মেগালিথ একপ্রকার প্রাচীন পাথর, যা কোনো স্থাপত্য বা মিনার তৈরিতে একক বা যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল কোনো একসময়ে। আর মেগালিথিক মানেই বিশেষ এই প্রাচীন পাথরের তৈরি কোনো স্থাপনা, যা মর্টার বা কংক্রিটের ব্যবহার ছাড়াই নির্মিত। অবশ্যই যা প্রাগৈতিহাসিক বলে পরিচিত। এই সময় পরবর্তী নির্মিত স্থাপনাগুলোকে মনোলিথিক বলা হয়।
মানুষ এককালে গুহা থেকে বেরিয়ে আবাস গড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায়। সে সময় সে নিজের আত্মরক্ষার্থে আর উপাসনার নিমিত্তে পাথরের সঙ্গে পাথর জোড়া লাগিয়ে শুরু করে এমন সব স্থাপনা নির্মাণ। এই সময় মানুষের নির্মিত মেগালিথগুলো পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এমনভাবেই অবিকৃত রয়েছে যা আজও সভ্যতার সূচনাকীর্তনই করে। যদিও অনেকই আজ বিলুপ্ত। সময়ের করাল গ্রাস ওদের গিলেছে। মানুষ নিজেই নষ্ট করেছে অনেকটা।
মেগালিথ গ্রিক শব্দ। মেগা মানে মহান, লিথ মানে পাথর। যার অর্থ মহান পাথর। মেগালিথের অর্থ অবশ্য এমনটাও দাঁড়ায় যে পাথর কুঁদে বিশেষ আকৃতি দেওয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে মনুষ্যনির্মিত স্থাপনাকেও মেগালিথ বলা হয়। বিভিন্ন ধরনের বিশাল বিশাল মেগালিথ দেখা যায়, যার অধিকাংশই ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত। এসব পাথরের নির্মাণ শুরু হয়েছিল নিওলিথিক পিরিয়ডে (মনোলিথিক পিরিয়ডের আগে) এবং চলেছিল চ্যালকোলিথিক হয়ে ব্রোঞ্জ যুগ পর্যন্ত।
পূর্ব তুর্কির প্রারম্ভিক যুগের পাথুরে কমপ্লেক্স
সংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব তুরস্কে বিশাল কিছু অনুষ্ঠানের বেদি আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলো খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০ শতাব্দীরও পুরোনো। এগুলো জড়িত ছিল প্রারম্ভিক কৃষিকাজ ও পশুপালনের সঙ্গে। বড় গোলাকার ও খোদাই করা স্থাপত্যের একটি সাধারণ উদাহরণ নেভালি কোরি ও ঘোবেকি টেপে। যদিও এই মেগালিথিক স্থাপত্যগুলো এখনো পর্যন্ত জানা সবচেয়ে প্রাচীন। এখনো পরিষ্কার না এগুলো থেকেই ইউরোপীয় মেগালিথিক এসেছে কি না! ঘোবেকি টেপেতে প্রায় ২০টার মধ্যে চারটায় খননকার্য চালানো হয়েছে। কোনো কোনোটা ৩০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। মানবাকৃতির পাশাপাশি এই পাথরগুলো কুঁদে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে আছে শূকর, শিয়াল, সিংহ, পাখি, সাপ আর কাকড়াবিছাও।
মধ্যপ্রাচ্যের মেগালিথিক
