একজন নভেরা আহমেদ

নভেরা আহমেদ একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের নাম। এই ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি কবেই। শহীদ মিনারে প্রতিবছর ফুল দিতে গিয়ে আমাদের ভাষার কথা মনে পড়ে। আর ভাষার কথা মনে পড়লেই আমরা এর স্থপতি হামিদুর রহমানকে স্মরণ করি। কিন্তু আড়ালে থেকে যান একজন নভেরা আহমেদ, যিনি বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। প্রখ্যাত ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে জাতীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে ছিল যাঁর সরব অংশগ্রহণ। এরপর সুদীর্ঘ সময় তিনি থেকে যান অন্তরালে। মানুষ ভুলে যায় তাঁকে; তাঁর কাজকে। হয়তো অনেকটা অভিমানেই পরিবার-পরিজন থেকে সুদূর প্যারিসে কাটান দীর্ঘ অন্তরাল এক জীবন। এরই মাঝে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি প্যারিসে তাঁর রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। অবশেষে ৬ মে ২০১৫ সালে প্যারিসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হারিয়ে যান মহাকালের অতলে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে।

 শৈশব ও শিক্ষাজীবন

নভেরার বাবা সৈয়দ সাঈদ আহমেদের কর্মক্ষেত্র ছিল সুন্দরবন অঞ্চলে। সেখানেই জন্ম নভেরার ১৯৩০ সালে। ফার্সি শব্দ ‘নভেরা’র অর্থ নবাগত, নবজন্ম। পৈতৃক নিবাস ছিল চট্টগ্রামের আসকারদিঘিতে। চাকরিসূত্রে বাবা সাঈদ আহমেদ পরবর্তীতে যান কলকাতায়। নভেরার শৈশব কেটেছে এ শহরেই। কলকাতার লরেটা থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুলজীবনেই ভাস্কর্য গড়তেন তিনি। ১৯৪৭-এ ভারত ভাগ হওয়ার পর সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুমিল্লায় চলে আসেন। ভর্তি হন ভিক্টোরিয়া কলেজে। বাবার অবসরগ্রহণের পর সপরিবাওে চট্টগ্রামে শুরু করেন স্থায়ী বসবাস। ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে।

নভেরা লন্ডনে যান ১৯৫০ সালে। লন্ডনে তখন তাঁর মেজো বোন শরীফা আলম বিবিসির অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন, যার দায়িত্বে ছিলেন নাজির আহমেদ। নাজির আহমেদের ছোট ভাই হামিদুর রহমান তখন পড়তেন ঢাকা আর্ট কলেজে। কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের একজন তিনি, সহপাঠী ছিলেন আমিনুল ইসলাম। হামিদুর যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন বড় ভাই নাজির আহমেদ তাঁকে নিয়ে গিয়ে প্যারিসের বোজ আর্ট স্কুলে ভর্তি করালেন। কিন্তু হামিদুর প্যারিসে থাকতে পারলেন না, তিনি লন্ডনে ফিরে ভাইয়ের ফ্ল্যাটে উঠলেন। আর এখানেই পরিচয় হামিদুরের সঙ্গে নভেরার। লন্ডনে হামিদুর ভর্তি হলেন সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টে।

নভেরা ১৯৫১ সালের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনে ভর্তি  হন মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে। সেখানে ভর্তি হতে শিল্পকলাবিষয়ক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল না। নভেরা ১৯৫৫ সালে কোর্স শেষ করে পেলেন ডিপ্লোমা ডিগ্রি। ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন ডক্টর ক্যারেল ভোগেল। ১৯৫৫ সালে নভেরার প্রত্যয়নপত্রে বিভাগের অধ্যক্ষ লিখেছিলেন,

‘Her studies from life show a strong sense of observation, and certainly there is originality and depth of thought in her compositions. Her portrait heads are full of life. Though i general working in the European way. Miss. Ahmed’s sculptures shows how indelible is the unconscious influence of Eastern monumentality and traditions. The personality developed here will, I am convinced, become a fine artist and inspiring teacher, given the necessary help and opportunity.’

