মা-ই যাঁর সফলতার মূলমন্ত্র 

‘বাবার হাত ধরেই ব্যবসায় আসা। পড়ালেখার ফাঁকে যখনই সময় পেতাম, বাবাকে ব্যবসায় সহযোগিতা করতাম। তখন আমাদের উঠতি ব্যবসা। কিন্তু হঠাৎ করেই বাবার অকালপ্রয়াণ সবকিছু এলোমেলো করে দিল; দিশেহারা হয়ে পড়লাম আমি। কী করব না করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমন ক্রান্তিলগ্নে মা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসার হাল তোকেই ধরতে হবে। তিনি তোকে যেভাবে ব্যবসায় সহায়তা করতেন, আমিও ঠিক তেমনটাই করব।’ মায়ের এমন অনুপ্রেরণাতেই ব্যবসাটাকেই আঁকড়ে ধরি। এরপর অনেক বাধা পেরিয়ে দাঁড় করাই ব্যবসাকে। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন উদীয়মান তরুণ নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী আলী আহম্মেদ মাসুম। কৃষ্টপুর, আলিয়া মাদ্রাসা রোড, ময়মনসিংহের ‘মেসার্স তাজুল এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব উদীয়মান তরুণ এ মানুষটির সাফল্যরহস্য। সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মাদুল্লাহ খান জাকী ও জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা শরীফ উল্লাহ সবুজ।

ব্যবসায়ী আলী আহম্মেদ মাসুমের জন্ম ১৯৮৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ সদরে। বাবা মরহুম তাজুল ইসলাম সুলতান ও মা মমতাজ বেগম। পরিবারে তিনি ছাড়াও আছেন বড় এক বোন। ১৯৯৮ সালে মুকুল নিকেতন, ময়মনসিংহ থেকে মাধ্যমিক, ২০০০ সালে নাসিরাবাদ কলেজ, ময়মনসিংহ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ২০০৬ সালে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি তাঁর বাবার ব্যবসায় সময় দিতেন। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে স্থায়ীভাবেই ব্যবসায় থিতু হন। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্টের ময়মনসিংহ টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ রিটেইলার। এ ছাড়া তাঁর ব্যবসায়িক পণ্যের মধ্যে রয়েছে রড, গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলা। বর্তমানে নির্মাণপণ্যের একটি শোরুম ছাড়াও তাঁর রয়েছে দুটি গোডাউন।  

সিমেন্ট ব্যবসার প্রারম্ভে ব্যবসায়ী মাসুম ও তাঁর বাবা তাজুল ইসলাম অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে; মাত্র ১০০ ব্যাগ সিমেন্ট দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বিক্রি কিছুটা বাড়লেও এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০০-৫০০ ব্যাগে। একপর্যায়ে আকিজ সিমেন্ট বিক্রি শুরু করেন। স্বল্পসময়ে পণ্যটি বিক্রিতে পান অভাবনীয় সাফল্য। বছর যেতে না-যেতেই তিনি হয়ে ওঠেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ময়মনসিংহ টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। ব্যবসা শুরুর দ্বিতীয় বছরেই অত্র টেরিটরিতে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রেতার গৌরব অর্জন করেন। পরবর্তী বছরগুলোতেও থাকেন সেরা বিক্রেতার তালিকায়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পণ্য বিক্রির এমন অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, এসি, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রো ওভেন, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার।

ব্যবসায়ী আলী আহম্মেদ মাসুমের বাবা দেশীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ব্যবসা। প্রাথমিক পর্যায়ে একটি গিফ্ট শপ এবং পরে মোবাইল ফোন সেবা ও এক্সেসরিজ বিক্রি করতেন। ২০০৬-০৭ সালের দিকে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো ময়মনসিংহ শহরেও লাগে উন্নয়নের ছোঁয়া। নির্মিত হতে থাকে বহুতল ভবন, শপিং কমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো। এতে নির্মাণপণ্যের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এই ব্যবসাটির সম্ভাবনা উপলব্ধি করে নির্মাণপণ্যের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। স্বল্পসময়েই ব্যবসাটিকে বেশ ভালোভাবে গুছিয়ে নিয়ে লাভজনক একটি ব্যবসায় পরিণত করেন। কিন্তু হঠাৎই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এ পরিস্থিতিতে আলী আহম্মেদ মাসুম মানসিকভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। তাঁর একার পক্ষে এই ব্যবসা সামলানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। প্রবাসী মামারা তাঁকে বিদেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একমাত্র ছেলে হওয়ায় তাঁর মা যেতে দিতে রাজি হননি। বরং তাঁকে বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসার হাল ধরতে বলেন। তাঁকে সাহস দেন; অনুপ্রাণিত করেন। শুধু তা-ই নয়, একজন মহিলা হয়েও ব্যবসায় অনেক সময় দেন। ব্যবসায়ী মাসুম যখন সাইট ভিজিট, সাইটে পণ্য পৌঁছানো ও বকেয়া আদায় করতে যেতেন, তখন তিনি দোকানে বসতেন। কোনো ম্যানেজার রাখতে দেননি বরং নিজেই সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। এখন আগের মতো সময় দিতে না পারলেও ব্যবসার যাবতীয় খোঁজখবর রাখেন। 

ব্যবসায়ী মাসুম বাবার কাছ থেকে শুধু ব্যবসার কৌশলই নয় বরং নৈতিকতাও শিখেছেন। আর তাঁর অবর্তমানে মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন অনুপ্রেরণা ও সাহস। মেধা, মনন, একাগ্রতা ও পরিশ্রমের বলে তিনি হয়েছেন সফল। তা ছাড়া ব্যবসা উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন নির্মাণ সাইটে গিয়ে ইজ্ঞিনিয়ার, মিস্ত্রি ও নির্মাতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের ভালো মানের পণ্য কিনতে উৎসাহিত করেন। পণ্য বাকিতে দিলেও তাঁদেরই দেন, যাঁদের টাকার থেকে সম্মানের মূল্য বেশি। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি থেকেও সব সময় পান পর্যাপ্ত সহযোগিতা। বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মাদউল্লাহ খান জ্যাকির প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা অশেষ।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৯

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top