বগুড়া শহরের ছোট্ট একটি বাজার ফুলতলা। অন্য বড় বাজারের তুলনায় বেচাকেনা; ক্রেতা সমাগম অনেকটাই কম। তাই বলে ব্যবসায়িক দৌঁড়ে সবাই যে পিছিয়ে আছেন তা কিন্তু নয়। চরম প্রতিযোগিতার এ বাজারে এমন কেউ আছেন যাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যে ঈর্ষনীয়। গতানুগতিক ব্যবসায়িদেরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছেন সাফল্য অর্জনে। এমনই একজন সফল ও অভিজ্ঞ নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. সিদ্দিক আলী। শহরের ফুলতলা এলাকায় গোহাইল রোডে অবস্থিত মেসার্স এস এন্ড এইচ এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী তিনি। কিন্তু কিভাবে তিনি নির্মাণপণ্য বিক্রিতে অনন্য হয়েছেন তা জানতে আলাপচারিতা হয় তাঁর সঙ্গে। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের জেষ্ঠ্য আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান সরকার-এর সহায়তায় এবারের ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে জানাবো তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের নানা সাফল্য কথন।
ব্যবসায়ী সিদ্দিক আলীর জন্ম ১৪ আগষ্ট ১৯৬৩, বগুড়ার চককান পাড়ায়। বাবা মরহুম নয়া মদ্দিন ও মা মোছা. মিনী। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ৩য়। তিনি সুলতানগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮০ সালে মাধ্যমিক এবং শাহ সুলতান মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর একই কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে বি.কম পাস করেন। শিক্ষারত অবস্থাতেই তিনি চাকরী জীবনে জড়িয়ে যান। খাদেম ট্রেডার্স নামক একটি আমদানি ও বিপনন প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় ১ যুগ পর চাকরীটি ছেড়ে দেন। এরপর একটি টেক্সটইল মিলের চাকরিতে যোগ দেবার কথা থাকলেও শেষমেশ তা হয়ে ওঠেনি। ফুলতলা বাজারে তাঁদের একটি নির্মাণপণ্যের দোকান ছিল। ব্যবসাটি পরিচালনা করতেন তাঁর ছোট ভাই। যেহেতু নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাই পরিবারের সকলের পরামর্শে ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই ব্যবসা শুরু করেন। এভাবেই একজন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর আত্নপ্রকাশ।
সুদীর্ঘ সময়ের চাকরী জীবন তাঁর। নতুনভাবে ব্যবসা করাটা সহজ ছিলনা। ক্রেতাকে বুঝিয়ে পণ্য বিক্রি করাই ছিল সবচে কঠিন। চাকরির অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কাজে কালে। ব্যবসাকে নিজের আয়ত্তে আনতে কিছুটা ও কৌশলী হন তিনি। এছাড়া যেহেতু তাঁর ভাই আগে থেকে ব্যবসা করতেন এজন্য তাঁদের বেশ পরিচিতিও ছিল। দুই ভাই একত্রে ব্যবসা করাতে ক্রমেই উন্নতি হতে থাকে। সে সময়ে বাজারে আরও দু’টি নির্মাণপণ্যের দোকান ছিল। তাঁদের ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টতায় মাত্র ক’ মাসের সে দোকান দু’টি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাজার চলে আসল তাঁদের দখলে। একচেটিয়া ব্যবসা তখন তাঁদের। কিন্তু বছর না যেতেই আগের বন্ধ দু’টিসহ আরো নতুন দুটি দোকান চালু হল বাজারে। এই সল্প আয়তনের বাজারে এতগুলো দোকান চালু হলে স্বাভাবিক ভাবে ক্রেতা ভাগ হয়ে যাবে। আগের মতো ব্যবসাও হবে না। এ যেন এক নতুন বিপত্তি! পরিস্থিতি সামাল দিতে দু’ভাই মিলে বুদ্ধি পরামর্শ করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা আলাদা ভাবে ব্যবসা করতেন। ছোট ভাই চলে গেলেন নতুন দোকানে। এই সিদ্ধান্তের সুফল মিললেও দেখা দিল নতুন বিপত্তি। যেহেতু তাঁরা উভয়ই পরিচিত তাই ক্রেতারা কার দোকানে যাবেন এ নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল। সমস্যাটির সমাধানে তাঁরা আলাদা আলাদা ব্রান্ডের পণ্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। এতে জটিলতা কিছুটা হলেও লাঘব হল।
নতুন ব্রান্ডের কোন পণ্যের বাজার সৃষ্টির এক অসাধারণ ক্ষমতা ব্যবসায়ী সিদ্দিক আলীর। তিনি চান সতন্ত্রভাবে ব্যবসা করতে। আশপাশের ব্যবসায়ীরা যে ব্রান্ডের পণ্য বিক্রি করেন তিনি তা করেন না। বরং আপ্রাণ চেষ্টা করে ক্রেতাদেরকে গুনগতমানের পণ্য সরবরাহে। এভাবেই তিনি বেঁছে নেন আকিজ সিমেন্ট। পণ্যটি বিক্রিতে অল্প সময়ের মধ্যেই সাফল্য পান। পরপর পাঁচ বার বগুড়া জেলার সর্বোচ্চ বিক্রেতা নির্বচিত হন। এ সাফল্যে সম্প্রতি তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পরিবেশক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়াও সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরুপ কোম্পানির পক্ষ থেকে জয় করেছেন টেলিভিশন, মাইক্রোওভেন, ডিজিটাল ক্যামেরা, ওয়াশিং মেশিন, ল্যাপটপ, মোবাইল, নগদ টাকাসহ নানান উপহারসামগ্রী। এছাড়াও ব্যাংকক, বালি, নেপাল, দার্জিলিং ভ্রমনের অফার পেয়েছেন।
ব্যবসায়ী সিদ্দিক আলী বিয়ে করেছেন ১৯৯১ সালে। স্ত্রী মোছা. মুসলিমা বেগম। সংসারে ১ মেয়ে ও ১ ছেলে। বড় মেয়ে আইরিন আক্তার শিমু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কর্ম বিষয়ে সম্মান ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে মো. মশিউর রহমান আপেল বগুড়া ন্যাশনাল একাডেমি ফর কম্পিউটার ট্রেইনিং অ্যান্ড রিসার্চ (NACTAR)-এ উচ্চ মাধ্যমিক পড়ছে। ব্যবসাতে তাঁকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন তাঁর আত্নীয় ও ম্যানেজার মো. আল আমিন।
সততা, আদর্শ ও নীতিই ব্যবসার মূল সম্পদ। এগুলোকে ধারণ করেই ব্যবসা করেন সিদ্দিক আলী। এজন্যই সকলে তাঁকে বিশ্বাস করেন; ভালবাসেন। যা কিছুই ঘটুক না কেন তিনি তাঁর নীতি বজায় রেখে ব্যবসা করবেন চিরদিন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৫