মনের শক্তিতে ব্যবসায়িক সাফল্য

বাল্যকাল থেকেই মেধাবী ছাত্রের সুখ্যাতি তাঁর। প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান হওয়া চাই চাই। কিন্তু অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় সহপাঠীদের মধ্যে হওয়া একটি শর্ত ভঙ্গ করেন কয়েকজন। ফলে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব চলে যায় অন্য সহপাঠীর কাছে। বন্ধুদের এমন আচরণ মন থেকে মেনে নিতে পারেননি আজও। প্রবল অভিমান জন্মে মনে। ছুটি দেন শিক্ষাজীবনকে। শুরু করেন ব্যবসা। আত্মবিশ্বাস, মেধা ও পরিশ্রমের সুবাদে কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার অন্যতম সেরা নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। সফল এ ব্যবসায়ীর নাম মো. আমান উল্লাহ। মিনার বাড়ি, বালুচর, বন্দর, নারায়ণগঞ্জের ‘মেসার্স হোসাইন ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব সফল এ ব্যবসায়ীর বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনি। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. আসমত আলী।

ব্যবসায়ী মো. আমান উল্লাহর জন্ম ১৯৭৬ সালের ৩০ জুন বালুচর, নারায়ণগঞ্জে। তাঁর পিতা মো. মোক্তার হোসেন ও মা মরহুমা রাহিমা বেগম। তিনি মিরকুণ্ডি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষারত অবস্থায় কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। প্রায় দুই বছর যাবৎ ওয়ার্কশপে কাজ শেখেন গ্রিল তৈরির। এরপর ২০০১ সালে অংশীদারি ভিত্তিতে গড়ে তোলেন একটি গ্রিল ওয়ার্কশপ। এই ব্যবসার জন্য তাঁর বাবার কাছ থেকে পান মাত্র ২২ হাজার টাকা এবং অপর অংশীদার বিনিয়োগ করেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। এই স্বল্প মূলধন ও ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করলেও নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও একনিষ্ঠতায় কয়েক দিনের মধ্যেই সাফল্য পেতে শুরু করেন। কাজ পেতে থাকেন প্রত্যাশারও অধিক। তা সত্ত্বেও যৌথ মালিকানার এ ব্যবসাটি তাঁর মনঃপূত হচ্ছিল না। উন্নতির আশায় অংশীদারি ব্যবসা ছেড়ে এককভাবে ব্যবসা শুরু করেন। মিনার বাড়িতে একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন ওয়ার্কশপ। এ পর্যায়ে ব্যবসাটি আগের তুলনায় সমৃদ্ধি লাভ করে। চলমান এ ব্যবসায় বিপর্যয় হয়ে দাঁড়ায় রডের দাম অসম বৃদ্ধি। ব্যবসায় দেখা দেয় মন্দাভাব। তখন ওয়ার্কশপটি ভাড়া দিয়ে গড়ে তোলেন কসমেটিকস সামগ্রী ও কাপড়ের পৃথক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রডের দাম কমলে ওয়ার্কশপ ব্যবসাটি আবার শুরু করলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় তা ছেড়ে ২০১৩ সালে নতুনভাবে প্রবেশ করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসার জগতে।

গ্রিল ওয়ার্কশপের ব্যবসা থেকেই ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ ধারণা পান নির্মাণপণ্য ব্যবসার। মূলত তিনি বিক্রি করেন রড ও সিমেন্ট। ব্যবসা শুরুর কিছুদিন পর থেকেই বিক্রি করছেন আকিজ সিমেন্ট। গুণগত মানের এ পণ্যটি বিক্রির ফলে স্বল্পসময়ে সিমেন্ট বিক্রিতে তিনি পান অনন্য সাড়া; হয়ে ওঠেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ-২ টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অত্র টেরিটরিতে আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে প্রথম স্থান অধিকার করায় স্থানীয় পরিবেশকের কাছ থেকে অর্জন করেন বেস্ট সেলার অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া তাঁর নজরকাড়া সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন, ল্যাপটপ, আইপিএস, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ অসংখ্য উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার।

তরুণ ব্যবসায়ী আমান উল্লাহর ব্যবসায় সফলতার মূলমন্ত্র জেনে, বুঝে, মন থেকে ব্যবসা করা।  অত্যন্ত পরিশ্রম করেন ব্যবসার উন্নয়নে। এলাকার সবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ। সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে। পণ্য কিনতে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ক্রেতারা আসেন ন্যায্য মূল্যে মানসম্মত পণ্য পাবেন এ বিশ্বাসে। তাঁর বাবা ও ভাইও ব্যবসায় যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। টাকা হলেও যেমন ব্যবসা হয় না, টাকা ছাড়াও হয় না। ব্যবসা করতে হয় সময়, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে।

ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ বিয়ে করেছেন ২০০৭ সালে। সহধর্মিণী সাজেদা আমান। তাঁদের একমাত্র ছেলে মো. হোসাইন আদর্শ কিন্ডারগার্টেন মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কাজেও জড়িত। দরিদ্র মানুষকে নিজের সাধ্যমতো উপকার করতে চেষ্টা করেন। কাউকে হয়তো বাড়ি বানিয়ে দেন, কাউকে-বা সেলাই মেশিন কিনে দেন অথবা কোনো দরিদ্র পল্লিতে স্থাপন করেন নলকূপ। ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানাসহ ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানেও অনুদান ও জাকাত দেন নিয়মিত।

বর্তমানে ব্যবসায়ী আমানের রয়েছে চারটি নির্মাণপণ্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেগুলো সব ভাড়া দোকানে। তাঁর একান্ত ইচ্ছা নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটিকে নিজস্ব জায়গায় আরও বড় পরিসর করার। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যদি সম্ভাবনাময় ব্যবসা পান, তবে হয়তো সে ব্যবসায়ও তিনি রাখবেন তাঁর সরব পদচারনা। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান এ ব্যবসায়ী জানেন তিনি যে ব্যবসাতেই হাত দেবেন তাতেই পাবেন সফলতা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top