ডলমেন ও দাঁড়ানো পাথর পাওয়া গেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায়। সিরিয়ার দক্ষিণে তুর্কি-আলেপ্পো বর্ডার থেকে শুরু হয়ে যা চলে গেছে দক্ষিণে ইয়েমেনের দিকে। সেগুলা লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবেও পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড়টা পাওয়া যাবে সিরিয়ার দক্ষিণে এবং জর্ডান রিফট উপত্যকার ওপর, যেখানে এগুলো রয়েছে ঝুঁকির মুখে। এগুলোর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ক্যালকোলিথিকের শেষ দিক থেকে বা ব্রোঞ্জ যুগের প্রথম দিকে। ইরানের খরগদ্বীপে এবং ইরাকের বারদ বালকাতে পাওয়া গেছে মেগালিথ।
ইসরায়েলের আটলিট ইয়ামে একটি উপবৃত্তাকার মেগালিথিক পাওয়া গিয়েছিল, যেটা এখন সাগরে পানির নিচে। এটা ছিল খ্রিষ্টপূর্ব সাত হাজার বছরের পুরোনো মেগালিথিকের বড় উদাহরণ।
জর্ডানের রিফ্ট উপত্যকার উভয় পাশেই বিশেষ করে পূর্বদিকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ডলমেনস-প্রধান এলাকা। সর্বপ্রথম এগুলো দেখা যায় হোল্ডেন হাইটসে, হাউরানে ও জর্ডানে, যেগুলো সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ডলমেন। সৌদি আরবের হেজাজে খুব সামান্য কিছু ডলমেন পাওয়া গেছে। এগুলোই হয়তো ইয়েমেনে ঘুরেফিরে এসেছে, যেগুলো সোমালিয়ান আর ইথিওপিয়ানের মতোই।
মেসোপটেমিয়ান সময়কাল থেকে চলে আসা এককভাবে দাঁড়ানো পাথরগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ ঐতিহ্য। অবশ্য পুরোপুরি মেগালিথিক বলা যায় না পাথরগুলোকে। পাঁচ মিটার বা তারও বেশি আকারে পাথরগুলোকে পাওয়া যায় প্রাচ্যে (যেমন জর্ডানেরটা)। এ রকম কিছু ঘটনার বর্ণনা ওল্ড টেস্টামেন্টে পাওয়া যায়, যেমন- ইব্রাহিম (আ.) প্রপৌত্র ইয়াকুবের (আ.) কাহিনি, যিনি একটি দাঁড় করানো পাথরে তেল ঢেলেছিলেন, ফেরেশতারা স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে এ রকম কিছু একটা স্বপ্নে দেখার পর (জেনেসিস ২৮:১০-২২)। বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইয়াকুব (আ.) পাথর দাঁড় করাতেন, যেমনটা মুসা (আ.) করেছিলেন- ২২টি গোত্রের প্রতীক হিসেবে ২২টি পাথর বসানো হয়েছিল। পাথর দাঁড় করানোর এই রীতি চলেছিল নেবাটিয়ান কাল পর্যন্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাবা এবং আশপাশের স্তম্ভগুলোকে নিয়ে ইসলামি যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, একই রকম অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যেও দেখা যায়। যেমন- কাফহোল, পাথর কেটে বানানো কবর, পাথুরে বৃত্ত ইত্যাদি।
ইউরোপীয় মেগালিথ
ইউরোপের সবচেয়ে বেশি দেখা মেগালিথিক স্থাপনা হলো পোর্টাল কবরÑ দাঁড় করানো পাথরের ওপর একটি (বা একাধিক) পাথর দিয়ে বানানো ছাদ। অনেকগুলোতেই শবদেহের চিহ্নমাত্র নেই, এটাই বিতর্কের সৃষ্টি করে যে আসলেই এগুলো কবর হিসেবে ব্যবহৃত হতো কি না। মাল্টার মেগালিথিকগুলোকে (বিশেষ করে স্কোর্বা মন্দিরকে) ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো মেগালিথিক