গৌড়ীয় স্থাপত্যকলার গৌরবগাথা

প্রাচীন বইপত্রে এই বাংলার বেশ কিছু অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, পুন্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্রী ও রাঢ়। আর্যরা যখন এই উপমহাদেশে আসে তখন দেখতে পায় কিছু কালচে বেঁটে-খাটো ও গোঁয়ার লোকের বাস এ অঞ্চলে। কিন্তু এই লোকগুলোই সুপ্রাচীন কাল থেকে শিক্ষিত। এরা লিখতে জানত, যেখানে আর্যরা মুখস্থ করে রাখত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ। অনেক ভেবে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় দেবদেবীদের ঠাই দিল নিজ ধর্মগ্রন্থে। রচিত হলো নতুন নতুন গ্রন্থ। আর্যরা শিক্ষিত হলো। অস্ট্রিকদের ঘরবাড়ি বানানোর প্রক্রিয়া দেখে নিজেরাও শিখল কীভাবে নগর পত্তন করা যায়। আর তাই প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে এসব অঞ্চলের নানা বর্ণনা পাওয়া যায়। ধীরে হলেও এসব অঞ্চলে স্থাপিত হয়েছে নানা রকম স্থাপত্যকলা। লাখো মানুষের পদচারণে মুখর এসব অঞ্চলের নাম হারিয়ে গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে ইতিহাস। এই ইতিহাসের অন্যতম স্মারক ঐতিহাসিক গৌড়নগর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ জেলা। ঐতিহাসিক গৌড়নগরের অংশবিশেষ এ চাঁপাইনগরে, যা সোনালি অতীতের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের স্মৃতিচিহ্ন বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজও। পৃথিবীর জাগতিক বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে ধারণ করেই তো ইতিহাস। আর এই ইতিহাস লালন করে এর অন্তর্গত শিক্ষাকে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আয়তন প্রায় ৬৭৯.০৫ বর্গমাইল। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। দূর অতীতে পুন্ড্রবর্ধন, লখনৌতি, গৌড় ও জান্নাতাবাদের মতো ঐতিহ্যে লালিত ধনে-জনে পরিপূর্ণ এক সমৃদ্ধশালী অঞ্চল এই চাঁপাইনবাবগঞ্জ। অজস্র বৌদ্ধ, হিন্দু ও ইসলামি স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন আজও বুকে ধারণ করে রেখেছে এ জনপদটি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পুকুরিয়া থেকে কোতোয়ালি দরজা পর্যন্ত এলাকা ছিল গৌড় নগরের উপশহর। এই অংশের নাম ফিরোজপুর বা ফিজপুর। ব্রিটিশ আমলে এই জনপদটি দিনাজপুর, পূর্ণিয়া কখনো মালদহ আবার কখনো রাজশাহী ও ১৯৭১ সালের পাকিস্তান আমলের পর রাজশাহী এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৮৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় রূপান্তরিত হয়।

গৌড়নগর ও মুসলিম স্থাপত্যকীর্তি

রাজমহল থেকে ২৫ মাইল ভাটিতে সেন আমলের লক্ষ¥ণাবতীকে আশ্রয় করে তুর্কি সুলতানদের গৌড়নগর গড়ে ওঠে। প্রায় ২৫ বর্গমাইল আয়তনের নগরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১২ ও ২ মাইল। সর্বোত্তম শ্রীবৃদ্ধিকালে এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১২ লাখ।

ইতিহাসে গৌড়নগর

ঐতিহাসিক গৌড়নগর বাংলার প্রাচীন রাজধানী। নানা ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী এই গৌড়নগর। নানা ধর্মাবলম্বী রাজা, সুলতান, সম্রাট গৌড়নগরের বুকে দাঁড়িয়ে সগৌরবে শাসন করেছেন। ইতিহাস এর অমর সাক্ষী। সময় ও শাসকের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কখনো গৌড়, কখনো লক্ষ¥ণাবতী বা লখনৌতি, কখনো  জান্নাতাবাদ, কখনো ফিরুজাবাদ নাম হয়েছে। হয়েছে এর সীমানা পরিবর্ধন বা সংকুচিত। কিন্তু বহু ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে এই সুশ্রীনগর ও প্রাচীন রাজধানী।

ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে গৌড় পুন্ড্রবর্ধনের একাংশ ছিল। গুপ্ত শাসনের পর মহাসামন্ত শশাঙ্ক ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বলা হয়ে থাকে, শশাঙ্কই আর্যবর্তে বাঙালির জন্য স্বাধীন সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন দেখেন এবং তিনিই প্রথম বাঙালি রাজা। মনে করা হয়, গৌড় পাল রাজাদেরও রাজধানী ছিল। চতুর্দশ বৌদ্ধ রাজা রামপালের শাসনামলে গৌড়কে রামাবতী নামে অভিহিত করা হতো। লক্ষ¥ণ সেনের নাম রাখেন লক্ষ¥ণাবতী।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঊষালগ্ন থেকে বাংলার মুসলমান সুলতানদের শাসনাধীন সমগ্র অঞ্চলই গৌড় নামে পরিচিত ছিল। নদীয়া জয়ের পর বখতিয়ার খলজি আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হন এবং গৌড়সহ উত্তরবঙ্গের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করেন এবং গৌড় নগরে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। মূলত মুসলিম শাসনামল থেকেই গৌড় নগরের সমৃদ্ধির যুগ শুরু হয়। সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহের আমলে গৌড় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির স্বর্ণ শিখরে উপনীত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে গৌড় শব্দটি বাংলার পরিচয়বাহী হয়ে পড়েছিল।