১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমান একসঙ্গে যান ইতালির ফ্লোরেন্সে। প্রথমে তাঁরা শিল্পী আমিনুল ইসলামের আতিথ্য গ্রহণ করেন। পরে তিনজন একত্রে ওঠেন একটি স্টুডিওতে। নভেরা মাস দুয়েক শুধু ইতালি ঘুরেই বেড়ান। ডক্টর ফোগেল ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির নামে ইতালীয় এক চিত্রশিল্পীর কাছে নভেরা নাম উল্লেখ করে একটি চিঠি দেয়। এই শিল্পীর সাহচর্যে নভেরার দোনাতেলোসহ প্রাচীন কয়েকজন শিল্পীর কাজের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। দুই মাস তাঁদের কাছে কাজ শেখেন। ফ্লোরেন্স থেকে ভেনিসে এলেন নভেরা ও হামিদুর। অতঃপর সেখান থেকে লন্ডন।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা ও নভেরার নাম-বিষয়ক বিতর্ক

১৯৫৬ সালের জুনে নভেরা ও হামিদুর একসঙ্গে দেশে ফেরেন। ঢাকায় তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরিকল্পনায় আধুনিক স্থাপত্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তাঁরই উদ্যোগে নবনির্মিত পাবলিক লাইব্রেরি, পরবর্তীকালে, যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়। সেখানে এঁরা দুজনেই কাজ করার কমিশন লাভ করেন। ওপরের একটি দেয়ালজুড়ে বিশাল এক ফ্রেসকো করলেন হামিদুর; নভেরা করলেন প্রবেশপথের দেয়ালের ওপরের অর্ধেকটা জুড়ে একটি লো রিলিফ। তারপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁরা আরও কিছু কাজ করলেন এবং ’৫৭ সালে ওই লাইব্রেরিতেই প্রদর্শিত হলো তাঁদের যৌথ প্রদর্শনী। একেবারে নতুন ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচয় হলো এ দেশের মানুষের।

কিন্তু বিপত্তি বাধে ১৯৫৮ সালের সামরিক আইন জারির কারণে কাজ বন্ধ হওয়ায়। সময় গড়াল আর নভেরার নাম বাদ পড়ল ইতিহাস থেকে। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করার অনুরোধ জানান প্রধান প্রকৌশলী জব্বার আহমেদ ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে। প্রকৌশলী জব্বারের অন্যতম সহকর্মী ছিলেন প্রকৌশলী শফিকুল হক, নভেরার বড় বোন কুমু হকের স্বামী। শহীদ মিনারের নকশার জন্য কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন যায়নি। জয়নুল আবেদিন সরাসরি হামিদুরকে বলেছিলেন স্কেচসহ মডেল পেশ করতে। স্থপতি রবিউল হুসাইন ‘ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে স্থাপত্য ভাস্কর্যের সর্বপ্রথম উদাহরণ হচ্ছে শিল্পী হামিদুর রহমান, ভাস্কর নভেরা আহমেদ এবং স্থপতি জাঁ দেলোরা কর্তৃক নকশাকৃত ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।’ জাঁ দেলোরা তখন সরকারের স্থাপত্যবিষয়ক উপদেষ্টা। হামিদুর রহমান শহীদ মিনারের যে মডেল ও স্কেচ উপস্থাপন করেছিলেন, দেলোরা তাঁর স্তম্ভগুলোর মাপ পরিবর্তন করেন।

১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দ্য পাকিস্তান অবজার্ভার-এর প্রথম পাতায় শহীদ মিনার সম্পর্কিত খবর দিয়ে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো, তার একটি বাক্য ছিল: ‘The memorial has been designed by Mr. Hamidur Rahman in collaboration with Miss Novera Ahmed.’ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রাতে যাঁরা শহীদ মিনার গেঁথে তোলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র কবি রফিক আহমেদ। নির্মাণাধীন শহীদ মিনারে তাঁর ছিল নিত্য যাতায়াত। তিনি জানেন, শিল্পীদ্বয়ের যৌথ অবদানের কথা। এই শিল্পীদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘একটি সত্য যে কালের হাতে কত সহজে বিস্মৃতি ও বিভ্রান্তিতে পরিণত হতে পারে এটিই তার প্রমাণ।’

