আত্মবিশ্বাসীরাই ব্যবসায় সফল হয়

সবুজ মাঠের বুক চিরে দীর্ঘ পিচঢালা পথ। গাছের ফাঁক গলে দুপুরের সোনা রোদ ঠিকরে পড়ছে পথের ওপর। ঝিরিঝিরি বাতাসের দোলায় চলছে আলো-ছায়ার মায়াবী খেলা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জ থেকে আলাদা হয়েছে সড়কটি। পিচঢালা এ পথ ধরে, পাখির কলতান শুনতে শুনতে পৌঁছালাম হবিগঞ্জে। এ শহরের একজন তরুণ ও উদীয়মান নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন টিটু। শহরের আনোয়ারপুর বাইপাস রোডের ‘তাইবা করপোরেশন’-এর স্বত্বাধিকারী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক কনিষ্ঠ বিক্রয় কর্মকর্তা ইমাম মেহেদী হাসান-এর সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব তরুণ এ ব্যবসায়ীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

তরুণ ব্যবসায়ী টিটুর জন্ম ১৯৮৫ সালের ২ অক্টোবর, হবিগঞ্জের ওমেদনগরে। বাবা মো. আব্দুস সামাদ ও মা জায়েদা বেগম। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। হবিগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০০১ সালে মাধ্যমিক ও শচীন্দ্র কলেজ থেকে ২০০৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর যোগ দেন একটি বিমা কোম্পানিতে। দীর্ঘ আট বছরের চাকরিজীবনে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন প্রতিষ্ঠানটিতে। পরিবারের সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। টিটুর স্বপ্ন ছিল তাঁদেরও ছাড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু চাকরি করে আদৌও তা সম্ভব নয়। এ জন্য নিতে হবে ভিন্ন পথ। এই আত্ম-উপলব্ধি থেকেই সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসার। কিন্তু কী ব্যবসা করবেন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। পরামর্শের জন্য শরণাপন্ন হন বড় ভাইয়ের বন্ধুর, শহরের একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী, মো. নজরুল হোসেনের। তিনি সিমেন্ট ব্যবসার সম্ভাবনার কথা জানান। টিটু বুঝতে পারেন শহরে যেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে সিমেন্ট ব্যবসায় নিঃসন্দেহে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই দেরি না করে ২০১২ সালেই শুরু করেন সিমেন্ট ব্যবসা। পরে এতে যুক্ত হয় রড, টিন ও হার্ডওয়্যারসামগ্রী।

তরুণ ব্যবসায়ী টিটুর ব্যবসা সম্পর্কে পূর্বঅভিজ্ঞতা তেমন ছিল না। অথচ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে নিজেকে তিনি সফল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্জন করেছেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লি., হবিগঞ্জ সদর উপজেলার এক্সক্লুসিভ ডিলার হওয়ার বিরল কৃতিত্ব। আর এসব সম্ভব হয়েছে তাঁর সততা, পরিশ্রম ও ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে। এ ছাড়া শহরে তাঁদের পারিবারিক পরিচিতি ও সুনাম ব্যবসা প্রসারে সহায়ক হয়েছে। তাঁর ছোট চাচা মো. আবুল হাসিম হবিগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান কাউন্সিলর ও সাবেক প্যানেল মেয়র। তাঁর পরিচিতির কল্যাণেও তিনি অনেক ক্রেতা-শুভাকাঙ্খী পেয়েছেন। ফলে ক্রমেই বেড়েছে পণ্য বিক্রির পরিসর। সেরা বিক্রেতার সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন ট্যাব, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসেট, নগদ টাকাসহ নানা সামগ্রী। এ ছাড়া ভ্রমণের জন্য অফার পেয়েছেন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড যাওয়ার। ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় সব জায়গায় যেতে না পারলেও কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানির পক্ষ থেকে যাবেন থাইল্যান্ড সফরে।

ব্যবসায়ী টিটু ছেলেবেলা থেকেই খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি স্থানীয় লিটল ফ্লাওয়ার কেজি অ্যান্ড হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল, হবিগঞ্জের শ্রম-বিষয়ক সম্পাদক, প্রকল্পাধীন হবিগঞ্জ হোমিও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, হবিগঞ্জ সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি এবং হবিগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের একজন সম্মানিত সদস্য। হবিগঞ্জ সমাজকল্যাণ সংস্থা থেকে নিয়মিত রক্তদান, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, দুস্থদের সাহায্যের পাশাপাশি খেলাধুলায় সহায়তা করা হয়। ব্যবসা নিয়েই তাঁর যত ব্যস্ততা, তবুও চেষ্টা করেন পরিবারকে সময় দিতে। এ ছাড়া অবসর পেলেই ছুটে যান কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে। সেখানে মেডিটেশন (ধ্যান) করেন, বক্তব্য শোনেন, বই পড়েন। এই মেডিটেশন তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখে, আত্মবিশ্বাসী ও ধৈর্যশীল হতে শেখায়। ব্যবসায়ী টিটু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে না করলেও আকদ সম্পন্ন করেছেন। তাঁর বাগদত্তা জেনি আক্তার। বিয়ের পর্বটাও শেষ করবেন খুব শিগগিরই।

মাত্র ১০০ বস্তা সিমেন্ট দিয়েই শুরু যে ব্যবসার, আজ তা রূপ নিয়েছে বিশালাকার। শুরুর ১০০ বস্তা সিমেন্ট কয়েক দিনেই বিক্রি হয়ে যায়। এবার কম পণ্য নয়, প্রয়োজন আরও বেশি পণ্যের। চরম আত্মবিশ্বাস ও সাহসের বলে বলীয়ান হলেন তিনি। উপলব্ধি করলেন নিজের প্রতি আস্থা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন নবীন ব্যবসায়ীও হতে পারেন সফল ব্যবসায়ী, যে চেতনা আজও বুকে লালন করে এগিয়ে চলেছেন সম্মুখপানে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৫তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top