স্বাধীন নবাবী এবং ইংরেজ আমলে গৌড় ক্রমেই পরিত্যক্ত হতে থাকে। কালক্রমে সমৃদ্ধ গৌড়নগর তার অতি ক্ষয়িঞ্চু অস্তিত্ব ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। ১৮৯৭ সালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে গৌড়নগরের অনেক ঐতিহ্যমণ্ডিত সুউচ্চ ইমারত বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছোট সোনা মসজিদ অন্যতম। এ সময় এই পশ্চিম দেয়ালের পাথর এবং দক্ষিণ পশ্চিমের গম্বুজ বিধ্বস্ত হয় বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

গৌড়িয়া স্থাপত্যসমূহ

মুসলিম শাসনামলে অসংখ্য রাজা-বাদশাহ তাঁদের নিজ নিজ স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন রেখে গেছেন। এগুলো কালের গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, নিশ্চিহ্ন হয়েছে হাজারো পুরাকীর্তি। তবুও কিছু কিছু মসজিদ, মাদ্রাসা, পীর-দরবেশদের মাজার, নগররক্ষা প্রাচীর ছাড়া অধিকাংশ সুরম্য অট্টালিকা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এগুলো অতি পবিত্র স্থান ও ঐতিহ্য হিসেবে যুগ যুগ ধরে মানবমন্দিরের মণিকোঠায় স্থান করার কারণে সামান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে আবার কিছু ধ্বংসস্তূপ হয়ে টিকে রয়েছে আজও। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাংলায় (বাংলাদেশ) যেসব স্থাপনা পড়েছে তার মধ্যে ছোট সোনা মসজিদ, দরসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসা, তাহখানা কমপ্লেক্স, শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) মসজিদ ও সমাধি, ধনীচকের মসজিদ, রাজবিবি মসজিদ প্রভৃতি ভগ্নদশা নিয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

সুলতানি আমলের স্থাপত্য

ছোট সোনা মসজিদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ ‘গৌড়ের রত্ন (Gem of Gaur)’ নামে খ্যাত। এটি বাংলায় মুসলিম শাসনামলের তথা সুলতানি আমলের স্থাপত্যশিল্পের চরম উৎকর্ষতার পরিচয় বহন করে। কালো ব্যাসাল্ট পাথরে নির্মিত এই মসজিদের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য খুবই আকর্ষণীয়। এটি স্থাপত্যকলা ও অলংকরণের জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। সুলতানি স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছোট সোনা মসজিদ এক অপূর্ব সৃষ্টি।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছাকাছি পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা থেকে দক্ষিণে কোতোয়ালি দরজা রয়েছে। এই কোতোয়ালি দরজা থেকে আনুমানিক তিন কিলোমিটার দক্ষিণে বর্তমান চাঁপাইনওয়াবগঞ্জ জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তরে শিবগঞ্জ থানার শাহবাজপুর ইউনিয়নের ফিরোজপুর  গ্রামে ছোট সোনা মসজিদ অবস্থিত।

ছোট সোনা মসজিদ, উইকিপিডিয়া

নাম-বৃত্তান্ত

আলেকজান্ডার কানিং হাম বলেন, ‘ইমারতের অলংকরণে ব্যবহৃত সোনালি রং থেকে ছোট সোনা মসজিদের বর্তমান নামকরণ হয়েছে। এটি প্রকৃত নাম না হলেও স্থানীয় জনগণের উপলব্ধির জন্য সঠিক বলে মনে হয়।’ ক্রেটন তাঁর  ‘Ruins of Gaud ’-এ বলেন, ‘মেহরাব প্রাচীরে সোনার প্রলেপের অংশবিশেষ দেখা যায় এবং এ থেকেই এই মসজিদ ছোট সোনা মসজিদ ও বড় সোনা মসজিদ নামকরণ করা হয়।’ সামসুদ্দিন আহমদের মতে, এই মসজিদটি ‘খাজাকি মসজিদ’ নামে পরিচিত। কারণ, কিংবদন্তি অনুযায়ী এটি রাজকীয় হেরেমের তোশাখানার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন খোজা কর্মকর্তা কর্তৃক নির্মিত।

নির্মাণকাল ও নির্মাতা

মসজিদের মধ্যভাগের প্রবেশপথের ওপরে যে শিলালিপি অদ্যবধি বিদ্যমান তা থেকে জানা যায়, মজলিস-ই-মাজলিস মুনসুর ওয়ালি মুহাম্মদ বিন আলী কর্তৃক এটি নির্মিত। মসজিদের নির্মাণ তারিখসংবলিত অক্ষরসমূহ শিলালিপিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু শিলালিপিতে সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহের নাম থেকে এটা স্পষ্ট যে মসজিদটি অবশ্যই ১৪৯৩-১৫১৯ সালের মধ্যে তাঁর রাজত্বকালের কোনো একসময় নির্মিত।

