দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। বাংলাদেশের সব থেকে প্রাচীন জাদুঘর। রাজশাহী শহরের হেতমখাঁ মহল্লায় এর অবস্থান। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত গৌড় রাজমালা পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমিতির কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘গহনের মধ্যে অদৃশ্য গৌড় পুরাবৃত্তের লুপ্তপ্রায় রথ চক্রের ঘরে অন্তসরণ করিয়া আপনারা আমাদের দেশের ইতিহাসের যে সুপ্রশস্ত রাজপথে উদ্ঘাটনে ব্রতী হইয়াছেন, আপনাদের সে উদ্যোগ সার্থক হইল।’ রবীন্দ্রনাথের এই উক্তির মধ্যেই নিহিত রয়েছে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সার্থকতা।
বাংলাদেশের বিস্তৃত ও লুপ্তপ্রায় ইতিহাসের উপাদান সংকলনের আশায় বরেন্দ্রভূমিতে ধারাবাহিকভাবে তথ্যানুসন্ধানের জন্য গত শতাব্দীর প্রথম দশকে গঠিত হয়েছিল বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। আর এরই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আজকের বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। এই মহৎ ও কালজয়ী প্রচেষ্টার পেছনে নাটোরের দিঘাপতিয়ার রাজপরিবারের বিদ্যোৎসাহী জমিদার শরৎকুমার রায়ের ব্যক্তিগত অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর অদম্য জ্ঞানপিপাসা এবং পুরাতত্ত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ এই প্রচেষ্টাকে সার্থক রূপ দিতে সহায়তা করেছিল। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের আদি সূচনা ঘটে ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং ১৯১৪ সালে এই সমিতিকে ১৯৬০ সালের ভারতীয় সমিতি আইন অনুযায়ী নিবন্ধন করা হয়।
বরেন্দ্র অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠিত হয়। কুমার শরৎকুমার রায়, অক্ষয়কুমার মৈত্র, রামপ্রসাদ চন্দ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের রামকমল সিংহ ও কালিমাতা জাদুঘরের রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গঠিত অনুসন্ধানী দল রাজশাহী জেলার দেওয়াপাড়া চব্বিশনগর মান্ডেল, কুমারপুর, বিজয়নগর, খেতুর, জগপুর, মালঞ্চ প্রভৃতি স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য পুরাকীর্তি সংগ্রহ করে। এ ছাড়া নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর মাহীসন্তোষ, জগদ্দল এবং দিনাজপুর জেলা বানগড়, ঘোড়াঘাট প্রভৃতি স্থানেও তারা অনুসন্ধান ও উৎখনন চালিয়ে আরও কিছু প্রত্ন নিদর্শন সংগ্রহ করে রাজশাহী নিয়ে আসে। অনুসন্ধানী দলের এই সংগ্রহ রাজশাহী নিয়ে আসার পর তা সংরক্ষণ করা বিরাট এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সংগৃহীত প্রত্নসামগ্রী প্রাথমিকভাবে কুমার শরৎকুমার রায়ের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ প্রমদানাথ রায়ের রাজশাহীর বাড়ির উঠানে (পুরোনো বিভাগীয় কমিশনার ভবন) রাখা হয়। পরে রাজশাহীর পাবলিক লাইব্রেরির নিচতলায় একটি কক্ষে তা স্থানান্তর করা হয়। ক্রমান্বয়ে সংগ্রহের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাবলিক লাইব্রেরির বরাদ্দকৃত কক্ষে আর স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। ফলে নিজস্ব ভবনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটি জাদুঘর ভবন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
