ক্রেতা সন্তুষ্টিই যাঁর অঙ্গীকার

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত আর বিশ্ববরেণ্য বাউলসম্রাট লালন শাহের তীর্থভূমি কুষ্টিয়া। পদ্মা-গড়াই নদীঘেরা জনপদটি শিক্ষা-সাহিত্যে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ও শিল্পে বেশ প্রসিদ্ধ। কিন্তু সম্প্রতি দেশব্যাপী চলা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই স্থবির। বিপাকে  ব্যবসায়ীরা। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বড়বাজার, কুষ্টিয়ার এস সি ব্যানার্জি সড়কের পাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী নিখিল কুমার পাল। এলাকার একজন সফল সিমেন্ট ব্যবসায়ী হিসেবে যার পরিচিতি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমের সহায়তায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব তাঁরই সাফল্য-কাহিনি।

ব্যবসায়ী নিখিল পালের জন্ম ১৯৫৩ সালে কুমারখালী, কুষ্টিয়ার সাওতা গ্রামে। বাবা স্বর্গীয় নরেন্দ্রনাথ পাল ও মা স্বর্গীয়া শান্তিবালা পাল। মোহিনী মোহন বিদ্যাপীঠ থেকে ১৯৬৯ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৭৫ সালে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপরই শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। যোগ দেন চাকরিতে। ছয় মাস পরে তা ছেড়েও দেন। ভালো লাগেনি; চাকরিকে নিজেকে পরাধীন মনে হতো। তাই শুরু করেন ব্যবসা। আত্মপ্রকাশ নির্মাণপণ্য বিক্রেতা হিসেবে। সিমেন্ট দিয়েই শুরু। এখনো তাঁর ব্যবসা বলতে ওই একটি মাত্র নির্মাণপণ্যই।

সিমেন্ট ব্যবসা এখন তুলনামূলক লাভজনক হলেও আগে তেমন মুনাফা থাকত না। তা ছাড়া এখনকার মতো এতো অবকাঠামোও নির্মিত হতো না তখন। বলা চলে অনেকটা সংগ্রাম করেই তিনি এ ব্যবসাকে আঁকড়ে রেখেছেন। কিন্তু কখনোই ন্যায়-নীতি-আদর্শকে জলাঞ্জলি দেননি। বরং সব সময় ক্রেতাদের পণ্যের গুণগত মান; ভালো-মন্দ সম্পর্কে বুঝিয়েছেন। কখনোই মানহীন পণ্য বিক্রি করেননি। এভাবেই এ জগতে তিনি ক্রেতাদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেছেন। ফলে তাঁর ব্যবসার প্রসারও ঘটেছে দ্রুত। অধিক পণ্য বিক্রির সুবাদে কোম্পানির তরফ থেকে পেয়েছেন উপহার ও সম্মাননা। বিভিন্ন সময়ে উপহারস্বরূপ জিতে নিয়েছেন টেলিভিশন, হ্যান্ডিক্যাম, মাইক্রো ওভেন, মোবাইল, নগদ টাকাসহ নানান সামগ্রী। এ ছাড়াও আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে ঘুরে এসেছেন নেপাল ও কক্সবাজার।

দীর্ঘ সময় একটি পণ্যকেই আঁকড়ে আছেন ব্যবসায়ী নিখিল পাল। নির্মাণপণ্যের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে এ এক বিরল দৃষ্টান্ত। কারণ, এই ব্যবসাটি যাঁরা করতে আসেন সাধারণত তাঁরা বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী যোগ করে ব্যবসার পরিসর বাড়াতে চেষ্টা করেন। অর্থাৎ সিমেন্ট, রড, ঢেউটিন, স্যানিটারিসামগ্রী, টাইলসসহ নানা নির্মাণপণ্য ব্যবসায় যুক্ত হন। অথচ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পথে হাঁটেননি তিনি। একটি পণ্যকেই আঁকড়ে ধরেই বাড়িয়েছেন নিজস্ব পরিচিতি; এনেছেন ব্যবসায়িক সাফল্য। সংসারের সব ধরনের ব্যয় বহন করেও সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বাড়ি করেছেন শহরে। দোকান ছাড়াও রয়েছে তাঁর নিজস্ব গোডাউন।

ব্যবসায়ী নিখিল পাল বিয়ে করেছেন ১৯৭৮ সালে। সহধর্মিণী শেফালী রানী পাল। তাঁদের দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে নিরঞ্জন কুমার পাল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ছোট ছেলে সৌরভ কুমার পাল কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক পড়ছে। পড়ালেখার ফাঁকে সাহায্য করে বাবার ব্যবসায়। মেয়ে স্বপ্না রানী পাল গৃহিনী। সারা দিন ব্যবসা নিয়েই সময় কাটে নিখিল পালের। এরপর সময় দেন সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে। বড়বাজার দোকান মালিক সমিতি ও কুষ্টিয়া সিমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য তিনি। বড়বাজার মন্দির কমিটিতে রয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন পূজা-পার্বণে রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি।

প্রায় ৪০ বছর ধরে এলাকায় ব্যবসা করছেন নিখিল পাল। তাঁর মতো আরও অনেকেই এ ব্যবসায় এসেছিলেন। কিন্তু সবাই নিজ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে পারেননি। তিনি ব্যবসা করছেন সুনামের সঙ্গে। কম মুনাফা করলেও কখনো কম মূল্যে বা লসে পণ্য বিক্রি করেননি। সব সময় পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ রাখেন যেন কোনো ক্রেতা ফিরে না যায়। অনেকে হয়তো মাত্র কয়েক ব্যাগ সিমেন্ট নিয়ে ব্যবসা করেন। কোনো ক্রেতার অধিক পণ্য প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম ব্যবসায়ী নিখিল। সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ দিনের ব্যবসার ফলে গড়ে উঠেছে অত্যন্ত সুসম্পর্ক। ফলে তিনি কোম্পানির সহায়তায় চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারেন। কিন্তু নতুন ব্যবসায়ীদের অনেকের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। এই ব্যবসায় ভালো করতে প্রচুর ধৈর্যের দরকার। যত দিন যাবে অভিজ্ঞতা বাড়বে ততই, মানুষ চিনবে, জানবে। নীতি, আদর্শ ও লেনদেন ভালো থাকলেই পারবেন সামনে এগোতে। তাই নবাগত ব্যবসায়ীদের প্রতি তাঁর আহ্বান সততার সঙ্গে ব্যবসা করার।

কুষ্টিয়া একটি শিল্পসমৃদ্ধ জেলা শহর। দিন দিন শহরটি উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। চোখের সামনেই নিখিল পাল দেখছেন এসব উন্নয়ন। একজন নির্মাণপণ্যের ব্যবসায়ী হিসেবে তিনিও এসব উন্নয়নের অংশীদার। কিছুটা সংগ্রাম করে হলেও সুন্দরভাবে পরিবার চালাতে পেরেছেন এটাই তাঁর ব্যবসায়িক সন্তুষ্টি। বয়স হওয়ায় এখন সংসারের হাল ধরার পালা সন্তানদের। তবু যত দিন সম্ভব নিজেই এই ব্যবসাটি করে যেতে চান।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top