গঠন ও নির্মাণশৈলী

বড় একটি দিঘির দক্ষিণ পাশে আয়তাকার এই মসজিদটি নির্মিত। মূল মসজিদের বাইরের দিকের উত্তর-দক্ষিণে ২৫ দশমিক ১ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫ দশমিক ৯ মিটার, উচ্চতা ২০ ফুট। ১ দশমিক ৭৮ মিটার পুরু দেয়াল দ্বারা মসজিদটি নির্মিত। অভ্যন্তর ভাগের আয়তন ২১ দশমিক ২ x ১২ দশমিক ২ মিটার। অভ্যন্তরের প্রতি সারিতে চারটি করে দুই সারি পাথরের স্তম্ভ দ্বারা তিনটি গলিপথে বিভক্ত। প্রশস্ত গলিপথ ৩ দশমিক ৫০ মিটার ও ৪ দশমিক ৫ মিটার পরিমাপের তিনটি আয়তাকার ইউনিটে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় আয়তক্ষেত্রের চারকোণে চারটি প্রস্তরস্তম্ভ আছে। উত্তর-দক্ষিণে দুটি করে চারটি স্তম্ভ আছে। মসজিদের অভ্যন্তরের সর্বমোট ১৫টি ইউনিট রয়েছে। আয়তাকার ইউনিট তিনটি গম্বুজ প্রবেশদ্বার ও কেন্দ্রীয় মেহরাবের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এগুলো দেখতে চৌচালা ঘরের মতো। এবং বাকি ১২টি বর্গাকার ইউনিট উল্টানো চাড়ি আকৃতির গম্বুজে আচ্ছাদিত। অবশিষ্ট ১২টি গম্বুজের তিনটি উত্তর দিকে পূর্ব-পশ্চিমে দুই সারিতে মোট ছয়টি গম্বুজ; একইভাবে দক্ষিণ দিকেও আছে ছয়টি গম্বুজ। এর সঙ্গে ষাট গম্বুজ মসজিদের মিল আছে বলে অনেকে মনে করেন।

দেয়ালে ইটের গাঁথুনি। কিন্তু আবরণ পাথর দিয়ে আবৃত যেখান থেকে গম্বুজ নির্মাণের জন্য ধনুকাকৃতির খিলানের কাজ শুরু হয়েছে, সেখানে পাথরের কাজ শেষ হয়েছে। খিলান ও গম্বুজ সবগুলো ইটে নির্মিত। ভেতরের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি দ্বিতল গ্যালারি (মাকসূরা) রয়েছে। কেউ একে লার গ্যালারি আবার কেউ একে জেনানা গ্যালারিও বলে থাকে।

ছোট সোনা মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ধনুকাকারে খিলানের সাহায্যে নির্মিত পাঁচটি প্রবেশপথ রয়েছে। এই প্রবেশপথগুলোর ওপরের দিকে সুন্দর খাঁজ কাটা কারুকার্য আছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালে অনুরূপ তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ফ্রেমের ওপরের দিকে ব্যতিক্রমতা দৃশ্যমান। সেখানে একটি বৃহৎ শিলালিপি আছে। ওই লিপিতে আছে তিনটি নকশাযুক্ত বৃত্ত। তাতে ‘ইয়া আল্লাহু’ ‘ইয়া হাফিজু’ ‘ইয়া রাহিমু’ কথাগুলো আরবি অক্ষরে উৎকীর্ণ আছে।

এই মসজিদের ভেতরে রয়েছে পাঁচটি মেহরাব। পশ্চিম দেয়ালে পাঁচটি মেহরাবের মধ্যে কেন্দ্রীয় মেহবারটি সবচেয়ে বড়। মেহরাবের পাথর সম্ভবত চুরি হয়ে গেছে। শোনা যায়, একটি মেহরাবের পাথর নাকি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ৪৩ দশমিক ৫ মিটার x ৪২ মিটার মসজিদ চত্বরের পূর্ব দেয়ালে তোরণদ্বার রয়েছে।

বাইরের মসজিদের চারকোণে চারটি অষ্টকোনাকৃতির ব্যাসাল্ট পাথরের বুর্জ রয়েছে, যা মসজিদের মূল কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছে। বাইরের দেয়ালে মনোরম নকশা আছে। পাথরের ওপর অলংকরণের এসব কাজ চিত্রফলকের অনুকরণে করা হয়েছে। লতা-পাতা, গোলাপ ফুল, ঝুল শিকড় ও ঘণ্টার প্রতিকৃতি মসজিদের গায়ে লক্ষণীয়। পাঁচটি দরজায়ও একই ধরনের কারুকার্য দেখা যায়।

মসজিদসংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম কোণে বহির্দিকে একটি সিঁড়িবিশিষ্ট উঁচু মঞ্চ আছে, যা থেকে মসজিদের উত্তর দেয়ালেকৃত দরজার মাধ্যমে গ্যালারিতে আরোহণ করা যায়। এই গ্যালারির সামনে একটি মেহরাব আছে। মসজিদ আঙিনার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ১৯৭১ সালে শহীদ দুজন মুক্তিযোদ্ধার সমাধি আছে, যার একটি বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি।

নির্মাতার ভিত্তি স্থাপন

প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে অনুমান করা যায়, সুলতান হোসেন শাহের আমলে আলীর পুত্র মজলিম-ই-মজলিস-মনসুর ওয়ালি মোহাম্মদ কর্তৃক এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল ১৪৯৩-১৫১৯ সালের কোনো এক সালের রজব মাসের ১৪ তারিখে।

মসজিদসংলগ্ন স্থানসমূহ

১. মসজিদের পূর্ব দিকের তোরণ থেকে সামান্য পূর্ব উত্তর দিকে ১৫’ x ১০’-৫”  আয়তনের মঞ্চাকারে নির্মিত একটি উঁচু বেদীতে দুটি পাশাপাশি বাঁধানো কবর রয়েছে। কবর দুটি কার? মুসলমান যে কেউ যে এখানে শায়িত আছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