স্থাপনা বলে ধরা হয়। কেউ কেউ ডরমেন বললেও আর্কিওলজিস্টদের দেওয়া আসল নাম পোর্টাল কবর। তারপরও বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন: গ্যালিসিয়া এবং পর্তুগালে আন্তা, সার্বিয়াতে স্ট্যাজোন, নেদারল্যান্ডে হিউনবেড, জার্মানিতে হিউনেনগ্রাব, ডেনমার্কে ডিসে/ডাইসে, ওয়েলসে ক্রোমলেচ ইত্যাদি। ধরে নেওয়া হয়, কবরগুলো প্রথমে মাটির ঢিবি দিয়ে ঢাকা ছিল।
সহজে দেখা মেলে এমন কবরের মধ্যে দ্বিতীয় হলো প্যাসেজ কবর। এগুলো সাধারণত বর্গাকার, বৃত্তাকার, ক্রুশাকার কক্ষে স্ল্যাব বা করবেল ছাদ দিয়ে আবৃত, লম্বা-সোজা প্যাসেজওয়ে দিয়ে ঢোকা যায়, পুরো স্থাপনাটাই একটা মাটির ঢিবি দিয়ে ঢাকা। কখনো কখনো বাইরে থেকে পাথর দিয়ে আটকে দেওয়া। আয়ারল্যান্ডের ব্রু না বনি এবং ক্যারোমোর, ওর্কনির মায়েস হো এবং ফ্রান্সের গ্রাভরিনিস হলো এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
গ্যালারি কবর নামক একপ্রকার কবর আসে তৃতীয় ধাপে। এগুলো দীর্ঘ ঢিপির নিচে তীর্যকভাবে বসানো চেম্বার। আইরিস কোর্ট টম্ব, ব্রিটিশ লং ব্যারো, জার্মান স্টেইন কিস্টেন এই গ্রুপের মধ্যে পড়ে।
আরেক প্রকার এককভাবে দাঁড়ানো মেগালিথিক পাথরের মধ্যে ফ্রান্সের মেনহির অন্যতম। ইউরোপে এটা বহুল পরিচিত, অন্তত ৫০,০০০টা বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছে। কোনোটাকে মহাজাগতিক কর্মকাণ্ডের চিহ্ন হিসেবেও মনে করা হয়। কোনো কোনো এলাকায় পাথরের তৈরি দীর্ঘ জটিল এলাইনমেন্ট পাওয়া যায়, সবচেয়ে বড়টার নাম কার্নাক, ফ্রান্সের ব্রিটানিতে অবস্থিত।
ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের কিছু কিছু অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য মেগালিথিক স্থাপনা হলো পাথরের বৃত্ত, স্টোনহেন্জ, অ্যাভব্যুরি, রিং অব ব্রডগার এবং বেলটানি। এগুলোও মহাজাগতিক এলাইনমেন্টের চিহ্ন বহন করে (সৌর এবং চন্দ্র উভয়ই)। সে আমলে মানুষ সূর্য ও চাঁদের বৃত্তাকার ঘূর্ণনকাল কত, সেটা বের করে ফেলেছিল। এবং সে সময়ে সূর্য ও চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরা উপগ্রহ বলেও মনে করত অনেকে। পৃথিবীকে কেন্দ্র ভেবে সূর্য ও চাঁদের গতিকে কেন্দ্র বানিয়ে ফেলা পাথরের সৌধগুলো এ সময় দেখা যায়। যেমন স্টোনহেন্জ তার সোলস্টিক এলাইনমেন্টের জন্য বিখ্যাত। ইউরোপের অন্যত্রও পাথরের বৃত্তের অনেক উদাহরণ আছে। আয়ারল্যান্ডের লিমেরিকের কাছাকাছি লাফ গুরের বৃত্তকেও ওই সময়ের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। একে প্রায় স্টোনহেনজের সমসাময়িক বলেই ধরা হয়। পাথরের বৃত্তগুলোকে ধারণা করা হয় কবর, যা নিওলিথিক শ্রেডিং এবং ব্রোঞ্জ যুগের পরের সময়কার।
কবর
