স্থাপত্যকলার অনন্য রূপকল্প মেটাবলিজম স্থাপত্য

মেটাবলিজম হলো স্থাপত্যের সেই ধারা, যা জাপানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শুরু করেছিলেন সে সময়কার স্থপতিরা। এই ইজমের শুরুর দিকে যে ভাবনাটা সে সময়কার স্থপতিদের মনে কাজ করেছিল তা হলো আমাদের শরীরের ভেতরের মেটাবলিক সিস্টেমের মতো করেই একটা নতুন ইজম দাঁড় করানো। মেটাবলিক সিস্টেমে আমাদের খাদ্যগ্রহণের পর সেই খাদ্যবস্তু ধীরে ধীরে ভেঙে পরিণত হয় এর কণাতে। শরীরের জন্য উপযুক্ত ভিটামিন ও অন্যান্য উপাদানে বিভক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়াটির নাম মেটাবলিক সিস্টেম। স্থপতিরা এই অর্গানিক বায়োলজিক্যাল গ্রোথটি নিয়ে কাজ করেছেন ১৯৬০-এর দিকে। Congres internationaux d’architecture moderne (CIAM)-এর ১৯৫৯ সালের মিটিংয়ে এই ধারণা নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন জাপানের কেঞ্জো তাঙ্গে ইনস্টিটিউটের একজন শিক্ষার্থী। টোকিওর ওয়ার্ল্ড ডিজাইন কনফারেন্স এ জাপানের একদল মেধাবী স্থপতি (কিনোরি কিকুতাকি, কিশু কুরোকাওয়া, ফুমিহিকো মাকি প্রমুখ) এই মেটাবলিজমের মেনিফেস্টো পেশ করেন। তাঁরা সেখানে দেখান এর বিভিন্ন প্রকারাদি, যা কি না মার্ক্সবাদ এবং বায়োলজিক্যাল প্রসেসকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তাঁদের বক্তব্য ছিল আর্কিটেকচার কেন শুধু রেকটেংগুলার বা সারকুলার হবে? এগুলো ভেঙেচুরে অন্য আকৃতির ফর্ম ও বানানো সম্ভব। এই ফর্ম বানানোর পদ্ধতি মানবে না কোনো নিয়ম। বিভিন্ন দিকে, ভাবে ও উপায়ে একেবারেই অজ্যামিতিক ভাঙন সৃষ্টি করবে একটি সুন্দর স্থাপনা।

এই মেনিফেস্টোতে ছিল ওশান সিটি, স্পেস সিটি, গ্র“প ফোরাম এবং ম্যাটেরিয়াল অ্যান্ড ম্যান নামের চারটি অংশ। সেসব অংশে স্থপতিরা দেখিয়েছিলেন ভবিষ্যতে কীভাবে স্থাপত্যকে একটি ছোট্ট ফর্মের ধারণার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে ভেঙে ভেঙে মেটাবলিক সিস্টেমের মতো করে বিভিন্ন দিকে ধাবিত করে নানা মাধ্যমে কীভাবে দৃষ্টিনন্দন ও সমসাময়িকভাবে আরও বেশি ধারণক্ষমতা বিশিষ্ট স্থাপত্যে রূপদান করা যায়। কিন্তু সেবার এটা ছিল কেবল নিতান্তই একটি ধারণা। অনেকটা পদার্থবিদ্যার সূত্রের মতো একটা বিষয়।

এর পরেই মেটাবলিজম নিয়ে কিছু কাজ শুরু করা হয় জাপানে। নাকাজিন ক্যাপসুল টাওয়ারের মধ্যে একটি। স্থপতি কুরোকাওয়া এই ক্যাপসুলের স্থপতি হিসেবে বিশ্বস্থাপত্যে এক নজিরবিহীন বিপ্লব সাধন করেন।