২. উত্তর দিকে আছে একটি মাঝারি আকারের দিঘি। এটির উত্তর-পূর্ব দিকটা বাঁধানো ঘাট ছিল মুসল্লিদের ওজু করার জন্য। ঘাট এখন ভেঙে গেছে। তবে পানি খুব স্বচ্ছ।

ক্ষয়-ক্ষতি

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এর কেন্দ্রীয় চৌচালা তিনিট গম্বুজ ও অপর তিনটি গম্বুজ ভেঙে যায়। ১৯০০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার নতুন করে গম্বুজ নির্মাণ করে। সন্দেহ করা হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত কোনো মন্দিরের পাথর দিয়েই ভেঙে যাওয়া গম্বুজ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এটি এখন বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন।

দরসবাড়ি মসজিদ

কোতোয়ালি দরজার এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সোনা মসজিদ থেকে শূন্য দশমিক ৭৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশ-ভারত সীমা পাগলা নদী দ্বারা চিহ্নিত। এই সীমানার সঙ্গেই অবস্থিত মসজিদটি। আগে এটি ছিল বিরাট দিঘি। এ দিঘির পূর্ব পাশেই দরসবাড়ি মাদ্রাসা অবস্থিত।

নির্মাতা  ও নির্মাণকাল

মসজিদের ধ্বংসস্তূপে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ইলিয়াস শাহি শাসক সুলতান বারবক শাহের পুত্র সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ কর্তৃক হিজরি ৮৮৪ (১৪৭৯ খ্রি.) সালে মসজিদটি নির্মিত।

দাসবাড়ি মসজিদ, উইকিপিডিয়া

মসজিদের কাঠামো

বর্তমানে মসজিদটি ছাদবিহীন এবং পূর্ব দিকে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বারান্দা সংযোজিত। আকৃতিগতভাবে এটি বড় সোনা এবং গৌড় ও লখনৌতি নগরের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ। মসজিদ দুইটি অংশে গঠিত। পূর্ব দিকে একটি বারান্দা ও এর পশ্চিমে মূল নামাজের ঘর এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে লম্বভাবে বিস্তৃত একটি প্রশস্ত গলিপথ দ্বারা গোটা ইমারতটি সমান দুই অংশে বিভক্ত। মসজিদটির বাহ্যিক পরিমাপ ৩৪ মিটার x ২৬ দশমিক ৬০ মিটার এবং অভ্যরীণ ৩০ দশমিক ৩০ মিটার  x  ১১ দশমিক ৭০ মিটার। বারান্দা ও প্রশস্ত গলিপথের পরিমাপ যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩০ মিটার ও ৫ দশমিক ৪০ মিটার। ইমারত অভ্যন্তরে উত্তর-পশ্চিম কোনায় ৫ দশমিক ৫০ মিটার x ৩ দশমিক ৪০ মিটার পরিমাপের একটি রাজকীয় গ্যালারির (মাকসূরা) অবশিষ্টাংশ বিদ্যমান।

মসজিদের গম্বুজগুলো সব ধসে পড়েছে। অর্থাৎ ছাদ নেই। ইট নির্মিত প্রাচীরগুলো ধ্বংস হওয়ার পথে। তবুও মসজিদটির বিশালত্ব সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা করা যায়। অভ্যন্তরীণ কক্ষ ও বারান্দা এই দুই ভাগে মসজিদটি বিভক্ত। এতে সর্বমোট ছয়টি মিনার বা টারেট ছিল। এগুলো বিরাট আকারের ছিল। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে সাতটি প্রবেশপথ এবং দ্বারপথের খিলানগুলো ইটের তৈরি বিশাল স্তম্ভের ওপর নির্মিত। অভ্যন্তরীণ কক্ষের পূর্ব দেয়ালেও সাতটি দরজা ছিল। এবং ভেতরের কক্ষের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ছিল তিনটি করে প্রবেশপথ। 

মসজিদের ভেতরের কক্ষটি তিন ভাগে বিভক্ত। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা কেন্দ্রীয় অংশের আয়তন ৩৮’-৯”  x  ১৭’-৯” । এবং পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা পার্শ্বের দুটি অংশের প্রতিটির আয়তন ৩৮’-৯”  x  ৩৭’-৪” । পাশের দুটি অংশ আবার তিন ভাগে বিভক্ত এবং প্রতিটি বিভাগে দুই সারিতে তিনটি করে মোট ছয়টি পাথর ছিল। উত্তর বিভাগের পশ্চিম কোণের স্তম্ভটি ছিল আকারে বড় এবং আট কোণবিশিষ্ট। এর সাহায্যে ওপরে একটি জেনানা মহল নির্মিত হয়েছিল। গৌড়ের লট্টন মসজিদ, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও পরবর্তীকালে ছোট সোনা মসজিদে যে চৌচালা ধরনের আচ্ছাদন দেখা যায় এই মসজিদটিতে ঠিক সে রকম আচ্ছাদন কেন্দ্রীয় অংশে ছিল বলে আহম্মদ হাছান দানী বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু আবিদ আলী ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

মসজিদটিতে প্রায় ২৪টি অর্ধগোলাকার ও চারটি চৌচালা ধরনের মোট ২৮টি গম্বুজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে কোনো গম্বুজই সেখানে টিকে নেই। মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে নয়টি মেহরাব ও ওপরে জেনানা মহলে একটি মেহরাব আছে। এই মেহরাবগুলো অত্যন্ত কারুকার্যময়। এই মসজিদের একটি শিলালিপি ছিল, যা এলাহী বখশ উদ্ধার করেন। এটি ১১’-৩” x ২’-১”  আয়তনের একখণ্ড কালো পাথরের ওপর এক পঙ্তিতে উৎকীর্ণ। লিপিটি আরবি হস্তলিপির এক অপূর্ব নিদর্শন। এ লিপি থেকে জানা যায়, শাসক শামস-উদ-দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৬-১৪৮১ খ্রি.) ৮৮০ হিজরিতে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