মেগালিথিক কবরগুলো মূলত মাটির ওপরে কবর দেওয়ার জায়গা, বড় পাথর দাঁড় করিয়ে ওপরে মাটি বা ছোট পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া। এগুলো একধরনের চেম্বার কবর, যা নিওলিথিক পিরিয়ডে নিওলিথিক কৃষকগোষ্ঠীর দ্বারা নির্মিত হয় আটলান্টিক ইউরোপে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও এর আশেপাশে। এগুলো পাথরের গাঠনিক ব্যবহার দেখে সমসাময়িক লং ব্যারো থেকে সহজেই আলাদা করা যায়।
অনেক রকমের মেগালিথিক কবর আছে। উন্মুক্ত একক চেম্বারের ডলমেন এবং পোর্টাল ডলমেন পাওয়া যায় ব্রিটেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, ওয়েলসে। এ ছাড়া বড় পাথর পাওয়া যায় তিন, চার বা আরও বেশি দাঁড়ানো পাথর দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া অবস্থায়। এগুলো মাটির টুকরো বা পাথরের স্তম্ভ দিয়ে মোড়ানো থাকে।
ইতালিতে, বিশেষ করে সার্ডিনিয়াতে ডলমেন পাওয়া যায়। ১০০-রও বেশি ডলমেন পাওয়া গেছে নিওলিথিক পিরিয়ডে (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০-৩৫০০), সবচেয়ে বেশি বিখ্যাতটা মোরের নিকটবর্তী ডলমেন ডি সা কোভেক্কাডা নামে পরিচিত। ব্রোঞ্জ যুগে, নুরাগিক সভ্যতা ৮০০টি বিশাল সিরকা গ্রেভ বানিয়েছিল এক বিশেষ ধরনের গ্যালারি কবর, যা সার্ভিনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতিতে দেখা যায়। সার্ডিনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো বৃত্তাকার কবর তথাকথিত আর্যাচেনা রীতির, যা কর্সিকা, দক্ষিণ ফ্রান্স এবং পূর্ব স্পেনেও পাওয়া যায়।
ডলমেন ইটালির অ্যাপুলিয়া আর সিসিলিতেও আছে। আধুনিক এ অঞ্চলে এই ছোট স্থাপনাগুলোর অবস্থান মুরা প্রেগনে (পালেরমো), স্কিয়াক্কা (এগ্রিগেন্টো), মন্টে বুবোনিয়া (কালতানিসেত্তা), বুটেরা (কালতানিসেত্তা), সাভা লাজ্জারো (সিরাকুসা), সাভা ডেই সারভি (রুগাসা), অ্যাভোলা (সিরকাসা)। ব্রোঞ্জ যুগের প্রাথমিক সময়ে (২২০০-১৮০০ খ্রিষ্টপূর্ব), প্রাগৈতিহাসিক সিসিলিয়ান ভবনগুলো গোলাকার মাটির ঢিবি দিয়ে ঢাকা থাকত। সাভা ডেই সারভির ডলমেনে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ অজস্র মানুষের হাড়ের টুকরো আর ব্রোঞ্জ যুগের ক্যাস্টেলুসিয়ান সিরামিকের ভাঙা অংশ পেয়েছে, যা হস্তনির্মিত বস্তুগুলো মাটিচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্য নিশ্চিত করে। ব্রোঞ্জ যুগ এবং তাম্র যুগের (অ্যাপেনাইন এবং ক্যাস্টেলুচ্চিও সংস্কৃতির) ডলমেন এবং স্টেলাই মূর্তি অবশ্য অ্যাওস্তা উপত্যকা, লাটিয়াম, টুসকানি, লম্বার্ডি ও ট্রেন্টিনো অঞ্চলে অত্যন্ত সহজলভ্য।
