একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সকলে তাঁকে আদর্শ মানলেও ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে অনেক ব্যবসাতেই হয়েছেন ব্যর্থ। ব্যক্তিজীবন ও সংসারেও তখন নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। অথচ কঠিন ক্রান্তিকালেও তিনি ভেঙে পড়েননি। অবিচল ছিলেন নিজের সততায়, সাহসে। তাঁর এমন দৃঢ়চেতা মনোভাবেই সফল ব্যবসায়ী হতে পেরেছেন, পেয়েছেন অভাবনীয় সাফল্য। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এবারের সফল ব্যবসায়ী হাজি মো. বাবুল মিয়া। শিবু মার্কেট, লামাপাড়া, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জের ‘মেসার্স বাবুল আয়রন স্টোর’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। এবারের যাত্রায় সহসঙ্গী আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম।
ব্যবসায়ী হাজি মো. বাবুল মিয়ার জন্ম ১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর লামাপাড়া, নারায়ণগঞ্জে। বাবা মরহুম আক্কাস আলী ও মা মরহুমা মোছা. আম্বিয়া খাতুন। তিনি ১৯৮২ সালে ফতুল্লা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর জড়িয়ে পড়েন মামাদের ইটভাটার ব্যবসায়। ব্রিটিশ আমল থেকেই তাঁরা কেরানীগঞ্জ এলাকার প্রভাবশালী সফল ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রারম্ভে তিনি ইটভাটায় ব্যবহৃত কয়লা সরবরাহ করতেন। কিশোর বয়সেই কয়লা কিনতে তিনি পাড়ি দিয়েছেন সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, শেরপুরসহ দেশের নানা প্রান্তে। এই ব্যবসায় কিছুটা থিতু হলে তিন বন্ধু মিলে চালু করেন ইটভাটা। কিন্তু ব্যবসাটিতে তিনি সফল হতে পারেননি বরং অনেক মূল্যবান পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছে ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে আরেক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে শুরু করেন ইটভাটায় মাটি সরবরাহের ঠিকাদারি। কিন্তু তাতেও মেলেনি আশানুরূপ সাফল্য। অবশেষে ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর পরামর্শ ও সহায়তায় শুরু করেন ২০১৪ সালে রড-সিমেন্ট ব্যবসা। বিক্রয়পণ্য হিসেবে বেছে নেন আকিজ সিমেন্ট। এই নির্মাণপণ্যটিই তাঁকে এনে দেয় সাফল্য। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ফতুল্লা টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ রিটেইলার।
নির্মাণপণ্য ব্যবসার সাফল্য তাঁকে অনুপ্রাণিত করে দারুণভাবে। ধারাবাহিক ব্যবসায় উন্নয়নে অতীতের ব্যর্থতাকে ঝেড়ে ফেলে প্রত্যয়ী হন এগিয়ে যেতে। ফলে সিমেন্ট ব্যবসার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার পরও কিছুদিনের মধ্যেই পণ্যটি বিক্রিতে তিনি অভ‚তপূর্ব সাফল্য অর্জন করেন; হয়ে ওঠেন ফতুল্লা টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। শুরু থেকেই তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ঢাকা সাউথ এরিয়ার সেরা বিক্রেতা। বরাবরই তিনি হন অত্র এলাকার সর্বোচ্চ সিমেন্ট বিক্রেতা। এমনকি ২০১৯-২০ অর্থবছরে তিনি জাতীয় পর্যায়ে সপ্তম সর্বোচ্চ রিটেইলারের খেতাব অর্জন করেন। তাঁর অভূতপূর্ব এমন সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন এক্সিও গাড়ি, মোটরসাইকেল, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ, স্মার্ট টিভি, ল্যাপটপ, মাইক্রো ওভেন, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার।
সফল ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া নির্মাণপণ্য ব্যবসায় সাফল্য পেলেও আগের ব্যবসায় তেমনটা হয়নি; এর রহস্যটা কী? সেক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, অনেক কম বয়সে ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়ায় ব্যবসার অনেক কৌশল বুঝতে সময় লেগেছে। তা ছাড়া যাঁদের সঙ্গে তিনি ব্যবসা করেছেন, তাঁরাও তাঁকে নানাভাবে প্রতারিত করেছে; যথাযথভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেনি। তবে ব্যর্থ হলেও নিজের সততা কখনো বিকিয়ে দেননি; নেননি ছল-চাতুরীর আশ্রয়। ঈমানি শক্তির ওপর বিশ্বাস রেখে ব্যবসা চালিয়ে গেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল সততা থাকলে একদিন না একদিন ব্যবসায় সফলতা আসবেই। তা ছাড়া এলাকার সবাই সৎ মানুষ হিসেবেই তাঁকে জানে বিধায় পণ্য কিনতে তাঁর প্রতিষ্ঠানকেই বেছে নেয়।
ব্যবসায়ী হাজি বাবুল মিয়া বিয়ে করেছেন ১৯৮৬ সালে। স্ত্রী হাজি মোছা. রিনা পারভীন। এ দম্পতির ৩ ছেলে ২ মেয়ে। বড় ছেলে মাসুদ রানা (আব্দুল) ব্যবসা দেখে, ২য় ছেলে হাজি রনি আহমেদ ‘ইয়ান এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি নির্মাণপণ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী, ৩য় মেয়ে জুবাইদা আক্তার আনিকা সরকারি তুলারাম কলেজে এলএলবিতে অধ্যয়নরত, ৪র্থ মেয়ে সাবিকুন্নাহার মৌসুমী বিবাহিতা এবং ৫ম ছেলে আবু হুরায়রা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় সদ্য ভর্তি হয়েছে। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। তিনি পশ্চিম লামাপাড়া দর্গাবাড়ি জামে মসজিদ ও লামাপাড়া লাল খাঁ রামারবাগ কবরস্থান কমিটির কোষাধ্যক্ষ। বর্তমানে তাঁর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছে ২ জন ম্যানেজারসহ অন্তত ১২ জন শ্রমিক-কর্মচারী।
একনজরে
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম: মেসার্স বাবুল আয়রন স্টোর
অবস্থান: শিবু মার্কেট, লামাপাড়া, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
ব্যবসা শুরু: ২০১৪ সালে
নির্মাণপণ্য: সিমেন্ট-রড
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৩০তম সংখ্যা, জুন ২০২১