আকস্মিক বন্যার সহজ সমাধান

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশ ষড়্্ঋতুর দেশ, এসব কথা আমরা যেন ভুলতে বসেছি। আমাদের দেশ এখন মোটেও নদীমাতৃক নয়। অনেক নদীই এখন ভরাট। নদীতে অসংখ্য ময়লা-আবর্জনা ফেলায় সৃষ্টি হয়েছে চরের। ফলে বর্ষা এলেই এখানে দেখা দেয় বন্যা। এই বন্যা যেনতেন বন্যা নয়, একেবারে বিধ্বংসী বন্যা। এ ধরনের বন্যায় কি শিকার কেবলই আমরা? তা কিন্তু নয়। পৃথিবীর পুরোটাই এখন একই সমস্যার সম্মুখীন। আমরাই ওজোনস্তর ধ্বংস করে সমগ্র পৃথিবীকে আস্ত একটা গ্রিন হাউসে পরিণত করছি। তাই ক্রমেই গলছে বিশালাকৃতির বরফখণ্ড। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এতে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখছেন বিজ্ঞানীরা। আর এর মধ্যেও তো হুটহাট বন্যা রয়েছেই। বন্যানিয়ন্ত্রণে প্রচলিত উপায় বাঁধ দেওয়া, যা অনেকটাই স্থায়ী ব্যবস্থা। কিন্তু সাময়িক বন্যা মোকাবিলায় স্থায়ী বাঁধ মোটেও উপযোগী নয়। আর এ সমস্যাটির সমাধানে বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন আধুনিক ও সহজ প্রযুক্তির বন্যানিয়ন্ত্রণের নানা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার ফলে আমরা হঠাৎ ঘটে যাওয়া বন্যা থেকে রক্ষা পেতে পারি। কিন্তু কীভাবে? আসুন জেনে নিই সেসব বন্যা নিয়ন্ত্রণের সুব্যবস্থা সম্পর্কে।

ওয়াটারগেইট ফ্লাড ব্যারিয়ার

এটি এমনই একটি প্রোডাক্ট, যেটি পিভিসি বা পলিভিনাইল ম্যাটেরিয়েলে তৈরি। এটি পাওয়া যায় ৬ ফুট থেকে শুরু করে ৬০ ফুট পর্যন্ত। এটি এতটাই নরম যে ভাঁজ করে যেকোনো স্থানে রেখে দেওয়া যায়। আবার কাজের সময় পানির স্রোতের সামনে ফেলে দিলেই কাজ শেষ। এটি নিজে থেকেই সব পানি আটকে দেওয়ার কাজটা করে সুন্দরভাবে।

যেদিক থেকে পানির স্রোত আসছে, সেদিকে এটি বিছিয়ে দিতে হয়। খুব সহজেই এটি পানি দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়। আর একবার এর ভেতরে পানি ঢুকলেই এর পকেটগুলো সব পানিতে ভরে যায়। আর পানির নিজের ওজনের কারণেই এটা বাড়তি পানিকে সামনের দিকে এগোতে বাঁধা দেয়। খুবই সহজ প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো একটা গ্রামকে রক্ষা করা যায়। তবে পানির উচ্চতা অনেক বেশি হলে সাধারণত এটি কাজ করে না। দেখা যায় এটি যদি কোনো একটি এলাকায় একটি বাড়ির চারপাশে বিছিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুরো গ্রাম বা এলাকা ডুবে গেলেও টানা কয়েক দিন সেই নির্দিষ্ট বাড়িতে কোনো বন্যা হয় না। নিম্নাঞ্চল বেশি হলে এটি ব্যবহার না করাই উত্তম। এটি পানির একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে। পানি আসার সময় এটি পানি আটকে ধীরে ধীরে পানি সামনের গেট দিয়ে বের করে দেয়। ফলে পানির উচ্চতা থাকে সমান। তবে অতিরিক্ত স্রোত এলে এটি কাজ না করার সম্ভাবনা প্রবল।

অটোমেটিক ফ্লাড ব্যারিয়ার

শহুরে বন্যা আটকাতে এর জুড়িমেলা নেই। বন্যা যেমনই হোক, এটি পানি জমার পর থেকেই কাজ শুরু করে। পানি যত উঁচু হবে, এর গেট অংশ ততই ওপরের দিকে উঠতে থাকবে। পানি উচ্চতা ১০ ইঞ্চি হলেই এটি পুরো খুলে যাবে। আর একটি শহুরে বাড়ির গেটে এটি স্থাপন করা গেলে পুরো বাড়িকেই এটি রক্ষা করবে। বাড়ির আঙিনা বা রাস্তা যেখানে শেষ, সেখানে এটি স্থাপন করলে চিত্রের মতোই দেখা যায়। এটির ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটতে কিংবা গাড়ি চলতে পারে। কোনো রকমের সমস্যাই হয় না। কিন্তু একটু পানির ছোঁয়া পেলেই এর প্লাস্টিকের গেটের অংশটি পানিতে ভেসে ওঠে। আর কিছুটা পানির ধাক্কাও এর ভেসে থাকার গুণেই খানিক পরেই এটি ফ্লাড ব্যারিয়ারে রূপ নেয়।