সৈয়দ মহম্মদ আলী বলেছিলেন, ‘Novera had a major contribution in designing the shaheed minar’ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর হৃৎকলমের টানে সংকলনটিতে এ প্রসঙ্গে কয়েকবার লিখেছেন। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘হামিদুর রহমান চিত্রকর, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিকল্পনাকারী শিল্পী দুজনের একজন, অপরজন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আরও লিখছেন, ‘মনে পড়ে গেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দুজন তাঁদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমত, আমরা একেবারেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন, যদিও বা কেউ জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম, খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদের সঙ্গে আরও একজন ছিলেন। হামিদের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দুজনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন। অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘কিছুদিন আগে শিল্পী হামিদুর রহমান ঢাকায় এসে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকার দেন এ সাক্ষাৎকারে হামিদ নভেরার নাম করেননি। অদ্ভুত কারণে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দপ্তরের একটি প্রামাণ্যচিত্রেও হামিদের বক্তব্য শোনা যায় শহীদ মিনার সম্পর্কে, কিন্তু তাতে শোনা যায়নি নভেরার কথা উল্লেখ করতে।’

জাগোনিউজ২৪

নভেরার কাজের ধারা

শহীদ মিনারের মূল যে স্তম্ভটি, যাকে মাতৃমূর্তির রূপক মনে করা হয়, তার আনতভঙ্গি প্রথমে যেটি হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের উপস্থিতিতে নির্মিত হয়, সেটি বর্তমানের মাতৃমূর্তিটির মতো কৌণিক ছিল না। নভেরার Seated Woman নামে তিনটি কাজ আছে। কোমল ভঙ্গিতে মা দৃষ্টিনত করে রেখেছে কোলের সন্তানের প্রতি। নভেরার মাতৃমূর্তিগুলো সুইজারল্যান্ডের জারম্যাটে ম্যাটার হর্ন (মাদার হর্ন) নামে যে পর্বতশৃঙ্গটি আছে তার সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেই সুউচ্চ পর্বত আর তার আনত শৃঙ্গের সঙ্গে নভেরার ঈষৎ আনত মাতৃমূর্তির সাদৃশ্য আছে, বিশেষভাবে সাদৃশ্য আছে শহীদ মিনারের মাতৃমূর্তির সঙ্গে, সেই পর্বতের সঙ্গে দেশমাতৃকার তুলনা চলে। সন্তানের প্রতি আশীর্বাদ ও স্নেহ আনত যার অপরাজেয় শৃঙ্গ। বিশিষ্ট সাংবাদিক সাদেক খান বলেন, ‘এ ধরনের বিমূর্ত কাজ তখন নভেরা ছাড়া আর কেউ করেনি।’

১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর শহীদ মিনারের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। এরপর অনেকবার কাজ হয়েছে। কিন্তু মিনারের মূল বা সম্পূর্ণ পরিকল্পনা কোনো দিনই বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর হামিদুর একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগ দেওয়ার জন্য আমেরিকায় যান এবং নভেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ শুরু করেন। কিন্তু হাবার্ট রিডের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয়, ‘ভাস্করের কাজ কবি বা চিত্রশিল্পীর মতো নয়, ভাস্কর্যের জন্য দরকার খোলা জায়গার, চার্চ বা মার্কেট প্লেসের কারণ সে কাজ রাজসিক ভঙ্গিতে সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে এবং সকলের দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে। কিন্তু এ ধরনের সুযোগ তখন আমাদের দেশে বিশেষ ছিল না এবং সরকার বা ধনী লোকের পৃষ্ঠপোষকতার একান্ত প্রয়োজন ছিল। সে সময় নভেরা তেজগাঁওয়ের এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে একটি কমিশন পেয়েছিলেন। এর ওপর সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘একটু হকচকিয়ে যেতে হতো এই ভেবে যে সে একজন বাঙালি মুসলমান তাঁর বাড়ির বাগান সাজানোর জন্য একটি ভাস্কর্য কিনেছেন। এবং সে ভাস্কর্যটি নারী মূর্তি নয়, কোমলপ্রাণ ও চিত্রিত দেহ কোনো পশুমূর্তি নয় কিংবা ছাঁচে ঢালা কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা কোনো সস্তা কাজও নয়, এক প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীর বিমূর্ত ও পরীক্ষামূলক একটি কাজ।’