দরসবাড়ি মাদ্রাসা

ছোট সোনা মসজিদ থেকে প্রায় এক মাইল উত্তরে রাস্তার পশ্চিম পাশে বালিয়া দিঘি নামে একটি সুপ্রাচীন জলাশয় রয়েছে। এ দিঘি পার হয়ে উত্তর দিকে গেলেই রাস্তার পশ্চিমে একটি ছোট আম বাগান চোখে পড়ে। এবং বাগানটি ছেড়ে সামান্য পশ্চিমে একটি উঁচু ভিটা দেখা যাবে। এ ভিটাই ছিল মাদ্রাসা।

‘দরস’ আবরি শব্দ। ইংরেজিতে এটিকে অনুশীলন বা বক্তৃতা বলা হয়। ‘দরসবাড়ি’ শব্দের অর্থ পাঠশালা বা মাদ্রাসা। মুসলিম বিজয়ের সময় থেকে গৌড় নামে পরিচিত লাখনৌতি মুসলিম শিক্ষা সংস্কৃৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে উন্নীত হয়। লাখনৌতি অঞ্চলের উমরপুর গ্রামের সন্নিকটে দরসবাড়ি নামক স্থানে আশপাশের ধ্বংসস্তূপ থেকে সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহের আমলের (১৪৯৩-১৫১৯) একটি মাদ্রাসার ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। হুসেন শাহি আমলের যে দুটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয় তার হিজরি ৯০৯ সন এবং ১৫০৩-১৫০৪ খ্রি.।

শিলালিপির অনুবাদ : নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করো, যদি তা চীন দেশে গিয়ে করতে হয়।’ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী, সাইয়্যেদগণের সাইয়্যেদ এবং শুভ কাজের উদ্যোগী আলাউদ্দীন আবুল মোজাফফর হুসেন শাহ আস সুলতান, যিনি হজরত হুসাইনের বংশধরের অন্তর্ভুক্ত এই মর্যাদাসম্পন্ন মাদ্রাসা নির্মাণের আদেশ প্রদান করেছেন। দ্বীন বা ইসলামি জীবন বিধানের যাবতীয় বিদ্যা এবং ধর্ম বিশ্বাসসংক্রান্ত সব বিষয়ের বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রদানের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এবং আল্লাহর কাছ থেকে কাক্সিক্ষত পুরস্কার লাভ ও তাঁর (আল্লাহ তাআলা) সন্তুষ্টি হাসিলের বাসনা নিয়ে ৯০৭ হিজরির (১৫০২ খ্রিষ্টাব্দ) রমজান মাসের ১ তারিখে এই মাদ্রাসা নির্মিত হয়।

দাসবাড়ি মাদ্রাসা

প্রাচীন শিলালিপির ওপর ভিত্তি করে অনেকেই মনে করেন, মাদ্রাসাটি হোসেন শাহি আমলে নির্মিত। উল্লেখ্য, এই শিলালিপিটি কোনো ইমারতে প্রোথিত ছিল না। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অপর দিকে পার্শ্ববর্তী মসজিদটি দরসবাড়ি মসজিদ নামে পরিচিত এবং এটি ১৪৭৯ সালে সুলতান ইউসুফ শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ কর্তৃক বাংলায় প্রকাশিত জার্নালে যে প্রবন্ধটি ছাপা হয়, তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেহেতু মসজিদটি পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসা থেকে নামাকৃত। সেহেতু মাদ্রাসাটি ইউসুফ শাহ কর্তৃক নির্র্মিত।

পরিকাঠামো

৫৫ দ্ধ ৫৫ মিটার আয়তনের বর্গাকৃতি এই মাদ্রাসার মোট ৪০টি কক্ষ রয়েছে। ৪১ দশমিজ ৫ দ্ধ ৪১ দশমিক ৫ মিটার আয়তনের বর্গাকৃতির আঙিনার চারপাশে ৩ দ্ধ ৩ মিটার বর্গাকৃতির এই কক্ষগুলো। এই মাদ্রাসার চার ব্লকেই কক্ষগুলো ছিল এবং মাঝখানে ছিল একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। আঙিনার মাঝখানেও একটি স্থাপনা ছিল, যার ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়েছে।

মাদ্রাসার আবিষ্কার

এই ভিটার পাশে চাষ করার সময় কয়েক বছর আগে স্থানীয় জনগণ একটি শিলালিপির সন্ধান পায়। সৌভাগ্যক্রমে ওই শিলালিপিটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে চলে যায়। এরপর ১৯৭৪-৭৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সেখানে আংশিক ও পরীক্ষামূলক খননকার্য পরিচালনা করে। এ খননের ফলে সেখানে বিরাট মাদ্রাসা ইমারতের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। যে শিলালিপিটি সূত্র হিসেবে কাজ করেছে, সেটি লম্বায় ১১’-৩”  চওড়ায় ২’-১”  ছিল। বর্তমানে এ লিপিটি কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দরসবাড়ি খননকার্য পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হয়নি। ফলে মাদ্রাসাটির গঠনশৈলী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে এটুকু বোঝা যায় যে দুর্গাকারে নির্মিত নেই।

