প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সৎ হোন

গ্রীষ্মের দুপুর। তেজোদীপ্ত সূর্যটা ঠিক মধ্য গগনে। চারদিকে ঝলমলে রোদ, সঙ্গে তীব্র গরম। রাস্তার পিচ মনে হয় গলতে শুরু করেছে। দুই পাশে সারি সারি গাছের ছায়ায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও মাঝে মাঝেই লাগছে গরমের হলকা। সজোরে চলছে আমাদের মোটরসাইকেল। যাচ্ছি যশোরের অদূরে মনিরামপুর বাজারে। তীব্র দাবদাহে বাজার অনেকটাই জনশূন্য। অলস সময় কাটাচ্ছেন দোকানিরা। বাজারের প্রাণকেন্দ্রেই ‘মেসার্স ইমন এন্টারপ্রাইস’। এ জনপদের একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. বজলুর রহমান গাজী। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী তিনি। তাঁর ব্যবসায় সফলতার রহস্য জানতেই এখানে আসা। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম। কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান ব্যবসায়ী জীবনের নানা কথা। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে সফল এ ব্যবসায়ীর কথকতা।

ব্যবসায়ী মো. বজলুর রহমান গাজীর জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৩ আগস্ট যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কামালপুরে। বাবা মরহুম হাজি হাজের আলী গাজী ও মা মোছা. আমেনা খাতুন। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে ষষ্ঠ। মনিরামপুর সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর জড়িয়ে যান ব্যবসায়ে। পারিবারিকভাবেই তাঁরা ব্যবসায়ী। বাবা করতেন পাটের ব্যবসা। বড় ভাই ছিলেন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর একজন পরিবেশক। মূলত বড় ভাইয়ের কাছ থেকেই নির্মাণপণ্যের ব্যবসাটিকে নিজ দায়িত্বে নেন বজলুর রহমান। শুরুতে পণ্য তালিকায় সিমেন্ট ও রড থাকলেও পর্যায়ক্রমে যুক্ত হয় সিলিন্ডার গ্যাস ও চুলা।

সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য পথ পাড়ি দিয়ে আজ একজন অভিজ্ঞ ও সফল ব্যবসায়ী বজলুর রহমান গাজী। ব্যবসার শুরুটা ছিল কিশোর বয়সে। ব্যবসা শুরুর জন্য মূলধন পেয়েছিলেন মাত্র ১৩ হাজার টাকা। পরিমাণটা নির্মাণপণ্যের ব্যবসায় যৎসামান্যই বলা যায়। এ মূলধনে ব্যবসা দাঁড় করানো কঠিন হলেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। পরিশ্রম, মেধা, কৌশল ও ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের মাধ্যমে এগিয়ে যান তিনি। ক্রমেই বাড়ে ব্যবসার পরিসর। এমন উন্নতি দেখে বাবা তাঁকে আরও কিছু অর্থ-সহায়তা দেন, যা ব্যবসায় আনে নব জোয়ার। পর্যাপ্ত পণ্য সংস্থান নিশ্চিত করায় হয়ে ওঠেন একজন সফল ব্যবসায়ী। একপর্যায়ে অর্জন করেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানিসহ অন্য একটি সিমেন্ট কোম্পানির সম্মানিত পরিবেশক হওয়ার গৌরব। মনিরামপুর উপজেলা শহর হওয়া সত্ত্বেও মেসার্স ইমন এন্টারপ্রাইসের পণ্য বিক্রির হার উল্লেখযোগ্য। প্রতিমাসের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১২৫ শতাংশ আকিজ সিমেন্ট বেশি বিক্রি হয় তাঁর দোকানে। অন্যান্য পণ্য বিক্রিতেও অনবদ্য তাঁর ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। ফলে উপহারস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ডিজিটাল ক্যামেরা, রুম ডেকোরেশন পণ্য, নগদ টাকাসহ নানা সামগ্রী। এ ছাড়া চীন ও সৌদি আরবে ওমরাহ হজসহ বিভিন্ন ভ্রমণের অফারও পেয়েছেন তিনি।

ব্যবসায়িক সফলতার অন্যতম মন্ত্র তাঁর সুনাম। সব সময় চেষ্টা করেন সৎভাবে ব্যবসা করতে। পণ্য বিক্রিতে জ্ঞানত কখনো কাউকে ফাঁকি দেন না। নির্মাণপণ্যের মাধ্যমেই ব্যবসায়িক আত্মপ্রকাশ ঘটলেও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়েছেন নিজেকে। বর্তমানে তাঁর সাতটি ট্রাক, একটি বাস ও একটি মাইক্রোবাস রয়েছে। এসব ব্যবসার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে ২৫-৩০ জন মানুষের কর্মসংস্থান। নির্মাণপণ্যের ব্যবসায় তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করেন ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম। ব্যবসার পাশাপাশি নেতৃত্ব ও সামাজিক নানা কাজের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। তিনি মনিরামপুর ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি এবং উপজেলা জামে মসজিদের হিসাবরক্ষক। ভূমিহীন অসহায় মানুষের জন্য নিজ এলাকায় কিছু বাড়ি নির্মাণ করে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন। ইচ্ছে আছে আরও কিছু আবাসন তৈরির। স্থানীয় মাদাইনগর মাদ্রাসার এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মিনিবাসও দান করেছেন। এ ছাড়া নিজ এলাকার অসহায় মানুষদের নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকেন।

ব্যবসায়ী বজলুর রহমান গাজী বিয়ে করেছেন ১৯৮৭ সালে। সহধর্মিণী কোহিনুর পারভীন। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড় মেয়ে তাজমিন নাহার হিরা যশোর এমএম কলেজে বোটানি এবং ছোট মেয়ে তাজনীন নাহার হিমা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ফার্মেসিতে অনার্স পড়ছে। বড় ছেলে সাজেদুর রহমান ইমন মনিরামপুর সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে এবং ছোট ছেলে ওয়াহিদুর রহমান ইয়াদ প্রতিভা বিদ্যাপীঠে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে।

ব্যবসায়িক সফলতা পেতে সততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকে মূলমন্ত্র মনে করেন সফল এ ব্যবসায়ী। সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে সৎভাবে ব্যবসা করলে ব্যবসায় মূলধনই মুখ্য নয়। নিজের প্রতিশ্রুতি ঠিক রাখলে ব্যবসায় উন্নতি হবেই। 

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top