 এ কাজটিতে নভেরা গ্রামীণ একটি বিষয় ব্যবহার করেছেন। এখানে মানুষ ও গরুর পা এবং শরীর একীভূত হয়ে গেছে। এভাবেই গরুর ও মানুষ উভয়ের ওপর উভয়ের নির্ভরশীলতা বোঝানো হয়েছে। চট্টগ্রামের রেকিট অ্যান্ড কোলম্যান অফিস এবং ঢাকার আনবিক শক্তি কমিশনের সামনের লনে নভেরার আরও দুটি কাজ আছে। কাজ দুটি আয়তনে তেমন বড় নয়, উচ্চতায় তিন ফুটের মতো। প্রথমটি অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ, দ্বিতীয়টি অ্যাবস্ট্রাক মাতৃমূর্তি। ’৫৯ সালে নভেরা বার্মা (মিয়ানমার) গিয়েছিলেন বৌদ্ধমন্দির দেখার জন্য। সেখান থেকে ফিরে বুদ্ধের আসন বা পিস নামকরণে কয়েকটি ফর্মে কাজটি করেছেন।

নভেরার বেশকিছু ভাস্কর্যে আবহমান বাংলার লোকজ আঙ্গিকের আভাস পাওয়া যায়। তবে লোকজ ফর্মের সঙ্গে সেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়ও বর্তমান। লোকজ টেপা পুতুলের ফর্মকে সরলীকৃত করে তাকে দক্ষতার সঙ্গে বিশেষায়িত করেছিলেন তিনি। এভাবে ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্য শিক্ষা সার্থকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা তাঁর অনেকগুলো কাজে বর্তমান। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভাস্কর্যগুলো আদলে তিন কোনাকৃতি, চোখের স্থানে গোলাকার ছিদ্র, লম্বা গ্রীবা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আসে। তাঁর কাজের প্রধান দিক হচ্ছে নারীদের প্রতিমূর্তি। সমসাময়িক পুরুষ শিল্পীরা ইউরোপীয় ইন্দ্রিয় সুখাবহ নারীদেহে একটি রোমান্টিক ইমেজ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি জয়নুল আবেদিন বা কামরুল হাসান নারীকে মাতা, কন্যা, স্ত্রী এবং প্রেমানুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখালেও নারীদের যথার্থ কর্মময় জীবন উহ্যই ছিল। তিনি নারীকে দেখলেন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, পুরুষ শিল্পীদের উপস্থাপনার বিপরীতে। তাঁর কাজে নর-নারীর কম্পোজিশন একটি ঐক্য তৈরি করে। তিনি ভাসা ভাসা সুন্দর আনন্দময়ী আদর্শ ফর্ম গঠন করতে চাননি। তাঁর ফর্মগুলোকে সরল, অর্থপূর্ণ, স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ। উন্মোচন করেছেন সব ধরনের বিচলিত, আবেগমথিত, সত্যিকারের নারীর রূপকে। মা শক্তিদায়ী, সংকল্পবদ্ধ, অকপট, মৌন আকর্ষণরূপে উদ্ভাসিত। ‘দ্য লং ওয়েট’ কাজটি তারই নমুনা। তাঁর মায়েরা সুন্দরী নন, কিন্তু শক্তিময়ী, জোরালো ও সংগ্রামী। কখনো কখনো তাঁরা মানবিকতার প্রতীক।

পর্যালোচনায় নভেরার কাজ

ব্রিটেনের সমালোচক ম্যারি মারশাল নভেরার ‘দ্য লং ওয়েট’ কাজটি সম্পর্কে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত চমৎকার ও অদ্ভুত উদাহরণ, যেখানে হতাশায় পিছিয়ে পড়া নারী মুক্তির পথ খুঁজছে দৃঢ়তার সঙ্গে।’ নভেরা তাঁর শিল্পকর্মে একঘেয়েমি কাটাতে পরবর্তী সময়ে কতগুলো কাজে ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছিলেন। যেমন: নগ্ন নারীমূর্তি, লম্বা গ্রীবা ও মাথার অ্যানাটমিতে বাংলাদেশের ‘কন্যা-পুতুলের’ আঙ্গিকের পাশাপাশি হাত-পা-শরীরের অবস্থান স্থাপনের ক্ষেত্রে মদিয়ানির ফর্ম ও ড্রাইভের সুষমা, স্তন ও শরীরের উপস্থাপনায় মহেঞ্জোদারোর ‘বালিকা-মূর্তির’ প্রাচ্য অভিলাষকে একত্র করেছেন। অন্যদিকে প্লাস্টার অব প্যারিসে নির্মিত দুটি ভাস্কর্যে মুখমণ্ডল বহুলাংশে বাস্তবধর্মী, সামান্য গান্ধার শিল্পধারায় প্রভাবিত। সম্ভবত এই মস্তক দুটি বুদ্ধের মস্তকের অনুকরণে অণুকৃত।