অন্যান্য উদাহরণও আছে, যেগুলো কবর দেওয়ার উদ্দেশ্য নির্মিত হয়নি। দক্ষিণ-পশ্চিম স্কটল্যান্ড আর উত্তর আয়ারল্যান্ডের কোর্ট কেয়ার্নস, দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের সেভার্ন কটসওল্ড কবর এবং ফ্রান্সের লয়র অঞ্চলের গির্জার মতো গ্যালারি কবর অনেক অন্তর্গত ফিচারকে সেতুবন্ধ করে, যদিও এদের মধ্যকার সম্পর্ক পুরোপুরি বোধগম্য নয়। এগুলোর প্রায়ই অ্যান্টিচেম্বার বা ফোরকোর্ট থাকে, যা কি না মনে করা হয় তৈরিকারীর উদ্দেশ্য ছিল দেহের সঙ্গে আত্মার মেলবন্ধনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য।
আয়ারল্যান্ডের বয়েন উপত্যকার অর্কনি এবং উত্তর ওয়েলসের আড়াআড়ি আকৃতির চেম্বার আর প্যাসেজবিশিষ্ট প্যাসেজ কবরগুলো আরও বেশি জটিল ও চমকপ্রদ। উদাহরণস্বরূপ মাইশোয়ির পাথরের ব্লকের গঠনপ্রণালি ওই সময়ের উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে আর দেখা যায় না।
মেগালিথিক কবরগুলো তখনকার সমাজে দীর্ঘসময় মৃতদেহের সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো এবং কোনো কোনো সময় সেগুলো পরিবর্তন করে বড় করাও হতো। যে পরিমাণ পরিশ্রম আর পরিকল্পনা লাগত, সেই বড় বড় পাথরকে দাঁড় করাতে, সেটা দেখে ধারণা করা যায় যে সেই সময়কার সমাজ মৃতদেহের সৎকারের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল। মেগালিথিক পাথরগুলোর ওপরে খোদাই করা চিত্রকর্মগুলোও এ ব্যাপারে সমর্থন দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের আবিষ্কৃত মাটির চুলা এবং প্রাণীর হাড়গোড় পাওয়া থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে মৃতদেহ সৎকারের পর কুলখানির মতো খাওয়াদাওয়াও হতো এবং আত্মার শান্তির জন্য হতো বলিদানও।
মেগালিথিক কবরের উদাহরণের মধ্যে আরও আছে অর্কলের মিডহোতে স্টলড কেয়ার্ন এবং অ্যাংলেসির ব্রিন সেলি ড্যুর প্যাসেজ কবরসমূহ। আরও আকর্ষণীয় ৬০টির মতো মেগালিথিক করবের সাইট আছে বর্ণহোমের ড্যানিস দ্বীপপুঞ্জের লুইসেনলান্ড এবং গ্রিটে। নামে কবর হলেও ইউক্রেনে পাথরের কবর আসলে কোনো কবর নয় বরং এটি একটা অভয়ারণ্য।
অন্যান্য স্থাপনা
সারা ইউরোপের অন্যান্য মেগালিথিক স্থাপনার সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পকর্মের ও বিভিন্ন ডিজাইনের মৃৎশিল্প হেনজেস নামে পরিচিত হাবিজাবি এবং ঘন ঘন কৃত্রিম ঢিপি যেমন ইংল্যান্ডের সিলবারি হিল এবং সার্ডিনিয়ার মন্টেতে প্রাচীন পিরামিড পাওয়া গেছে। সার্ডিনিয়াতে পাওয়া গেছে প্রচুর স্পাইরাল, যেগুলোর মধ্যে মামোইয়াডার পার্ডা পিন্টা সর্বাধিক পরিচিত।
মেগালিথিক নির্মাণকারীদের জন্য স্পাইরালগুলো খুব দরকারি ছিল বলে মনে করা হতো। ইউরোপের সর্বত্র এগুলোকে পাথর কুঁদে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া যেমন লজেন্স, চোখ, বিভিন্ন লাইনে আঁকাবাঁকা অবস্থায় পাওয়া গেছে। আধুনিক মতবাদ অনুসারে যদিও একে স্ক্রিপ্ট বলা চলে না, তবুও আকৃতিগুলো যেন তার নির্মাতার কথাই বলছে। এগুলো ইউরোপের সর্বত্রই বিরাজমান ছিল।
ইউরোপে মেগালিথিক স্থাপত্যের প্রসার