মানুষের জীবনের চলমান সকল দ্বিধাদ্বন্দ্বকে পেছনে ফেলে ছুটে চলা সময়ের পরিব্রাজকদের একত্র করে এক একটি ছোট্ট স্যুট দেওয়ার চিন্তা করেছিলেন কুরোকাওয়া। সবার একটি করে স্যুট থাকবে, যা নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকৃতির চেয়ে একে ভেঙে এর ভেতর থেকে স্পেস বের করে এনে এর মাঝে ক্যাপসুল বসিয়ে মানুষের জন্য জায়গা বের করে নেওয়াই ছিল এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। ১৪০টি এশরুমের ফ্ল্যাট দিয়ে সাজানো এই ক্যাপসুলের প্রতিটির মাপ ছিল  ৪ী২.৫ী২.৫ মিটার। মাঝে একটি ভার্টিক্যাল লিফটকোরের সঙ্গে সংযুক্ত এসব ক্যাপসুল ঝোলাতে প্রতিটিতে তিন ঘণ্টারও কম সময় লেগেছিল। এবং কনস্ট্রাকশনের এক মাসের মধ্যে সবকটি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়ে যায়।

মেটাবলিজম ও সামুদ্রিক নগরের ধারণা

কিকুতাকির সামুদ্রিক নগরের ধারণা আসে এই মেটাবলিজমের হাত ধরেই। একটা শহরকে একটি টাওয়ার এ স্থাপনের আইডিয়া দিয়ে তিনি হয়ে যান বিখ্যাত। এর আগে কেউ কখনো একটা টাওয়ার ভবনে শত শত পরিবারকে রেখে শহর স্থাপনের চিন্তা করেনি। শহর বলতে একটি শহরের প্রতিটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে একটি বাড়ি স্থাপন, যা প্রতিটি প্রয়োজনকে পরিপূর্ণ করবে। এমন চিন্তাভাবনার সঙ্গে আর্কিটেকচারালি মেটাবলিজমকে ব্যবহার করে এর স্থাপত্যগুণ বাড়ানো এবং একটি নান্দনিক চেহারা দেবার মাধ্যমে এই থিওরিটির উদ্ভব। কিকুতাকি ১৯৬০ সালে ‘কিন্দাই কেনচিকু’ নামের ম্যাগাজিনে এ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যাতে তিনি দেখিয়েছিলেন একটি বাড়িতে শুধু স্ল্যাব ওয়াল ও সামুদ্রিক আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে আনা সম্ভব সৌন্দর্য। এই কৃত্রিম আবহকে প্রতিটি তলায় বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন অথচ সন্নিবেশিতভাবেই প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তিনি। এবং এভাবে তিনি একটি যুগান্তকারী ডিজাইন করেছিলেন নাম যার ‘মারিন সিটি’।

হাবিট্যাট ৬৭

স্থপতি মোশেহ শাফদির স্কুলজীবনে শুরু হওয়া এই মেটাবলিজম আর্কিটেকচার নিয়ে যখন পুরো বিশ্ব মেতেছিল, তখন তিনি মাত্র আর্কিটেকচার পড়ছেন ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে। ওনার থিসিস প্রজেক্টে তিনি সর্বপ্রথম ফর্মের ভাঙাচোরা নিয়ে প্রথম গবেষণা করেন। তিনি এই প্রজেক্ট করেছিলেন থিসিসের জন্য। সেখানে তিনি অনেক প্রশংসা পান। কিন্তু এর পরেই চাকরি করতে শুরু করেন। যেনতেন কোথাও নয়। একেবারে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে। স্থপতি লুই কানের কাছে। লুই কান ছিলেন ফরমাল আর্কিটেক্ট। তাঁকে মাস্টার আর্কিটেক্টের খেতাব দেওয়ার আগে থেকেই ফর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন। এবং এসব গবেষণায় কখনোই মেটাবলিজমকে সমর্থন করেননি। মোশেহ শাফদি ওখান থেকে বেড়িয়ে আসেন কদিন পরেই। তারপর স্যান্ডি ভ্যান জিঙ্ক্যালের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তিনি ওখানে থাকা অবস্থায় বিশ্ব স্থাপত্যমেলায় প্রথম প্রজেক্ট শো করেন। ১৯৬৭ সালে এই প্রজেক্ট ছিল একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু শাফদি দমে যাননি। তিনি এর আগের মেটাবলিস্টদের ভুলগুলোকে শুধরে নিয়ে নতুন করে প্ল্যান ডেভেলপ করেন। এবং এর পরেই তিনি মোটামুটি বিখ্যাত হয়ে যান। ১৯৫০ সালের আর্কিটেকচারের ধারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তিনি হ্যাবিট্যাট ৬৭ ডিজাইন করেন। সাফদি পরবর্তী জীবনে এই কাজকে উল্লেখ করেছিলেন রূপকথার সঙ্গে। সরকারি অনুদানের এই বাড়িটি কিন্তু একটি অ্যাপার্টমেন্ট হাউস।