নভেরার যত প্রদর্শনী

নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার) পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির উদ্যোগে এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়। ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট রোববার বিকেলে অন্তর্দৃষ্টি বা Inner Gaze শীর্ষক এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আজম খান। দৈনিক আজাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ‘গভর্নর পাকিস্তানে ভাস্কর্যশিল্পের আলোকবর্তিকা বহনকারিণী নভেরার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন এবং তাঁর শিল্প সৃষ্টির সহায়তাকল্পে ১০ হাজার টাকা সাহায্য ঘোষণা করেন।’ পরের দিন থেকে পরবর্তী ১০ দিন এই প্রদর্শনী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কেবল ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কিছু ভাস্কর্য গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণেও প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য ছিল সর্বসাকুল্যে প্রায় ৭৫টি। এর প্রায় তিন যুগ পরে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে সে প্রদর্শনীর ৩০টির বেশি ভাস্কর্য সংগৃহীত হয় এবং ১৯৯৮ সালে একত্রে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রদর্শিত হয়। পরে শিল্পপতি এম আর খানের বাডড়র উদ্যানে নির্মিত মুক্তাঙ্গন ভাস্কর্য ‘পরিবার’ (১৯৫৮) ফোয়ারাসহ জাতীয় জাদুঘরের সামনে পুনঃস্থাপিত হয়।

‘অন্তর্দৃষ্টি’ কেবল নভেরা আহমেদেরই নয়, সমগ্র পাকিস্তানের ক্ষেত্রেই সেটা ছিল নারী-পুরুষনির্বিশেষে কোনো ভাস্করের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি পাকিস্তানের দুই অংশের শিল্পরসিকদেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তৎকালীন পত্রিকার সাক্ষ্যে জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনের তিন দিন পর ১০ আগস্ট বুধবার গভর্নর-পত্নী মিসেস আজম খান নভেরার ভাস্কর্য প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানান প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির পূর্বাঞ্চল শাখার সদস্য ডা. ফাতিমা সাদেক, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও শিল্পী স্বয়ং। সেদিনের অন্যান্য দর্শনার্থীর মধ্যে ছিলেন লাহোরের পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সেক্রেটারি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, লাহোর আর্ট কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল শিল্পী শাকির আলী, শিল্পী জয়নুল আবেদিনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

নভেরা আহমেদের দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীর সময়কাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রচলিত আছে। মেহবুব আহমেদের মতে, ‘১৯৬৮ সালের শেষদিকে ব্যাংককে নভেরা আহমেদের একক প্রদর্শনী হয়।’ শিল্প ও শিল্পীর দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ২০১২) প্রকাশিত ‘নভেরা নতুন পথের দিশারী’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি আক্ষেপ করেছেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে নভেরার প্যারিসে করা যে কাজগুলো ব্যাংককে প্রদর্শিত হয়েছিল, তার কোনো নিদর্শন পাইনি, এমনকি ব্রোশারও নয়।’ বাংলাদেশের নারী চরিতাভিধানে ব্যাংককের প্রদর্শনী সম্পর্কে সঠিক তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা গ্রন্থমালার চারু ও কারুকলা (২০০৭) সংকলনভুক্ত লালা রুখ সেলিমের লেখায় : ‘১৯৭০ সালে তিনি [নভেরা আহমেদ] ব্যাংককে যান এবং প্রাঙ্গণ ভাস্কর্যের প্রদর্শনী করেন।’