ইউরোপে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০০ থেকে ১৫০০ বছর আগে নিওলিথিক বা প্রস্তর যুগের শেষ ভাগে এবং ক্যালকোলিথিক বা তাম্র যুগে সাধারণত পাথর লম্বাভাবে দাঁড় করানো হতো। মাল্টার মেগালিথিকগুলোকেই ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো মেগালিথিক বলে মনে করা হয়। ইংল্যান্ডের মধ্যে স্টোহেন্জটাই হতে পারে সবচেয়ে প্রাচীন। সার্ডিনিয়াতেও ৮০০০-এরও বেশি মেগালিথিক স্ট্রাকচারÑ ডলমেন, মেনহির আর বৃত্তাকার কবর আছে। নুরাগি নামের এক নুরাজিক সভ্যতার তৈরি, যেগুলো পাথর দিয়ে টাওয়ারের মতো করে তৈরি কিন্তু অনেক জটিল। প্রায়ই এগুলো বিশাল কবর বা অন্যান্য মেগালিথিক স্থাপত্যের কাছাকাছি হয়ে থাকে।
কার্নাক পাথরের কথা বলতে গেলে সবার আগে আসে ফ্রান্সের কৌম ডে ক্যেলুর কথা। পিয়েরে জিনÑ ব্যাপ্টিস্ট লিগ্রা ড’অসি মেনহির এবং ডলমেন নাম প্রবর্তন করে, দুটোই ব্রিটেন ভাষার প্রত্নতাত্ত্বিক শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। তিনি ভুলক্রমে মেগালিথিককে গ্যালিক কবর বলে অভিহিত করেন। ব্রিটেনে মেগালিথিক নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা শুরু করেন প্রত্নতাত্ত্বিক আবরি ও স্টুকিলি। ১৮০৫ সালে, জ্যাক ক্যামব্রি মনুমেন্ট সেলটিক নামে একটি বই বের করেন, যেখানে তিনি একটি সেল্টিক পাথরভিত্তিক গোপন সংঘের কথা তুলে আনেন। ড্রুইড এবং মেগালিথের সঙ্গে ভিত্তিহীন সম্পর্কের গুজবে জনগণের মন কুরে কুরে খায়। বেলজিয়ামের ছোট শহর ওয়েরিসে একটি মেগালিথিক সাইট আছে। নেদারল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব দিকে বিশেষ করে ড্রেনথে প্রদেশে আছে বেশ কিছু মেগালিথিক স্থাপনা। আয়ারল্যান্ডে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৩০০০ বছরের পুরোনো নিওলিথিক প্যাসেজ কবরক্ষেত্র আছে ব্রু না বনি নামে। এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে দুই শতাধিক সাজানো পাথর বেরিয়ে এসেছে, যা ইউরোপের সব মেগালিথিক শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ।
মেগালিথিক নির্মাণের সময়কাল
মেসোলিথিক
ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স আর স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলে কিছু মেগালিথিক মূর্তি (কখনো বা কেবল স্থাপনা) খনন করে ধারণা করা হচ্ছে যে এগুলোর সঙ্গে ধর্মীয় কার্যকলাপের সংযোগ ছিল, যা কি না নিওলিথিক যুগ থেকে মেসোলিথিক যুগে, শতাব্দী থেকে হাজার বছর যাবৎ চলে আসছে। কিছু পূর্বশর্তও রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্ম এসব রীতিকে ছুড়ে ফেলেছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে এদের কার্যকলাপে রয়েছে বৈপরীত্যও।
চলবে…..
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