবিষ্যতের কল্পনায় রূপান্তর করা যেতে পারে। একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ভবনকে কীভাবে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা যায় সেটিও তার চাওয়া ছিল।

স্থাপনা ও চারপাশের প্রেক্ষাপট
জাদুঘরটির এক পাশে রয়েছে গগনচুম্বী ভবনের সারি। আর অন্য পাশে রয়েছে ট্যালেন্ট পার্ক। এর ভেতরে রয়েছে প্রদর্শনী গ্যালারি, শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কক্ষ, গ্রন্থাগার এবং বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য একটি থিয়েটার। পুরো জায়গাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে একটি ঢেউ খেলানো সবুজ ছাদ, যা জাদুঘরের বেশিরভাগ অংশকে মাটির নিচে ঢেকে রেখেছে। একইসঙ্গে শহর ও উপকূলের মধ্যে ঘুরপথে চলাচলের রাস্তাও তৈরি করে দিয়েছে।

পাথরের মতো স্থাপনা ও পাখির উড়ালপথের বিবেচনা
সবুজ ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বোল্ডার-সদৃশ কাঠামোগুলো মোড়ানো হয়েছে পালিশ করা গ্রানাইট দিয়ে। শহরের দিকের সর্বোচ্চ গ্যালারিটির উচ্চতা ২৮ মিটার। যা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে পার্কের দিকে গিয়ে একটি লম্বা, নিচু ও গম্বুজাকৃতির গ্যালারিতে রূপ নিয়েছে। ভবনটিকে ইচ্ছাকৃতভাবেই ভূদৃশ্যের সঙ্গে নিচু করে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে এটি পূর্ব এশিয়া-অস্ট্রেলিয়া উড়ালপথ ধরে চলাচলকারী পরিযায়ী পাখিদের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

ভূগর্ভস্থ স্থাপনার নকশা
ম্যাড জানিয়েছে, ভবনের কাঠামোগুলোকে ভূদৃশ্যের নিচে রাখার মধ্য দিয়ে তারা মাটির উপরিভাগকে প্রকৃতির জন্য উন্মুক্ত রেখে দিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে একটি খোলা জলতীরবর্তী উদ্যান। যেখানে মানুষ অবাধে হাঁটাচলা, ঘোরাঘুরি ও অবসর যাপন করতে পারে।
দর্শনার্থীরা যেকোনো দিক থেকে প্রবেশ করে মৃদু ঢালু পথ বেয়ে উঠে, ঘোরানো ছাদপথ অনুসরণ করে উপসাগরের দৃশ্য দেখার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে পারেন। মাটির নিচের গ্যালারিগুলোতে কংক্রিটের কাঠামো অনাবৃত রাখা হয়েছে। আলো ও অন্যান্য সেবা-ব্যবস্থা লুকিয়ে রাখা হয়েছে ছাদের ভেতরে। একটি বৃত্তাকার অলিন্দ বা অ্যাট্রিয়াম এই পাথর-সদৃশ কাঠামোগুলোর একটিকে ঘিরে রেখেছে, যা ভূগর্ভস্থ গ্যালারিগুলোকে একসঙ্গে সংযুক্ত করে এবং সেখানে দিনের আলো নিয়ে আসে।

জলাধার, প্রাঙ্গণ ও সবুজায়ন
জায়গাটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি অগভীর জলাধার। একটি খোলা প্রাঙ্গণ তৈরি করা হয়েছে বহিরাঙ্গন পরিবেশনা, শিল্প-বাজার ও উৎসব আয়োজনের জন্য। ছাদজুড়ে লাগানো হয়েছে স্থানীয় প্রজাতির উদ্ভিদ, আর পাশের পার্কের জলাভূমি এলাকা ঘেঁষে ভূদৃশ্যায়ন ধীরে ধীরে নেমে গিয়ে উপকূলের সঙ্গে মিশে গেছে। কোনো কঠোর সীমারেখা তৈরি না করে, বরং স্বাভাবিকভাবে মিশে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই ডিজাইন করা হয়েছে।

শেনজেন বে কালচার স্কয়ার যতটাই একতা সফল জাদুঘর ঠিক ততটাই সমুদ্র থেকে পুনরুদ্ধার করা জমিতে প্রকৃতি, স্থাপত্য ও সর্বজনীন জীবনযাত্রাকে একসূত্রে গাঁথার একটি প্রয়াস। ভূগর্ভস্থ স্থাপনা, সবুজ ছাদ এবং পাখির উড়ালপথের প্রতি সংবেদনশীলতা এই সবকিছু মিলিয়ে ম্যাড দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে একটি বড় সাংস্কৃতিক ভবনও মানুষ ও প্রকৃতির জন্য ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র:
ডিজেইন

