ব্যাংকক পোস্ট পত্রিকার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আলীই যে এই প্রদর্শনীর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। আর সম্প্রতি-প্রাপ্ত ‘ব্রোশার’ বা ক্যাটালগের সাক্ষ্য নিয়ে এখন নিশ্চিত করেই বলা সম্ভব, ব্যাংকক আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আয়োজনে নভেরার প্রদর্শনী চলেছিল ১৯৭০ সালের ১৪ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবনে। প্রদর্শনী আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন থাইল্যান্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মি. রব, শিল্পাকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলংকারিক শিল্পকলা অনুষদের ডিন প্রিন্স ইয়াৎচাই চিত্রাবংস, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ডিরেক্টর মাহমুদ-আল-হক। এবং এর উদ্বোধন করেছিলেন প্রিন্স কারাবিক চক্রবন্ধু, যিনি নিজেও ছিলেন শৌখিন চিত্রকর ও ভাস্কর। ক্যাটালগে মুদ্রিত ভাষ্য অনুযায়ী :

‘This is a unique kind of art exhibition. Novera Ahmed, the most famous sculptress of Pakistan and well known among art circles in London and Paris, presents her recent works in an exposition that provies a welcome break to her self-imposed detachment from public attention. What makes this exhibition all the more unique is that itis also Bangkok’s first open air show of sculptures in direct metal, an medium that poses almost formidable challenges to contemporary artists. In more ways than one, this exhibition should make a vital contribution to the modern art movement in Asia.’

আর এ সময়েই, ১৯৭০ সালের অক্টোবরে, নভেরা আহমেদের ধাতব মাধ্যমে তৈরি ভাস্কর্যের প্রদর্শনীটি ছিল ব্যাংককে ধাতব ভাস্কর্যের প্রথম মুক্তাঙ্গন প্রদর্শনী। ব্রোঞ্জ ছাড়াও এ পর্বে নভেরা তাঁর ভাস্কর্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন শিট মেটাল এবং ঝালাইকৃত বা ওয়েলডেড ও স্টেইনলেস স্টিল। ১৯৭৩ সালে জুলাই মাসে প্যারিসে গ্যালারি রিভগেসে তাঁর প্রদর্শনী হয়েছিল। সেলিনা হোসেন জেন্ডার বিশ্বকোষের (২০০৬) প্রথম খণ্ডের ‘নভেরা আহমেদ’ শীর্ষক ভুক্তিতে লিখেছেন, ‘১৯৮৮ সালে প্যারিসে অবস্থানকালে ব্যাংককের আলিয়ঁস ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস যৌথভাবে তাঁর একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে।’ ১৯৬১ সালে ‘All Pakistan Painting and Sculpture Exhibitions’-এর আয়োজন হয়। বছর দশকের একটি ছেলে ঘরের কাজে নভেরাকে সাহায্য করত, এই এক্সিবিশনের জন্য নভেরা তারই একটি আবক্ষমূর্তি তৈরি করে দিলেন। ক্যারেল ফোগেলের ছাত্রী কাজটির নাম দিলেন ‘Child Philosopher’-এর জন্য প্রথম পুরস্কার পেলেন নভেরা।

অবয়বধর্মী ভাস্কর্য ‘Exterminationg Angel’ ছয় ফুটের অধিক উচ্চতাবিশিষ্ট স্টাইলাইজড ভাস্কর্যটিতে বিধৃত হয়েছে শকুনের শ্বাসরোধকারী একজন নারীর অবয়ব। নারীর হাতে অশুভ শক্তি ও মৃত্যুর পরাভবের প্রতীক। পাকিস্তানের অগ্রগণ্য শিল্প-ইতিহাসবেত্তা সালিমা হাশমি তাঁর Unveiling the Visible: Lives and Works of Women Artists in Pakistan (২০০২) বইয়ের ‘নভেরা আহমেদ’ শীর্ষক ভুক্তি-নিবন্ধে ‘Child Philosopher’-‘Exterminating Angel’ শীর্ষক ভাস্কর্যটির নির্মাণকাল ১৯৬০ উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে ভাস্কর হিসেবে নিজের একটা দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন নভেরা। Pakistan Quarterly পত্রিকার সম্পাদক জালালউদ্দিন আহমেদের Art in Pakistan (করাচি, ১৯৫৪) গ্রন্থের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৬২) তাঁর ওপর একটি স্বতন্ত্র ভুক্তি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বেশ বড় আকারের ৫ ফুট থেকে শুরু করে এমনকি ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। একই বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত একাধিক ভাস্কর্যের মধ্যে ‘পরিবার’ (১৯৫৮), ‘যুগল’ (১৯৬৯), ‘ইকারুস’ (১৯৬৯) ইত্যাদি কাজে মাধ্যমগত চাহিদার কারণেই অবয়বগুলো সরলীকৃত। ওয়েলডেড স্টিলের ‘জেব্রা ক্রসিং’ (১৯৬৮), দুটি ‘লুনাটিক টোটেম’ ইত্যাদির পাশাপাশি রয়েছে ব্রোঞ্জে তৈরি দণ্ডায়মান অবয়ব। এ ছাড়া কয়েকটি রিলিফ ভাস্কর্য ও স্ক্রল। ‘লুনাটিক টোটেম’ বা ‘মেডিটেশনে’র (১৯৬৮) মতো ভাস্কর্যে শিল্পীর মরমি অনুভবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কোথাও-বা রয়েছে আদিম ভাস্কর্যরীতি থেকে পরিগ্রহণ। বস্তুতপক্ষে ৩৩টি শিল্পকর্মের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১১টিই ছিল পরিত্যক্ত ভাস্কর্য।

