বৈচিত্র্যময় নদী সন্ধ্যা। নদীর দুই পারে কখনো বসতি, কখনো সবুজ খেত, কখনো-বা বাজার। জেলেদের জালে ধরা পড়ে রুপালি ইলিশ, পাঙ্গাশ, আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছ। নদীমাতৃক এই জনপদের নাম বরিশাল। এ অঞ্চলের একজন সফল ব্যবসায়ী হাজি মো. শাহীন হাওলাদার। রাহুৎকাঠি বাজার, বাবুগঞ্জ, বরিশালের ‘মেসার্স সিয়াম সিফাত ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধনের নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব সফল এ মানুষটির সাফল্য-রহস্য। সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির এরিয়া-ইন-চার্জ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
ব্যবসায়ী মো. শাহীন হাওলাদার ১৯৬৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ইদিলকারী, বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম মো. হোসাইন হাওলাদার ও মা মরহুমা মোছা. সকিনা বেগম। তিনি ১৯৮৫ সালে চরসাধুকাঠি ইসলামিয়া সি. মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ১৯৮৭ সালে কাসেমাবাদ ইসলামিয়া কামেল মাদ্রাসা থেকে আলেম সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৯০ সালে জীবিকার অনে¦ষণে পাড়ি জমান সৌদি আরব। সেখানে একটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে চাকরি নেন। চাকরিকালীন মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশ ঘোরার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। প্রায় ২০ বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট, বাবুগঞ্জ, বরিশাল টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ ডিলার।
ব্যবসা সম্পর্কে সামান্যই ধারণা ছিল শাহীন হাওলাদারের। মূলধনও ছিল সীমিত। আসবাব বলতে একটি চেয়ার আর একটি টেবিল। দীর্ঘদিন বিদেশ থেকেও সামান্যই অর্থ জমাতে পেরেছিলেন, কারণ পরিবারের মায়ায় বছরে অন্তত দুইবার দেশে আসতেন। অনভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক অজ্ঞতার কারণে কয়েক দিনের মধ্যেই লোকসানের কবলে পড়েন। সরল বিশ^াসে বাকিতে পণ্য বিক্রি করায় অনেক টাকা আটকে যায়। দিশেহারা শাহীন সিদ্ধান্ত নেন বিদেশ ফিরে যাবেন। সে সময় পাশে দাঁড়ান তাঁর সহধর্মিণী। তাঁকে সাহস দেন; নিজের কিছু গয়না তাঁর হাতে তুলে দেন। নতুন করে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। তবে এবার অন্যের বুদ্ধিতে নয় বরং আগের ভুল-ত্রুটি শুধরে; বুঝে-শুনেই এগোতে থাকেন। প্রাধান্য দেন গুণগত মানের পণ্য বিক্রিতে।
এ পর্যায়ে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে; মাত্র ৫০ ব্যাগ আকিজ সিমেন্ট দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। স্বল্প সময়ে গুণগতমানের এ পণ্যটি বিক্রিতে পান ব্যাপক সাফল্য। দ্রুতই হয়ে ওঠেন পণ্যটির বরিশাল টেরিটরির একজন সেরা বিক্রেতা। বেশ কিছুদিন খুচরা বিক্রির একপর্যায়ে কোম্পানির প্রতিনিধিগণ তাঁকে ডিলারশিপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনিও গ্রহণ করেন আকিজ সিমেন্ট ডিলারশিপ। প্রত্যন্ত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ঐকান্তিক পরিশ্রম ও ব্যবসায়িক কৌশলে স্বল্পসময়েই তিনি অর্জন করেন কাক্সিক্ষত লক্ষ্য। প্রতিনিয়তই বাড়তে থাকে তাঁর বিক্রয় পরিসর।
হাজি মো. শাহীন হাওলাদার সব সময়ই বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছেন বিধায় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রো ওভেন, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় ভ্রমণ অফার পেয়েছেন আমেরিকা, থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ। সিমেন্ট ছাড়াও বার্জার, এশিয়া, নেরোলাক, নিপ্পন ও আকিজ প্লাস্টিকের স্থানীয় ডিলার তিনি। তাঁর ব্যবসায়িক পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইট, খোয়া, বালু, রং, প্লাস্টিক পণ্য। বর্তমানে ২টি শোরুম ছাড়াও রয়েছে ৩টি গোডাউন, স মিল ও ৩টি ট্রলি গাড়ি। এসব ব্যবসায় জড়িত ২০ জন শ্রমিক-কর্মচারী।
ব্যবসায়ী মো. শাহীন হাওলাদার বিয়ে করেন ২০০০ সালে। স্ত্রী ইশরাত জাহান বেবি। এ দম্পতির দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. রায়হান সিফাত, বরিশাল মাহমুদিয়া মাদ্রাসা থেকে কোরআনে হাফেজ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবসা ‘মেসার্স সওদা ট্রেডার্স’ পরিচালনা করছেন। মেজো ছেলে মো. সিয়াম, চরসাধুকাঠি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ১০ পারা ও ছোট মেয়ে মোছা. সওদা মনি, দক্ষিণ রাকুদিয়া জৈনপুরি মাদ্রাসায় পঞ্চম জামাতে অধ্যয়নরত। ব্যবসার পাশাপাশি শাহীন হাওলাদার সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনের সঙ্গেও জড়িত। তিনি চরসাধুকাঠি ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার গভর্নিং বোর্ডের সদস্য, নিজ গ্রামের মসজিদ ও মাদ্রাসার সভাপতি এবং স্থানীয় বাজার মসজিদের সেক্রেটারি। এ ছাড়া স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি।
ব্যবসায়ী শাহীন হাওলাদারের সাফল্যের অন্যতম কারণ তাঁর সততা ও সবার সঙ্গে আন্তরিকতা। তিনি চেষ্টা করেন সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে। কোনো ক্রেতাকেই তিনি ছোট করে দেখেন না, চেষ্টা করেন আপ্যায়ন করতে। তা ছাড়া তাঁর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শ্রমিক-কর্মচারীদের নিজ পরিবারের অংশ মনে করেন। তাঁদের যেকোনো বিপদ-আপদে পাশে থাকেন। ফলে দীর্ঘ ব্যবসায়ী জীবনে তাঁকে কেউ ছেড়ে যায়নি বরং ব্যবসা উন্নয়নে হয়েছে সহযোগী। এভাবেই তিনি অব্যাহত রেখেছেন তাঁর অগ্রযাত্রা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, জুলাই ২০২১।