কুমার শরৎকুমার রায় নিজের ব্যয়ে রাজশাহী শহরে এই জাদুঘর ভবন নির্মাণ করেন। নব নির্মিত ভবনটির দায়িত্বভার রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি ট্রাস্টি বোর্ডের ওপর অর্পণ করা হয়। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা হলেন কুমার শরৎকুমার রায়, কুমার প্রতিভানাথ রায়, মহেন্দ্রকুমার সাহা চৌধুরী, রাম প্রসাদ চন্দ্র এবং অক্ষয়কুমার মৈত্র। ১৯১৬ সালের ১৯ নভেম্বর বাংলার তদানীন্তন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ১৯১৯ সালের ২৭ নভেম্বর লর্ড বোনাল্ডসের দ্বারোদ্ঘাটন করেন। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে সম্পূর্ণ সংগ্রহ এই নব নির্মিত ভবনে নিয়ে আসা হয়। এরপর জাদুঘরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ১৯৩০ সালের ৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয় Comuittee Management এবং ওই তারিখ থেকে জাদুঘরটি আধা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে। পদাধিকার বলে এর সভাপতি নিযুক্ত হন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। প্রাচীন গৌড়ীয় স্থাপত্যশৈলীর ধারায় নির্মিত এই জাদুঘর অল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গীয় শিল্পকলার সমৃদ্ধ ভান্ডার হিসেবে সারা বিশ্বে খ্যাতি লাভ করে। এই দেশের তিনজন কৃতী সন্তান দিঘাপতিয়ার রাজবংশজাত দয়ারামপুরের জমিদার বিদ্যোৎসাহী কুমার শরৎকুমার রায়, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্র এবং খ্যাতনামা নৃতত্ব ও শিক্ষাবিদ রামপ্রসাদ চন্দ এই অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এই জাদুঘর আর্থিক অসচ্ছলতায় ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় ও পরিচালনার জন্য এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। এ অবস্থার বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গৃহীত হয়। জাদুঘরটি পরিচালনার জন্য ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। পদাধিকার বলে যার সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অধিগ্রহণের পর জাদুঘরের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়।
জাদুঘর প্রদর্শন
সংগ্রহের গুণগত ও পরিমাণগত সমৃদ্ধির কারণে এই বিপুলসংখ্যক (প্রায় ১০ হাজার) প্রত্ন নিদর্শন ভাস্কর্যশিল্প প্রস্তর, ধাতব, বিভিন্ন মুদ্রা (স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্য ও মিশ্র ধাতুতে নির্মিত ছাপযুক্ত (Punch-tarked) মৌর্য, গুপ্ত, শশাঙ্ক, সুলতান, সুরী ও মোগল মুদ্রা), শিলালেখ তাম্রশাসন, পোড়ামাটির ফলক ও অন্যান্য মৃন্ময় শিল্পী পাণ্ডুলিপি, চিত্রশিল্প প্রভৃতি সংগ্রহ করেছে এই জাদুঘর এবং এই সংগ্রহের ধারা আজও অব্যাহত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌর্য, গুপ্ত ও পাল আমলের বৌদ্ধ, জৈন, শক্ত ব্রাহ্মা বৈষ্ণব, সৌর শৈব গণপত্যসহ নানা দেব-দেবীর মূর্তি, একশি পাথর পোড়ামাটির ফলক মৃৎভাণ্ড ছাড়াও রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতা। মহাস্থান নালন্দা বিহার, পাহাড়পুরে প্রাপ্ত নিদর্শন, প্রাক-মুসলিম ও মুসলিম আমলের শিলাখণ্ড তাম্রশাসন, ফরমান, দলিল ও রঙিন চিত্রযুক্ত অস্ট্রসাহসিক প্রজ্ঞা পারমিতার মতো দুর্লভ পুঁথি, এগুলো জনসাধারণ্যে প্রদর্শনের জন্য ভবনের বিভিন্ন গ্যালারিকে সুবিন্যস্ত করা হয় প্রস্তর নির্মিত ভাস্কর্য, বাংলা মুসলিম শাসনাধীনে আসার পূর্ব পর্যন্ত এই জাদুঘরে প্রাচীন বাংলার প্রত্ন নিদর্শনের সংখ্যাও প্রচুর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাঁকারাইল মালদহ ও নরহট্টের (বগুড়া) বিষ্ণুমূর্তি। এদের বাসন, ভূষণ, গঠনশৈলী দেখে তা কুষান যুগের মূর্তির অনুরূপ বলে মনে হয়। এরই অব্যাহত ধারায় পাল আমলেও এসে বাংলার ভাস্কর্যশিল্পের চরম উৎকর্ষ সমাধি হয়েছিল। এই জাদুঘরে প্রদর্শিত সুষমামণ্ডিত গঙ্গাদেবীর মূর্তি অধনাযীশ্বর শিব, রাজ্যপালের ভাতুড়িয়া লিপি ও প্রথম মহীপালের রাজভিটা লিপি এর সাক্ষ্য।