সুলতানি আমলের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য

বাংলার মুসলিম স্থাপত্যগুলো সুলতান ও মোগল স্থাপত্য নামে বিভাজিত। বখতিয়ার খলজি কর্তৃক ১২০৪ সালে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনের ছাপ সুলতানি আমলের স্থাপত্যগুলোতেও পরিলক্ষিত হয়। সুলতানি আমলের স্থাপত্যগুলো আয়তাকার এবং বর্গাকারে নির্মিত। বাংলার প্রারম্ভিক মুসলিম শাসনের ইমারতসমূহ, পুরোনো দালানকোঠা, পুরোনো মন্দিরের মাল-মসলা থেকে। ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে সংগতি রেখে দেব-দেবীর ভাস্কর্যসংবলিত দেয়ালের অভ্যন্তরে রেখে ঢুকিয়ে দিয়ে এর উল্টো অংশে এমনভাবে খোদাই করা হয়েছে যেন একটি অবতল মেহরাব হিসেবে দৃশ্যমান হয়। এ ধরনের পাথর স্বাধীন সুলতানি আমল এবং পরবর্তী মোগল আমলের নির্মিত ইমরাতসমূহে মজবুতীকরণে ইট ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। সুলতানি আমলের ইমারতসমূহ প্রশাসনিক বিভাগীয় সদর এবং কেন্দ্রীয় রাজধানীতে দৃশ্যমান। বর্তমানে বিদ্যমান স্থাপত্যগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই ধর্মীয় শ্রেণিভুক্ত। এগুলোর মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা ও সমাধির প্রাধান্য বেশি। সুলতানি আমলে নগররক্ষা প্রাচীর বেশি নির্মিত হয়েছিল। সুলতানি আমলে মসজিদগুলোকে দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। কারণ, এ সময়ে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র। সুলতানি আমলের মসজিদগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো ইটের ব্যবহার, ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ মিটার পরিমাপের প্রশস্ত দেয়াল। তবে ইমারতের সৌন্দর্যবর্ধনে ইটের দেয়ালগাত্র মসৃণ কালো পাথরের আবৃতকরণের উদাহরণ মাঝে মাঝে পরিলক্ষিত হয়। ইমারতের বহির্কোণসমূহে অষ্টভুজাকৃতির বুর্জ। তবে মাঝে মাঝে গোলায়িত বুর্জ দ্বারা সুরক্ষিত। বুর্জসমূহ ছাদ কিনারা পর্যন্ত উত্থিত। ছাদ সাধারণত অর্ধগোলাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। এ ছাড়া চৌচালা আকৃতির গম্বুজও পরিলক্ষিত হয়। মসজিদের পূর্ব দেয়ালের দরজা বরাবর কিবলা দেয়ালে অনুরূপসংখ্যক মেহরাব দৃশ্যমান। মেহরাব দেয়াল খুবই অলংকৃত বিভিন্ন লতাপাতা ও কারুকার্য দ্বারা। বৃহদাকৃতির ইমারতের অভ্যন্তরে দুইকেন্দ্রিক খিলান সারির ভারবহনের জন্য দেশীয় শক্ত গ্রানাইট পাথরের সপ্রোথিত। বড় মসজিদগুলোর উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি দ্বিতল গ্যালারি (মাকসূরা) বিদ্যমান, যার সামনে আছে একটি মেহরাব। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, সুলতান বা শাসকের প্রার্থনাকালে নিরাপত্তার জন্য এই গ্যালারি ব্যবহৃত হতো। আবার অনেকে একে জেনান গ্যালারি হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

 মোগল আমলের স্থাপত্য

তাহাখানা

ছোট সোনা মসজিদের ৫০০ গজ উত্তরে গেলে একটি ছোট পথ সামান্য পশ্চিম দিকে চলে গেছে। সেই পথ ধরে সামান্য এগিয়ে গেলে উত্তর পাশে পড়ে একটি দিঘি। দিঘির পশ্চিম পাড়ে আছে পরপর তিনটি প্রাচীন ইমারত। সর্বদক্ষিণের ইমারতকে বলা হয় তাহাখানা। তাহাখানা অর্থ শীতল প্রাসাদ। এটি একটি মোগল আমলের স্থাপত্যকীর্তি। দেখতে অনেকটা দ্বিতল আকৃতির মূলত লবণাক্ত পানি থেকে এ ভবনকে রক্ষার জন্য এভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পুকুর থেকে পাইপের মাধ্যমে ভেতরে পানির ব্যবস্থা ছিল।

তাহাখানা, উইকিপিডিয়া

তাহাখানার নির্মাতা

কে এই তাহাখানা নির্মাণ করেছেন তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবে প্রবল জনশ্রুতি আছে, সম্রাট শাহ্ জাহানের পুত্র সুলতান শাহ্ সুজা ১৬৫৫ খ্রিষ্টাব্দে এই ইমারতটি নির্মাণ করেন। অন্য মতে, শাহ্ সুজা গৌড়ে বসবাসকারী তাঁর পীর শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.)-এর জন্য এই সৌধ নির্মাণ করেছিলেন।

গঠনশৈলী

এর আয়তন ৩১ দশমিক ৭ x ১০ দশমিক ৩ মিটার। এটি তিনভাগে বিভক্ত। এতে বেশ কয়েকটি কক্ষ আছে। হাম্মামখানাও লক্ষ করা যায়। দিঘি থেকে এর ভেতরে পাইপের সাহায্যে পানি আনা হতো। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে।

শাহ্ নিয়ামত উল্লাহ (রহ.)-এর মসজিদ

শাহ্ সুজার তাহাখানার প্রায় কাছেই শাহ্ নেয়ামত উল্লাহর মসজিদ অবস্থিত। মসজিদের সামনে আছে ছোট পাকা আঙিনা। আঙিনার দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিকে রয়েছে অনুচ্চ দেয়াল।

