একজন কামেল পীর গড়ে তোলেন অসংখ্য ভক্ত, মুরিদ। কিন্তু একজন কামেলে মোকাম্মেল শুধু মুরিদই নন, তাঁদের মধ্যে অনেককেই পীর হিসেবেও বাইয়াত দান করেন। সুফি সাধক; পীর খাজা মোহাম্মদ ইউনুস আলী এমনই এক কামেলে মোকাম্মেল। তিনি ইসলামের অমিয় বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন লাখো মুসলিমের হৃদয়ে। ছিলেন বিলাসী জীবনের চরম বিরোধী। সমাজসেবামূলক কাজে রেখেছিলেন অনন্য অবদান। সুলতানুল আউলিয়া আর চিরস্থায়ী সংস্কারের জন্য ভক্তরা তাঁকে ডাকেন আখেরি মুজাদ্দেদ বলে। পীর খাজা এনায়েতপুরী নামে সর্বজন পরিচিত মহান এই আউলিয়ার জন্ম ও ওফাত শরিফ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার এনায়েতপুরে। তাঁর জন্মধন্য এই জনপদটি ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশেষ করে তাঁতশিল্পে বেশ সমৃৃদ্ধ। আধ্যাত্মিক এ এলাকারই একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী ডা. মনিরুজ্জামান ফরহাদ। মাজার শরিফ রোডে অবস্থিত মেসার্স রয়েল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামানের সহযোগিতায় এবারের ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে জানাব তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের সফলতার গল্প।
ব্যবসায়ী ফরহাদের জন্ম এনায়েতপুরে। বাবা মরহুম ডা. আবদুল কাদের ও মা নাজমা কাদের। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। এনায়েতপুর ইসলামী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে মাধ্যমিক এবং বেলকুচি ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ময়মনসিংহ হোমিওপ্যাথি কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল থেকে ব্যাচেলর অব হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল সায়েন্স (BHMS)-এ উত্তীর্ণ হন ২০০৭ সালে। বর্তমানে তিনি দারুল ইহসান ইউনির্ভাসিটি, রাজশাহীতে ইসলামের ইতিহাসে মাস্টার্স করছেন। তাঁর বাবাও ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। হোমিওপ্যাথি বিষয়ে সম্মান সম্পন্ন করার পর তিনি ডাক্তারি চর্চার পাশাপাশি একজন সিমেন্ট ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত হন ফরহাদ। ২০০৯ সালের কথা। চলছে তাঁর বাড়ির নির্মাণকাজ। এ জন্য প্রয়োজন প্রচুর সিমেন্ট। সিমেন্টগুলো রাখার জন্যই অনেকটা দোকানের মতো করেই একটি ঘর তৈরি করেন। কিন্তু বিশেষ কারণবশত বাড়ির নির্মাণকাজ বেশ কয়েক দিনের জন্য পেছাতে হয়। এদিকে সিমেন্টও বেশি দিন ফেলে রাখলে জমাট বেঁধে যাবে! এতগুলো সিমেন্টের গতি কী হবে? তখন তিনি বুদ্ধি করে সেগুলোকে বিক্রি করে দিতে চাইলেন। ঘরটিই হলো তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দিন কয়েকের মধ্যে সব সিমেন্ট বিক্রিও হয়ে গেল। এ বিষয়টি তাঁকে এ ব্যবসায় যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করল। নিজের বাড়ির নির্মাণকাজের সম্পূর্ণটাই করলেন আকিজ সিমেন্টে। পণ্যটির গুণ-মানে মুগ্ধ হয়ে পরে শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট বিক্রি। এখনো তিনি একটি মাত্র ব্র্যান্ডের সিমেন্ট নিয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর নিজস্ব ব্যবসা।
ব্যবসায়ী ফরহাদ এনায়েতপুরে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। পরিচিতির ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে চলেছে তাঁর ব্যবসা। এনায়েতপুর খুব বড় বাজার না হলেও প্রচুর পরিমাণে সিমেন্ট বিক্রি হয় তাঁর দোকানে। অত্র এলাকায় যত নির্মাণ এবং উন্নয়নকাজ হয়, তার সিংহভাগ সিমেন্টই তিনি সরবরাহ করেন। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলায় সর্বোচ্চ আকিজ সিমেন্ট বিক্রেতা তিনি। কোম্পানি ঘোষিত সব অফারেরই যোগ্য দাবিদার। গত দুই বছরে অর্জন করেছেন সেরা সিমেন্ট বিক্রেতার সম্মান। সাফল্যের এমন স্বীকৃতিস্বরূপ আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন ওয়াশিং মেশিন, মোবাইল, নগদ টাকাসহ নানা উপহার। এ ছাড়া কোম্পানির পক্ষ থেকে দেশের বাইরে ঘুরে এসেছেন থাইল্যান্ড, ভুটান আর দেশের ভেতর ঘুরেছেন কক্সবাজার।
সিমেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ফরহাদের রয়েছে ধান, আলু, কাপড়, ইট ও অন্যান্য ব্যবসা। এসব নিয়ে তিনি এতটাই ব্যস্ত যে সিমেন্ট ব্যবসায় ঠিকমতো সময়ই দিতে পারেন না। তাতে যে খুব অসুবিধা হয় তা কিন্তু নয়। সেটা খুব ভালোভাবেই সামলে নেন তাঁরই আত্মীয় কাম ম্যানেজার মো. মোতালেব মোল্লা। সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতা দিয়েই ব্যবসাটিকে আগলে রেখেছেন তিনি। যেহেতেু ফরহাদ একজন হোমিও ডাক্তার, তাই ব্যবসার পাশাপাশি মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেন। তিনি এনায়েতপুর পাকদরবার শরিফ চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির পরিচালক। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সেখানে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। যমুনার বুক চিরে গড়ে ওঠা এনায়েতপুর প্রতিবছরই হয় বন্যাকবলিত। সে সময়ে ঘরভাঙা মানুষের যথাসম্ভব সহায়তা করা অনেকটাই যেন মানবিক নিয়মে পরিণত করেছেন তিনি। এ ছাড়া এলাকার খেলাধুলা, সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে যথাসম্ভব সম্পৃক্ত রাখেন নিজেকে।
ব্যবসায়ী ফরহাদের জন্ম এমন এক পুণ্যভূমিতে, যেখানে জন্মেছেন সাধক ইউনুস আলী। এ জন্য নিজেকে ধন্য মনে করেন তিনি। ব্যবসা হয়তো এনে দেয় অর্থ, সম্মান, প্রতিপত্তি। তবে ব্যবসার কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া ঠিক নয় কখনোই। কেননা সব প্রয়োজনই মানুষের জন্য। বর্তমান ব্যবসাকে সঙ্গী করেই সামনে এগোতে চান। একটি রোটার স্পিনিং মিল করাই তাঁর এখনকার স্বপ্ন। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে মিলটির নির্মাণকাজ। মিলটি চালু হলে তাঁর ব্যবসায়িক জীবনে যোগ হবে নতুন এক প্রাপ্তি!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৫