ভবনের প্রদর্শনী গ্যালারি
১ নম্বর গ্যালারি: এখানে আছে প্রাচীন আমলের ঢাল-তলোয়ার, ধাতব পাত্র, মহেঞ্জোদারো ও মহাস্থানের বিভিন্ন নিদর্শন।
২ নম্বর মূর্তি গ্যালারি: সম্রাট অশোক থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত কাঠ, পাথর ও অন্যান্য বস্তু দ্বারা নির্মিত মূর্তিসমূহ।
৩ নম্বর দেব গ্যালারি: সূর্য, বিষ্ণ, শিব, কার্তিক ও অন্যান্য দেবতার মূর্তি।
৪ নম্বর দেবী গ্যালারি: পার্বতী, সরস্বতী, মনসা দুর্গা ও অন্যান্য দেবীর মূর্তি।
৫ নম্বর বুদ্ধ গ্যালারি: এ গ্যালারি আছে সব বুদ্ধ দেব-দেবী ও জৈন মূর্তি, বোধিসত্ত্ব ইত্যাদি।
৬ নম্বর গ্যালারি: এ গ্যালরিতে উম্মুক্ত আছে প্রচীন আমলের আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত, বাংলা লেখচিত্র এবং পাল, সুলতানি, মোগল যুগের শিলালিপি ছাড়াও শের শাহের দুটি কামান, মেহরাব ইত্যাদি।
৭ নম্বর ইসলামি গ্যালারি: হাতে লেখা কোরআন শরিফ, মোগল আমলের ফার্সি দলিল, পোশাক মুদ্রা ইত্যাদি দিয়ে এই গ্যালারি প্রাচীন ঐতিহ্য প্রদর্শন করছে।
৮ নম্বর আবহমান বাংলা গ্যালারি: এখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে বাঙালি জাতির ব্যবহার্য জিনিসপত্র, প্রাচীন গহনা, দেশি বাদ্যযন্ত্র, আনুষ্ঠানিক মৃৎপাত্র, উপজাতিদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র।
কিশলয়বেষ্টিত নদীমাতৃক বাংলার নৌকার মডেল গ্যালারিকে সমৃদ্ধ করেছে। অস্তের সূর্য নরম সোনালি রোদ ছড়িয়ে জš§ভূমিকে করেছে অপরূপ। এই জাদুঘরের একটি পুঁথি সংগ্রহশালাও রয়েছে যেখানে অস্ট্রসাহসিক প্রজ্ঞা পারমিতাসহ হস্তলিখিত বাংলা ও সংস্কৃত পুঁথির সংগ্রহশালাও রয়েছে। পুঁথির সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজারের মতো, যা আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া অত্র জাদুঘরে প্রায় ১৪ হাজার দুষ্প্রাপ্য পুস্তক ও পত্রিকা সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। যেখানে দেশি-বিদেশি শিক্ষক, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পড়ার সুযোগ পান। প্রত্ননিদর্শন সম্পর্কে পাটন এবং গবেষণার উদ্যোগ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয়। তৎকালের অনেক খ্যাতনামা বাংলা ইতিহাসের গবেষকেরা এই সংগ্রহের ওপর প্রচুর প্রবন্ধ রচনা করে সংশ্লিষ্ট সাময়িকী ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
রাশজাহী সিটি করপোরেশনের আর্থিক অনুদানে আরও তিনটি সিটি গ্যালারি নির্মিত হয়েছে। এখানে প্রদর্শন করা হবে রাজশাহী শহরের আদি নিদর্শন, খানদানি বংশের বিভিন্ন কীর্তির নিদর্শন, কৃতী সন্তানদের ছবি, ঐতিহ্যবাহী টমটম, রেশমশিল্পের নিদর্শন, প্রাচীন প্রেস, শহরের লেখকদের উল্লেখযোগ্য বই ইত্যাদি। জাদুঘর নির্মিত নতুন ভবনে উপজাতীয় সংস্কৃতি ও মুদ্রা প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে একটি গ্রন্থাগার উন্মুক্ত রেখে শিক্ষানগর রাজশাহীর এমফিল, পিএইচডি ও সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং লেখক, গবেষকদের গবেষণাকর্মে সহায়তা করছে। জাদুঘরটিতে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু প্রমুখ।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬১তম সংখ্যা, মে ১০১৫