স্বপ্ন যাঁর আকাশ ছোঁয়ার

এসেছি লিচুর দেশে। সুগন্ধি চালের জনপদ বললেও ভুল হবে না। অথবা বলা যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগে জন্ম নেওয়া হিমালয়ের এক কন্যার বাড়ি, যেখানে রয়েছে মনোমুগ্ধকর কান্তজি মন্দির, রামসাগর, শৈল্পিক মাটির বাড়ি আরও কত কী! বলছি সমৃদ্ধ প্রাচীন এক জনপদ; দিনাজপুরের কথা। এসব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছেন ব্যবসায়ী তীর্থ গোপাল দাস আর তাঁর পরিবার। যে বাড়িতে তীর্থ পরিবারের বাস, বয়সে তা সাড়ে তিন শ বছরের বেশি ছাড়া কম হবে না। ব্যবসা সূত্রে বড় বন্দর, কালীবাড়ি সড়কের দাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী। এলাকার একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে তাঁরই সাফল্য-কাহিনি।

ব্যবসায়ী তীর্থ দাসের জন্ম ১৯৭৭ সালের ২১ জানুয়ারি দিনাজপুর শহরে। বাবা স্বর্গীয় রেবতী রঞ্জন দাস ও মা করুণা দাস। সাত বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। তিনি মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৫ সালে দিনাজপুর আদর্শ মহাবিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। এরপর চিরিরবন্দর ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বরাবরই চাকরি থেকে ব্যবসার প্রতিই ঝোঁক ছিল বেশি। এ জন্য ব্যবসায়ী হিসেবেই শুরু কর্মজীবনের। অনেকটা সময় ধরে এলাকায় করেছেন ঠিকাদারি। এর পাশাপাশি কয়েক বছর যাবৎ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের পরিবেশক স্বত্ব নিয়ে ব্যবসাও করেছেন। পারিবারিক ব্যবসা কাঁসা-পিতলের। সেখানেও সময় দিতেন কখনো কখনো। বছর দুই হলো শুরু করেছেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। পণ্য তালিকায় রয়েছে সিমেন্ট, রড ও সিলিন্ডার গ্যাস। পাশাপাশি তিনি পরিবহন, ইট ও ফিলিং স্টেশন ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত।

নির্মাণপণ্য জগতে নবীন ব্যবসায়ী হলেও এরই মধ্যে দেখিয়েছেন অসাধারণ সাফল্য। ২০১৩ সালে আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে দিনাজপুরে হন প্রথম। পরবর্তী সময়ে অর্জন করেন প্রাইম সেলার হওয়ার গৌরব। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে ঘুরে এসেছেন নেপাল। দিনাজপুরে নামকরা নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী থাকলেও মাত্র এক বছরের মধ্যে এমন ব্যবসায়িক সাফল্য সত্যিই বিস্ময়কর। এই অর্জনই তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আত্মবিশ্বাসী করেছে, যাকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলছেন দুর্বার গতিতে।

নির্মাণপণ্য ব্যবসার শুরুতে স্থানীয় পর্যায়ে তিনি সিমেন্ট সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করতেন। এই সময়ে তাঁর কাছ থেকে পণ্য কিনতেন বন্ধু, পরিচিতজন ও শুভাকাক্সক্ষীরা। লাভজনক ব্যবসা হলেও ব্যাপক পরিসরে এগোতে না পারলে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবেই থাকতে হবে। এ জন্য বড় প্রকল্পগুলোতে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এই ভাবনা থেকেই ছুটে যেতেন বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে। পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে বোঝাতেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। কিন্তু তাঁরা তা শুনবেন কেন? আশাহত হলেও দমে যাননি। দিনাজপুরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটেছেন মোটরবাইকে। দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। অনেকে পণ্যের গুণাগুণ পরীক্ষা করে তাঁর কথার সত্যতা পেয়েছেন। তাঁরা নিম্নমানের সিমেন্টের পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন ফ্লাই অ্যাশবিহীন আকিজ সিমেন্ট। এভাবেই নিজ এলাকায় সবার কাছে পরিচিতি পান তিনি ও তাঁর প্রতিষ্ঠান। অনেক বড় বড় প্রকল্পে তিনি আকিজ সিমেন্ট সরবরাহ করেছেন। এভাবেই এসেছে তাঁর সফলতা। এ অগ্রযাত্রায় সঙ্গী হয়েছেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম। সব ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে বাজার সৃষ্টিতে সমান অবদান রেখেছেন তিনি। এ জন্য ব্যবসায়ী তীর্থ কৃতজ্ঞ তাঁর প্রতিও। 

সফল এ ব্যবসায়ী বিয়ে করেছেন ২০০৪ সালে। সহধর্মিণী জয়া দাস। তাঁদের একমাত্র মেয়ে দেবলিনা দাস ঝুমুর, স্থানীয় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল টিউলিপ ইন্টারন্যাশনালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। সব বোনের বিয়ে হয়েছে। বাড়িতে পরিবার ছাড়াও রয়েছেন মা ও ভাইয়ের পরিবার। বড় ভাই নিত্য গোপাল দাস দেখাশোনা করেন পারিবারিক ব্যবসা। আগে কিছুটা সময় পেলেও বর্তমানে বেড়েছে তাঁর ব্যবসায়িক ব্যস্ততা। তা সত্ত্বেও যতটুকু পারেন স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেন। তাঁদের নিয়ে বেশ কয়েকবার ভারতে বেড়িয়ে এসেছেন। সেখানে তাঁর বোন ও অন্যান্য আত্মীয়রা থাকেন। অবসর পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন। ব্যাডমিন্টন খেলা তাঁর ভীষণ প্রিয়। খেতে পছন্দ করেন পান্তা-ইলিশ। একসময় জড়িত ছিলেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে। মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। ভারত ও ঢাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অভিনয় করেছেন। নিজস্ব ব্যান্ডদল ছিল, যেখানে তিনি গিটার বাজাতেন। এলাকার দোকান মালিক সমিতি ও কেন্দ্রীয় কালীমন্দিরের কার্যকরী কমিটির একজন সদস্য। স্থানীয় একটি এনজিওর (পিডিপি) সদস্য হিসেবেও দায়িত্বরত। এ ছাড়া এলাকার বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি।

স্বল্প সময়ে ব্যবসাটা অনেকটাই গোছানো গেলেও এখনো খুচরা পর্যায়ে ব্যবসা করছেন তীর্থ দাস। তবে বাড়াতে চান ব্যবসার পরিসর। একজন পরিবেশক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর। ছোট-বড় সাফল্য তাঁকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু এখনই তিনি পরিবেশকের মতো গুরুদায়িত্ব নিতে চান না। আরও একটু গুছিয়ে নিতে চান। যেন এখানেও তিনি সমান সফল হতে পারেন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top