মসজিদের কাঠামো

এই মসজিদটির আয়তন ৭ দশমিক ৬২ x ১৯ দশমিক ৮১ মিটার। চার কোণে চারটি মিনার। কার্নিশ পর্যন্ত এগুলো আট কোনাকার। এবং পরে এগুলো গোলাকার হয়ে চূড়ায় ছোট গম্বুজে শেষ হয়েছে। ওপরে তিনটি অতি সুন্দর গম্বুজ। সামনের দেয়ালে তিনটি এবং দক্ষিণের দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ আছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথ প্রশস্ত। ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি সুন্দর মেহরাব আছে। সামনের দেয়ালে প্যানেলিংয়ের কারুকার্য। উপরিভাগ অলংকৃত ‘ব্যাটল মেন্টের’ কাজে।

মসজিদ নির্মাতা

মসজিদ নির্মাণ কে করেছেন তার কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সম্রাট শাহ্ জাহান শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.)-কে বছরে পাঁচ হাজার টাকা আয়ের একটি সম্পত্তি দান করেছিলেন। নেয়ামত উল্লাহ ৩৩ বছরের অর্জিত ভোগ দখলকৃত সম্পদ থেকে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। অন্য মতে, সম্রাট আওরঙ্গজেব এ সম্পত্তি দান করেছিলেন। সম্ভবত প্রথম জনশ্রুতিই সত্য। কেননা, আওরঙ্গজেব রাজ্য অধিকার করার পরে নেয়ামত উল্লাহ বেশি দিন বাঁচেননি।

শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.)-এর মাজার

ছোট সোনা মসজিদের আধা মাইল উত্তর-পশ্চিমে একটি লম্বা দিঘির পশ্চিম পাড়ে শাহ্ নিয়ামত উল্লাহর সমাধি অবস্থিত। প্রায় পাঁচ বিঘা জায়গাজুড়ে মাজার এলাকার প্রাচীর পরিবেষ্টিত।

শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) মসজিদ, উইকিপিডিয়া

নির্মাণশৈলী

মাজারের দক্ষিণের দেয়ালে আছে ছোট একটি ফটক। এই ফটকের ইট বাঁধানো রাস্তা দিয়ে কিছু দূর গেলেই সামনে মাজার ইমারত। এটি বর্গাকারে নির্মিত। এর প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য বাইরের দিকে ৫৩ ফুট এবং ভেতরের দিকে ৪৫ ফুট। ইট নির্মিত প্রাচীরের উচ্চতা চার ফুট। প্রতি দেয়ালে তিনটি করে দরজা আছে। এ জন্য একে ‘বারদুয়ারী’ও বলা হয়। দরজাগুলো ৫ দশমিক ৫ ফুট প্রশস্ত। দেয়ালের ভেতরে ১০ ফুট ৯ ইঞ্চি চওড়া টানা বারান্দা আছে। এর পরেই আছে মাজার ইমারতের কেন্দ্রীয় কক্ষ। এই কক্ষটি বর্গাকারে নির্মিত। বাইরের দিকে এর দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ৫ ফুট এবং ভেতরের দিকে ১৬ ফুট ৮ ইঞ্চি। কেন্দ্রস্থলে রয়েছে শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.)-এর পাকা কবর। এই কামরায় ঢোকার জন্য দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ, পশ্চিম দেয়ালে একটি মেহরাব ছিল। এখন শুধু দক্ষিণ দেয়ালের দরজাটিই খোলা আছে। বাকি দুটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। মাজার ইমারতের চার কোণে চারটি মিনার আছে। এগুলো বেশ উঁচু এবং আট কোনাকারে নির্মিত। এগুলোর ছাদের ওপরের চূড়ায় ছোট গম্বুজের ওপর গিয়ে শেষ হয়েছে। এর ওপর আর কোনো গম্বুজ নেই এবং বারান্দাগুলোর ওপরে আছে ‘ফ্ল্যাট ভল্টেট’ ছাদ।

শাহ্ নিয়ামত উল্লাহ দিল্লির নিকটবর্তী কর্নালের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করতেন। এভাবেই ভ্রমণ করতে করতে তিনি রাজমহলে আগমন করলে শাহ্ সুজা তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। বলা চলে শাহ্ সুজা তাঁর ভক্তে পরিণত হন।

মোগল আমলের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য

সুলতানি আমলের স্থাপত্যগুলো আয়তাকার এবং বর্গাকারে নির্মিত। মসজিদগুলোকে দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। কিন্তু মোগল যুগে এমনটির উদাহরণ খুবই কম। কারণ, এ সময়ে মুসলিম শাসন দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগল আমলে সমাধি স্থাপত্য সুলতানি আমলের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। মোগল আমলের নির্মিত ইমরাতসমূহে মজবুতীকরণে ইট বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। মেহরাব দেয়াল খুবই অলংকৃত বিভিন্ন লতাপাতা ও কারুকার্য দ্বারা। বৃহদাকৃতির ইমারতের অভ্যন্তরে দুইকেন্দ্রিক খিলান সারির ভারবহনের জন্য দেশীয় শক্ত গ্রানাইট পাথরের সপ্রোথিত বুরুজসমূহ ছাদের কিনারা পর্যন্ত উত্থিত। ছাদ সাধারণত অর্ধগোলাকৃতির ১ গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত।