হ্যাবিট্যাট ৬৭-এ মোট ৩৫৪টি আলাদা কংক্রিট ব্লক বসিয়ে পুরো কমপ্লেক্সটি ডিজাইন করা। অনেক খানে এটা বারো তলা পর্যন্ত উঠে গেছে। একটি ভাঙা দেয়ালের মতো দেখতে অংশে মোট ১৫৮টি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় একটা ইউনিট বানানোর জন্য দুটি বা তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট জোড়া দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে একটি করে টেরাস আছে, যা কি না ১০০০ বর্গফুট পর্যন্ত কোনো কোনো ইউনিটে।

মোশেহ শাফদির এই ডিজাইনে মূলত যে কার্যকরিতা তিনি দেখাতে পেরেছিলেন তা হলো প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টে পর্যাপ্ত আলো, বাতাস ও সুন্দর পরিবেশের নিশ্চয়তা। ডিজাইনারের কল্যাণে সেই ’৬৭ সালেই প্রায় অসম্ভব কাজটি তিনি করে দেখিয়েছিলেন। ওনার এই বাড়িটি করার জন্য প্রথম প্রিকাস্ট কংক্রিট ব্লক দিয়ে বানানো ঘর ক্রেন দিয়ে তুলে বসানোর চল শুরু হয়। কারখানায় পুরো বাড়িটি তৈরি করে নিয়ে এসে খালি ক্রেন দিয়ে তোলা হয়েছিল ব্লকগুলো। এতে খরচ কিছুটা বেড়ে গেলেও বিশ্বখ্যাত হয়ে যায় এই বাড়িটি।

মেটাবলিজম স্থাপত্য বাংলাদেশে

বাংলাদেশে মেটাবলিজম টার্মটা বেশ নতুন। বাংলাদেশের আবহাওয়া আর কনস্ট্রাকশন সিস্টেম খুব একটা উন্নত নয়। আর মাটির ক্ষমতা নেই এই দোহাই দিয়ে অনেক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এসব বাড়ির স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং করতে চান না। আর তাই অনেক আর্কিটেক্ট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু কিছু আর্কিটেক্ট ও তাঁদের ফার্ম এখন এসব কাজ বেশ ভালোভাবেই করছে।

মূলত স্ট্রাকচারের নড়বড়ে ভাব কিংবা দেখতে নড়বড়ে মনে হয় দেখেই অনেকেই এসব বাড়ির কাজে হাত দিতে চান না। খরচ তুলনামূলকভাবে একটু বেশি বলে অনেক ক্লায়েন্ট এসব বাড়ি করতে চান না। কিন্তু তবুও কিছু প্রজেক্ট হচ্ছে। যেমন- র‍্যাংগস ব্যাবিলনিয়া করেছেন ‘ভিস্তারা লিমিটেড’-এর স্থপতি মোস্তফা খালিদ পলাশ। উনার অগ্রগম্যতায় এখন অনেক জুনিয়র লেভেলের স্থপতি এসব কাজে এগিয়ে এসেছেন। ফর্মকে ভেঙে এর সঙ্গে স্পেস ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপনে এখন স্থপতি মোস্তফা খালিদ পলাশ একজন অধিনায়কও বটে। তাঁর করা ডিজাইন র‍্যাংগস ব্যাবিলনিয়া এখন প্রায় শেষের পথে। এটা শেষ হয়ে গেলে এটাকে মাইলফলক ধরে মেটাবলিজমের দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের স্থপতিরা, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলার দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের স্থাপত্যকলা এ আশা করাই যায়।

প্রকাশকাল: ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top