সততায় কোনো আপস নয়

আর এক দিন পরেই শুরু হবে এলাকাবাসীর প্রাণের উৎসব ‘নৌকাবাইচ’। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন উপভোগে শহরজুড়ে তাই উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ঘাটে ভিড়েছে বাহারি সব নৌকা। উৎসবের সেই ক্ষণে সফল ব্যবসায়ীর খোঁজে হাজির হয়েছি যমুনাপারের জনপদ সিরাজগঞ্জে। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এবারের সফল ব্যবসায়ী মো. মোজাহারুল ইসলাম (ফিরোজ)। নিউ ঢাকা রোড, সিরাজগঞ্জের ‘মেসার্স অনিক মটরস্’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বিশ^াস।

ব্যবসায়ী মো. মোজাহারুল ইসলামের জন্ম ১৯৭৯ সালের ১০ আগস্ট সিরাজগঞ্জে। বাবা মরহুম তজিম উদ্দিন শেখ ও মা মরহুমা সুরাতুন নেসা। তিনি ১৯৯৪ সালে এস বি রেলওয়ে কলোনি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৬ সালে সিরাজগঞ্জ বিশ^বিদ্যালয় কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বড় ভাইয়ের ব্যবসা সূত্রে ব্যবসায়ী ফিরোজ বাল্যকাল থেকেই জড়িয়ে পড়েন ব্যবসার সঙ্গে। স্কুলে পড়াকালীনই তিনি পণ্য কিনতে সিরাজগঞ্জ থেকে পাড়ি দেন চট্টগ্রামে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে পণ্য আনা-নেওয়ার কাজটিও করেছেন। ছিলেন ক্যারিং কন্ট্রাকটর। পাথর, কয়লা ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন। ১৯৯৭ সালে শুরু করেন নিজস্ব পণ্য পরিবহন ব্যবসা। পরে সম্পৃক্ত হন গাড়ির টায়ায়, ব্যাটারি ও লুব্রিকেন্ট ব্যবসার সঙ্গে। এসব ব্যবসায় বেশ সাফল্য পেলেও অতৃপ্তিটা যেন থেকেই যায়! এমন একটি ব্যবসা করতে চাচ্ছিলেন, যা তাঁকে প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। একপর্যায়ে বন্ধুপ্রতিম কয়েকজন ব্যবসায়ীর পরামর্শে ২০১৯ সালে শুরু করেন সিমেন্ট ব্যবসা। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির সিরাজগঞ্জ টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ ডিলার।

সিমেন্ট ব্যবসার পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকার পরও ডিলারশিপ নিয়ে বড় পরিসরে ব্যবসা শুরু করা সত্যিই বিরল ঘটনা। একজন ব্যবসায়ীর জন্য যা রীতিমত চ্যালেঞ্জিংও বটে। কিন্তু ব্যবসায়ী ফিরোজ জেনে-বুঝেই নিয়েছেন এমন চ্যালেঞ্জ। কারণ, দেশের প্রথম সারির কিছু টায়ার, ব্যাটারি, লুব্রিকেন্ট ও মোটরসাইকেলের ডিলার-ডিস্ট্রিবিউর ব্যবসা তিনি করেছেন এবং করছেন। এসব পণ্যের মধ্যে অনেকগুলোর দেশসেরা বিক্রেতার খেতাব রয়েছে তাঁর। তা ছাড়া আকিজ সিমেন্টের ডিলারশিপ নেওয়ার আগে তিনি বিভিন্ন সিমেন্ট কোম্পানির সভা, সেমিনার ও ট্যুরে অংশ নিতেন। ফলে সিমেন্টের ব্যবসা না করলেও পণ্যটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন আগেই।

ব্যবসায়ী মোজাহারুল ইসলাম ফিরোজ বিয়ে করেন ২০০১ সালে। স্ত্রী মিসেস ফাতেমা ফিরোজ। এ দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. তানজিদ অনিক, সবুজ কানন উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। মেয়ে লাইবা অরিন মিম, সালেহা ইসহাক সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। বহুমুখী ব্যবসা নিয়ে সদা ব্যস্ত পুরোদস্তর একজন ব্যবসায়ী। তা সত্ত্বেও অবসর পেলেই সপরিবারে ঘুরে যান দেশে-বিদেশে। নানা ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। তিনি সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সদস্য, সিরাজগঞ্জ জেলার ট্রাক মালিক শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহসভাপতি, সিরাজগঞ্জ ট্রাক মালিক গ্রুপ এবং সিরাজগঞ্জ মোটরপার্টস দোকান মালিক সমিতির সাবেক ক্যাশিয়ার। এ ছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ থাকলেও সময়ের অভাবে তা হয়ে ওঠে না। বর্তমানে তাঁর রয়েছে তিনটি শোরুম ও তিনটি গোডাউন। বিভিন্ন ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে ১০ জন ব্যবসা সহযোগী এবং অন্তত ৪০ জন শ্রমিক-কর্মচারী। এ ছাড়া ক্রেতাদের দোরগোড়ায় সিমেন্ট পৌঁছে দিতে রয়েছে সব ধরনের পরিবহনব্যবস্থা।

ব্যবসায়ী ফিরোজ যে ব্যবসায় হাত দিয়েছেন, তাতেই পেয়েছেন সফলতা। তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফ্রিজ, এলইডি টিভি, স্মার্টফোন, স্বর্ণালংকার প্রভৃতি। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার। কিন্তু তাঁর অভাবনীয় এ সাফল্যের রহস্য আসলে কী? তিনি মনে করেন, ‘পরিশ্রমের মাধ্যমেই ব্যবসায় এগোনো সম্ভব। শ্রমের কোনো বিকল্প নেই! তা ছাড়া থাকতে হবে পরিকল্পনা। সততায় কোনো আপস নয়। আর এই সূত্রগুলো অনুসরণ করলেই যে কেউ সুব্যবসায়ী হিসেবে হতে পারেন সুপ্রতিষ্ঠিত।’

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top