ইউ এস ফ্লাড কন্ট্রোল

এটি ব্যবহারের কিছু ঝুঁকি রয়েছে। বর্ষার সময় আপনি বাড়ি থেকে গাড়ি বের করতে চাইলে এটি আগের অবস্থানে না আসা পর্যন্ত আপনি ঘর থেকে গাড়ি বা নিজে বের হওয়ার জন্য বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে। তবে ক্ষণিকের বন্যা এটি বেশ ভালোভাবেই আটকে দেয়।

টিউব ব্যারিয়ার

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যে ব্যারিয়ার, সেটি হলো টিউব ব্যারিয়ার। এটি বানানো তেমন জটিল কিছু না। বিশালাকারের একটা প্লাস্টিকের থলে বা শিটকে সেলাই করে বাতাসনিরোধী করলেই সহজেই এটি বানিয়ে ফেলা সম্ভব। এখন বাজারেও কিনতে পাওয়া যায় এটি; ২০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। অনেক সময় ২০ ফুটের টিউব একের পর এক জোড়া দিয়ে এটি বানানো হয়। জোড়া দেওয়ার আগে প্রথমে টিউব শোয়ানো হয়। এরপর এর ভেতর বাতাস ভরা হয় মেশিনের মাধ্যমে। পুরো টিউবগুলো বাতাসে ভর্তি হয়ে গেলে যেখানে বাঁধ দিতে হবে, সেখানে বহন করে নিয়ে যেতে হয়। এরপর শুরু হয় আসল কাজ। টিউবগুলোকে বেল্টের সাহায্যে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর এর ভেতর পানি প্রবেশ করানো হয়। একবার এর ভেতর পানি প্রবেশ করলেই এটি স্থায়ী বাঁধের মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে মাঝে মাঝে পুরো শহরকে রক্ষা করা সম্ভব। কোনো নদীর পানি সাময়িক ধরে রেখে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বা পাহাড়ি এলাকায় ছোট্ট বাঁধ তৈরিতে এর জুড়ি নেই।

NOAQ বক্স ওয়াল

খুব দ্রুত কোনো এলাকায় বাঁধ দেওয়ার প্রয়োজন হলে এই NOAQ বক্স ওয়াল ব্যবহার করা হয়। আগের আলোচিত সব কটা বাঁধ ছিল প্লাস্টিকের ব্যাগের মতো। কিন্তু এটি প্লাস্টিকের দেয়াল। এটি টুকরো টুকরো থাকে। যেখানে বন্যা আসার আশঙ্কা আছে সে রকম জায়গায় চট করে এটি বিছিয়ে দিলে সব কটা মিলে এটা বাঁধের মতো আচরণ করে। পানির তোড়ে উড়ে যায় না। অনেকক্ষণ যাবৎ পানি আটকে রাখার সক্ষমতা আছে এর। সবচেয়ে মজার হলো, বন্যা শেষ হলেই এটি টুকরো করে খুলে ভাঁজ করে রেখে দেওয়া যায়।

মেটাল ব্যারিয়ার

মেটাল ব্যারিয়ার হলো লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি টেম্পোরারি ড্যাম, যেটা বাসাবাড়িতে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি ব্যবহারে তেমন জায়গার প্রয়োজন হয় না দেখে এটির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। মাটিতে এক ফুটের একটি স্পেস হলেই সহজেই এটি বসিয়ে দেওয়া যায়। বৃষ্টির পানি বাড়তে শুরু না করা পর্যন্ত এটি বন্ধ থাকে। আর পানি বাড়তে শুরু করলেই এটি বাঁধের মতো খুলে গিয়ে এর কাজ শুরু করে। 

গেডিলাস

মেটাল ব্যারিয়াল ওয়ালগুলো এখন দীর্ঘস্থায়ী ফেন্স হিসেবে ব্যবহারের চল বেড়েছে। বসতবাড়ির চারপাশে বা শহররক্ষা বাঁধের দীর্ঘস্থায়িত্ব বাড়াতে এর জুড়ি নেই। দেখতেও বেশ নান্দনিক, তাই অনেকেই এখন ইটের প্রাচীর বানানোর পরিবর্তে মেটাল ব্যারিয়ার ব্যবহার করছেন, যা একই সঙ্গে সৌন্দর্য ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাড়ি বা শহর রক্ষা করছে। খুব সাধারণ মেটাল লোহা বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রমের ওপর অ্যালুমিনিয়াম শিট বসিয়ে এটি বানানো যায়। একটার সঙ্গে একটা জোড়া লাগিয়ে মাইলের পর মাইল লম্বা বাঁধ তৈরি করে ফেলা সম্ভব। তবে এটিও শক্তিশালী জলস্রোত আটকাতে ক্ষেত্রবিশেষে অপারগ। পানির বেগ অত্যধিক হলে এটি কাজ করে না। সুনামি বা জলকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এটি ব্যবহার করলে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। তাই এটি সাধারণ জলোচ্ছ্বাসে ছাড়া তেমন কোনো সাহায্য মানুষকে করতে পারে না। তবে এটি দিয়ে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা পানির বেগ আটকে ফেলা সম্ভব। প্রায় চার ফুট পর্যন্ত পানি আটকানো যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটির ফ্রেম রয়েল বোল্ট দিয়ে মাটিতে আটকে ফেলে আরও উঁচু প্রাচীর তৈরি করা সম্ভব।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৯।

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top