মুসলিম শাসনামলের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট

ধনে-জনে পরিপূর্ণ অপূর্ব সৌন্দর্যের ভিত্তিভূমি, চির ঐশ্বর্যশালী গৌড়নগরের (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) নগরায়ণ, রাজধানী রক্ষা পরিকল্পনা, অপূর্ব শৈল্পিক স্থাপত্য, সুশোভিত অট্টলিকা দিল্লির সঙ্গে তুলনা করা যেত। মুসলিম শাসনামলে গৌড় অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী ছিল। গৌড় ব্যবসা-বাণিজ্যের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। গৌড়ে প্রচুর পরিমাণে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপন্ন হতো। মোগল আমলে এখানকার মসলিন বিশ্বখ্যাত ছিল। গৌড়ের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ও অন্য ইউরোপীয় পর্যটকদের বিবরণী থেকে জানা যায়। রাজপ্রাসাদের পাশেই সভাসদদের আবাসস্থল ছিল এবং তারপরে ছিল অন্যান্য জনসাধারণের বসতবাড়ি। পেশাভিত্তির জনবসতিরও প্রমাণ মেলে। যেমন, তাঁতীপাড়া, ধুনী চক ইত্যাদি। গৌড়ে সমৃদ্ধির যুগে অন্যান্য অঞ্চল থেকে অভিজাত মুসলমান, সুফি-সাধকেরা এসে বসবাস শুরু করেন। মুসলিম শাসনামলের স্থাপত্যিক কর্মকাণ্ডে সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা তৎকালীন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পরিচায়ক। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, সুলতানরা ধর্মীয় অনুভূতি থেকে মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ এবং রাজধানী ও শহররক্ষায় দুর্গ প্রাচীর নির্মাণ এবং জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে অন্যান্য স্থাপত্য কর্মকাণ্ডে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছরের মুসলিম শাসনামলে অসংখ্য রাজা-বাদশাহ তাঁদের নিজ নিজ স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন রেখে গেছেন। বাংলার প্রারম্ভিক মুসলমান শাসকেরা তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা কারিগরদের নিজস্ব ধর্মীয় চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ স্থাপত্য কাঠামো নিয়ে আসেন। এবং স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত মাল-মসলায় স্থানীয় কারিগরদের নিজস্ব পরিকল্পনা রূপদানে আহ্বান জানান। আবার আরব, আফগান, পারসিক এবং তুর্কি মুসলমানদের আগমনে দেশীয় ও মুসলিমধারা জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়, যা ‘ইন্দো-মুসলিম’ ধারা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। প্রাক-ইসলামি রোমান-বাইজানটাইন এবং পারসিক স্থাপত্যের এই নির্মাণরীতিসমূহ মুসলমানরা তাদের ইমারত নির্মাণে এতটাই খাপ খাইয়ে নিয়েছিল যে পরিণামে এগুলো ইসলামি বিশ্বের সর্বত্রই মুসলিম ইমারতের অঙ্গরূপে ব্যবহৃত হয়। তৎকালীন মুসলিম শাসনামলে ধর্মীয় ও সমাজ-সংস্কৃতির বাস্তবতায় সুলতানি আমলে যে স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত, তা মোগল আমলেও প্রভাব বিস্তার করেছিল। তবে মোগল আমলের স্থাপত্যগুলোতে ইটের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। মোগল আমলে এক গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপত্যকর্মও চোখে পড়ে। স্থাপত্যিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চিত্রকলা ও কারুশিল্পের ব্যাপক উন্নতি লক্ষ করা যায়। এ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, এসবের প্রতি মুসলিম শাসনামলে সুলতান বা শাসকদের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। সুতরাং এ অঞ্চল যে একটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। যদিও এখনো পর্যন্ত এ স্থাপত্যকীর্তিগুলোর সঠিক ইতিহাস রচনা করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে গবেষণার মাধ্যমে হয়তো আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব স্থাপত্যকীর্তিসমূহ অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে, খোয়া যাচ্ছে এ স্থাপনাগুলোর অনেক মূল্যবান অংশ বা উপাদান। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এগুলো চিহ্নিত করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। ভবিষ্যতে এগুলো সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস রচনা করতে এবং বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ মূল্যবান স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের জন্য সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কাম্য-

১. ‘আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষা আইন’ অনুযায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।

২. ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জাতিকে সচেতন করা।

৩. রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি।

৪. ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

যেকোনো বিষয়ে সঠিক জ্ঞানলাভ করতে হলে ওই বিষয়টি প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ, দরসবাড়ি মসজিদ, দরসবাড়ি মাদ্রাসা, তাহাখানা, শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ মসজিদ ও মাজার পরিদর্শন শেষে উপরিউক্ত যাবতীয় তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সন্ধিহান হওয়ার বিপরীতে বরং যথেষ্ট আশাবাদী হই। দরসবাড়ি মাদ্রাসা এবং মসজিদের তথ্যগত অপ্রাচুর্যতা লক্ষণীয়। কেননা, এ দুটি স্থান পুরোপুরি প্রত্নতাত্ত্বিক খননের আয়ত্তে এনে যাবতীয় অলব্ধ তথ্য প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সংস্কারের অভাবে এসব মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী শৈল্পিক স্থাপত্যময় নিদর্শনগুলো ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের মুখে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসসচেতন করে ঐতিহ্যগত ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে। এ থেকে উপকৃত হবে দেশ ও জাতি। সমৃদ্ধ হবে জাতীয় চেতনা। প্রতিষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যগত সম্মান; অপরাপর জাতির কাছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top