৪১ বছর পর প্যারিসে ভাস্কর নভেরা আহমেদের রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী শিল্পকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি। প্রায় ১০০ দিনব্যাপী (১৬ জানুয়ারি থেকে ২৬ এপ্রিল ২০১৪) প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর ১৯৬৯-২০১৪ কাল পর্বের ৫১টি শিল্পকর্ম (৯টি ভাস্কর্য ও ৪২টি চিত্রকর্ম)।

স্বীকৃতি ও অর্জন 

১৯৬১ সালে ভাস্কর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি; পরে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু এরপর তিনি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যান। অনেক পরে তাঁকে নিয়ে জীবনী উপন্যাস রচিত হয়েছে (নভেরা, হাসনাত আবদুল হাই, ১৯৯৪, গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯৯৫), নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র (নহন্যতে, এন রাশেদ চৌধুরী, ১৯৯৯)। জাদুঘরের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল’ নামে।

জীবন সায়াহ্নে

১৯৭৩ সালে নভেরা দেশত্যাগ করে প্যারিসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েন, কিন্তু বড় কোনো আঘাত পাননি। কিন্তু ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে স্ট্রোকের ফলে হুইলচেয়ারে বসেই তাঁর শেষ জীবন কাটাতে হয়। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকেই ২০০৭-এর ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’র অষ্টম খণ্ডে (‘চারু ও কারুকলা’) নভেরা আহমেদকে নিয়ে আলোচনার অন্তিম অনুচ্ছেদে (পৃষ্ঠা ৩৫৮) লালা রুখ সেলিম জানাচ্ছেন, ১৯৬০-এর দশকের পর নভেরা আর বাংলাদেশে ফেরেননি এবং তাঁর বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি। তাঁর নীরবতার পাল্টা জবাবে যেন তাঁর নাম বিস্মৃতিতে হারিয়ে গেল, তাঁর কাজ অবহেলায় এবং অযত্নে ধ্বংস হয়ে গেল। ১৯৬০ সালে নভেরার প্রদর্শনীর ক্যাটালগে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন লিখেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পজগতে একটা ক্ষুদ্র বিপ্লব ঘটে যায় যখন নভেরা আহমেদ নগরের কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের দেয়ালে উচ্চাবচ ভাস্কর্য গড়েন ১৯৫৭ সালে এবং প্রথম প্রাঙ্গণ ভাস্কর্য গড়েন ১৯৫৮ সালে।

বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর নভেরা আহমেদ ছিলেন প্যারিসের ‘অজ্ঞাতবাসে’, রবীন্দ্রনাথের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতো, যাঁকে একদিন ‘মরিয়া’ প্রমাণ করতে হতো যে নভেরা ‘মরে নাই’! শেষমেশ এ বছরের ৬ মে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে যাত্রা করেন অচীনপুরের উদ্দেশে। একজন নভেরা আহমেদকে বাংলাদেশ ভুলে গেছে। একজন নভেরাকে বাংলাদেশ সঠিক মূল্যায়ন করেনি। কথা আছে যে জাতি গুণীর মূল্য দেয় না, সেখানে গুণীর জন্ম হয় না। আর একজন নভেরা আহমেদকে পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হবে হয়তো হাজারো বছর।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top