সফলতার লক্ষ্যে একাগ্র যিনি 

বাংলাদেশের নিসর্গভূমি সিলেট। হাওর-বাওড়, চা-বাগান, পাহাড়-টিলা, বন-বনানী আর জীববৈচিত্র্যের বিশাল সম্ভার রয়েছে এই জনপদে। পর্যটনে সিলেটের গুরুত্ব অপরিসীম। এ ছাড়া বালু, পাথর ও অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যে সিলেটের সুনাম ও জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান অনস্বীকার্য। এই সমৃৃদ্ধ জনপদের একজন সফল ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তা মো. রায়হান মাসুদ (রাসেল)। আম্বরখানা, সিলেটের ‘মেসার্স ইজাফা ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধনের নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব সফল এ মানুষটির সফলতার কাহিনি। সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান।

ব্যবসায়ী রায়হান মাসুদ (রাসেল)-এর জন্ম ১৯৭৫ সালের ১০ জুলাই আম্বরখানা, সিলেটে। বাবা মরহুম আবদুর রব ও মা রায়হানা চৌধুরী। পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় তিনি। বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী। ১৯৯১ সালে সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৯৩ সালে সরকারি এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৯৫ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে বিকম সম্পন্ন করেন। এরপর রহমান রহমান হক সিএ ফার্ম থেকে সিএ (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট), সিসি কোর্স সম্পন্ন করেন ২০০১ সালে। এরপর সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে করেন মাস্টার্স প্রিলিমিনারি। এরপর শুরু হয় তাঁর ব্যবসায়িক জীবন। ২০১৭ সালে জড়িয়ে পড়েন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্টের সিলেট টেরিটরির ডিলার।

শিক্ষাজীবন শেষে ২০০২ সালে সিলেট ফিরে আসেন ব্যবসায়ী রায়হান মাসুদ। মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারী একটি হ্যাচারির ফাইন্যান্স ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নাইনটিন নামে একটি ইনডোর স্পোর্টস জোন ও বিনোদন কেন্দ্র। পাশাপাশি শেয়ার ব্রোকার হাউসের একটি শাখাও স্থাপন করেন। ২০১০ সালে ৪ জন অংশীদার মিলে সিলেটের জিন্দাবাজারে ‘পানশী’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে ওই রেস্টুরেন্টেরই একটি শাখা খোলেন মৌলভীবাজারে ও ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলে। পরের বছর সিলেটের জিন্দাবাজারে পানশী ফুড নামে চালু করেন আরেকটি রেস্টুরেন্ট। ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতেও ওই বছর চালু করেন পানশীর আরেকটি শাখা, যদিও পরে সেটি বন্ধ করে দেন। এ ছাড়া পানশী ইন নামে একটি আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এবং পানশী বাজার নামে সিলেট নগরে গড়ে তোলেন একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। ২০১৬ সালে এককভাবে ইজাফা  ট্রেডিং-এর ব্যানারে গ্রহণ করেন আকিজ সিমেন্টের ডিলারশিপ। সম্প্রতি অংশীদারির ভিত্তিতে ডাক বিভাগের মোবাইলে লেনদেন-বিষয়ক নতুন সেবা নগদ-এর সিলেট ও হবিগঞ্জের ডিলারশিপ নিয়েছেন।

ব্যবসায়ী রাসেল ছিলেন পড়ালেখায় তুখোড় মেধাবী। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতো একটি প্রসিদ্ধ বিশেষায়িত বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করেছেন। অবশ্যই একটি বড় চাকরি করতে পারতেন। কিন্তু তেমনটি করেননি। বেছে নিয়েছেন ব্যবসা। কারণ, ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা। তা ছাড়া নিজের অর্জিত জ্ঞান ও মেধা দিয়ে কিছু করতে চেয়েছিলেন বরাবরই। আর তা করে দেখিয়েছেন; সফলও হয়েছেন। বিভিন্ন ব্যবসা গড়ে তোলার পরেও যেন তিনি তৃপ্ত হতে পারছিলেন না। কারণ, ইচ্ছে ছিল বড় পরিসরে ডিলারশিপের ব্যবসা করার। আকিজ সিমেন্টের ডিলারশিপ গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর সে ইচ্ছে পূরণ হয়। তাঁর বিশ^াস ছিল যেহেতু তিনি সিলেটে জন্মেছেন; বড় হয়েছেন সেহেতু নিজের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটানো সহজ হবে। তা ছাড়া সিলেটে নির্মাণপণ্যের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এখানে নির্মাণপণ্য নিয়ে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। 

ব্যবসায়ী রায়হান মাসুদ বিয়ে করেন ২০০৩ সালে। তাঁর স্ত্রী তৌহিদা বেগম। তিনি এবি ব্যাংকে কর্মরত। এ দম্পতির দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে নাভিন রায়হান আদ্রিয়ান আনন্দ নিকেতন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মেজো মেয়ে ইজাফা ইবতেসাম একই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট ছেলে আরভিন রায়হান আইনানের বয়স প্রায় দেড় বছর। দুজনের ব্যস্তমুখর সময়ে সন্তানদের সময় কাটে তাদের দাদির আদরেই। অবসর পেলেই ব্যবসায়ী রাসেল সúরিবারে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যান। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গেও জড়িত। তিনি রোটারি ক্লাবের একজন সদস্য। ভালোবাসেন পুল খেলতে, ঘুরতে ও ফটোগ্রাফি করতে। কখনো কখনো মেতে ওঠেন গানের সুরে। 

ব্যবসায়ী রায়হান মাসুদের ব্যবসায়িক সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর সুব্যবসায়ী হয়ে ওঠার মানসিকতা। এ ছাড়া মেধা, মনন, একাগ্রতা ও পরিশ্রম সফলতার অন্যতম হাতিয়ার। তা ছাড়া বিশ^াস করেন ব্যবসা উন্নয়নের চিরন্তন সূত্র, ‘স্বল্প মুনাফায়, অধিক সেবা’। এসব পুস্তকী সূত্রের বাইরেও তাঁর সাফল্যের পেছনে রয়েছে ভিন্ন এক গল্প। কিশোর বয়সে বাবা মারা যান। তখন তাঁর মা শিক্ষকতা করে সংসার চালিয়েছেন। অনেক হিসাব করে এগোতে হয়েছে জীবনে। কিন্তু কখনোই সম্মানকে বিকিয়ে দেননি! সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছেন। সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত। এক সন্তান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অন্যজন আর্কিটেক্ট। কষ্টে গড়া এই সংসারের উন্নয়নের কথাই ভেবেছেন রাসেল সব সময়। নিজের কথা কখনোই চিন্তা করেননি। পরিবারের সবার হাসি মুখটা দেখতে চেয়েছেন। বিশেষ করে মায়ের। পরিবারের সবাইকে সুখী করতেই তিনি এত কিছু গড়ে তুলেছেন। এখন তাঁর ইচ্ছে বিভিন্ন নির্মাণপণ্যের ডিস্ট্রিবিউটর হওয়া এবং সেগুলোকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা, যেন কেউ বাড়ি বানাতে চাইলে এক জায়গায় সব ধরনের নির্মাণপণ্য পায়।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top